১. একাত্তর টিভিতে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের মাসুদা ভাট্টি আপাকে নিয়ে অশ্লীল কটূক্তি। ফলশ্রুতিতে দেশজুড়ে অনলাইনে অফলাইনে নিন্দার ঝড়। মাঝখানে তসলিমা ম্যাডামের পুরনো ক্ষোভের উদগীরণ। যার ফলে আবারো বিভক্তি। পরিশেষে মইনুল সাবের “রেহনা পারেগা সেন্ট্রাল জেলে” সংগীত পরিবেশন এর মাধ্যমে সার্কাসের যবনিকাপত। What a show indeed!!!
২. হঠাৎই এদেশের রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে আবির্ভাব “যুক্তফ্রন্ট ” নামের ডঃ কামাল স্যারের নেতৃত্বে আরেকটি কমেডি ক্লাবের। আর মূলত: এই “কমেডি ক্লাব” টিকে নিয়েই আমার এই যৎকিঞ্চিত অরণ্যে রোদনের প্রচেষ্টা।
প্রথমেই আসি “কমেডি ক্লাব” নামকরণ প্রসঙ্গে। শুরু করি প্রথম থেকেই। এমন এমন সব নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত হলো এই ফ্রন্টটি, এদেশের রাজনীতিতে যারা আসলে কাজীর গরু। কিতাবে আছে , গোয়ালে নেই।
ক. ডঃ কামাল হোসেন : একাত্তরে তাজউদ্দীন আহমদকে ব্যাগ আনার কথা বলে পালিয়ে গিয়েছিলেন শ্বশুরবাড়ি পশ্চিম পাকিস্তানে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর স্নেহের কারণে এডভোকেট এস. আর.পাল এর সাথে
তিনিও পান সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব। আর কৌশল গত কারণে এস. আর পালের সম্মতিক্রমে নিজেই হয়ে যান সংবিধান প্রণেতা। আর এস. আর.পালের নাম হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অতল গর্ভে। এরপর দুই দুইবার নৌকা প্রতীক নিয়েও পার হতে ব্যর্থ হন নির্বাচনী বৈতরণী। মতপার্থক্য হওয়ায় দল ছেড়ে গঠন করেন গণফোরাম। এরপর থেকে শুরু হয় তাঁর নিয়মিত নির্বাচনে দাঁড়ানো আর জামানত হারানোর অন্তহীন কাফেলা। যুদ্ধাপরাধীদের পেইড এজেন্ট জাতির জামাই “ডেভিড বার্গম্যান “এর সম্মানিত শ্বশুর হয়ে যখন “জামায়াত বিরোধিতা ” করেন তিনি , তখনই বোঝা যায় ” হিপোক্রিসি ” জিনিসটা আসলে ঠিক কোন পর্যায়ে কাজ করে উনার মাঝে। এই ডুয়েল স্ট্যান্ডার্ড থাকার কারণেই সব যোগ্যতা থাকার পরেও “ভয়েস অফ নেশন” হতে পারেননি তিনি।
খ. ডাঃ বদরুদ্দোজ্জা চৌধুরী : নেতার পুত্র সাবেক রাষ্ট্রপতি স্বনামধন্য চিকিৎসক বি চৌধুরী যুক্তফ্রন্টের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। আওয়ামী লীগের সাবেক অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতার পুত্র হয়েও যোগ দেন বিএনপিতে দলটির প্রতিষ্ঠালগ্নেই। ছিলেন জেনারেল জিয়ার অত্যন্ত আস্থাভাজন। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে জিয়াউর রহমান সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ার দিনে ছিলেন তাঁর পাশের কক্ষেই। দলীয় আনুগত্যের কারণে ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তাঁকে করা হয় রাষ্ট্রপতি। দেশের সর্বোচ্চ সম্মানিত আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরেই তাঁর ভাগ্যাকাশে নেমে আসে দুর্যোগের ঘনঘটা। যুবরাজ তারেকের সাথে বিরোধের ফলে তাকে “জরু আর গরু” দুইটাই হারাতে হয়। রাষ্ট্রপতির আসন আর উভয় থেকেই বিতাড়িত হন তিনি। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে গঠন করেন বিকল্প ধারা। গঠনের মাত্র কিছুদিনের মধ্যেই আরেক দলত্যাগই কর্নেল অলি আহমদ এর সাথে বিরোধ দেখা দেয় তার। কর্নেল অলি বিকল্প ধারা ত্যাগ করে আলাদাভাবে “এলডিপি ” গঠন করেন। সেই থেকে অদ্যাবধি আর
নির্বাচিত হতে পারেননি বাপ ছেলে একজনও। কখনো লীগের পক্ষে আবার কখনো বিএনপির পক্ষে স্ট্যান্ড নিয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছিলো তাঁর “পার্ট টাইম পলিটিকাল ক্যারিয়ার।” “লক্ষ্যশূণ্য লক্ষবাসনা” থেকে এবার হাতে নিয়েছিলেন “যুক্তফ্রন্ট প্রজেক্ট।” কিন্তু যুদ্ধাপরাধী হিসেবে জামায়াতের বিরোধিতার কারণে মাত্র কিছুদিন পরেই ছিটকে পড়েন। নিজ দলের বহিষ্কৃত নেতারাই উল্টো তিনি আর তাঁর ছেলে মাহি বি চৌধূরীকেই বহিষ্কৃত করে দেন বিকল্প ধারা থেকেই। সম্ভবত “উস্টা খাওয়া ” রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ডাক্তার সাহেব। কারণ ফ্রন্টের পাশাপাশি নিজ দলের উস্টার কাছেও “উস্টা খাওয়ার ” বিরল দুর্ভাগ্যে খুব কম লোকেরই আছে। সাধে কি আর বলি “কমেডি ক্লাব” এর কথা।
গ. মাহমুদুর রহমান মান্না: ছাত্রজীবনে তুখোড় ছাত্রনেতা ছিলেন। স্বাধীনতার পূর্বে জড়িত ছিলেন আইয়ুব খানের এনএসএফ এর সাথে। স্বাধীনতার পরে জাসদ গঠিত হলে যোগ দেন জাসদ ছাত্রলীগে। ডাকসুর ভিপিও হন। এরপরই শুরু হয় পল্টিবাজী। প্রথমে জাসদ ছেড়ে যোগ দেন বাসদে। সেখান থেকে আওয়ামী লীগে। কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকও হন। ১/১১ এর সময়ে “মাইনাস টু”ফর্মুলার পক্ষ নিয়ে সংস্কারপন্থী সেজে যান। কিন্তু ফর্মুলাটি ব্যর্থ হলে বিতাড়িত হন আওয়ামী লীগ থেকে। গড়ে তোলেন “নাগরিক ঐক্য” নামের একটা সাইনবোর্ড সর্বস্ব দল।আওয়ামী লীগের সাবেক অত্যন্ত প্রভাবশালী বিতাড়িত হয়ে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হন আর সরকার এর বিরুদ্ধে। রীতিমতো আদাজল খেয়ে নেমে পড়েন সরকার বিরোধিতায়। সাদেক হ পরিকল্পনা আটেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ লাশ ফেলে দিতে.যাতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বিএনপির সাদেক হোসেন খোকার সাথে উনার এই
কথোপকথনের রেকর্ড ফাস হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মামলা হয় উনার বিরুদ্ধে। তিনি সেই মামলায় গ্রেফতার হন। আর হাজতবাস হয় তার্। জেল থেকে বের হয়ে আবারো রাজনীতি মনোনিবেশ করেন। যুক্তফ্রন্ট প্রতিষ্ঠার অন্যতম কুশীলবরা মান্না সাহেব এখন দলীয় মুখপাত্র হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন একাগ্রচিত্তে। পরিনীতি দেখার অপেক্ষায় রইলাম গ্যালারীতে পপকর্ণ হাতে বসে। divine comnedy আর বলে কারে??
