কখনও চড়াই-উতরাই, কখনও উল্লাস-উৎসব, কখনও স্বপ্নভঙ্গ মেঘাচ্ছন্ন বিষণ্ণতা, কেটে আবার ঊষার ঝলকানি। বাংলাদেশের ক্রিকেট পটরেখা ছুটছে এভাবেই। বৃহস্পতিবার যেমন মিলল উৎসবের দেখা। টাইগার ক্রিকেটের সাফল্যাকাশে যুক্ত হল একটি উজ্জ্বল ঝকঝকে সোনালী অধ্যায়। এদিন নিউজিল্যান্ডকে ৬ উইকেটে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছে লাল-সবুজের যুব দল।
পচেফস্ট্রুমে শিরোপা উৎসবে মাতার পথ এখনও অনেকটা দূরে। সবে তো সেমিফাইনাল জেতা হল। সাদা চোখে দেখলে হয়ত এখন শিরোপা থেকে এককদম দূরে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল। সেই এককদম দূরত্ব যে ডিঙাতে হবে বিশাল এক লাফে। পা হড়কালেই আক্ষেপ, হতাশা, আফসোস, আহ্-উহ্, কাটাছেঁড়া, তেতো-বিষাদ স্বাদ!
শিরোপা এককদম দূরেই, তবে লাফিয়ে যেতে হবে ভারত নামের এক গভীর সুড়ঙ্গ! ৯ ফেব্রুয়ারির ফাইনালে ভারতের যুবাদের বিপক্ষে ট্রফির মঞ্চে পরীক্ষা আকবর-রাকিবুলদের। যাদের বিপক্ষে শিরোপা ফয়সালার চিত্রনাট্যে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র, খুব একটা সুবিধের ইতিহাস নেই যেকোনো পর্যায়ের টাইগারদের লেটারমার্কস পাওয়ার। ব্যতিক্রম ধরলে নারী এশিয়া কাপে ভারতকে হারিয়ে টিম টাইগ্রেসের ট্রফি উঁচিয়ে ধরা ছাড়া।
সেটি আসছে রোববারের ফাইনালের হিসাব-নিকাশ। আপাতত তোলা থাক। তার আগে উপভোগ-তৃপ্তির ঢেকুর তোলা যাক বৃহস্পতিবারের অর্জন নিয়ে। এদিন যে অনন্য এক ইতিহাস লিখে ফেলেছে যুবা টাইগাররা। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে কোনো দলকে প্রথমবার তারা তুলে নিয়েছে বিশ্বকাপের ফাইনালে। অধিনায়ক আকবর আলী হলেন দেশের প্রথম দলপতি, যিনি বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের ফাইনালে তুললেন লাল-সবুজের কোনো দলকে। এই সাফল্যই তো কতটা অধরা ছিল!
পথটা সুগম ছিল না। সেমিতে টস জিতে নিউজিল্যান্ডকে ব্যাটিংয়ে পাঠানো বাংলাদেশ ২১২ রানের লক্ষ্য পায়। শুরুতে নামা কিউই যুবাদের আঁটসাঁট বোলিংয়ে আটকে রাখতে সক্ষম হয় টাইগাররা। শেষে দ্রুত কিছু রান জমায় প্রতিপক্ষ। নির্ধারিত ওভারে ৮ উইকেটে তাতে ২১১ রানে যেতে পারে নিউজিল্যান্ড।
ওপেনিংয়ে ব্যর্থতার পর মিডলঅর্ডারে প্রতিরোধের চেষ্টা করে নিউজিল্যান্ড। তখন রান তোলার গতি ছিল খুবই ধীর। ওয়ানডাউনে লেলম্যান ২৪, পরে লিডস্টোন ৪৪ ধাক্কা সামলানোর চেষ্টায় খানিকটা সফল। কাজের মতো কাজটা যদিও করে দেন লোয়ার মিডলে হুইলার-গ্রিন্যাল, অপরাজিত ৭৫ রানের ইনিংসে দুইশ পেরিয়ে দেন দেশকে। তাতেই জমে মহারণ।
