শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল হলে হয়ে গেল ঢাকা থিয়েটারের আয়োজনে বিনোদিনী। এই আয়োজনে বিনোদিনীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন শিমুল ইউসুফ। বিনোদিনী-রূপী শিমুল ইউসুফের অভিনয় শক্তিতে মুগ্ধ হয়ে অভিনেতা কাওসার চৌধুরী তার সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন-
।। বিনোদিনী: ঢাকা থিয়েটারের ‘মঞ্চকবিতা’………।।
শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল হলে প্রবেশ করি নির্ধারিত সময় ৭-টার একটু আগে। দর্শকরা মিলনায়তনে ঢুকে যে যার আসনে বসছেন। সহযোগিতা করছেন ঢাকা থিয়েটারের তরুণ কর্মীগণ। মঞ্চের প্রায় সামনেই, শুরু থেকে দুই নম্বর সারিতে আমার বসার জায়গা হয়।
মিলনায়তনে হাল্কা একটি আলোর আভা দর্শক আর নাট্যকর্মীদের চলাচলে সাহায্য করছে। তার চাইতেও একটু কম আলো জ্বলছে মঞ্চে। সেই স্বল্প আলোতেও মঞ্চের সাজসজ্জা আর বাদক/সঙ্গীত-দলকে দেখা যাচ্ছে মোটামুটি।

মঞ্চের ঠিক মাঝখানে একটি গোলাকার বৃত্ত। ঠিক ব্যাকরণিক বৃত্ত নয়! বৃত্তের বিন্দুটি যাত্রা শুরু করে যেখানটায় এসে মিলে যাবার কথা সেখানে না মিলে একটু দূরত্ব রেখেই চলে গেছে পাশ কেটে। ফলে প্রথাগত বৃত্ত ওটাকে বলা যাবেনা! বৃত্তের মাঝ বরাবর ‘ডিভান’ আকৃতির একটি আসন আছে, ঠিক চেয়ার বলা যায়না ওটাকে।
বৃত্ত থেকে একটু সামনে, মঞ্চের দু’পাশে মনুষ্যাকৃতির কয়েকটি ফাঁপা স্ট্যান্ড; যেখানে বিভিন্ন রঙ-এর বেশকিছু কাপড় ঝোলানো। মঞ্চের বাঁপাশে আরও একটি আসন। আসনের পাশেই একটি খাপ। খাপের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে একটি ‘ব্যাটন’। ব্যাটনের ডগায় একটি হ্যাট ঝুলছে।
মঞ্চের একদম সামনে গদিঘরের ক্যাশবাক্সের মত একটি বাক্স (আমার দৃষ্টিতে)! বাক্সটি বেশ কারুকার্যময়। তার ওপরে মেরুণ কভারের একটি খেরো খাতা। তারপাশে একটি দোয়াতে পালকের একটি কলম শোভা পাচ্ছে।
অন্যকোন নাটকের মঞ্চে, মঞ্চের সাজসজ্জা দেখে এক ঝটকায় যেমন নাটকের একটি ‘থিম-ক্যারেক্টার’ দর্শকেরা মনে মনে তৈরি করে ফেলেন- এ নাটকের সাজসজ্জায় সেটা করতে পারা একটু দূরুহ! একটু জটিল। ফলে প্রথম থেকেই নাটকের ‘এক রৈখিক’ কোন চরিত্র ভেবে রাখার কোন সুযোগ ছিলন।
অবশ্য নাটকের বহুমাত্রিকটা টের পাওয়া যায় আরও একটু পরে, যখন বিনোদিনী-রূপী শিমুল ইউসুফ মঞ্চে উপস্থিত হন। নাটক শুরু হল কাঁটায় কাঁটায় ৭-টায় (নির্ধারিত সময়ে)!