ঘ. আ স ম রব: স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার প্রথম উত্তোলনকারী রব সাহেব বলতে গেলে কিংবদন্তী ছাত্রনেতা ছিলেন। “স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস ” এর অন্যতম সদস্য রব সাহেব স্বাধীনতার পরপরই ক্ষমতার দ্বন্ধে জড়িয়ে পড়ে নুরে আলম সিদ্দিকী গ্রুপের সাথে। ফলে বিভক্ত হয়ে যায় ছাত্রলীগ। বঙ্গবন্ধু নুরে আলম সিদ্দিকী গ্রুপকে সমর্থন জানালে নিজের অনুসারীদের নিয়ে “বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ” শ্লোগান দিয়ে গঠন করেন জাসদ। সদ্য স্বাধীন দেশে সরকার বদলের জন্য অনুসরণ করেন সশস্ত্র পন্থা।সারা দেশে শুরু হয় খুন , ডাকাতি , থানা লুটের মতো ভয়াবহ অরাজকতা। অর্ধশতাধিক জনপ্রতিনিধিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সরকার ও গ্রহণ করে চরম পদক্ষেপ। জাসদের দাবী অনু্যায়ী , দুইপক্ষের সংঘর্ষে মারা যান ২০ হাজার
মানুষ। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের গদিচ্যুত করেন একাত্তরের বিজয়ী বীর খালেদ মোশাররফ। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের নেশায় মত্ত জাসদ কর্নেল তাহেরের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা নিয়ে ৭ই নভেম্বর সংগঠিত করেন তথাকথিত “সিপাহী জনতার বিপ্লব” , হত্যা করা হয় কে ফোর্সের খালেদ মোশাররফ , ক্র্যাক প্লাটুনের মেজর হায়দার , আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী কর্নেল হুদার মতো দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের্। ক্ষমতায় আসেন জিয়াউর রহমান। এসেই তাহেরকে ঝুলিয়ে দেন ফাসিঁতে। আর রবসহ বাকিদের কারাগারে। জেনারেল এরশাদ এর সময়ে গৃহপালিত বিরোধী দলীয় নেতার ভূমিকায় অভিনয় করে অঢেল অর্থবিত্তের মালিক বনে যান। পরে আওয়ামী লীগের প্রথম টার্মে গৃহপালিত মন্ত্রীও হন। এরপর থেকে কূলহারা মাঝির মতো মাঝনদীতে ইতস্ততভাবে বৈঠা চালিয়ে গেলেও কূলের দেখা পাননি। অবশেষে এতদিনে সুযোগ পেয়ে নৌকা ভেড়ালেন যুক্তফ্রন্টের বন্দরে।
এতগেলো নেতাদের অবস্থা .. এবার আসা যাক ফ্রন্ট প্রসঙ্গে। আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানেই সভাপতির বক্তৃতায় ডঃ কামাল সবশুদ্ধ ১৮ বার উল্লেখ করলেন বঙ্গবন্ধুর নাম। শাহবাগ আন্দোলনের ব্যাপারে একটা উল্লেখযোগ্য দিক হলো সারাজীবন “বিপ্লব দীর্ঘজীবী হউক” “জয় সর্বহারা ” শ্লোগান দেয়া বামেরাও শাহবাগে এসে “জয় বাংলা ” শ্লোগান দেয়া শুরু করেছিলেন। মজার দিক হলো যুক্তফ্রন্টের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানেও সারা ময়দান জুড়ে ছিলো “জয় বাংলা” “জয় বঙ্গবন্ধু ” শ্লোগান। আপনাদের কেমন লেগেছিল জানিনা, আমি কিন্তু “আবেগে কাইন্দালাইছি”, কারণ এটা ছিলো নির্ভেজাল ফরমালিন বিহীন “জোক অফ দ্য ইয়ার” বিএনপি জামায়াতের কর্মীদের মুখ দিয়ে নিজেদের দলীয় শ্লোগান দেওয়ানো অবশ্যই আওয়ামী লীগের বিশাল একটি রাজনৈতিক সাফল্য বটে!!
যাইহোক, ফ্রন্ট গঠিত হলো, বিএনপির সাথে জোটও বাধা হয়ে গেলো। এরপর শুরু হলো কুটনীতিকদের সাথে দেনদরবার্। এদেশেতো আবার “গরীবের বউ সবার ভাবী” র নিয়মে প্রভুদের তুষ্ট করতে না পারলে সিংহাসনের স্বপ্ন দেখাই বোকামি। কিন্তু হুজুর মেহেরবানরা প্রথমেই জানতে চাইলেন,” নির্বাচনে জিতলে প্রধানমন্ত্রী হবেন কে???” কবি এখানেই নীরব!!! “কমেডি অফ এররস”
বর্তমানে চলছে “সংলাপ”, দেশজুড়ে যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা। কিন্তু আলোচনার বিষয় বস্তু যতটুকু না রাজনৈতিক ইস্যু , তার চেয়ে বেশী আলোচনার খাবারের মেন্যুর আইটেম নিয়ে। এটা কি আসলে “রাজনৈতিক সংলাপ” নাকি “ফ্রেন্ডলি রিইউনিয়ন” এর মেজবানী দাওয়াত সেটা নিয়েই ট্রল করছেন অনেকে। আর করবেননা কেন বলুন? ডঃ কামাল যে “কেক” আর “চিজ” ছাড়া খেতেই পারেননা! মোদ্দা কথা, কমেডি ক্লাবের কমেডি ভালোই জমে উঠেছে। আমরাও না হয় একটু হাসি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







