নিজ সময়ে তিনি ছিলেন সেরাদের সেরা। এখনো তার তুলনা পাওয়া অসম্ভব। তারুণ্যদীপ্ত আলী খ্যাতির শিখরে থাকা অবস্থায় যতটা জনপ্রিয় ছিলেন, এখনো তার চেয়ে কিছুটা কম নন। তাই বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত এই খেলোয়াড়ের মৃত্যুতে যেন কেঁপে উঠেছে সারা বিশ্ব।
শনিবার শ্বাসযন্ত্রের জটিলতায় মাত্র ৭৪ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন বিশ্বখ্যাত বক্সিং তারকা মোহাম্মদ আলী। রেখে গেলেন তার অমরকীর্তি। কিন্তু তিনি কিভাবে হয়ে উঠেছিলেন আজকের মোহাম্মদ আলী? আসুন জেনে নেই তার জীবনের খুঁটিনাটি।
জন্ম ও বিখ্যাত হয়ে ওঠা
বক্সিং কিংবদন্তি মোহাম্মদ আলীর জন্ম ১৯৪২ সালের ১৭ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকি অঙ্গরাজ্যের লুইসভিলে। বাবা ক্যাসিয়াস মারসেলাস ক্লে’র নামানুসারে প্রথমে তার নাম ছিল ক্যাসিয়াস মারসেলাস ক্লে জুনিয়র। বাবার নামকরণ হয়েছিল একজন দাসপ্রথা বিরোধী রাজনীতিবিদ ক্যাসিয়াস ক্লে’র নামানুসারে।
বাবা ক্লে সিনিয়র সাইনবোর্ড এবং বিলবোর্ড রঙ করতেন। মা ওডিসা গ্র্যাডি ক্লে ছিলেন গৃহিনী। ক্লে সিনিয়র একজন মেথডিস্ট হলেও সন্তানদের বাপ্টিস্ট চার্চে নিতে তার স্ত্রীকে অনুমতি দিয়েছিলেন।
১৯৫৪ সালের একদিন ক্লে জুনিয়রের সাইকেল চুরি হয়ে গেলে সে পুলিশ অফিসার মার্টিনকে জানায়, সে সাইকেল চোরকে পেটাতে চায়। অফিসার মার্টিন তখন ছিলেন সে শহরের বক্সিং কোচ। তিনি বলেন, এর জন্য জুনিয়রকে লড়াই করা জানতে হবে। পরদিন তিনি মার্টিন এর কাছ থেকে বক্সিং শেখা শুরু করেন।
সেই ১২ বছর বয়স থেকেই প্রশিক্ষণ শুরু হয় ক্যাসিয়াস ক্লে জুনিয়রের। কোচ মার্টিন তাকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে প্রজাপতির মতো নেচে নেচে মৌমাছির মতো হুল ফোটাতে হয়।
কঠোর পরিশ্রমের ফল হিসেবে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ১৯৬০ সালে রোম অলিম্পিকসে লাইট-হেভিওয়েট শ্রেণীতে স্বর্ণপদক জয়ের মাধ্যমে প্রথম খ্যাতির শিখরে উঠতে সক্ষম হন ক্লে জুনিয়র। এর মধ্য দিয়ে প্রথম জনপ্রিয়তা পান তিনি।
৬ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার ক্লে জুনিয়রের বিশেষত্ব ছিল, তিনি খেলার সময়ে সবার মতো হাত মুখের সামনে রাখতেন না, শরীরের পাশে রাখতেন। প্রতিপক্ষের মার ঠেকানোর জন্য নির্ভর করতেন সহজাত প্রবৃত্তির ওপর। ১৯৬০ সালের ২৯ অক্টোবর তিনি প্রথম পেশাদার লড়াই জেতেন। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৩ সময়ে তিনি টানা ১৯টি লড়াই জেতেন যার মধ্যে ১৫টি নকআউট। ১৯৬৩ সালে তিনি ডগ জোন্সের সাথে ১০ বাউটের এক বিতর্কিত লড়াইয়ে জেতেন।
এরপর ২২ বছর বয়সে ১৯৬৪ সালে সানি লিস্টনের বিপক্ষে তিনি জেতেন ওয়ার্ল্ড হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নশিপ। ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৭, ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৮ ও ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তিনি বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি তিনটি ভিন্ন প্রতিযোগিতায় আন্তর্জাতিক হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন।