‘ঘণ্টা’ বাজানোর সাথে সাথে মিলনায়তনের আলোর আভা নিভে গিয়ে মঞ্চের একটি কোন উজ্জ্বল হয়ে ওঠলো। দেখা যায়, সূত্রধর হিসেবে স্বয়ং নির্দেশক নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু কথা শুরু করছেন। উনার কাছেই দর্শক জানতে পারে- শিমুল ইউসুফের শারীরিক অসুস্থতার কারণে বেশ কিছুদিন এই নাটকের প্রদর্শনী বন্ধ থাকার পর আজ (২৯/১০/২০১৭) নতুন করে এই নাটকের যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে।

এরপরে নির্দেশক নাটকের পটভূমি, প্রস্তুতি এবং মঞ্চায়ন সম্পর্কে অবহিত করেন দর্শকদের। নাটক বিনোদিনী আসলে একটি একক অভিনয়ের উপস্থাপনা। এটি ঢাকা থিয়েটারের ৩১-তম প্রযোজনা।
নির্দেশক বলতে থাকেন- “পেশাধারী বাঙলা থিয়েটারের উন্মেষ কালের প্রবাদ প্রতিম অভিনেত্রী মঞ্চকুসুম শ্রীমতি বিনোদিনী দাসীর জীবন ও অভিনয় নিয়ে আমার কৌতূহল ও শ্রদ্ধা দীর্ঘদিনের। আমকে বিস্মিত করেছে শিল্পী হিসেবে থিয়েটারে তাঁর আবির্ভাব, অভিনয় শিল্প নিয়ে তাঁর নান্দনিক ভাবনা এবং নাটক থেকে তাঁর হঠাৎ নিষ্ক্রমণ”।
সূত্রধরের (নির্দেশক) কথার ফাঁকেই মঞ্চের পেছনের অংশে বসা সঙ্গীতদল মৃদুস্বরে সু্র তোলে। এরমাঝে নির্দেশক নাটকের বাকী অংশটুকুর সারমর্ম উপস্থাপন করেন। কয়েক সেকেন্ড পরেই বাতি নিভে যায় নির্দেশকের ওপর থেকে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে সঙ্গীতের স্বর উঁচু হয়ে দর্শকদের নিয়ে যায় সূত্রধরের বর্ণিত সময়ে।
এবারে মঞ্চে প্রবেশ করেন বিনোদিনী রূপী শিমুল ইউসুফ। বাংলা নাটকের লোকায়ত ধারায় প্রথমেই বন্দনা! এরপরেই ছোট্ট একটি ভূমিকা এই চরিত্রটি নিয়ে। তারপরেই বিনোদিনীর ভূমিকায় অভিনয়ের শুরু।
খেরো-খাতাটি টেনে নিয়ে পালকের কলম দিয়ে লিখতে লিখতে বলে চলেন আত্মকাহিনী (বিনোদিনী)! সে এক অসাধারণ উপস্থাপনা!
সেই সত্তর দশকের শুরু থেকে শিমুল ইউসুফ এদেশের মঞ্চের সাথে জড়িয়ে আছেন নিবিড়ভাবে। নাট্য জীবনের ৪০ বছরের মাথায় এসে শিল্পী শিমুল ইউসুফ হয়ে ওঠেন- ‘মঞ্চকুসুম’। তারও অনেক পরে বিনোদিনীর চরিত্রে পুনরাভিনয় আজ (এই নাটকটি শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে)। ৮০ মিনিটের এই নাটকে কোন বিরতি ছাড়াই একক-শক্তিতে শিমুল ইউসুফ দর্শকদের টেনে নিয়ে যান সেই ১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দে।
শ্রীমতি বিনোদিনী দাসীর জন্ম আনুমানিক ১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায়। মাত্র ১১/১২ বছর বয়সে তিনি প্রথম মঞ্চাভিনয় শুরু করেন গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারের ‘শত্রু -সংহার’ নাটকে দ্রৌপদীর সখীর ভূমিকায়। অতঃপর ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত গ্রেট ন্যাশনাল, বেঙ্গল, ন্যাশনাল এবং স্টার থিয়েটারে তৎকালীন যাবতীয় শ্রেষ্ঠ নাটকের প্রধান নারী চরিত্রে অভিনয় করে অসামান্য যশ লাভ করেন। মাত্র ২৩/২৪ বছর বয়সে তিনি তাঁর খ্যাতি ও ক্ষমতার চরম সিদ্ধির লগ্নে রঙ্গালয়ের সংশ্রব ত্যাগ করেন!
