সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) পূরণের রোল মডেল বাংলাদেশ জাতিসংঘের নির্ধারণ করা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) পূরণে আপাততঃ বেশ পিছিয়ে আছে।
জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সল্যুশন্স নেটওয়ার্কের এসডিজি সূচক এবং ড্যাশবোর্ডস রিপোর্ট ২০১৭ অনুযায়ী, ১৫৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২০। সবদিক মিলে বাংলাদেশের স্কোর ৫৬ দশমিক ২।
শুধু পাকিস্তান বাদে দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, নেপাল, ভুটান র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে। ৫৫ দশমিক ৬ স্কোর নিয়ে পাকিস্তান আছে ১২২ নম্বরে। আফগানিস্তানের অবস্থান ১৫০।
এমডিজির ৮টি লক্ষ্য দারুণভাবে পূরণ করলেও প্রকাশিত এই রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে এসডিজির ১৭ টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ১০ টি তেই ‘লাল কার্ড’ পেয়েছে বাংলাদেশ।

যে ১০ টেকসই লক্ষ্যমাত্রায় প্রত্যাশার তুলনায় পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ
এসডিজি২. খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টির উন্নয়ন ও কৃষির টেকসই উন্নয়ন; এসডিজি৩. সকলের জন্য সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা; এসডিজি৪. মানসম্পন্ন শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিতকরণ; এসডিজি৭. সকলের জন্য জ্বালানি বা বিদ্যুতের সহজলভ্য করা; এসডিজি৮. স্থিতিশীল ও অংশগ্রহণমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পূর্ণকালীন উৎপাদনমূলক কর্মসংস্থান ও কাজের পরিবেশ; এসডিজি৯. স্থিতিশীল শিল্পায়ন এবং উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা; এসডিজি১১. মানব বসতি ও শহরগুলোকে নিরাপদ ও স্থিতিশীল রাখা; এসডিজি ১৪. টেকসই উন্নয়নের জন্য সাগর, মহাসাগর ও সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ ও পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করা; এসডিজি১৬.শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমুলক সমাজ, সকলের জন্য ন্যায়বিচার, সকল স্তরে কার্যকর,জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা; এবং এসডিজি১৭. টেকসই উন্নয়নের জন্য এ সব বাস্তবায়নের উপায় নির্ধারণ ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের স্থিতিশীলতা আনা।

এসডিজি পুরোপুরি পূরণ হয়েছে প্রকাশ করতে রিপোর্টে সবুজ, মোটামুটি পূরণ হয়েছে প্রকাশের জন্য হলুদ, আরও কাজ করতে হবে এমন লক্ষ্যমাত্রার জন্য কমলা এবং প্রত্যাশিত তুলনায় বেশ পিছিয়ে থাকা লক্ষ্যমাত্রার জন্য লাল রং ব্যবহার করা হয়েছে।
রিপোর্টে বাংলাদেশ,ভারত, পাকিস্তান একটি এসডিজি লক্ষ্যমাত্রাতেও সবুজ পায়নি। জলবায়ু পরিবর্তন রোধের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে সবুজ কার্ড পেয়েছে নেপাল ও ভুটান। দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র দেশ হিসেবে ভুটান টেকসইভাবে দারিদ্র্য দূর করার জন্য আরেকটি সবুজ কার্ড পেয়েছে।
এসব লক্ষ্যপূরণে মন্ত্রণালয় ভিত্তিক পরিকল্পনা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পদক্ষেপ না থাকা এবং সমন্বয়হীনতার সংস্কৃতি ‘লাল কার্ডের’ কারণ বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ।
এসডিজি অর্জনে এমন দুর্দশার কারণ তুলে ধরে চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন,’ এমডিজিতে মাত্র একেবারেই প্রাথমিক ৮ টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিলো। সেগুলো বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সময় পেয়েছে ১৫ বছর। এরপর আমাদের সামনে এসডিজি এলো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে। কারণ এখানে ২০৩০ সালের মধ্যে ১৭ টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হবে। এসডিজিতে শুধু কাজ করলেই চলবে না কাজটির মান কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে সেটাই গুরুত্ব পাবে। এদিকটা বাংলাদেশে অনেকাংশেই গুরুত্ব পাচ্ছে না। খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বসবাসসহ ১৭ টি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে কতটুকু পরিকল্পনা আছে এবং কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে সেগুলো নিশ্চিত না করলে টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা আরও কঠিন হবে।’
সরকারি পর্যায়ে এসডিজি পূরণে বেশ কিছু পরিকল্পনার কথা বহুপ্রচারিত হলেও বাস্তবায়নে আন্তরিকতা ও সমন্বয়হীনতায় কাঙ্ক্ষিত সফলতা থেকে বহু দূরে বাংলাদেশ বলেই মনে করেন এই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ।
তিনি বলেন,’ দেশে প্রতিবছর পাবলিক পরীক্ষায় পাশের হার বাড়ছে, কিন্তু প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষাস্তরে মান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তা কিছুটা স্থিতিশীল হলেও এসডিজি খাদ্যের গুণগত পুষ্টিমান নিশ্চিতের দাবি করে। সরকার ২০১৫ সালে পুষ্টি নীতিমালা করেছে। কয়েকবছর আগে বাংলাদেশ ন্যাশনাল নিউট্রিশন কাউন্সিল (বিএনএনসি) গঠিত হলেও এখন পর্যন্ত এই কাউন্সিলের কোনো কর্মকাণ্ড,সভা-সেমিনার কিছুই দেখিনি। খোদ রাজধানী ঢাকাতেই বসবাসের উপযুক্ত শহর কিংবা টেকসই নগর গড়ার তেমন উদ্যোগ নেই। নিম্ন আয়ের নাগরিকের বাসস্থান, নাগরিক সুবিধা, পরিচ্ছন্নতা নিয়ে বিক্ষিপ্ত কিছু উদ্যোগ থাকলেও সমন্বয়হীনতা সেগুলো নগরকে বসবাসের জন্য স্থিতিশীল করতে পারছে না।’
২০০০ সালে শুরু হওয়া ‘মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল’ বা এমডিজি অর্জনের সময় শেষ হয় ২০১৫ সালে। এরপর জাতিসংঘ ঘোষণা করে ১৫ বছর মেয়াদি ‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল’ বা এসডিজি৷ জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ২০১৬ থেকে ২০৩০ মেয়াদে এসডিজির ১৭টি লক্ষ্য পূরণ করতে হবে।







