আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কখনো-সখনো নাকি আইন ভাঙতে হয়। প্রচলিত বিচার ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাতে হয়; ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে, ক্ষমতা গ্রহণের অল্প দিনের মধ্যেই যিনি বিশ্বব্যাপী এখন আলোচিত চরিত্র-তিনি এরইমধ্যে সেটি প্রমাণ করেছেন।
গত তিন মাসে ফিলিপাইনে আড়াই হাজারেরও বেশি লোক খুন হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে যারা মাদক ব্যবসায়ী, পাচারকারী বা মাদক সংশ্লিষ্ট। এখানে প্রচলিত বিচারব্যবস্থার ধার ধারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কারণ সম্ভবত দুটি- ১. ভয়ঙ্কর অপরাধী বা মাদক মাফিয়াদের বিরুদ্ধে কোনো শক্ত সাক্ষী না পাওয়া, ২. এরকম বিচারবহির্ভূত হত্যার মাধ্যমে সব অপরাধীর মনে ভয় ঢুকিয়ে দেয়া।
কিন্তু এই তরিকায় অপরাধ দমনের সমালোচনাও হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠন তো বটেই, খোদ আদালতও এ বিষয়ে মুখ খুলেছেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট দুতার্তে বিচার বিভাগকে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এই বলে যে, এ বিষয়ে নাক গলালে সামরিক শাসন দেয়া হবে। দুতার্তের মাদক বিরোধী এই যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক আইনে অপরাধ বলে জাতিসংঘের সমালোচনার পর তিনি জাতিসংঘ ছাড়ারও হুমকি দিয়েছেন।
শুধু তাই নয়, মাকিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ফিলিপাইনের এই বিচারবহির্ভূত হত্যার সমালোচনা করায় তাকে সান অব বিচ বলেও গালি দিয়েছেন দুতার্তে। যার প্রতিক্রিয়ায় লাওসে আসিয়ান সম্মেলনে দুতার্তের সঙ্গে বৈঠকও বাতিল করেন ওবামা। যদিও আসিয়ান সম্মেলনের শেষদিনে এ দুই প্রেসিডেন্টের দেখা হয়। খাবার টেবিলে তারা কুশল বিনিময় করেন। এর আগেই অবশ্য দুতার্তে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ব্যক্তিগত আক্রমণের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।
নির্বাচনী প্রচারাভিযানেই দুতার্তে অঙ্গীকার করেছিলেন, যে ক্ষমতায় এলে দুই মাসের মধ্যে দেশ থেকে অপরাধ মুছে ফেলবেন। তার জন্য যদি অপরাধী সন্দেহে এক লাখ লোককে হত্যা করতে হয় তাতেও পিছপা হবেন না। ফলে মে মাসে দায়িত্ব নেয়ার পরই তিনি মাদক ব্যবসায় জড়িত সন্দেহভাজনদের ওপর সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেন। এই অভিযান থেকে রেহাই মিলছে না মাদকসেবীদেরও।

প্রেসিডেন্ট হবার আগে তিনি ২২ বছর দক্ষিণের দাভাও নগরীর মেয়র থাকাকালে মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ তুলত যে, দুতার্তে সেই সব ঘাতক স্কোয়াডের সঙ্গে যুক্ত যারা সেখানকার সন্দেহভাজন অপরাধীদের হত্যা করত। তবে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র ও ক্যাথলিক চার্চ এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সমালোচনা করলেও শোনা যায়, ফিলিপাইনের সাধারণ মানুষের কাছে দুতার্তে বেশ জনপ্রিয়।
ফিলিপাইনে অপরাধ দমনের নামে যেভাবে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে, সেই একইরকম সমালোচনা আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধেও হয়। বিশেষ করে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ বা হেফাজতে মৃত্যু নিয়ে নানা মহলেই সমালোচনা হয়েছে বা এখনও হচ্ছে। যদিও প্রতিটি ঘটনারই পরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তরফে ব্যাখ্যা দেয়া হয় যে, আত্মরক্ষার্থে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুলি ছুঁড়েছে।
এখানের বাস্তবতাও ফিলিপাইনের চেয়ে খুব আলাদা নয়। কারণ শীর্ষ অপরাধী বা ভয়ঙ্কর জঙ্গিদের বিরদ্ধে সাক্ষী খুঁজে পাওয়া কঠিন। আবার প্রচলিত বিচারব্যবস্থায় অনেক বড় অপরাধী জামিনে মুক্তও হয়ে গেছে বিভিন্ন সময়ে। এ নিয়ে সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকেও উষ্মা প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে দেখা যায় অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক সময়ই প্রচলিত বিচারব্যবস্থাকে বাইপাস করে অন্য পথ অবলম্বন করে। এক্ষেত্রে তারা অন্য অপরাধীদের এই বলে বার্তা দিতে চায় যে, আত্মসমর্পণ না করলে বা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে না এলে পরিণতি মৃত্যু। যার ইঙ্গিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানরা বিভিন্ন সময়ে দিয়েছেন।
এখন প্রশ্ন হলো, প্রচলিত বিচারব্যবস্থায় অপরাধ দমন সম্ভব নয় বলে বিচারবহির্ভূত হত্যা কি সমর্থনযোগ্য? মানবাধিকারের দৃষ্টিতে অবশ্যই এটি গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু পুলিশ প্রধান একেএম শহীদুল হক সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, জঙ্গিদের কোনো মানবাধিকার থাকতে পারে না। আরেকটি প্রশ্ন হলো, ১০ জন জঙ্গি বা দুর্ধর্ষ অপরাধীর মধ্যে যদি একজন নিরীহ মানুষও নিহত হয়, সেই দায়ভার কি রাষ্ট্রের ওপর বর্তায় না? এই ইস্যুতে দুরকম মতামত আছে। যেমন অনেকে মনে করেন অপরাধী মারতে গিয়ে যদি দুয়েকজন সাধারণ মানুষ মারা যায়, সেটি গ্রহণযোগ্য। আবার অনেকে এরকম মনে করেন যে, কোনো অবস্থাতেই বা কোনো যুক্তিতেই একজন নিরীহ মানুষকেও মারা যাবে না। কেউ কেউ এরকম বলেন, ১০ জন অপরাধীর ছাড়া পেয়ে যাওয়ার চেয়ে একজন নিরীহ লোকের ফেঁসে যাওয়া বেশি ভয়ঙ্কর। ফলে বিচারবহির্ভূত হত্যা নিয়ে ফিলিপাইনে যে বিতর্ক, সেই বিতর্ক বাংলাদেশেও। তাহলে এর সমাধান কী?