শুরুতে কিপ্টে বোলিংয়ে বাংলাদেশের পেস-স্পিন এদিন সমানে সমান দৌড়েছে। বাঁহাতি স্পিনার রাকিবুল ১০ ওভারে ৩ মেডেনে ৩৫ রানে নেন এক উইকেট। তিনি নিজের স্পেলের শুরুতে টানা ৩.২ ওভার ডট বল করেন।
আরেক বাঁহাতি স্পিনার হাসান মুরাদ ১০ ওভারে এক মেডেনে ৩৪ রানে নেন ২ উইকেট। ডানহাতি অফস্পিনার শামীম হোসেন ৬ ওভারে এক মেডেনে ৩১ রানে জমান ২ উইকেট। বাঁহাতি পেসার শরিফুল ইসলাম শেষে যেয়ে একটু খরুচে হয়ে পড়েন, ১০ ওভারে ২ মেডেনসহ ৪৫ রান খরচায় তার ঝুলিতে উইকেট জমে ৩টি।
বোলারদের কাজটা তারা ভালোই সেরে দিয়েছেন। গড়ে দেয়া মঞ্চে পালাটা যখন ব্যাটসম্যানদের, টপাটপ সাজঘরে উদ্বোধনী জুটি। পারভেজ ইমনের (১৪) আগে বিদায় তানজিদ হাসান তামিমের (৩)। বিপদের গন্ধ!
দায়িত্বটা কাঁধে তুলে নিলেন মাহমুদুল হাসান জয় ও তৌহিদ হৃদয়। দুজনে ৬৮ রানের জুটিতে দিয়েছেন স্বস্তি। যখন একটু এলিয়ে দেয়ার মতো পরিস্থিতি পেয়েছে শরীর, তখনই ছন্দপতন। দারুণ খেলতে থাকা হৃদয় ৪৭ বলে ৪০ করে উইকেট দিয়ে আসলে।
দল ততক্ষণে একশ ছুঁয়েছে। শক্ত ভিত। তাতে ইমারত গড়তে সামান্যতম ভুল করেননি জয়। সঙ্গী পেয়েছেন শাহাদাত হোসেনকে। দুজনের যুগলবন্দীতে কিউইদের কেল্লাফতে!
জয়-শাহাদাত বিচ্ছিন্ন হয়েছেন একেবারে তিরে এসে। দুই টাইগার জুটিতে এনে দেন ১০১ রান। বাংলাদেশকে জয়ে নোঙর করানোর মতো পরিস্থিতি তখন। মাহামুদুল হাসান জয় তুলে নিয়েছেন সেঞ্চুরি। ফেরেন ১২৭ বলে ১৩ চারে ঠিক ১০০ রানে। সঙ্গী শাহাদাতের অবদান অপরাজিত ৪০ রান।
আইসিসির এই টুর্নামেন্টের বিধি অনুযায়ী, যদি কোনো কারণে ম্যাচে ফল না হতো আজ, মানে ফলহীন ‘নো রেজাল্ট’ ম্যাচ হতো, তবুও বাংলাদেশই যেত ফাইনালে। গ্রুপপর্বে শ্রেয়তর পয়েন্টের কারণে। প্রকৃতির কাছে হাত পাততে হয়নি! পচেফস্ট্রুমের আবহাওয়া পূর্বাভাসের শঙ্কা ঝুলিয়েও ঝরায়নি একফোঁটা বৃষ্টি। ঝকঝকে দিনটির শেষে যে রাতে নির্ভার ঘুমাতে যাবে যুবা টাইগাররা, যে রাতে তাদের মতোই শিরোপা স্বপ্নের ছটফটানি নিয়ে ঘুম রাজ্যে ডুবে যাবে পুরো বাংলাদেশ, সে রাতের আকাশে তাকালে দেখা মিলবে লাল-সবুজের ঊর্ধ্বগামী সাফল্যের ঝকঝকে একটি নতুন তারার উঁকি। টাইগারদের প্রথম কোনো দলের বিশ্বকাপের মতো আসরের ফাইনালে ওঠার সিলমোহর। যার পূর্ণতা পাবে ৯ ফেব্রুয়ারি আকবর আলীর দল বিশ্বকাপ ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরতে পারলে।
এখন অপেক্ষা কেবল বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার।








