একটি আলোর কণা থেকে লক্ষ প্রদীপ জ্বলে/ একটি মানুষ ‘মানুষ’ হলে বিশ্বভুবন টলে। এই কথাটি ভীষণভাবে সত্য আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর বেলায়। সত্যি এই একটি মানুষ ‘মানুষ’ হওয়ার কারণে বিশ্বভুবন টলে উঠেছিল। তিনি স্বাধীনতা শব্দটিকে আমাদের করে দিয়ে গেছেন। বঙ্গবন্ধু না থাকলে, না জন্মালে আমরা স্বাধীনতা পেতাম কিনা সন্দেহ!
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪০ সালে সর্বভারতীয় মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগদানের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ (বর্তমানে মাওলানা আজাদ কলেজ) ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৯ সালে তৎকালীন আওয়ামী মুসলিম লীগের পূর্ব পাকিস্তান শাখার যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৩ সালে তিনি পার্টির সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের টিকিটে ইস্ট বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হন।
ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আজীবন সোচ্চার এ অবিসংবাদিত নেতাকে রাজনৈতিক জীবনে বহুবার কারাবরণ করতে হয়। বাঙালি জাতির প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে সামনে থেকে ভূমিকা পালন করে জনমানুষের নেতায় পরিণত হন বঙ্গবন্ধু, যার নেতৃত্বে সূচিত হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পর সফলভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন তিনি। এর পর মাত্র সাড়ে ৩ বছর দেশ পরিচালনার মধ্যেই ’৭১-এর পরাজিত শক্তি এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মাত্র ৫৫ বছর বয়সে ঘাতকদের হাতে প্রাণ দিতে হয় এ মহান নেতাকে।
স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অবিস্মরণীয় ভূমিকার জন্য তিনি সারাবিশ্বে সমাদৃত। এসব ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ‘জুলিও কুরি’পদকে ভূষিত হন তিনি। এ ছাড়া বিবিসির এক জরিপে বঙ্গবন্ধু সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হন। শেখ মুজিবুর রহমানের কর্ম ও রাজনৈতিক জীবন অসামান্য গৌরবের। তার এ গৌরবের ইতিহাস থেকে প্রতিটি শিশুর মাঝে চারিত্রিক দৃঢ়তার ভিত্তি গড়ে উঠুক-আজকের দিনটিকে জাতীয় শিশুদিবস ঘোষণা এবং তার জন্মদিন পালনের এটাই উদ্দেশ্য।
আর দশটা মানুষের জন্মদিন পালনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন পালনের পার্থক্য আছে। সেই পার্থক্যটা আলাদা করা চাই। আমাদের এই রাজনীতির অন্তহীন দুর্নীতি আর ক্রমবর্ধমান অন্যায়প্রবণতার সঙ্গে ঘটা করে নেতানেত্রীদের জন্মদিন পালনের একটা প্রথা গড়ে উঠেছে। ক্ষমতা ও পেশিশক্তির উপর রাজনীতি যখন নির্ভরশীল হয়, তার একটা নিজস্ব স্ট্র্যাটেজি বা পদ্ধতিও তৈরি হতে থাকে। জন্মদিন সংস্কৃতির সাম্প্রতিক বাড়াবাড়ি সেই স্ট্র্যাটেজিরই একটা অংশ। আড়ম্বর, লোকদেখানো ধূমধাম, সামন্ত-সংস্কৃতির বিভিন্ন চিহ্নের সঙ্গে জুড়ে এই উৎসবের নতুন চেহারা, এ সবই আসলে ব্যক্তিপূজার বহিঃপ্রকাশ।
রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের জন্মদিন পালন, অনুষ্ঠান-আনুষ্ঠিকতা-এ সবের মধ্য দিয়ে একটা প্রতীক-কেন্দ্রিক রাজনীতি নির্মাণের চেষ্টা আছে। আমাদের পোড় খাওয়া গণতন্ত্র যেমন এক দিকে ব্যক্তিস্বাধীনতা, পারিবারিক শাসন ও সামন্ত সংস্কৃতি, আর অন্য দিকে আধুনিকতার স্বপ্ন, আধুনিক জীবনযাপনের ইচ্ছা, প্রযুক্তি ইত্যাদির মধ্যে দ্বন্দ্বের মঞ্চ, ঠিক তেমনই, নেতাদের এই জন্মদিন সংস্কৃতিও ক্রমশ এক দিকে ঐতিহ্যময় অভিজাতদের চিহ্ন, অন্য দিকে নিবার্চনী রাজনীতির সোপান হয়ে উঠছে। তাই জন্য জন্মদিনে নেতানেত্রীর জন্য এত বড় কেক বানাতে হয়, অনেক ক্ষেত্রে উৎসবের সমারোহ দেখিয়ে অর্থসংগ্রহের কাজটাও করা হয়।
যে গতিতে এ দেশের রাজনীতিতে এই ‘আওয়ারা ফান্ড’বা অজ্ঞাত অর্থ ঢুকছে, তাতে গণতান্ত্রিক রাজনীতির কাঠামোটির বড় রকমের ক্ষতি সাধিত হচ্ছে, সন্দেহ নেই। এই টাকার বেশির ভাগটাই দুর্নীতি-প্রসূত অর্থ। নেতাদের ফান্ড-এ এই টাকা ঢুকছে মানে রাজনীতির মধ্যে একটা মেকি ফাঁপানো সাচ্ছল্য তৈরি করা হচ্ছে, বাস্তবের থেকে অনেক গুণ ফাঁপানো! রাজনৈতিক নেতারা এবং তাদের সঙ্গপাঙ্গ, সকলে মিলে এই অজ্ঞাতকুলশীল অর্থভাণ্ডারে পুষ্ট হচ্ছে, এবং এই ভাণ্ডারের জোরেই নেতাদের জন্মদিনে এই অদৃষ্টপূর্ব মহোৎসবের প্রথা নির্মিত হচ্ছে। দলের সমর্থন-ভিত্তির মধ্যে যে বিশালাকার মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং ক্ষমতালোভী কর্মী-সমর্থকের দল, সকলের জন্যই এই স্ট্র্যাটেজি শেষ পর্যন্ত বেশ ফলপ্রসূ।