বিনোদিনী মাত্র ১২ বছর অভিনয় করেছেন ৮০টি নাটকে ৯০টির অধিক ভূমিকায়। বিনোদিনীকে তখনকার সাময়িক পত্রিকাগুলো ‘ফ্লাওয়ার অব দি নেটিভ স্টেজ’ ‘প্রাইমা ডোনা অব দি বেঙ্গলি স্টেজ’ ‘মুন অব দি স্টার কোম্পানি’- ইত্যাদি আখ্যায় ভূষিত করেছিল।
এই ইতিহাস স্বয়ং বিনোদিনীর (শিমুল ইউসুফ) মুখ থেকেই শোনা।
বিনোদিনীর অভিনয় জীবনে একদিকে যেমন তীব্র আলোর ঝলকানি, অন্যদিকে নিকষ কালো অন্ধকার। সেই দেড়’শ (প্রায়) বছরের পুরনো সমাজে একজন নারী (বিনোদিনী) যখন অভিনয় করতে যান, তখন তাঁকে ‘মানুষের মর্যাদায়’ আসীন না করে সমাজ তাঁকে ‘রক্ষিতা’ খেতাবে আখ্যায়িত করে! তাঁর শিল্পী সত্তার চাইতে ‘দেহ’ হয়ে ওঠে অনেক বেশী কাম্য।
যে পুরুষ একজন বিনোদিনীকে দিনের আলোয় নিগ্রীহিত করে পতিতা কিংবা রক্ষিতা বলে; সেই পুরুষই আবার রাতের অন্ধকারে তার প্রেম প্রত্যাশী হয়, দেহের স্পর্শ লাভের আশায় হাজার হাজার টাকা তার পায়ের কাছে উজাড় করতে উন্মাদ হয়ে ওঠে! কিন্তু নির্লোভ, দৃঢ় ব্যক্তিত্বের নারী বিনোদিনী ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করে পুরুষের এই দগদগে কামনার প্রস্তাব।
বিনোদিনী রূপী শিমুল যখন একক অভিনয়ে ‘একটি কাপড়ের প্রস্ত’কে কামুক ইংরেজ সাহেব বানিয়ে তার টুটি চেপে ধরে সংলাপ উচ্চারণ করেন; তখন চোখ ভিজে আসে দর্শকের। রক্তে কাঁপন লাগে! কিংবা যখন মঞ্চের সামনের ভাগে রাখা কাপড়ের ভেতর থেকে বড়ো ছোরা বার করে প্রতিবাদে রুখে দাঁড়ান, তখন রক্তে নাচন লাগে, দ্রোহে ফেটে পড়তে ইচ্ছে করে!
সেই একশ কুড়ি/তিরিশ বছর আগের সমাজ আজ কি খুব একটা পাল্টেছে? আজও কি নারীর প্রতি আমরা সে ধরণের মনোবৃত্তি পোষণ করছিনা (মোটা দাগে)? আজও কি আমরা নিজের বোন আর নিজের মাকে ছাড়া অন্যসব নারীকে নেহায়েত কামনার বস্তু হিসেবে দেখিনা (কিছু ব্যতিক্রম বাদে)!
এই নাটকের পাণ্ডুলিপি রচনাকারী সাইমন জাকারিয়া বলেন-
“……মঞ্চাভিনেত্রী নারীদের সেই শতবর্ষ পূর্বকৃত অধিকার বঞ্চনার চিত্র বা একেবারে ভিতরে অন্তরক্ষত আজ শতবর্ষ পরেও তেমনভাবে পরিবর্তিত হয়নি”! আমার কাছে বিনোদিনী- সব ধরণের কূপমণ্ডূকটা আর হীনমন্যতার বিরুদ্ধে গনগনে এক প্রতিবাদ!
বিনোদিনীর চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে মঞ্চকুসুম শিমুল ইউসুফ ওই নাটকে একাই অভিনয় করেছেন ৫/৭টি চরিত্রে। কখনো নীলদর্পন, কখনো মেঘনাদবধ কাব্য, কখনো মৃণালিনী, আবার কখনোবা চৈতন্য লীলা নাটকের কোন চরিত্র সেজে অভিনয় করে গেছেন দাপটের সাথে! এটা শিমুল ইউসুফের পক্ষেই সম্ভব- বয়সের এই স্তরে এসেও! কী বাচিক আর কী আঙ্গিক অভিনয়! শিমুল ইউসুফের নিজস্ব ঢং-এ সংলাপ উচ্চারণ আর গান পরিবেশন, সেটা দর্শকদের জন্য একটি ভিন্নতর অভিজ্ঞতা!
