‘গোল্লাছুট’ বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় খেলা হলেও আজকের যুগে খেলাটি আমাদের শিশু-কিশোররা প্রায় ভুলতে বসেছে। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক প্রাঙ্গণে ‘গোল্লাছুট’ খেলাটি এখনও বেশ আবেদন রাখে। অন্তত সাম্প্রতিক কালে আওয়ামীবিরোধী বুড়ো-খোকাদের দল নিজেরা একটি তথাকথিত ‘ঐক্যফ্রন্ট’ বানিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে যেভাবে তাদের অভীষ্ট লক্ষ্য (রাজনৈতিক মসনদ) স্পর্শ করার চিন্তা-ভাবনা করছে তাতে আসন্ন শীতকালীন নির্বাচনে বিনোদনের অভাব হবে বলে মনেই হচ্ছে না। কিন্তু এই ‘গোল্লাছুট’-এ সব রাজনৈতিক পল্টিবাজদের অংশ গ্রহণ করতে দেখে আমি ভাবছি এই খেলায় কে যে কার সাথে আছে, আর কে যে কার সাথে নেই – সেটা বোঝা বড্ড মুশকিল! এমনকি পল্টিবাজ বুড়ো-খোকারা নিজেরাও নিজেদের ব্যাপারে শত ভাগ নিশ্চিত নয়!
১.
প্রাণে প্রাণ মিলে করিয়ে, তুফানের ঘূর্ণি উড়িয়ে প্রথমে তারা যুক্ত হল একে অপরের সাথে। ভাল কথা! খেলাটা মাত্র শুরু হবে হবে ভাব! ঠিক এমন সময়ে ”বিসমিল্লাহ্তেই গলদ” – যোগ করতে গিয়ে হয়ে গেল বিয়োগ! ‘বিকল্পধারা’কে ধোঁকা দিয়ে ধাক্কা মেরে বের করে দেয়া হল। আর এই মাহমুদুর রহমান মান্না– বেচারা কোন টেলিফোন–ভাইবার লাইনে কথা বলে কে জানে! যখনি যা বলে ‘লিক’ হয়ে বেরিয়ে আসে! তার দরকার একখানা ‘পদি পিসির বর্মী বাক্স’ যার ভিতরে টেলিফোন আর ভাইবার লুকিয়ে রেখে তিনি চুপি চুপি কথা বলতে পারবেন – ‘লিক’-এর ঝামেলা শেষ!
তবে একটি কথা কিন্তু মানতে হবে। রাজনৈতিক দল পরিবর্তনের ‘ডিগবাজী’ খেলায় মাহমুদুর রহমান মান্না দারুণ সফল। এ ক্ষেত্রে আমরা তাকে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ধরে নিতে পারি। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) উগ্র সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবির্ভূত হয়। ঐ সময় মান্না ‘ডিগবাজি’ দিয়ে জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগের অগ্রভাগে চলে আসেন। তখন জাসদ নেতারা কথায় কথায় বঙ্গবন্ধুকে অপমান করতেন। ব্যঙ্গ করতেন। মান্নাও তখন সেই পথের পথিক ছিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ১৯৭২ সালে জাসদ ছাত্রলীগ থেকে চাকসুর জিএস নির্বাচিত হন মান্না। ১৯৭৩ সালে ২২ বছর বয়সে দখল করে নেন জাসদ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদটিও। ১৯৭৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে জাসদ ছাত্রলীগ থেকে ডাকসুর ভিপিও নির্বাচিত হন।