একই সঙ্গে, জন্মদিন সংস্কৃতির এই নব্য ধারা আরও একটা কথা বলে দেয়। বলে দেয় যে, মধ্যবিত্ত সমাজে একটা বিরাট অংশ কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রগতিশীল কিংবা লিবারেল ভাবধারার বাহক নয়। বরং এখানে গণতন্ত্রের মধ্যে যে গভীরচারী দ্বন্দ্ব, যেখানে সামন্ত সংস্কৃতির অপার মোহ ও আধুনিক জীবনযাপনের অদম্য আকর্ষণ, এই দুই-এর দ্বন্দ্বের উৎস কিন্তু এই শ্রেণির মধ্যেই। এদের দিকে তাকিয়েই এই নতুন রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজির সৃষ্টি ও নির্মাণ। এদেরই হাতে সেই নব্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভরণপোষণের সমস্ত ভার, যেখানে নেতাদের জন্মদিন মানেই রাজনৈতিক ও সামাজিক উৎসবের ঢল! এর মধ্যে দুর্ভাগ্যের কথা একটাই। রাজনীতি এক দিন গরিব মানুষকে উত্তরণের পথে নিয়ে যাবে, তাদের জীবনে কিছু পরিবর্তন আনবে, এমনই ভাবা হয়েছিল। কিন্তু এই নতুন ধারা স্পষ্ট দেখিয়ে দিচ্ছে, আমাদের রাজনীতিতে আসলে ঘটছে উল্টোটাই। রাজনীতি কথাটির ‘র্যাডিকাল’ অর্থটিই আস্তে আস্তে হারিয়ে যেতে বসেছে।
যাহোক, আমাদের আলোচনা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে, তার জন্মদিন নিয়ে। দীর্ঘদিন আমাদের দেশে বঙ্গবন্ধু প্রায় নিষিদ্ধ ছিলেন। আওয়ামী লীগের বাইরে যখন যারা ক্ষমতায় গিয়েছে, তখনই তারা সবার আগে বঙ্গবন্ধুকে নিষিদ্ধ করেছে। যার জন্য এই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ, সেই দেশনায়ককেই অন্ধকারে ঢেকে রাখার মূঢ়তা আমাদের দেশে হয়েছে। তাকে ভিলেন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টাও হয়েছে। কিন্তু আশার কথা, এখন সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। যারা ইতিহাসের চাকাকে পেছনে ঠেলার চেষ্টা করেছে, তাদের প্রেতাত্মারা এখন থাকলেও তাদের অস্তিত্ব আজ হুমকির সম্মুখীন।
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে, তার অবদান নিয়ে, চারিত্রিক দৃঢ়তা নিয়ে আরও অনেক বেশি আলোচনা হওয়া উচিত। পাশাপাশি কিছু নির্মোহ একাডেমিক আলোচনাও হওয়া দরকার। ব্যক্তিকে দেখতে হয় সামগ্রিকভাবে, তার দোষক্রুটিসহ। দোষত্রুটিগুলোকে বড় করে না দেখে, সেখান থেকে উত্তরপ্রজন্মকে শিক্ষা লাভ করতে হয়। শুধু পূজা করা বা পূজার ছলে পূজনীয়কে ভুলে থাকা বিচক্ষণতার লক্ষণ নয়।
অবশ্য আমাদের সমাজে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখবার ভিন্ন ভাবে বুঝবার-উপলব্ধি করবার দৃষ্টিটা যেন ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। ক্রমশ-হারতে-থাকা-বাঙালির কাছে যুক্তি হয়ে উঠছে কারাগার, বাহির হয়ে দাঁড়াচ্ছে বধ্যভূমি, কর্মের প্রতিশব্দ পরাধীনতা এবং জ্ঞানচর্চাকে মনে হচ্ছে উত্তরোত্তর বন্ধ্যা। যেহেতু বৈষয়িক কারণেই ক্লেশ, অতএব কামিনী-কাঞ্চন যেন পরিহার্য। গ্লানির বাহির থেকে ত্যাগ-শৌর্য-বীর্য আর অসীম সাহসে স্বাধীনতা ও মুক্তির বন্দরে একটি পুরো জাতিকে পৌঁছে দেওয়ার তাড়নাতেই বঙ্গবন্ধুর অন্যতা ও জনপ্রিয়তা। যিনি তার সমকালীন সামূহিক আত্মধিক্কারকে একটা পৌরুষের পোশাক পরিয়ে, জাতিকে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন এবং পেরেছিলেন।
যদিও তার শাসনকালটা সুখের হয়নি। এখানেও নানা জাতীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ছিল। ছিল দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত-লোভ ক্ষমতার কাড়াকাড়ি। ক্ষমতার দম্ভ কী ছিল? ছিল কী দলীয় সংকীর্ণতা, ছিল কী সব কিছু যথাযথভাবে ম্যানেজ করবার দক্ষতা ও যোগ্যতার অভাব?
এসব কিছুই সবার ভালোভাবে জানা দরকার। বঙ্গবন্ধুর সবটুকু যদি আগামী প্রজন্মের ছাত্রদের জানানো যায় তাহলেই তিনি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হবেন।
পরিশেষে জন্মদিনে এই মহান নেতাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






