ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কিতে গত ১৬ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের একান্ত বৈঠকে দোভাষীরা ছাড়া অন্য কেউ উপস্থিত ছিলেন না। তাই বৈঠকে যে আসলে কী বিষয়ে কথাবার্তা হয়েছে, তা নিয়ে শুরু থেকেই ছিল সবার কৌতুহল।
অবশেষে নিউইয়র্ক টাইমস পেয়েছে সেই বৈঠকের একটি অনুলিপি। অনুলিপিতে ট্রাম্প-পুতিনের কথোপকথন এ রকম:
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প: ইয়োর এক্সিলেন্সি।
ভ্লাদিমির পুতিন: ডোনাল্ড।
ট্রাম্প: আপনি যদি কিছু মনে না করেন, ভ্লাদিমির, তবে আপনাকে অকপটে বলতে চাই, আমি এই বৈঠক থেকে সত্যিই কিছু ভালো ফল চাই। ইংল্যান্ডে টেরেসা মের বিষয়টি নিয়ে প্রায় মরার অবস্থা আমার।
পুতিন: আলেক্সান্ডার লিতভিনেকো বা ডন স্টারগেসের মতো সত্যি সত্যি মরে যাচ্ছেন না নিশ্চয়ই, ডোনাল্ড। মনটাকে একটু বিশ্রাম দিন। ইউরোপে আপনার সফর দারুণভাবে সফল হয়েছে বলেই আমরা মনে করছি।
ট্রাম্প: ধন্যবাদ। রাশিয়াকে নর্ড স্ট্রিম গ্যাস পাইপলাইনের জন্য জার্মানি যে অর্থ দিয়েছিল, তার জন্য অ্যাঙ্গেলা সঙ্গে আমার কঠোর আচরণের জন্য আমি দুঃখিত।
পুতিন: না, এটি বরং একটি চরম কূটকৌশল হিসেবে কাজ করেছে। এতে লাভই হয়েছে আমাদের। জার্মানিতে গাজপ্রমবিরোধী এবং রাশিয়াবিরোধী একটা মনোভাব বাড়ছিল। কিন্তু আপনারা পাইপলাইনের বিরুদ্ধে বলা শুরু করতেই বার্লিন এ প্রকল্পে সমর্থন দেয়াটা তাদের জাতীয় গর্ব ও নীতির বিষয় বলে মনে করতে শুরু করল। এটি একটি ব্যবসা কৌশল: আপনি যাদের নিয়ন্ত্রণ করতে চান, তাদের এমনটা বিশ্বাস করানো যে আপনি তাদের হয়েই কাজ করছেন।
ট্রাম্প: ও। ট্রাম্প ইউনিভার্সিটির সঙ্গে আমরা যা করেছি, এটা ঠিক তার মতোই। বোকা লোকদের এমনভাবে বোঝানো যে তারা আবাসন ব্যবসার সাফল্যের গোপন রহস্য শিখতে যাচ্ছে!
পুতিন: ঠিক তা নয়, ডোনাল্ড। এটা সোজাসুজি প্রতারণা।
ট্রাম্প: আপনি জেনে থাকবেন, প্রতারকরা বলে থাকে, মিথ্যা খবর ছড়িয়ে আপনি আমাকে নির্বাচনে জিতিয়েছেন। আমাকে অনেকে বলছে, আপনি (পুতিন) কোনোভাবে হস্তক্ষেপ করেছেন এবং এটা আমার জয়ের ক্ষেত্রে কলঙ্ক। এ জন্য আমি সত্যিই আপনার কাছে দুঃখিত। কিন্তু আপনার সঙ্গে আলোচনায় তারা আমাকে বিষয়টি তুলতে বলেছে। আপনি কী বলেন?
পুতিন: ডোনাল্ড, আপনাদের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন যেমন একবার বলেছিলেন: আপনি কিছু মানুষকে অনেক সময়ের জন্য বোকা বানাতে পারেন, সব মানুষকে কিছু সময়ের জন্য বোকা বানাতে পারেন। কিন্তু যদি স্বাধীন গণমাধ্যমকে আপনি বিতর্কিত করতে পারেন, গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতে পারেন এবং তার সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়াতে পারেন, তবে আপনি প্রায় সব মানুষকে সব সময়ের জন্য বোকা বানাতে পারেন। কিন্তু এ প্রশ্নের উত্তর হলো ‘না’।
ট্রাম্প: ভ্লাদিমির, আমি আপনাকে বিশ্বাস করি, আমি সত্যিই করি। এটা কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু ধূর্ত হিলারি ক্লিনটনকে হারানোর জন্য তো আপনাকে আমার দরকার ছিল না!
