চ্যানেল আই অনলাইন
Advertisement
English
  • সর্বশেষ
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • রাজনীতি
  • খেলাধুলা
  • বিনোদন
  • অপরাধ
  • অর্থনীতি
  • আদালত
  • ভিডিও
  • জনপদ
  • প্রবাস সংবাদ
  • চ্যানেল আই টিভি
No Result
View All Result
চ্যানেল আই অনলাইন
En

এ লাশ মাটির নীচে থাকবে না, জেগে উঠবেই

চ্যানেল আই অনলাইনচ্যানেল আই অনলাইন
৭:০০ পূর্বাহ্ন ১৩, ফেব্রুয়ারি ২০১৬
মতামত
A A

তেত্রিশ বছর পার হয়ে গেছে যেন এক লহমায়। মনে হয় এই তো সেদিন। শাহবাগে বাস থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে এলাম মধুর ক্যান্টিন, মনে ছিলো চাপা উত্তেজনার সাথে একটা আনন্দ অনুভূতি। আজ মিছিল হবে, আজ আমরা ইতিহাস তৈরী করবো, ‘৫২-তে ছাত্ররা ইতিহাস গড়েছিলো, ‘৬২-তে, ‘৬৯-এ, ‘৭১-এ। আজ আমরা ‘৮৩-তে। এর আগে ১১ জানুয়ারি শিক্ষা ভবন ঘেরাও হবার কথা ছিল, হয়নি। বিক্ষুব্ধ সাধারণ ছাত্ররা সেদিন ডাকসু নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলো, ভেঙে ফেলেছিল ডাকসু ভবনের কলাপসিবল গেট।

কিন্তু ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্রনেতারা আর পিছু হটতে পারলেন না। বিশাল মিছিল নিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম শিক্ষা ভবনের দিকে। আনন্দ উত্তেজনার সাথে সাথে একটু ভয়ভীতিও যে ছিলো না মনে তা নয়। জানি নেতারা মরেন না, আমাদের মতো সাধারণ ছাত্ররাই সবসময় মারা যায়।

কার্জন হলের সামনে হাইকোর্টের গেট বরাবর থানা গেড়েছে পুলিশ, বিশাল বিশাল বার্বওয়্যার ব্যারিকেড। ওখানে গিয়ে বাধা পেতেই ফুঁসে উঠলো মিছিলের সামনের অংশ। মিছিলকারীদের গন্তব্য অদূরে শিক্ষাভবন। কিন্তু পুলিশ তাদেরকে সে পর্যন্ত যেতে দেবে না। শুরু হলো এ পক্ষ থেকে ভাঙ্গা ইট বর্ষণ, আর ও পক্ষ থেকে জবাব এলো কাঁদানে গ্যাস দিয়ে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখে অন্ধকার দেখতে লাগলাম। অনেকে কার্জন হলের মলে দৌড়ে গিয়ে কলের পানিতে রুমাল ভিজিয়ে আনতে লাগলো, নিজে চোখ মুছে অন্যকেও দিচ্ছে। এর মধ্যে এই প্রথম একটা নতুন জিনিষ দেখলাম। জলকামান। সেটা থেকে মিছিলকারীদের ওপর রঙিন জল ছিটানো হচ্ছে। উদ্দেশ্য দ্বিমুখী। মিছিলকারীদের দূর্বল করে দেয়া, আবার ধাওয়া করে পরে যেন ধরা যায় তাই জামা-কাপড়ে রঙিন মার্কা দেগে দেয়া।

