“ইশ! বাংলাদেশটার যে কী হলো!”, “এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়!” অথবা এমন আরো নানা মন্তব্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ জানান দিচ্ছেন যে, তাঁরা গুলশান-ট্রাজেডি নিয়ে সচেতন। তাঁদের সচেতনতা ও প্রতিক্রিয়ার প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাবোধ রাখছি। তবে বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদ এখন এতোটাই জটিল চেহারা ধারণ করেছে যে, কিছু বিষয়ে ন্যূনতম ধারণা না থাকলে এই ইস্যুতে মতামত দেয়াটাও বিপজ্জনক।
হয়তো নিজের অজান্তেই আমাদের মতামত কিংবা প্রতিক্রিয়া কোনো গোষ্ঠীকে তাদের স্বার্থ উদ্ধারে সক্রিয় সহায়তা জুগিয়ে ফেলবে।
গুলশানের ঘটনায় শোকস্তব্ধ, ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত এই ঘটনায় বিস্মিত হওয়ার মতো কোনো কারণ অন্তত আমার কাছে নেই। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সন্ত্রাসবাদে এই ঘটনা নতুন ধরণের হতে পারে, বিশ্বে এটি অপরিচিত নয়। আবার বাংলাদেশে উগ্র ধর্মান্ধতার চর্চা ও এর বিপজ্জনক বহিঃপ্রকাশও নতুন নয়। 
এর আগেও ভয়াবহ নানা হামলার ঘটনা আমরা জানি। ২০০১ সালের পহেলা বৈশাখে রমনার বটমূলে বোমাহামলা, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার বিভৎসতা ও হতাহতের পরিসংখ্যান দেখলে একথা বলার উপায় থাকবে না যে, গুলশানের ঘটনাতেই প্রথম প্রাণহানি। বরং মনে করা যায়, বাংলাদেশের এসব ঘটনা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ার নেপথ্যের শক্তি পরিবর্তন হয়েছে, মোটেই তা ভাবতে রাজি হওয়ার মতো কোনো প্রমাণ এখনো আমার হাতে আসে নি। কাজেই বাংলাদেশটার “কী” অনেক আগে থেকেই হয়ে আসছে এবং “এই মৃত্যু উপত্যকা” আমার-আপনার “দেশ নয়” বললেও প্রতিদিন তার ভেতরেই দীর্ঘ সময় ধরে আমরা বসবাস করে আসছি।
বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদের ইতিহাস অনেক পুরনো। এর পেছনে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার পুরনো অভিযোগের কথাও অবিদিত নেই। বরং হিসেব কষতে বসলে, অনেক সীমাবদ্ধতার পরেও বলতে হবে, বাংলাদেশে শেষ কয়েক বছরে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সক্রিয় প্রচেষ্টা লক্ষ্যণীয়। সেই প্রচেষ্টার সাফল্য-ব্যর্থতার খতিয়ানে কোন পাল্লা ভারি, সে আলোচনা হতেই পারে। তবে সন্ত্রাসবাদের ধারাবাহিকতা ভুলে গেলে চলবে না। বরং সেই পর্যালোচনা এবং তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়াটাও জরুরি।
“আমরা সবাই তালিবান, বাংলা হবে আফগান”- এমন একটি স্লোগান একসময় আমরা পথেঘাটে শুনেছি। যারা এই স্লোগান দিয়েছিলেন, তারা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে এই কথা বলেন নি। আফগানিস্তানে তখন তালেবানদের পক্ষে কারা কীভাবে যুদ্ধ করতে গিয়েছিলেন, সে নিয়ে পরবর্তীতে কি আমাদের কোনো চুলচেরা বিশ্লেষণ তৈরি করা হয়েছে? আজ গুলশানের ঘটনায় যে হামলাকারীদের কথা আমরা বলছি, ১৯৯৩ সালে, যখন হরকাতুল জিহাদ জাতীয় প্রেসক্লাবে প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলন করেছিলো, তখন তাদের কারো সম্ভবত জন্মই হয় নি। আমি নিশ্চিত, তারা কোনোদিন জানতেও পারেন নি কিংবা চান নি যে, তাদের জন্মের আগেই আফগানিস্তানে যুদ্ধ করার নাম করে গিয়ে কিছু মানুষ সন্ত্রাসবাদী হয়ে ফিরেছিলেন। এরপর তারা ভূরাজনীতি আর অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ঘেরাটোপে খাবি খেতে খেতে নিজেরাই অতলে হারিয়ে গিয়েছে। কিন্তু সন্ত্রাসবাদীদের উৎপাদন প্রক্রিয়া তাতে বন্ধ হয় নি। এর অর্থটা হলো, সন্ত্রাসবাদী হিসেবে যাদেরকে আমরা দেখেছি একেবারে ফ্রন্টলাইনে, তাদের পেছনে আরো কিছু থেকে যায়। যেগুলো অনুদ্ঘাটিত থাকে। অথবা যে কথাগুলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জোট-বেজোট কিংবা ভোটের খেলায় ঘুরপাক খেতে খেতে বিভাজিত হতে হতে হারিয়ে যায়। ফলে নেপথ্যের কুশীলবরা আড়ালেই থেকে যায়। 