পুতিন: অবশ্যই না। ডোনাল্ড, সময় মতো কোমির (সাবেক এফবিআই প্রধান) যথেষ্ট হস্তক্ষেপ ছিল। আপনার সমর্থকদের সমাবেশ এবং আপনার বিরোধীদের বিভ্রান্ত করার পদ্ধতিতে আমরা লাভবানই হয়েছি, যা সম্প্রতি অনেকটা ইউক্রেনের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে আপনার একই কৌশল ব্যবহার দেখে আমরা খুশি।
ট্রাম্প: ওহ্, ওরা ভীষণ খারাপ! আমরা এখন বাছাই করা শুরু করেছি! এটা জাসা গ্যাবরের (মার্কিন অভিনেত্রী) সঙ্গে বা অন্য কারও সঙ্গে বিয়ে হওয়ার মতো। আপনি তার জন্য সবকিছুই করবেন আর তারপরে আপনি গিয়ে জানতে পারবেন, আপনাকে তিনি বোকা বানিয়ে আপনার ঘর হাতিয়ে নিয়েছেন। নাহ, ধন্যবাদ!
পুতিন: একদম ঠিক তুলনা করেছেন ডোনাল্ড। সত্যিই আপনি ও সব মার্কিন করদাতা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। যদি আমরা জিজ্ঞাসা করি এমনটা কেন? কারল এত বেশি অভিবাসনের ফলে ইউরোপীয়রা আর ইউরোপীয় নেই। আপনি কি জানেন, ন্যাটোর নতুন সদস্য মন্টিনিগ্রোর প্রায় সবাই মুসলিম, শুধু তুরস্ক ছাড়া?
ট্রাম্প: এটা তো আমি জানতাম না!
পুতিন: এটা সত্য। আপনার পূর্বসূরি, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাদের ন্যাটোতে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তারা আপনার মেয়াদ শুরুর পর থেকে আপনার পেছনে লেগেছে। কল্পনা করুন, দেখতে পাবেন, ছোট্ট ওই অঞ্চলের বিরুদ্ধে আপনার তরুণ মার্কিন সৈন্যদের তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ করতে হতে পারে।
ট্রাম্প: আমার চোখে পড়েনি। এই ছোট দেশগুলোর কেউ আমাদের নিরাপত্তার জন্য কোনো কাজে আসবে বলে মনে হয় না।
পুতিন: আপনি সম্ভবত এস্তোনিয়ার মতো দেশগুলোর কথা বলছেন। এছাড়াও আরও দূরের কিছু দেশ আছে, এগুলোর ব্যাপারে আমাদের কথা বলার অনুমতি দিন। আপনি বলবেন, এসব ব্যাপারে কিছু জানেন না।
ট্রাম্প: সত্যি কথা বলতে কি, মানচিত্রে এসব দেশকে খুঁজেও পাই না।
পুতিন: ডোনাল্ড, আমাদের লক্ষ্য একই। আমরা মহান খ্রিস্টান সভ্যতাকে তুলে ধরতে চাই। কিন্তু পেছন থেকে আমাদের পিঠে ছুরি মারা হচ্ছে। ছুরি মারছে সেই একই মানুষ! আমি বলতে চাইছি, জর্জ সরোস ও বিল ব্রাউডারের মতো বৈশ্বিক পুঁজিবাদী ব্যক্তি, ‘পুরুষালি’ হিলারি ও মেরকেল এবং ‘নারীসুলভ’ বারাক ওবামা – তাদের এই যুদ্ধ করার কোনো ইচ্ছাই নেই। পেছন থেকে ছুরি মারা এই ব্যক্তিদের দিকে অবশ্যই আমাদের ঘুরে তাকাতে হবে। ডোনাল্ড, রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদের পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য যে তোড়জোড় চলছে, আসুন তা বন্ধ করি।
ট্রাম্প: ব্যক্তিগতভাবে এসব বার্তা দেয়ার জন্য আপনি ওয়াশিংটনে চলে আসুন না।
পুতিন: ওহ্ ডোনাল্ড, আমি তো ভেবেছিলাম আপনি কখনো আমাকে যুক্তরাষ্ট্রে ডাকবেনই না।
তাদের মধ্যে আসলেই এধরণের কোনো আলাপ হয়েছিল কিনা, তা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। আবার অনেকে সরাসরি নিন্দা জানিয়েছেন।