এরপরই জাসদ ভেঙে খালেকুজ্জামান ও আ ফ ম মাহবুবুল হকের নেতৃত্বে বাসদ গঠিত হলে মান্না খেলেন আরেক ‘ডিগবাজি’। ১৯৮০ সালে বাসদ ছাত্রলীগ থেকে নির্বাচন করে দ্বিতীয় দফায় ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সময়ে বাসদের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন তিনি। ১৯৯০-এর দশকে মান্না খেলেন আরেক ‘ডিগবাজি’। এক সময়ের জাসদ নেতা মীর্জা সুলতান রাজার নেতৃত্বে ‘জনতা মুক্তি পার্টি’ গঠিত হলে ওই দলের নেতা হন মান্না। এই দলটি ১৯৯২ সালে আওয়ামী লীগে বিলুপ্ত হলে মান্না ‘ডিগবাজি’ খেয়ে হয়ে যান আওয়ামী লীগের নেতা। ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে পর পর দুবার তিনি আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন।
২০০৭ সালে রাজনীতিতে সেনা হস্তক্ষেপের পর দুই নেত্রীকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা, যা মাইনাস টু ফর্মুলা, হিসেবে পরিচিত, তাতে মান্নার সক্রিয় ভূমিকার কথা বেশ আলোচিত। এজন্য তাকে ওয়ান-ইলেভেনের অন্যতম ‘কুশীলব’বলা হয়। ‘বিতর্কিত ভূমিকা পালনের’ অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে আওয়ামী লীগের কক্ষপথ থেকে ‘ডিগবাজি’ খেয়ে তিনি ছিটকে পড়েন। দলবিযুক্ত মান্না তখন থেকে বিভিন্ন আলোচনা অনুষ্ঠান ও টেলিভিশন টক শো-তে সক্রিয় হয়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখেন। ২০১২ সালে নতুন ‘ডিগবাজি’ খেয়ে ‘নাগরিক ঐক্য’ নামে একটি সংগঠনের ঘোষণা দেন মান্না।
এরপর ক্রমেই তিনি আওয়ামী বিরোধী ভূমিকায় ফিরে যান। বিএনপি-জামায়াত জোট পরিচালিত বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে হিংস্র ও ভয়াবহ অবরোধ-হরতাল-পেট্রোল-বোমা সন্ত্রাসের সময় পরিস্থিতি যখন অস্থিতিশীল, তখনই মান্নার সঙ্গে বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকার একটি এবং অজ্ঞাত পরিচয়ের একজনের আরেকটি অডিও ক্লিপে শোনা যায়, সেই সময়ের পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের বিষয়ে তাকে আগ্রহ প্রকাশ করতে। অডিওতে সরকার বিরোধী আন্দোলন চাঙ্গা করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘লাশ ফেলার’ ব্যাপারেও তিনি উৎসাহী বলে জানা যায়। এখন তিনি ফুল-টাইম আওয়ামীবিরোধী রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা কালে মান্না সক্রিয় ছিলেন “অনেক সূর্যের আশা”নামের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে। সেই ‘অনেক সূর্যের আশা’ মেটাতে গিয়ে তিনি নিজে ‘নক্ষত্র’ হয়ে ক্রমাগত ‘ডিগবাজি’ খেতে খেতে রাজনীতির কক্ষপথে ছুটে বেড়িয়েছেন। কখনও সমাজতন্ত্র, কখনও পুঁজিতন্ত্র, কখনও মুজিব বিরোধী, কখনও মুজিবপন্থী, কখনও রাজাকার বিরোধী আবার কখনও রাজাকারের জোটের আশ্রয়প্রার্থীও হয়েছেন। কিন্তু ভাগ্যের শিকে ছেঁড়েনি তার। না পেরেছেন এমপি হতে, না পেরেছেন মন্ত্রী হতে। এমনকি ঢাকার মেয়র হওয়ার খায়েশও মান্নার পূরণ হয়নি! ‘অনেক সূর্যের আশা’ মান্না এখন শুধুই এক হতাশার নাম!
২.