আমরা ঘটনার পর ফটাফট ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতে কার্পণ্য করি না। কিন্তু প্রতিটি ঘটনায় যারা অংশ নেয়, তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড কী, রাজনৈতিক মতাদর্শ ছিলো কি না- সে সব নিয়ে মাথা ঘামাই না। যখন কোনো একটি কমন ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে একের পর এক একই ধরনের অপরাধীর জন্ম হয়, তখন সেই ব্যাকগ্রাউন্ডটিকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিষয় ভেবে জনগণের একাংশ যখন এনওসি দিয়ে দেয়, তখন ভবিষ্যতে আরেকটি নতুন প্রজন্মের সর্বনাশ করার পথটা পরিষ্কার হয়ে যায়।
জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে আমার কাজের বয়স এক যুগ পেরিয়েছে। আমার বহু আগে থেকে এসব নিয়ে কাজ করেছেন, এমন গণমাধ্যমকর্মীর সংখ্যাও বাংলাদেশে কম নয়। বিভিন্ন সময়ে তাঁদের লেখাগুলো তাৎপর্যময়ও বটে। অথচ এমন গণমাধ্যমকর্মীদের অনেকেই এসব নিয়ে কাজ করতে গিয়ে একসময় রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের শরীরে দলীয় ট্যাগ লাগানোর চেষ্টা চলেছে এবং আমি-আপনি যথারীতি নিজেদের রাজনৈতিক অচেতনতার কারণে সেইসব ট্যাগের প্রতি সমর্থন জুগিয়েছি। তাতে কী লাভটা হয়েছে? গিয়েছে কি বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদীদের তৎপরতা ঠেকানো? নাকি উল্টো, সেইসব নেপথ্য কুশীলবদের শক্তি ও সাহস জুগিয়েছে আমাদের এই অবস্থান?
ঘটনার পর নানাপক্ষের ছিদ্রান্বেষণে আমাদের জুড়ি মেলা ভার! এবারো হচ্ছে। কিন্তু আমরা যারা, গুলশানের ঘটনার পর ছিদ্রান্বেষণে ব্যস্ত, তারা কি একবার নিজের বুকে হাত দিয়ে বলবো যে, সন্ত্রাসবাদ-বিরোধিতায় আমার ভূমিকাটা কী? গুলশানের যে রেস্তোঁরায় যে সময়ে হামলা হয়েছিলো, সেই সময়টা আশেপাশে কি লোকের অভাব ছিলো? কই, আপনি-আমি কেউ কি গিয়েছিলাম, সন্ত্রাসীদের সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ করতে? কই ছিলাম আমি-আপনি তখন? বাড়িতে? গাড়িতে? রিকশায়? ছিলাম হয়তো কোথাও! বিচ্ছিন্ন, বিভাজিত, একা হয়ে। এবং এই বিভাজিত-একাকী মানুষের গমগমে ভিড়ের মধ্যে সন্ত্রাসীরা ঢুকে পড়লো বীরদর্পে এবং অতঃপর চালালো হত্যাযজ্ঞ। আমাদের জন্য শুধু ফেলে গেলো বাংলাদেশকে “মৃত্যুউপত্যকা” বলার লাইসেন্স। 
বলা যেতেই পারে, এতোগুলো সশস্ত্র সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে নিরস্ত্র আমরা কী করতে পারি! প্রশ্নটা নিজের বিবেকের কাছে আগে একটু করেছি কি? করলে ঠিকই জবাব পেতাম যে, এ ক’জন মাত্র সন্ত্রাসী যতো সশস্ত্রই হোক, জনতার সম্মিলিত প্রতিরোধ রোখার ক্ষমতা এদের নেই।
প্রশ্ন আসতে পারে যে, এরা তো সব আইএস’র প্রশিক্ষিত! এই আইএস নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থানের সমালোচনাও কম দেখছি না। কিন্তু আমরা যারা সমালোচনা করছি, তারা কি জেনেবুঝে করছি? আমি জেনে এবং বুঝেই বলছি, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে যেসব ঘটনায় আইএস দায় স্বীকার করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তার প্রতিটি নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে। কিন্তু বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদিদের তৎপরতা নিয়ে আমার কোনো দ্বিমত নেই। এই মৌলিক তফাতটা বুঝতে না পারলে সর্বনাশ ঠেকানো যাবে না।
আমি জানি না, বাংলাদেশের বড় বড় বিশ্লেষকরা কেন এই বিষয়টা স্পষ্ট করছেন না। কিন্তু আমার মনে হয়, আইএস নিয়ে যেকোনো চূড়ান্ত কথা বলে দেয়ার আগে আমাদের কাছে বিষয়টা স্পষ্ট হওয়া উচিত।