এই নাটকের মঞ্চসজ্জা এবং আলোকসম্পাত দীর্ঘ আলোচনার দাবী রাখে। সেট ডিজাইন, নির্মাণ এবং প্রপস ডিজাইন ও নির্মাণে যথাক্রমে কামাল উদ্দিন কবির এবং কিরিটি রঞ্জন বিশ্বাস সৃজনশীলতার ছাপ রেখেছেন বিশ্বস্ততার সাথে। ‘মানবাকৃতির’ সেই ‘স্ট্যান্ড’গুলো একদিকে যেমন পারফর্মারের মঞ্চে ব্যবহার্য জামাকাপড় ধরে রাখার দায়িত্ব পালন করেছে, অন্যদিকে অভিনয়ের সময় জীবন্ত বিনোদিনীর পাশে স্থির ‘সহ-অভিনেতার’ ভূমিকাও পালন করেছে নীরবে!
প্রপসের ক্ষেত্রে কিরিটি রঞ্জন বিশ্বাস তাঁর প্রপস দিয়ে দর্শকদের একটানে নিহ্যে গেছেন একশ কুড়িস-তিরিশ বছর পূর্বের সময়ে। দু’জনকেই অসংখ্য ধন্যবাদ দিতে হয়। আলোক সম্পাতে ইশরাত নিশাত বরাবরের মতই অনবদ্য। তবে সম্প্রতি নাটক নির্দেশনা দিয়ে বিলেত ঘুরে আসার পরে তাঁর হাত-যশ বেড়েছে বহুগুণ!
মঞ্চ সজ্জার ব্যাপারে আর একটি বিষয়ে না বললেই নয়। তা হল, মঞ্চের ভেতরেই মঞ্চ নির্মাণ। একটি চরিত্র থেকে বিনোদিনী যখন অন্য একটি চরিত্রে রূপ বদলাচ্ছেন, তখন সেটা যদি হয় বিনোদিনীর কোন নাটকের অভিনয় সম্পর্কিত বর্ণনা; তখনই মূল মঞ্চের ওপর থেকে নেমে আসছে মঞ্চের ‘মূল পর্দার’ মত একটি ‘প্রতীকী পর্দা’। আবার অভিনয় শেষে বিনোদিনী যখন তাঁর ব্যক্তি জীবনের কাহিনীতে ফিরে যাচ্ছেন, তখন এই প্রতীকী পর্দাও ওঠে যাচ্ছে তার পূর্বের উচ্চতায়। পর্দার রঙ, তাতে আলোর রং-এর ব্যবহার এই পরিবেশনাটিকে ভিন্ন মাত্রায় আরোহণ করিয়েছে!
নির্দেশক নাসির উদ্দিন ইউসুফ এই নাটকের স্মরণিকায় লিখেছেন- “আমার সব নাটকে সঙ্গীত একটি মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। আমার জীবন ও শিল্পযাত্রায় হয়তো শিমুলের উপস্থিতি আমায় এরকম একটা সূচনা সূত্র পেতে সাহায্য করেছে। গানের সুর তৈরি হলে আমি ক্রমান্বয়ে নাটকের ছন্দ খুঁজে পাই। নাটকের কাব্যগুণ অনুভব করতে শুরু করি- দৃশ্যগুলো মঞ্চকাব্য হিসেবে প্রতিভাত হতে থাকে। শিমুল আমাদের সঙ্গীত দলের সদস্য চন্দন, শুভ এবং শান্ত’র সাথে বসে বেশ অল্প সময়ে গানের সুর করে ফেললো। পাঠের ফাঁকে ফাঁকে আবহ তৈরির কাজও এগিয়ে যেতে থাকলো”।

শিমুল ইউসুফের তৈরি করা সেই সঙ্গীত আর আবহ সঙ্গীত এই নাটকে ভিন্নতর একটি মাত্রা যোগ করেছে। একজন পারফর্মারের পক্ষে একাই দীর্ঘ আশি মিনিট ধরে নৃত্য, বাচিক আর আঙ্গিক অভিনয়ের সাথে সুরেলা কণ্ঠে সঠিক সুর আর স্বরে সংগীত পরিবেশন করা- এ যে কত বড় একটি কর্ম, সেটা প্রতিটি শিল্প-রসিক জনই বুঝতে সক্ষম হবেন, আশাকরি। আমার নিজের কথা বলতে গেলে শিমুল আপার অনবদ্য আর অসামান্য এই পারফরমেন্সে আমি অভিভূত, আপ্লুত আর শ্রদ্ধায় আনত।