রাজনৈতিক পল্টিবাজদের নিয়ে ‘ঐক্য ফ্রন্ট’ আয়োজিত ‘গোল্লাছুট’ খেলায় ‘চরিত্র’(!) একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করেন চরিত্রবান(!) ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। পেশাগত ভাবে তিনি একজন আইনজীবী এবং দৈনিক সংবাদপত্র ‘দি নিউ নেশন’-এর সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ও প্রকাশক। কয়েক বছর আগে পর্যন্ত তিনি ছিলেন ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ এর সম্পাদকীয় বোর্ডের চেয়ারম্যান। তবে বরাবরই তার ‘চারিত্রিক’ ভূমিকা বিতর্কিত।
১৯৬৯ সালে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এ সাংবাদিক সিরাজুদ্দিন হোসেন ব্যাপক জনপ্রিয় ‘মঞ্চে নেপথ্যে’ নামে কলাম লিখতে শুরু করেন। এই কলামে পাকিস্তানী দুঃশাসনকে তুলে ধরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরি করা হত। সিরাজুদ্দিন হোসেন দু-সপ্তাহের ছুটিতে নিজের গ্রামের বাড়ি মাগুরা গেলে ‘মঞ্চে নেপথ্যে’ কলামটি আমাদের ‘চরিত্রবান’ মইনুলের পরিকল্পনা অনুযায়ী খোন্দকার আব্দুল হামিদ ছিনতাই করে নেন এবং মইনুলের ইচ্ছায় হামিদ সেখানে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে পাকিস্তানী মতাদর্শ প্রকাশ করা চালু করেন। খোন্দকার আব্দুল হামিদ ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক আদর্শের লোক এবং সম্পর্কে মইনুলের আত্মীয়। এমনকি সাংবাদিক সিরাজুদ্দিন হোসেনকে অপহরণ ও হত্যার সঙ্গেও ‘চরিত্রবান’ মইনুলের যোগসাজশ ছিল বলে শোনা যায়।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ইত্তেফাক অফিস পুড়িয়ে দেয় পাক বাহিনী। পাকিস্তানী দালাল খোন্দকার আব্দুল হামিদের মাধ্যমে ‘চরিত্রবান’ মইনুল তখন পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে ২ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করে নেন। মুক্তিযুদ্ধকালে এই টাকা নিয়ে মইনুল ‘ডিগবাজি’ খেতে খেতে বিদেশে চলে যান এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হলে আবার ‘ডিগবাজি’ খেতে খেতে বাংলাদেশ ফিরে আসেন।
‘নারী চরিত্র’ সকল সময়েই ‘চরিত্রবান’ মইনুল হোসেনের খুব প্রিয় উপজীব্য বিষয়। সেই ১৯৭৪ সালে ‘বাসন্তি’ নামে একজন বুদ্ধি-প্রতিবন্ধী নারীকে মাছ ধরার জাল পরিয়ে ইত্তেফাক পত্রিকায় একটি ছবি প্রকাশ করা হয়। এই ছবির মধ্যে দিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করা হয়। পঁচাত্তরের ঘাতকদের প্রোপাগান্ডা হিসেবে এই ছবিটি ব্যবহৃত হয়েছিল। এই বাসন্তিকে জাল পরানোর পরিকল্পনাটি কিন্তু আমাদের ‘চরিত্রবান’ মইনুলের বলে অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক কালে একজন নারী সাংবাদিককে গণমাধ্যমে ‘চরিত্রহীন’ বলে মানহানি করার অপরাধে বর্তমানে আমাদের মইনুল কারাগারে বসে নিজের চরিত্রের সনদ যাচাই-বাছাই করাতে ‘সীতার অগ্নিপরীক্ষা’ দিচ্ছেন বলে শোনা যাচ্ছে!
ঐতিহাসিক ভাবে জানা যায়, মইনুল পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু, তার পরিবার এবং জাতীয় চার নেতা হত্যার পর, খুনি মোশতাককে নিয়ে ‘ডেমোক্রেটিক লীগ’ গঠন করেছিলেন। আরও অভিযোগ আছে যে, মইনুল বঙ্গবন্ধুর খুনিদের রাজনৈতিক দল ‘ফ্রিডম পার্টি’-এর সঙ্গেও রাজনীতি করেছেন। তিনি ২০০৫ সালে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরের সম্মেলনে গিয়ে সেই দল ও কর্মীদের প্রশংসাও করেছিলেন। সাধু! সাধু!