প্রথমেই বলে দিই, আইএস-এর কোনো সাইট কিংবা তাদের দাবিক ম্যাগাজিনে আমি ভরসা করতে রাজি নই। সন্ত্রাসবাদ নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে যারা কাজ করেন, তাঁদের বেশিরভাগই জানেন যে, আইএস এখন একটা ব্র্যান্ড। এই ব্যান্ডের সুযোগ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল কিংবা রাষ্ট্রে বিভিন্ন গোষ্ঠী বিভিন্নভাবে নিচ্ছেন। আইএস এই ব্র্যান্ডিংয়ের সুযোগটি খুব স্বাভাবিকভাবেই কাজে লাগাচ্ছে।
২০১৪ সাল থেকে ইউরোপ-অ্যামেরিকাতেই এমন অনেক ঘটনার নজির রয়েছে, যেখানে সন্ত্রাস হয়েছে ব্যক্তি উদ্যোগে। অথচ দায় নিয়েছে আইএস। কারণ স্রেফ তাদের ব্র্যান্ডিংয়ের কারণে ইন্টারনেটে ওই সন্ত্রাসীরা আইএস-এর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে। ব্যর্থ হলে তা নিয়ে আইএস টুঁ শব্দটাও করে না। কিন্তু সন্ত্রাসী সফল হলে তখনই আইএস তাদের সাইট কিংবা দাবিকে ঝোলটা নিজের পাতে টেনে নেয়। এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এটি সন্ত্রাসবাদের আঞ্চলিক কুশীলবদের আড়াল করে ফেলছে। শুধু আইএস-এর ব্র্যান্ডিংয়ের আড়ালে প্রকৃত সন্ত্রাসবাদ উৎপাদন প্রক্রিয়া ঢাকা পরে যাচ্ছে। এখনো যদি আইএস-এর ব্র্যান্ডিং প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত না থাকেন, তাহলে কিছু ঘটনার দৃষ্টান্ত দেখে নিই।
২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর। কানাডার কিউবেকে মার্টিন নামের এক সদ্য ধর্মান্তরিত মানুষ এক সেনাসদস্যকে হত্যা করে। ঘটনা ঘটানোর আগে সে অনলাইনে আইএসকে সমর্থন জানিয়ে এসেছিলো। অথচ ঘটনার পর তার ছবিসহ দাবিক ম্যাগাজিন, এ ঘটনা বাগদাদীর নির্দেশে বলে দাবি করে ‘ক্রুসেডার’ হিসেবে মার্টিনের ছবি ছেপে দেয়! এর দুদিন পর নিউইয়র্কে থম্পসন নামের একজন চার পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা চালায়। দাবিক তাকেও বাগদাদীর কথায় কাজ করেছে বলে দাবি করে। অথচ পুলিশ পরে তদন্তে জানতে পারে, থম্পসন ঘটনার আগে থেকেই অনলাইনে আইএস ছাড়াও আল কায়েদা ও সাবাবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়েছে। ২০১৫ সালের ৩ মে ডালাসে এক কার্টুন প্রদর্শনীতে দুই বন্দুকধারী হামলা চালায়। ঘটনার পর আইএস তাদের দুজনকেই খিলাফতের সেনানী বলে উল্লেখ করে। কিন্তু মার্কিন তদন্তে দেখা যায়, এদের ভেতর একজন ঘটনার আগে আইএস-কে সম্পৃক্ত করে একটি টুইট করে। এরপর আইএস বিষয়টির দায় স্বীকার করে। মার্কিন গোয়েন্দারা সেই সময় স্পষ্টতই বলেছিলেন, এই ঘটনার দায় স্বীকারের সুযোগ নিচ্ছে আইএস।
ফ্রান্সে গেলো বছরের জানুয়ারিতে দুদিনের হামলায় যে ১৭ জন মারা গিয়েছিলেন, সেই ঘটনাগুলোর মধ্যে চার্লি হেবদোরটার দায় স্বীকার করে আল কায়েদা। কিন্তু সুপারসপে আহমেদ কুলিবালি নামের একজন অনেক মানুষকে জিম্মি করেছিলো, তার ব্যাপারে ‘কৃতিত্ব’ নেয় আইএস। এর কারণ ঘটনা ঘটানোর আগে সে ফেসবুকে আইএস-এর পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে একটা ভিডিও পোস্ট করে আসে! সারাবিশ্বে সন্ত্রাসবাদে এমন ব্র্যান্ডিং-এর আরো অনেক ঘটনা আছে। একই সঙ্গে রয়েছে, অনেক বিশ্লেষণও। কাজেই, বাংলাদেশেও আইএস-এর এমন ব্র্যান্ডিং-এর সুযোগ কারা, কী উদ্দেশে নিচ্ছে এবং তার প্রক্রিয়া কী, তা উদ্ঘাটন করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে এখনই। কারণ, বাংলাদেশ আর মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা এক নয়।
যারা মনে করেন, বাংলাদেশ খুব দ্রুত আফগানিস্তান কিংবা পাকিস্তান হয়ে যাবে, আমি তাদের সঙ্গেও একমত নই। কারণ এটা আমার দেশ, কোনো মৃত্যু উপত্যকা নয়। এবং সেটা কোনোভাবে হতে দেওয়াও হবে না।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