এই নাটকটি ঢাকা থিয়েটারের অন্যান্য নাটকের পরিবেশন-ঘরানা থেকে খুব একটা আলাদা নয়। নির্দেশক নিজেই লিখেছেন- “বর্ণনা, সংলাপ, নৃত্য, সঙ্গীত ও শরীরের ভাষা দিয়ে আমি নাট্য-ছন্দ তৈরি করি যা আমার বিবেচনায় মঞ্চকবিতা”।
এই নাটকের মুখ্য উপদেশক প্রয়াত নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন। তাঁর জীবদ্দশায় এই নাটকের যাত্রা শুরু। পাণ্ডুলিপির মূল কাঠামো তাঁর হাতেই তৈরি। এই নাটকের স্মরণিকায় তিনি (সেলিম আল দীন) লিখেছেন- “জীবনের এই প্রান্তে এসে ভাবি যে, মানুষের শিল্প সাধনা শেষাবধি কোনো এক গভীর ধ্রুবতারার দিকে বাহিত হয় কিনা। সেই আদিকাল থেকে আত্মপ্রকাশের স্রষ্টা তাকে প্ররোচিত করেছে এই দহনে যে, বস্তু জগতের দৈন্য নিত্যদিনের পীড়া জরা বার্ধক্য ও মৃত্যুর শিখর পর্যন্ত- সে তা বহন করবে। আত্মার আবেগে দৈনন্দিনের বঞ্চনার ঊর্ধ্বে শিল্প স্রষ্টা চন্দ্রসূর্য খচিত দিন ও নক্ষত্র শোভিত রাতের ভেতর দিয়ে নিরবধি নিরন্তর যেতে থাকবে- কিন্তু কোথায়। কেউ জানে না”!
ঢাকা থিয়েটারের ‘বিনোদিনী’- সেলিম আল দীনের সেই ‘শিল্প সাধনা’র পথ পরিক্রমায় শেষাবধি কোন সে গভীর ধ্রুবতারার দিকে ধাবিত হবে, নিরবধি আর নিরন্তর; সেটার সাক্ষী হিসেবে অবিনশ্বর ‘সময়’ই জেগে থাকবে কেবল- এই পৃথিবীর ‘নশ্বর মানুষেরা’ নয়!
কিন্তু বিনোদিনীর যে আকুলতা, তার যে আর্তি, তার কি হবে!
নির্দেশক লিখেছেন- “আজ থেকে একশ কুড়ি পঁচিশ বছর পূর্বের একজন রক্ষিতা-পতিতা’র জীবনবোধ শিল্প সাধনা এবং শিল্প সৃষ্টি তাঁকে বিশ্ব সভার যে সুউচ্চ স্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে- অথচ তারই ব্যর্থ জীবনের হৃদয় চূর্ণ করা আর্তনাদ ‘ভালোবাসায় ভাগ্য ফেরে না গো, ভালোবাসায় ভাগ্য ফেরে না’ আমাদের হৃদয়েরও গভীর আর্তনাদের প্রতিধ্বনি”।
নির্দেশক নাসির উদ্দিন ইউসুফ আরও লিখেছেন- “শূন্যস্থানে অসম্পূর্ণ বৃত্তের ভেতরে বর্ণনা, সংলাপ, গীত, নৃত্য, রঙ, আলো, শব্দের সংঘাত ও সম্মিলনে সৃষ্টি হয় যে নাট্যমুহুর্ত তাই তো আমার আরাধ্য, আমার সাধনা। আর এসব কিছুকে ধারণ করে অসম্পূর্ণ বৃত্তের ভেতরে যদি সচল হয়ে ওঠে ছায়ানারী তবে সেই তো বিনোদিনী”!
বিনোদিনীর জয় হোক যুগে যুগে, কালে কালে। মঞ্চকুসুম শিমুল ইউসুফের জয় হোক। ঢাকা থিয়েটারের জয় হোক। জয় হোক মঞ্চ নাটকের।