আর কতোক্ষণ এভাবে চলতে পারে? মিছিল মারমুখী হচ্ছে আরও, এরপর অবশ্যই গুলি। সামরিক স্বৈরশাসন, বলা হয়েছে আকারে ইঙ্গিতে সমালোচনাও নিষিদ্ধ, সেখানে আমরা মিছিল করে অবরোধ করতে এসেছি। এটা একটা অসম যুদ্ধের মতো। একটা ছোট্ট জায়গায় অসম যুদ্ধকে সীমিত রাখতে নেই। অসম শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে বিব্রত করার একটা উপায় হলো যুদ্ধকে যথাসম্ভব ডিফিউজ করে দেয়া। আমি পাশে থাকা তখনকার বড় মাপের একজন ছাত্রনেতাকে বললাম: ভাইয়া, মিছিলের মুখ ঘুরিয়ে আমাদের উচিত ফুলবাড়িয়ার দিকে যাওয়া, শহরের ভেতরে। তিনি আমার কথাটাকে পাত্তা দিলেন বলে মনে হলো না। সিনিয়র নেতা, আমার মত এতা-পেতার কথাকে পাত্তা না দেবারই কথা (আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে সবে এডমিশন পেয়েছি, ক্লাশও শুরু হয়নি)।

কিন্তু পুলিশের কাঁদানে গ্যাস আর জলকামানের মুখে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে সত্যি সত্যি বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লাম।

Reneta

পুলিশের হামলার তীব্রতা বাড়তে লাগলো। আমরা কয়েকজন কার্জন হল ছেড়ে আস্তে আস্তে পিছু হটতে লাগলাম। শহীদুল্লাহ হল পাশে ফেলে কোনা মেরে এগোই, দাঁড়িয়ে স্লোগান দেই কিছুক্ষণ, আবার সরে যাই। এভাবে একসময় নিমতলি ঘুরে আমরা এসে পৌঁছালাম মেডিকেলের সামনে। লিখতে দু’লাইন কিন্তু বাস্তবে ইতিমধ্যে কেটে গেছে অনেকটা সময়। আমাদের ছোট গ্রুপ থেকে ইতোমধ্যে ছিটকে গেছে কেউ কেউ, আবার কেউ কেউ যোগ দিয়েছে নতুন। শুনতে পেলাম গুলি চলেছে, মারা গেছে কয়েকজন। মেডিকেলে উঁকিঝুঁকি মেরে কারও খোঁজ পাওয়া গেলো না। শুধু জানা গেলো লাশ নিয়ে যাওয়া হয়েছে কলাভবনের সামনে। ফুলার রোড ঘুরে, ভিসির বাসভবনের পাশ দিয়ে আমরা অপরাজেয় বাংলার সামনে এসে পৌঁছলাম। কেনো ঢাকা মেডিকেল থেকে টিএসসি আর শামসুন্নাহার হলের মাঝের রাস্তাটা দিয়ে না এসে শহীদ মিনার, জগন্নাথ হল পার হয়ে সলিমুল্লাহ হল ঘুরে ফুলার রোড ধরে এসেছিলাম তা আজ আর মনে নেই।

কলাভবনের সামনে জড়ো হয়েছে মিছিল ফেরার দল। যারা কলাভবনেই ছিলো, মিছিলে যায়নি তারাও উৎসুক হয়ে নেমে এসেছে। ঘনিষ্ঠ বন্ধু যারা মিছিল থেকে ছড়ে ছিটকে গিয়েছিলো তাদের সাথেও দেখা হলো। এত শত ছেলেমেয়ের সমাবেশেও কেমন অচেনা এক স্তব্ধতা, চোখে মুখে বেদনাবিদ্ধ এক হতচকিত ভাব। ঢলে পড়ছে ফেব্রুয়ারির বেলা, কয়েকজন ধরাধরি করে বয়ে নিয়ে এল সদ্য শহীদ জয়নালের লাশের খাটিয়াটা। এতো বছর পরেও স্পষ্ট চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই মুখ। সুন্দর ফুলের মতো একটি ছেলে, যেনো ঘুমিয়ে আছে, ডাকলেই উঠে আসবে। আহা কোন দুখিনী মায়ের সন্তান! মা-বাবার স্নেহের পুত্তলি, ভালবেসে তাকে পাঠিয়েছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ে, ছেলে বড় হবে, স্বপ্নপূরণ হবে, হাসি ফুটবে তাদের মুখে। তাঁরা কি জানতেন তাদের সে স্বপ্ন কোনোদিনই পূরণ হবার নয়, ন্যায়সঙ্গত একটি দাবীর পক্ষে স্লোগান দিয়ে মিছিল করবার অপরাধে বুলেটের আঘাতে কেড়ে নেবে তার প্রাণ স্বৈরাচারী এরশাদের পুলিশ?