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ড. ফখরুদ্দীন আহমেদের সাবেক উপদেষ্টা ছিলেন আমাদের ‘চরিত্রবান’ মইনুল। তার প্রাপ্ত মন্ত্রণালয় ছিল তথ্য, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত এবং ভূমি মন্ত্রণালয়। সেই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মুখপাত্র হিসেবে তিনি তার স্বভাব-সুলভ চরিত্র অনুযায়ী প্রায় প্রতিদিনই গণমাধ্যমে বিভিন্ন বক্তব্য রাখতেন। তার বক্তব্যের মধ্যে প্রকাশিত হতো ক্ষমতা, দাপট আর অহমিকা! সেই সময় তিনি বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, ‘মির্জা আব্বাস কিসের রাজনীতিবিদ? সে তো একজন বাস ড্রাইভার।’ এছাড়াও তখন মইনুল বিএনপির বর্তমান সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ‘রুহুল কবির রিজভী কে? এরাতো হলো পলিটিকাল ক্লাউন।’ অতি সম্প্রতি মইনুল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে, ‘তারেক রহমান আবার কে? … এটা কোথাকার ছাগল, Goat, না Cow, না মুরগী?’
এখন আপনারাই বলুন, আমার দেশের রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, বাস ড্রাইভার, ছাগল, গরু, মুরগী সবার ‘চরিত্র’ নিয়ে যিনি দিন-রাত্রি গবেষণায় অস্থির, তিনি না থাকলে ‘ঐক্যফ্রন্ট’ আয়োজিত ‘গোল্লাছুট’ খেলাটি নিজেই তো তার ‘চরিত্র’ হারিয়ে ফেলবে। বাইরে ‘গোল্লাছুট’ খেলা চলবে, আর খেলতে না পাওয়ার দুঃখে কারাগারের ভিতরে বসে আমাদের ‘চরিত্রবান’ মইনুল শরৎচন্দ্রের ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাস পড়বে আপন মনে– ‘অকাল-বিধবা সাবিত্রী’র মত! কিসের ঐক্য? কিসের ফ্রন্ট?
৩.
ঐক্যফ্রন্ট আয়োজিত ‘গোল্লাছুট’ টুর্নামেন্টের-এর আরেক খেলোয়াড় ‘সময়ে সরব’ আ স ম আব্দুর রব। তিনিও সময় মত ‘ডিগবাজি’ খাওয়াতে কম যান না। ‘সরব’ রব বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে ‘সরব’ রবের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। যাদের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে বাংলাদেশের পতাকা তুলে দেয়া হয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয় তাদের মধ্যে ‘সরব’ রব ছিলেন অন্যতম।
মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে ছাত্রলীগ করলেও স্বাধীনতার প্রায় পর পরই ‘সরব’ রব রাজনৈতিক ‘ডিগবাজি’ খান। ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর সাত সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটির ঘোষণা দেয়া হলে ‘সরব’ রব সেখানে যুগ্ম আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু হত্যার জন্য আওয়ামী লীগকেই দায়ী করে বিবৃতি দিয়েছেন আমাদের ‘সরব’ রব। সেই বিবৃতিতে তিনি এটাও দাবি করেন যে আওয়ামী লীগ নেতাদের নির্দেশেই জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয় এবং দেশে প্রথম সামরিক শাসন জারি করা হয়।
স্বৈরাচার এরশাদের গৃহপালিত বিরোধী দলের নেতা ছিলেন ‘সরব’ রব। ১৯৮৭ সালে নুর হোসেনের হত্যাকাণ্ডের পর যখন বাংলাদেশের সকল বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করেন তখন ১৯৮৮ সালের ওই নির্বাচনকে বৈধতা দিতে এই ‘সরব’ রবের নেতৃত্বে ৭০ টি দলের একটি জোট হয়। সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের পতন হলে সেই দলের নেতা কর্মীরা আত্মগোপন করে। কিন্তু মজার ব্যাপার হল ইতিহাসে ‘সরব’ রবই হল একমাত্র বিরোধী দলীয় নেতা যিনি ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর রব-হীন নীরবে আত্মগোপনে চলে যান!
