প্রিন্সেস এলিজাবেথ যেদিন রাণী হলেন সেদিন তিনি কেনিয়ার গভীর জঙ্গলে স্বামী ফিলিপের সঙ্গে অবকাশ কাটাচ্ছিলেন। সেখানে থাকা অবস্থায় তিনি বাবা ষষ্ঠ জর্জ এর মৃত্যু সংবাদ পান। রাজা ষষ্ঠ জর্জের মৃত্যুর পর ব্রিটিশ রাজপরিবারের উত্তরাধিকার হিসেবে সিংহাসন লাভ করেন প্রিন্সেস এলিজাবেথ। বাবার মৃত্যুর কারণে রাতারাতি রাজকুমারী থেকে রাণী হয়ে এলিজাবেথ।
১৯৫২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববাসীর ঘুম ভাঙ্গে রাজা ষষ্ঠ জর্জের মৃত্যু সংবাদে। তার মৃত্যু হয় ফুসফুসের ক্যান্সারে।
সেসময় ব্রিটিশ সিংহাসনের উত্তরাধিকারী এলিজাবেথের বয়স ছিল ৩৫ বছর। বাবার মৃত্যুর দিনেই এলিজাবেথ খবর পেয়ে যান। সেদিন এলিজাবেথ ছিলেন স্বজনদের কাছ থেকে অনেক দূরে অ্যাবেরডেয়ার রেঞ্জের গভীর জঙ্গলে।
সেসময় কেনিয়া ছিল ব্রিটিশ কলোনিভুক্ত। রাজকুমারী এলিজাবেথ কমনওলেথ দেশগুলোর মধ্যে কেনিয়াতেই প্রথম সফরে যান। সঙ্গে ছিলেন স্বামী প্রিন্স ফিলিপ। ৫২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাজ দম্পতিকে নেয়া হয়েছিল অ্যাবেরডেয়ার রেঞ্জের ভেতরে গাছের উপরে নির্মিত বাড়িতে। নাম ছিল ‘ট্রিটপস হোটেল’। সেই রাতেই নিয়তি ঠিক করে দেয় রাজা ষষ্ঠ জর্জ মারা যাবেন। ব্রিটিশ রাজ্যের রাণী হবেন এলিজাবেথ।
ওই দিনের ঘটনা নিয়ে শিকারী ও রাজ দম্পতির সঙ্গী জিম করবেট পরিদর্শক বইয়ে লিখেছিলেন, “বিশ্বের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কম বয়সী বালিকা গাছের চূড়ায় উঠেছিল রাজকুমারী পরিচয়ে যেটা তার জীবনে সবচেয়ে উত্তেজনাময় ঘটনা। সেই বালিকাই গাছের চূড়া থেকে নেমে হয়ে গেলেন রাণী।
সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা:
ট্রিটপস হোটেল থেকে ফেরার পর ডিউক অব এনিবার্গ ষষ্ঠ জর্জের মৃত্যুর খবর দেন এলিযাবেথকে। রাজ দম্পতি ফেরার পরেই ট্রিটপ হোটেল মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে যেখানে একজন রাজকুমারী রাণী হয়েছিলেন।
হোটেলটি চালু হয়েছিলো ১৯৩২ সালে। ধনাঢ্য ব্যক্তিদের এক রাত থাকার ব্যবস্থা রেখেই সেটি চালু করা হয়। আফ্রিকার দুর্গম বন্দরে গাছের শাখা প্রশাখায় নির্মিত বাড়িতে নিরাপদে বসে বন্যপ্রাণীর আনাগোনা কাছ থেকে দেখার সুব্যবস্থা রাখা হয়।
সেখানে অবস্থানের সময় কী কী প্রাণীর দেখা পেয়েছেন সেসবের নাম একটি কাগজে টুকে রেখেছিলেন এলিজাবেথ এবং ফিলিপ। তাদের কাগজটি এখনো ট্রিটপ হোটেলে টানিয়ে রাখা হয়েছে। তারা দেখেছিলেন বিশাল আকারের প্রায় ৪০টি হাতি, বেবুন এবং হরিন। এছাড়াও তাদের চোখে পড়েছিলো জলহস্তী। সকালে তারা সেখানে দুই ষাড়ের লড়াইও দেখেছিলেন।
রাজদম্পতির এক সহকারী তাদের হয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষকে সার্বিক আয়োজনের জন্য ধন্যবাদও জানিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি নিশ্চিত যে গাছের চূড়ায় নির্মিত বাড়িতে অবস্থানের অভিজ্ঞতা রাণী এবং তার স্বামীর জন্য জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।’ রাজপরিবারের সহকারীর লেখা এ চিঠিটিও হোটেলের ভেতরে টানানো রয়েছে।
মৃয়মান স্মৃতি:
রাজসিংহাসনে আরোহনের দুবছর পর ট্রিটপ হোটেলটি পুরে যায়। ধারণা করা হয় ব্রিটিশ কলোনীবিরোধী ম্যাউ ম্যাউ বিদ্রোহীরা ওই হোটেলে অগুন ধরিয়ে দেয়। পরে একই জায়গায় বিপরীত পাশে আরো বড় পরিসরে ট্রিটপ হোটেল নির্মিত হয়। যেটি এখনও বিদ্যমান।
রাজকীয় সফর এবং তাদের সফর ঘিরে চালু গল্পগুলোর কারণে বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত হোটেল হয়ে ওঠে ট্রিটপ হোটেল। ধনাঢ্য ব্যক্তিরা মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে রাজকুমারী এলিযাবেথ এর স্যুটে থাকতে পারেন। তারা যে ডাইনিং রুম ব্যবহার করেছিলেন সেখানে বসে খেতে পারেন।
১৯৮৩ সালে আবারও সেখানে সফরে যান রাণী এলিজাবেথ এবং প্রিন্স ফিলিপ। ততোদিনে ওই এলাকাকে সাফারি পার্কের আকার দেয়া হয়েছে। ৩১ বছরের ব্যাবধানে অনেক পরিবর্তন করে ফেলা হয় ট্রিটপ হোটেলকে।
পরিবর্তিত হলেও বর্তমানে সেসব দেখার সুযোগ নেই। করোনা মহামারীর কারণে হোটেলটি বন্ধ রাখা হয়েছৈ। আর দুবছর পর রাণী সিংহাসনে আরোহনের ৫০ বছর উদযাপন করবেন। কিন্তু ততোদিনে হোটেলটি আগের মতো জাকজমকপূর্ণ চেহারায় ফিরবে কি না সেটা অনিশ্চিত।