আর্ট কলেজের ছেলেরা সদ্য সদ্য হাতে লেখা পোষ্টার এনে কলাভবনের দেয়ালে সেঁটে দিলঃ “এ লাশ মাটির নিচে থাকবে না, জেগে উঠবেই”! আজ যখন দেখি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার তো দূরের কথা, যে বা যাদের এই হত্যাকাণ্ডের দায়-দায়িত্ব ষোল আনা তারাই আজ মহান জাতীয় সংসদে সসম্মানে সমাসীন, দুঃখ লাগে বইকি। সেদিনের স্বৈরাচারী এরশাদকে নিজ নিজ দল বা জোটের মধ্যে রাখবার জন্যে আমাদের প্রধান দু’ট রাজনৈতিক ধারার নেতারা রাজনীতির কতো তিক্ত মধুর খেলাই না খেলেছেন, অথচ তারা কিনা খোদ গণতান্ত্রিক সংসদীয় রাজনীতিই ফিরে পেয়েছিলেন জাফর-জয়নাল-দিপালী সাহাসহ আরও কতো জানা অজানা শহীদের রক্তের বদৌলতে। এ কথা সবাই জানেন ১৯৮৩-র পরেও সাত বছর ধরে অনেক রক্ত ঝরিয়ে শেষ পর্যন্ত সরে যেতে বাধ্য হয় এরশাদ নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে। কিন্তু এই অভ্যুত্থানের ভিততো রচনা হয়েছিল সেইদিন, ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩ সালে – জাফর, জয়নাল, দীপালি সাহাদের রক্তে।

তারপরেওতো কতো বলিদান। নূর হোসেন, গুলিস্তানে ঘাতক ট্রাকের নিচে সেলিম-দেলোয়ার, টিএসসির পাশের সড়কে ডাক্তার মিলন… কতো নাম। একটি হত্যাকাণ্ডেরও আজ অবধি বিচার হলো না।

যা হোক, জয়নালের লাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে আমরা, ডাকসুর ভিপি আক্তারুজ্জামান ভাই বক্তৃতা দিচ্ছেন অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে দাঁড়িয়ে, নতুন কর্মসূচী ঘোষণা হবে। ঠিক এমন সময় কলাভবন চারিদিক থেকে ঘিরে আমাদের ওপর শুরু হলো হামলা। সেদিন বিকেলে এরশাদের যৌথ বাহিনীর আক্রমণে কলাভবন, লেকচার থিয়েটার, বিশ্ববিদ্যালয় মল (মলচত্বর), মধুর ক্যান্টিন, সেন্ট্রাল লাইব্রেরিসহ সংলগ্ন গোটা এলাকায় কতোসংখ্যক ছাত্রছাত্রী নিহত আহত এবং নির্যাতিত হয়েছিলেন তার সঠিক পরিসংখ্যান কখনোই জানা যায়নি।