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ‘সরব’ রব লক্ষ্মীপুর জেলা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ঐ নির্বাচনের পর জাসদ ‘ডিগবাজি’ খেয়ে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেয়। ফলশ্রুতিতে আমাদের ‘সরব’ রব আওয়ামী লীগ সরকারের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হন। এখন আবার ‘সরব’ রব পাল্টা ‘ডিগবাজি’ খেয়ে সরকার বিরোধী জোটে অবস্থান করছেন। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, আমার তো তত চিন্তা বাড়ছে ‘সরব’ রবকে নিয়ে। নির্বাচনের আগেই যদি তিনি কয়েকটি ‘সরব ডিগবাজী’ দিয়ে ফেলেন তাহলে ‘ঐক্যফ্রন্টের’ কি হবে? ‘ঐক্যফ্রন্টের’ নন্টে, ফন্টে, কেল্টু, নেপচাঁদ, ল্যাংচা, বোঁচা এদের সবার কী হবে? নাহ, আর ভাবতে পারছিনা!
৪.
ঐক্যফ্রন্ট আয়োজিত ‘গোল্লাছুট’ টুর্নামেন্টের-এর তারকা খেলোয়াড় হল সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন। আমরা তাকে দেশ ও জাতির ক্রান্তিলগ্নে ‘উধাও’ হতে দেখি বরাবর। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হল। কেউ দেশে মুক্তিযুদ্ধে গেল, কেউ সীমানা অতিক্রম করে ভারতে ট্রেনিং-এ। আবার কেউ বা মুজিব সরকারের পক্ষে প্রচারণায়। কিন্তু ‘উধাও কামাল’ পাকিস্তানি সামরিক জান্তার কোলে স্বেচ্ছায় ‘উধাও’ হল। এ কারণে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ থেকে এম আর আখতার মুকুল ‘চরম পত্রে’র ভাষায় ‘পাকিস্তানি জামাই কামাইল্লা’কে নিয়ে তিনটি চরমপত্র পাঠ করেছিলেন।
সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ঠিক আগে আগেই বঙ্গবন্ধু সরকারের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ‘উধাও কামাল’ ব্যক্তিগত সফরে বিদেশে ‘উধাও’ হলেন। এতটাই ‘উধাও’ হলেন যে একটি প্রেস কনফারেন্স করে বিশ্ব মিডিয়াকে তখনকার প্রকৃত অবস্থা জানানোর প্রয়োজন মনে করলেন না। আফসোস!

স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময় এরশাদের পতন না হওয়া পর্যন্ত ‘উধাও কামাল’ ঘরে ফিরবেন না বলে তিন দিব্যি দিলেন। ১৯৮৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মিছিলে সেনাবাহিনীর হামলায় জাফর, জয়নাল, কাঞ্চন, দীপালী সাহাসহ অনেক শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঠিক তিন দিনের মাথায় ‘উধাও কামাল’ লন্ডনে ‘উধাও’ হলেন। ৯০’র এরশাদ বিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন ২৭ নভেম্বর তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘উধাও’ হলেন। ওই দিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় এরশাদের পেটোয়া বাহিনীর হাতে নিহত হন ডা. শামসুল আলম মিলন। আন্দোলন তুঙ্গে উঠে। ৪ ডিসেম্বর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জানান এরশাদ। আর ঠিক তার পরদিনই অর্থাৎ ৫ ডিসেম্বর ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ ঘটল। কি মুশকিল! ‘উধাও কামাল’ তো দেখি একেবারে ‘পাহাড়ি ঝর্না’র মত – ‘ঘরে নাহি রই গো উধাও হ’য়ে বই’।
