ছোটবেলায় যখন থেকে সিনেমার দর্শক হয়ে উঠছিলাম, সেই সময় দুই ধরনের ছবিই নিয়মিত চোখে পড়তো। এক. পারিবারিক সংকট নিয়ে নির্মিত ছবি। দুই. রাজা-জমিদারদের সময়কার প্রেক্ষাপট নিয়ে তৈরি ছবি। তখন বিটিভিই প্রধান ভরসা। সপ্তাহান্তে প্রতি শুক্রবারে একটা সিনেমা। আর কালেভদ্রে হলে গিয়ে সিনেমা দেখা।
সেই আশির দশকের শেষ দিকে মফস্বলের একটা থানা শহরেও তখন দুইটা সিনেমা হল। আর সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে অপেক্ষাকৃত নতুন সিনেমা আসতো। ‘উত্তরা’ সিনেমা হলে এইরকম কোনও এক সময় কিছুদিনের পুরনো হলেও অনেকটাই নতুন সিনেমা হিসেবে হাজির হলো ‘বিপ্লব’। পাড়া মহল্লার বড় ভাইদের কাছেতো বটেই, আমাদের মধ্যে মহল্লার পাকা দুই একজনও এই ছবি ততদিনে দেখে ফেলেছে। তাদের কাছে শুনেই ছবি দেখতে ছুটলাম।
মনে ছিলো না, সেদিন ছিলো হাটবার। আশপাশের কয়েক উপজেলার সবচে বড় হাটের দিনে ছবি দেখতে গিয়ে তো সিনেমা হলের রাস্তাই হারিয়ে ফেললাম। শেষ পর্যন্ত ঐদিন আমি সিনেমাটা দেখেছিলাম। বাংলা সিনেমায় মার্শাল আর্ট তার আগে কেউ এনেছিলো কি না আমি মনে করতে পারিনা। তবে যতটুকু মনে পড়ে, সেই ছবিতেই প্রথম এত ব্যাপক আকারে মার্শাল আর্ট ব্যবহার হয়েছিলো।
সেই থেকে তাকে ফলো করা শুরু। তারপর সিনেমা হলে গিয়ে যত পরিচালকের যত ছবি দেখেছি, তার মাঝে শহীদুল ইসলাম খোকনের ছবিই বেশী মনোযোগ দিয়ে দেখা। যতদূর মনে পড়ে খোকন-রুবেল জুটির প্রথম
ছবি ‘বিপ্লব’। এই বিপ্লব দিয়েই খোকন বাংলা সিনেমায় নতুন বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন। ‘বিপ্লব’ এর সাফল্যের কারণে হুট করে বাংলা সিনেমায় মার্শাল আর্ট ভিত্তিক সিনেমার জোয়ার বইছিলো। ঐ সময় কেবল মাত্র মার্শাল আর্ট ভালো জানে এমন অনেকেই সিনেমায় নায়ক হিসেবে আবির্ভুত হয়েছিলো।
পরবর্তিতে তাদের অবশ্য ভয়াবহ পতন হয়। কিন্তু একটা সময় সিনেমায় তারা যে আত্মরক্ষার এই কৌশলটিকে বিনোদনের একটা ক্ষেত্রে সফলভাবে প্রয়োগ করে গেছেন তা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস লিখতে গেলে উল্লেখ করতেই হবে। আর এর প্রধান কারিগর শহীদুল ইসলাম খোকন।
এই নির্মাতা কখনোই অন্য আট-দশটা নির্মাতার মতো সরল পথে হাঁটতে চাননি। প্রায়শই নতুন নতুন ব্যক্তিত্বকে হাজির করেছেন পর্দায়। রুবেলও বোধ হয় তারই আবিষ্কার। রুবেল ছাড়াও ড্যানি সিডাক, আলেকজান্ডার বো’র মতো মার্শাল আর্ট ব্যক্তিত্বরা সিনেমায় এসেছিলেন শহীদুল ইসলাম খোকনের হাত ধরেই। তবে খোকন এর সবচেয়ে বড় আবিষ্কার নিঃসন্দেহে নায়িকা শিমলা। প্রথম ছবি ‘ম্যাডাম ফুলি’তে অভিনয় করেই যিনি কিনা জয় করেছিলেন সেরা অভিনেত্রীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। 
তবে অন্য সব ছবির চেয়ে তার সবচেয়ে বেশী প্রভাব বিস্তারকারী ছবি ছিলো ‘ভণ্ড’। হুমায়ূন ফরিদী, এটিএম শামসুজ্জামান এর যুগলবন্দীর এক চমৎকার সিনেমা ছিলো সেটা। বাংলাদেশের সিনেমায় হাস্যরস বলতেই যেখানে এক প্রকার ভাড়ামি আমরা দেখে এসেছি, ‘ভণ্ড’ ছিলো তার বিরুদ্ধে এক প্রকার চপেটাঘাত। সমাজের প্রতি পদে পদে যে কত ভণ্ডামি আর মিথ্যার ছড়াছড়ি তা তিনি ঐ ছবি দিয়ে কিছুটা দেখিয়েছেন।
শেষ বয়সে এসে (এত দ্রুত সময়ে চলে না গেলে হয়তো এই কথাটা লিখতাম না) অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত যখন পরিচালক সমিতির সভাপতি ছিলেন, তখনও তিনি ছিলেন দুর্দান্ত অ্যাক্টিভ। নিজের স্বাতন্ত্র ও বাংলাদেশের সিনেমার স্বার্থের জন্য লড়ে গেছেন সবর্স্ব দিয়ে।
আমৃত্যু যোদ্ধা এই পরিচালক যখন চলে গেলেন না ফেরার দেশে, তখন ভার্চুয়াল মাধ্যমে সত্তর দশক থেকে শুরু করে আশির দশকের শেষ দিকে জন্মানো মানুষেরা তাদের সিনেমা প্রেম আর তাতে শহীদুল ইসলাম খোকনের কথা প্রকাশ করেছেন অনেকটা আবেগেই। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের নিয়মিত সিনেমা নির্মাতারা একজন বড় অভিভাবক যে হারিয়েছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