কলাভবনের রুমে রুমে ঢুকে লুকিয়ে থাকা ছাত্র-ছাত্রীদেরকে পেটাতে পেটাতে নিচে নামানো হয়। গাড়ীতে তোলা পর্যন্ত বেধড়ক পেটানো চলতেই থাকে। অনেক ছাত্রছাত্রী দৌড়ে পালায়, তারা ভেবেছিলো শেষ পর্যন্ত কোনো একদিকে যেদিকে পুলিশ নেই সেদিক দিয়ে তারা হয়তো বেরিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু যৌথবাহিনী দাঁড়িয়ে ছিলো সব দিক ঘিরে। বিভিন্ন দিকে দৌড়ে গিয়ে তারা মার খেতে খেতে আবার ফিরে আসে কলাভবনের সামনেই। শেষ পর্যন্ত মারের হাত থেকে বাঁচার উপায় হিসেবে তারা নিজেরাই ট্রাকে উঠতে থাকে। সেখানেও অভ্যর্থনাকারী হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা দু’সারি পুলিশ দুদিক থেকে মারতে মারতে তাদেরকে একপর্যায়ে তোল্লাই করে ছুঁড়ে দিচ্ছিলো ট্রাকের ভেতরে।

ট্রাকগুলো গাদাগাদি ভরে গেলে সেগুলো নিয়ে গিয়ে শাহবাগ কন্ট্রোল রুমে আনলোড করা হচ্ছিলো। নামানোর সময় আবারো দু’দিকে দাঁড়িয়ে থাকা দু’ সারি পুলিশ তাদেরকে মারতে মারতে নামিয়ে লাইন ধরে দাঁড় করাচ্ছিলো। এদিকে কলাভবনের রুমে তল্লাশি চালিয়ে বেপরোয়া পেটাতে পেটাতে যাদেরকে ধরা হচ্ছিলো তাদের মধ্যে অনেকে ওখানেই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যায়। কিন্তু বেধড়ক লাঠিপেটা থামেনি। যারা এই তীব্র পিটুনি বর্ষণের মধ্যে কলাভবন থেকে ছুটে বেরিয়ে মাঠে নামতে পেরেছিলো তারা বেঁচে ট্রাকে উঠতে পেরেছিলো। বাকিদের ভাগ্যে কি হয়েছিলো জানা যায়নি। বিশেষতঃ লাঠির আঘাতে মাথা ফেটে অজ্ঞান হয়ে যারা লুটিয়ে পড়েছিলো। সন্ধ্যা নেমে যাবার পর যেসব কক্ষে মেয়েদেরকে পাওয়া গিয়েছিলো তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছিলো তাও আর জানা যায়নি।

কন্ট্রোল রুমে ট্রাক থেকে নামানোর সময় বেধড়ক লাঠির বাড়ি আর সহ্য করতে পারলাম না, মাটিতে পড়ে গেলাম। টেনে হিঁচড়ে আমাকে লাইনে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো, কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না। কপালে হাত দিয়ে দেখলাম রক্ত তখনও গড়িয়ে গড়িয়ে নেমে আসছে। ইতোমধ্যে জামা ভিজে গিয়েছিলো। যথাসম্ভব শান্ত থাকবার চেষ্টা করছি, ব্যথা বেদনাকে অগ্রাহ্য করে।

দেখলাম আমাদেরকে দাঁড় করিয়ে রাখলেও কোথাও কোথাও বসিয়েও রাখা হয়েছে। আবার হঠাৎ হঠাৎ একদল পুলিশ এসে বৃষ্টির মতো কিছুক্ষণ লাঠি চালিয়ে যাচ্ছে। প্রথমে গ্রেফতারকৃতদেরকে দালানের ভেতরেই নিয়ে যাওয়া হয়েছে কিন্তু জায়গা শেষ তাই আমাদেরকে রাখা হয়েছে বাইরে। ভেতর থেকেও ভেসে আসছে নির্যাতনের শব্দ। পরে আমি শুনেছিলাম এই নির্যাতনের সময় এখানে বেশ কয়েকটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ কন্ট্রোল রুম গ্রেফতারকৃত অসংখ্য ছাত্রে ভরে গেলো। আহতদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠলো কন্ট্রোলরুমের বাতাস।

পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঠের বন্দীদেরকে দু’ গ্রুপে ভাগ করা হলো। একদলকে নিয়ে যাওয়া হলো রমনাসহ বিভিন্ন থানায়। গুরুতর আহতদেরকে রাজারবাগ পুলিশ লাইন হাসপাতালে। পুলিশ হাসপাতালে আমি একজন সহৃদয় পুলিশের দেখা পেলাম। খারাপের মধ্যেও ভালো থাকে, অবিবেচনার মধ্যে বিবেচনা। কলাভবনে আক্রমণের আগে যৌথবাহিনীকে বলা হয়েছিলো শিশু একাডেমিতে একজন পুলিশের মাথা থেতলে ফেলেছে বিক্ষোভকারীরা। এধরণের সর্বৈব মিথ্যার সাহায্যে আক্রমণের নিষ্ঠুরতা বৃদ্ধির মোটিভেশন দেয়া হয়েছিল নি:সন্দেহে। পরবর্তী দিন মিডিয়াতে এরকম পুলিশ হত্যার কোনো ছবি প্রকাশিত হয়েছিলো বলে আমার জানা নেই।

আমি হাঁটতে পারছিলাম না। আহত অবস্থায় আমার মতো অনেককে ফেলে রাখা হয়েছে পুলিশ লাইন হাসপাতালের বারান্দায়। কিছুক্ষণ এ অবস্থায় পড়ে থাকার পর আমার বাথরুমে যাবার খুব প্রয়োজন হলো। পুলিশটিকে কোনেক্রমে সেকথা জানাতে অত্যন্ত সহানুভূতির সাথে ধরে তিনি আমাকে বাথরুমে নিয়ে গেলেন। পুলিশ ভদ্রলোক আমাকে পেছন থেকে ধরে থাকলেন, আমি আস্তে আস্তে একহাতে দেয়ালটা ধরে কোন রকমে কাজ সারলাম। ফেরার সময় আমাকে বললেন দাঁড়ান, কাউকে খবর দিতে চান? আমি দু’টো ফোন নম্বর বললাম। এর একটি আমার এক বন্ধুর, অপরটি আমার ভগ্নিপতির যিনি তখন সেনাবাহিনীর একজন মেজর। পকেট থেকে এক টুকরো কাগজ বের করে পুলিশ ভদ্রলোক নাম এবং নম্বর দু’টো টুকে নিলেন। আমি ভাবিনি সত্যি সত্যি তিনি ফোন করবেন। মুহূর্তের আবেগে হয়তো নিয়ে থাকবেন, পরে ভুলে যাবেন। কিন্তু অনেক পরে জেনেছিলাম দু’ জায়গাতেই তিনি ঠিক ঠিক ফোন করে জানিয়েছিলেন। এই ফোনের সূত্র ধরেই তিনদিন পরে ১৭ ফেব্রুয়ারি আমার দুলাভাই আমাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান।

হাসপাতালে আহতদের আমদানি বেড়েই চলেছিলো। দলে দলে নতুনদেরকে আনা হচ্ছিলো, স্থান সঙ্কুলান হচ্ছে না, কোনোরকম প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে চালান করে দেয়া হচ্ছে থানায় থানায়। রাতেই আমাকে হাসপাতাল থেকে রমনা থানায় চালান করা হলো। হাজত কক্ষে গাদাগাদি করে আটকে রাখা শত শত ছাত্র। দু’একজন দেখলাম সাধারণ হাজতি, তারা আমাদেরকে যারপরনাই সম্ভ্রম দেখাচ্ছে। এর মধ্যে কয়েকজন বন্দী ছাত্রের সাথে আলাপ হলো। একজন জনৈক বিচারপতির ছেলে, আজ আর নাম মনে নেই। আরেকজন রাইসুল, আর্ট কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ময়মনসিংহ বাড়ী। এই ছেলেটির সাথে পরবর্তী জীবনে আমার দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিলো।