সমাধান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা। অপরাধ দমনের জন্য যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে একশো অপরাধীরও মৃত্যু হয়, সেখানে এই নিশ্চয়তাও থাকতে হবে যে, একজন নিরীহ মানুষও হয়রানির শিকার হবে না। যেমন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জঙ্গি ও অন্যান্য অপরাধ দমনে র্যাব যথেষ্ট সফলতার পরিচয় দিয়েছে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, মূলত র্যাবের তৎপরতার কারণেই বাংলা ভাই শায়খ রহমান অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়েছে। সেইসঙ্গে সাম্প্রতিক পুলিশের বিভিন্ন অভিযান, বিশেষ করে কল্যাণপুর ও নারায়ণগঞ্জে তারা যেভাবে আলোচিত জঙ্গিদের দমন করেছে, সেটি সারা দেশেই প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু দেশের মানুষ ঝালকাঠির কলেজছাত্র লিমনের কথাও ভুলে যায়নি।
স্থানীয় একজন সন্ত্রাসীকে ধরতে গিয়ে যে কিশোরের পায়ে গুলি করেছিল র্যাব এবং পরে তার পা কেটে ফেলতে হয়। শুধু তাই নয়, এই ঘটনা ধামাচাপা দিতে অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের ওই কিশোরকে সন্ত্রাসী বানাতে উঠেপড়ে লেগেছিল খোদ রাষ্ট্রযন্ত্র। যদিও পরে প্রমাণিত হয়েছে লিমন নির্দোষ। ওই ঘটনার পরপরই যদি র্যাব বা সরকারের তরফে ভুল স্বীকার করা হত এবং লিমনের চিকিৎসার দায়িত্ব সরকার গ্রহণ করতো, তাহলে এ নিয়ে পুরো দেশ তোলপাড় হত না।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব অভিযানই যে সফল হবে এমন নয়। কিছু অভিযান ব্যর্থ হতে পারে। কিছু ভুলও হতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে সেই ভুল স্বীকার করে নিলে এ নিয়ে বিতর্ক ওঠে না। একইভাবে অনেক অপরাধীর মধ্যে যদি দুয়েকজন নিরীহ লোক হয়রানির শিকার হয় বা নিহত হয়, তারও পরিস্কার ব্যাখ্যা থাকা দরকার এবং ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে রাষ্ট্রের দাঁড়ানো দরকার। তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো অভিযান নিয়েই মানুষের মনে সংশয় বা প্রশ্ন ওঠার সুযোগ থাকে না। সেক্ষেত্রে প্রয়োজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের দেশপ্রেম, জবাবদিহিতা এবং দায়িত্বের প্রতি অবিচল দৃঢ়তা। তাদের সততা এবং পক্ষপাতহীন আচরণই নিরপরাধ মানুষকে হয়রানির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।
রদ্রিগো দুতার্তের মতো মাস্তানি তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন শাসক নিজে সৎ। তিনি যদি দেশকে সত্যিই মাদক ও অপরাধমুক্ত করার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন এবং সেখানে যদি তার কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ না থাকে, অর্থাৎ অপরাধ দমনের নামে তিনি যদি প্রতিপক্ষ দমন না করেন, তাহলে সেই অভিযান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার কথা নয়। অর্থাৎ সত্যিকারের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তখনই প্রচলিত বিচারব্যবস্থাকে বাইপাস করাও সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে, যখন সেখানে জবাবদিহিতা নিশ্চিত থাকে। যখন সেখানে দেশপ্রেম থাকে। যখন সেখানে দেশকে এগিয়ে নেয়ার নির্মোহ প্রত্যয় থাকে।
তবে অপরাধী বলে যাকে বিচারহির্ভূতভাবে হত্যা করা হলো, সে যে প্রকৃতই অপরাধী সেটি প্রচলিত বিচারব্যবস্থার ভেতর দিয়ে না গেলে প্রমাণিত হয় না। যে কারণে কোনো সভ্য সমাজই বিচারবহির্ভূত হত্যা সমর্থন করে না।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