ক্যাসিয়াস মারসেলাস ক্লে থেকে মোহাম্মদ আলী
সানি লিস্টনের সঙ্গে জয়ের কিছু সময় পর জুনিয়র ১৯৬৪ সালে ইসলামি সংগঠন নেশন অব ইসলাম এ যোগ দেন। তার নাম রাখা হয় ক্যাসিয়াস এক্স, কারণ তিনি মনে করতেন তার পদবী ‘ক্লে’ দাসত্বের পরিচায়ক। ১৯৭৫ সালে সুন্নি ইসলাম গ্রহণ করে নাম পাল্টে হয়ে যান মোহাম্মদ আলী। এর প্রায় ৩০ বছর পর তিনি সুফিবাদ অনুসরণ শুরু করেন।
ভিয়েতনাম যুদ্ধে বিরোধী অবস্থান
১৯৬৪ সালে মোহাম্মদ আলী সৈনিক জীবনে প্রবেশ করতে গিয়েও ব্যর্থ হন পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হওয়ার কারণে। এরপর ১৯৬৬ সালে তিনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কিন্তু ভিয়েতনাম যুদ্ধে অংশ নিতে বলা হলে তিনি যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানান। আলীর যুক্তি ছিল: কোরআন যুদ্ধ সমর্থন করে না। আল্লাহ বা নবীর নির্দেশ ছাড়া তিনি যুদ্ধে যাবেন না। তিনি বলেন, ভিয়েতনামের কারও সঙ্গে তার কোনো বিরোধ নেই। তাদের কেউ তাকে কালো বলেও গালি দেয়নি।
শতাব্দীর সেরা লড়াইয়ে পরাজয়
১৯৭১ সালের মার্চে মোহাম্মদ আলী মুখোমুখি হন আরেক বিখ্যাত বক্সার জো ফ্রেজিয়ারের। বহুল আলোচিত এ বক্সিং ম্যাচকে বলা হয় শতাব্দীর সেরা লড়াই। ওই খেলায় ফ্রেজিয়ার জিতে যান। সেটি ছিল আলীর প্রথম পরাজয়। অবশ্য ১৯৭৪ সালের ফিরতি লড়াইয়ে তিনি শিরোপা পুনরুদ্ধার করেন।
বাংলাদেশ সফর ও নাগরিকত্ব লাভ
মোহাম্মদ আলী ঢাকায় এসেছিলেন ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে। আলীকে দেখতে সে সময় ঢাকা স্টেডিয়ামে উপচে পড়েছিল মানুষ। পল্টনের মোহাম্মদ আলী বক্সিং স্টেডিয়াম উদ্বোধন করেছিলেন আলী নিজেই। তার সম্মানেই স্টেডিয়ামটির নামকরণ করা হয়। ওই সফরে তাকে বাংলাদেশের সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দিয়ে তার হাতে চাবি তুলে দেয়া হয়েছিল। সেদিন মোহাম্মদ আলী বলেছিলেন, ‘ঢাকায় এসে আমি মুগ্ধ, এটা আমার প্রিয় শহর।’
শেষ লড়াই ও অবসর গ্রহণ
১৯৮০ সালে মোহাম্মদ আলী নিজের শিষ্য ল্যারি হোমসের কাছ থেকে শিরোপা ছিনিয়ে নেয়ার লড়াইয়ে নামেন। কিন্তু ১১ রাউন্ড পর হেরে যান তিনি। পরে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় আলীর মস্তিষ্কে পারকিনসন’স ডিজিজ নামের মারাত্মক রোগ ধরা পড়ে। ১৯৮১ সালে অবসর নেন আলী। ততদিনে তিনি অংশ নেয়া ৬১টি লড়াইয়ের ৫৬টিই জিতেছেন।
১৯৯৯ সালে স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেড ‘দ্য গ্রেটেস্ট’ উপাধি পাওয়া মোহাম্মদ আলীকে ‘স্পোর্টসম্যান অব দ্য সেঞ্চুরি’ এবং বিবিসি ‘স্পোর্টস পারসোনালিটি অব দ্য সেঞ্চুরি’ অথবা শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড় হিসেবে ঘোষণা করে।
বক্সিংয়ে দক্ষতা ছাড়াও ম্যাচের আগে ও পরে খেলা নিয়ে আলোচনা এবং সরাসরি ফলাফল নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণীর জন্য তিনি ব্যাপক আলোচিত ছিলেন। পাশপাশি সাধারণ মানুষের অধিকার ও বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যও কাজ করে গেছেন এই কিংবদন্তি মানুষটি।