একানব্বই সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হেরে গেলে ‘উধাও কামাল’ একেবারে আওয়ামী লীগ থেকেই ‘উধাও’ হয়ে গেলেন। তৈরি করলেন নতুন রাজনৈতিক দল গণফোরাম। এরপর ২০০১ সালের অক্টোবরে বিএনপি-জামায়াত জোট আবারো রাষ্ট্রক্ষমতায় আসল। দেশজুড়ে শুরু হল সংখ্যালঘু নির্যাতন। রক্ষা পেল না মন্দির, গির্জা, এমনকি মসজিদও। ২০০২ সালে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ নামে যৌথ বাহিনীর এক অভিযান শুরু হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে আসলে ওই অভিযান ছিল নির্বিচারে মানুষ হত্যার লাইসেন্স। পরবর্তীতে এই হত্যাকাণ্ডের বৈধতা নিয়ে ইনডেমনিটি আদেশও জারি করা হয়। কিন্তু আমাদের ‘জাতির বিবেক’ দাবিদার ‘উধাও কামাল’ টু শব্দটি করলেন না? অনেক খোঁজা হল তাকে, কিন্তু –
“দুধের বোতলে, ভাতের হাঁড়িতে! নেই তো
রেস্টুরেন্টে, হোটেলে, সেলুনে,
গ্রন্থাগারের গভীর গন্ধে,
টেলিভিশনে বা সিনেমা, বেতারে,
নৌকার খোলে, সাপের ঝাঁপিতে নেই তো।
গুড়ের কলসি, বিষের কৌটো,
চিনির বয়াম, বাজারের ব্যাগ,
সিগারেট কেস, পানের ডিব্বা,
জর্দার শিশি, লক্ষ্মীর সরা,
নকশী পাতিল, চৌকির তলা,
সবি খুঁজলাম, খুঁজে দেখলাম নেই তো!”
এটা ঠিক ‘উধাও কামাল’ সংবিধান বিশেষজ্ঞ হিসেবে বেশ পরিচিত। কিন্তু তার মনটা বড্ড অস্থির। সুযোগ পেলেই তিনি খোদ সংবিধান থেকেই ‘উধাও’ হয়ে যান! এই যেমন ধরেন, এক এগারোর প্রেক্ষাপটে ‘উধাও কামাল’ ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ তত্ত্ব আবিষ্কার করলেন। অনির্বাচিত সরকারের সমর্থনে তিনি ফতোয়া দিলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত নির্বাচন না হবে ততক্ষণ ক্ষমতায় থাকতে পারবে এই অসাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার! আবার ২০১৪ সালে যখন বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ৭২’এর সংবিধানে ফিরে গেল এবং বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত করা হলো তখন ‘উধাও কামাল’ এর বিরোধিতা করলেন। হুংকার দিয়ে বললেন, “সংবিধান, তোমায় আজকে দিলাম ছুটি’।
শেষকথা:
আসলে রাজনীতিতে শেষকথা বলে কিছু নেই। তবে ‘ঐক্যফ্রন্ট’-এর ঐক্য মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে তখনই পথ খুঁজে পাবে যখন তা বাংলাদেশ-বিরোধী শক্তিকে মোকাবিলা করার সাহস রাখবে। ‘ঐক্যফ্রন্ট’ গঠনকে কেন্দ্র করে ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, জামায়াত থাকলে কোন জোট করবেন না তিনি। কিন্তু গত ২৬ অক্টোবর তারিখে একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সভাপতি আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে আমরা ২০ দলীয় জোটে দীর্ঘ আলোচনা করেছি। সর্বসম্মতিক্রমে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিএনপি সেখানে ২০ দলের প্রতিনিধিত্ব করছে। ২০ দলের পক্ষ থেকে তো বিএনপি নেতারা মঞ্চে গিয়ে বক্তব্য রাখছেন। তারা আমাদের হয়েই কথা বলছেন।’

তাহলে কি বিশ দলীয় জোটের শরিক ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ও এই ‘ঐক্যফ্রন্ট’-এ রয়েছে? তার মানে ‘ঐক্যফ্রন্ট’ মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’র চাওয়া-পাওয়া নিয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামছে? ‘ঐক্যফ্রন্ট’ তাহলে প্রকৃতপক্ষে ‘জামায়াতী ফ্রন্ট’-এরই আরেক নাম?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