হাজত খানায় শোয়ার মতো পরিবেশ নেই। পাশে দুর্গন্ধযুক্ত বাথরুম। মেঝেতে বসে থেকে, না পারলে একটু কাত হয়ে নিয়ে, আবার অনেকে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে আমরা কাটিয়ে দিলাম রাত। সারারাতই কেটেছিলো প্রচণ্ড ভয় আর আতঙ্কের মধ্যে, কারণ এর মধ্যে একটা গুজব ছড়িয়ে পড়েছিলো আমাদের মধ্যে যে শেষ রাতে আমাদের হাজত কক্ষে এসে ব্রাশফায়ার করে নির্বিচারে মেরে ফেলা হবে। ঐ মুহূর্তে এরকম গুজব অবিশ্বাস করার মতো কোনো কারণ থাকে না।

ইতোমধ্যে আমরা শুনেছিলাম যে কার্জন হলের সামনে অবরোধকামী ছাত্র ছাড়াও ঐদিন কলাভবনে এবং পরে কন্ট্রোল রুমে বহু ছাত্রকে হত্যা করা হয়েছে। ছাড়া পাবার পর জেনেছিলাম যে ১৫ এবং ১৬ তারিখে সারা দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে আরও অনেকে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিল। গুলি ছাড়াও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে দুটি শিশুকে হত্যা করা হয়।পলিটেকনিকের ছাদ থেকে ছুঁড়ে ফেলে হত্যা করা হয় দু’জন ছাত্রকে।

এরপর পরিস্থিতি ক্রমশঃ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকলে সরকার পিছু হটার নীতি অবলম্বন করে। মজিদ খানের শিক্ষানীতি, যা নিয়ে আন্দোলনের সূত্রপাত, সে শিক্ষানীতি বাতিল ঘোষণা করা হয়। এরপর স্বল্পদিনের মধ্যেই ঘরোয়া রাজনীতির অনুমতি পায় রাজনৈতিক দলগুলো।

আজ এতোদিন পরে মনে হয় সত্যি কি ট্র্যাজেডি, স্বাধীন দেশের তরুণ তরুণীদেরকে নিজের দেশের পুলিশের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে, নির্যাতিত-ধর্ষিত হতে হয়েছে নিজের দেশের পুলিশ বাহিনীর হাতে, এবং সেটাও কোনো চরমপন্থি রাজনীতি করতে গিয়ে নয়, সাধারণ গণতান্ত্রিক অধিকারের সংগ্রাম করতে গিয়ে। এই কি ছিলো আমাদের একাত্তরের চেতনা? সত্যি সত্যি কি আমরা সভ্য স্বাধীন জাতি হিসেবে আবির্ভূত হতে পেরেছিলাম ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর? স্বাধীনতার এক বছর পার হতে না হতেই পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিতে হয়েছিল মতিউল কাদেরকে। কি অপরাধ ছিলো তাদের? ভিয়েতনামে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের অন্যায় যুদ্ধের প্রতিবাদ করছিলেন তাঁরা। ছাত্র ইউনিয়নতো কোনো জঙ্গী সংগঠন ছিলো না কোনো কালেও।

৪৫ বছর পার হয়ে গেছে, কিন্তু গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতা থেকে আজো আমরা লক্ষ যোজন দূরে। না আমাদের সমাজব্যবস্থা গণতান্ত্রিক, না আমাদের রাজনৈতিক সংগঠনগুলো গণতান্ত্রিক। কিন্তু চিরদিন নিশ্চয়ই এমন থাকবে না। আমাদের তরুণরা বার বার রক্ত দিয়ে যে ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছেন সে পথেই নিশ্চয়ই একদিন সত্যিকারের একটি গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মিত হবে, যেখানে বর্ণ, ধর্ম, রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। আমি সাধারণ মানুষ কিন্তু আশাবাদী, এতো কিছুর পরেও আমি হতাশ নই। আমি হতাশ হতে চাই না।

আজকের তরুণ–তরুণীরা ১৯৮৩-র ১৪ ফেব্রুয়ারির কথা হয়তো ভুলে গেছে, আজ তারা ঐদিন ভ্যালেন্টাইনস ডে পালন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে পথ দিয়ে শিক্ষাভবনে মিছিল করে গিয়েছিলাম সে পথ দিয়েই হাঁটছিলাম ১৪ ফেব্রুয়ারির দিন, ছোট ছেলের হাত ধরে, বইমেলার উদ্দেশ্যে। চকিতে ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩-র স্মৃতি মনে এলো। আজ ভ্যালেন্টাইন্স ডে। দেখলাম অনেক তরুণী হাওয়াইয়ান স্টাইলে মাথায় ফুলের মুকুট পড়েছে। এই দিনের সাথে যে বিষাদ মাখানো জাফর, জয়নাল, দীপালি সাহার স্মৃতি জড়িত তা হয়তো তাদের জানা নেই। ক্ষতি কি? যে ভালবাসতে জানে সে আত্মত্যাগ করে রুখে দাঁড়াতেও তো জানে।

এই তো সেদিন, শাহবাগে এই তরুণ-তরুণীরাইতো সমবেত হয়েছিল আর তাদের মহান সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে রুখে দিয়েছিলো একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার নিয়ে রাজনীতি-রাজনীতি খেলা। এজন্যতো জীবনও দিতে হয়েছে তাদের কাউকে কাউকে। সুতরাং আশাবাদী না হবার কিছু নেই। আমরা যারা জানি ১৯৮৩-র ১৪ ফেব্রুয়ারি কি হয়েছিলো, আজ তাদেরই কর্তব্য সেটা সকলের কাছে ছড়িয়ে দেয়া।

Channel-i-Tv-Live-Motiom

ট্যাগ: মধ্য ফেব্রুয়ারি
শেয়ারTweetPin

সর্বশেষ

ছবি: সংগৃহীত

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে সরকারকে ধন্যবাদ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির

এপ্রিল ১৯, ২০২৬

ঢাকায় গরমের তেজ, বৃষ্টির দেখা নেই

এপ্রিল ১৯, ২০২৬

অ্যাটলেটিকোকে হারিয়ে কোপা ডেল রে চ্যাম্পিয়ন সোসিয়েদাদ

এপ্রিল ১৯, ২০২৬

মেসির জোড়া গোলে টেবিলে বড় লাফ মিয়ামির

এপ্রিল ১৯, ২০২৬

আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও ডিজিটাল অর্থব্যবস্থা বিষয়ক সম্মেলন শুরু

এপ্রিল ১৯, ২০২৬
iscreenads

প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
সম্পাদক: জাহিদ নেওয়াজ খান
ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড , ৪০, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণী, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮, বাংলাদেশ
www.channeli.com.bd,
www.channelionline.com 

ফোন: +৮৮০২৮৮৯১১৬১-৬৫
[email protected]
[email protected] (Online)
[email protected] (TV)

  • আর্কাইভ
  • চ্যানেল আই অনলাইন সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In
Bkash Stickey January 2026 Bkash Stickey September 2025 Desktop

Add New Playlist

No Result
View All Result
  • সর্বশেষ
  • প্রচ্ছদ
  • চ্যানেল আই লাইভ | Channel i Live
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • স্বাস্থ্য
  • স্পোর্টস
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • কর্পোরেট নিউজ
  • আইস্ক্রিন
  • অপরাধ
  • আদালত
  • মাল্টিমিডিয়া
  • মতামত
  • আনন্দ আলো
  • জনপদ
  • আদালত
  • কৃষি
  • তথ্যপ্রযুক্তি
  • নারী
  • পরিবেশ
  • প্রবাস সংবাদ
  • শিক্ষা
  • শিল্প সাহিত্য
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

© 2023 চ্যানেল আই - Customize news & magazine theme by Channel i IT