১৭ মার্চ বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন। তিনি শিশুদের ভালোবাসতেন বলে এই দিনটাকে ঘোষণা করা হয়েছে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে। বেঁচে থাকলে বঙ্গবন্ধুর বয়স হতো এখন ৯৭। এতদিন তিনি হয়তো বাঁচতেন না। কিন্তু এটা বড় দুঃখের বিষয় যে, মাত্র ৫৫ বছর বয়সে, এক ষড়যন্ত্রের ফলে তিনি নিহত হন। যাদের জন্য অনেক কষ্ট স্বীকার করে তিনি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাদেরই কয়েকজন বিপথগামী তাকে এবং তার পরিবারের সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
বঙ্গবন্ধু বলতেন, তার প্রধান গুণ এই যে, নিজের দেশের মানুষকে তিনি ভালোবাসেন, আর তার প্রধান দুর্বলতা এই যে, তিনি তাদের বড় বেশি ভালোবাসেন। তাদের কেউ কখনো যে তাকে মেরে ফেলতে পারে, এ কথা কখনো তার মনে আসেনি। ইতিহাসের নির্মম পরিহাস এই যে, সেই অভাবিত ঘটনাই ঘটেছিল। মৃত্যুর মুহূর্তেও তিনি ভয় পাননি। খুনিরা যখন তাঁকে মারতে গেল, তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তাদের মুখোমুখি হয়ে জানতে চেয়েছিলেন ‘কী চাস তোরা? তারা তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছিল। তার কথার জবাবে তারা তাকে লক্ষ্য করে বর্ষণ করেছিল গুলির পর গুলি। এই অদম্য সাহস ছিল শেখ মুজিবুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।
ছেলেবেলায় বারবার অসুখে ভোগার কারণে তার পড়াশোনার সময় অনেকটা নষ্ট হয়েছিল। এজন্য তিনি লেখাপড়ার সহপাঠীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়েন। তবে খেলাধুলায় তার খুব মন ছিল। ফুটবল, ভলিবল ও হকি খেলতেন। স্কুলে টিমে তার জায়গাটা ছিল পাকা। তার আব্বা ছিলেন গোপালগঞ্জের অফির্সাস ক্লাবের সেক্রেটারি। তার দলের বিরুদ্ধে শেখ মুজিব স্কুলের টিম নিয়ে ফুটবল খেলে এক গোলে হেরেছেন, কিন্তু পিতাকে মাঠ ছেড়ে দেননি।
সেটিও খুব বড় কথা নয়। বড় কথা তাঁর চিরকালের সাহস। ছেলেবেলা তেকে তিনি ছিলেন ডানপিটে স্বভাবের। একবার এক মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন। আরো আরেকজনের সঙ্গে তার বিরুদ্ধেও মামলা হয়। তার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বের হয়। তার ফুফাতো ভাই পরামর্শ দিলেন পাশের বাসায় গিয়ে সরে থাকতে। মুজিব বললেন, আমি পালাব না, লোকে বলবে আমি ভয় পেয়েছি। বাড়ি থেকে তাকে ধরে নিয়ে গেল। জেলহাজতে থাকতে হল সাতদিন। তারপর জামিন হল। তখন তিনি স্কুল ছাত্র।
অনেককাল পরের কথা। পূর্ব পাকিস্তানে প্রথমবার সাধারণ নির্বাচন হয়েছে। মুসলিম লীগ হেরে গেছে। যুক্তফ্রন্টের নেতা এ কে ফজলুল হক মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু পাকিস্তানের সরকার অন্যায়ভাবে সে মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করে দিল, শেখ মুজিবকে ধরতে পুলিশ গেল তার বাড়িতে। তিনি তখন ঘরে ছিলেন না, সব জেনে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে ফোন করেন মুজিব। বললেন, আমার বাড়িতে পুলিশ এসেছিল, বোধহয় আমাকে গ্রেপ্তার করার জন্য। আমি এখন ঘরেই আছি, গাড়ি পাঠিয়ে দিন। পুলিশ এসে তাকে নিয়ে গেল।
এমনই হল ১৯৭১ সালে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতে গেছে। কিন্তু পাকিস্তান সরকার তার হাতে ক্ষমতা দেবে না। বঙ্গবন্ধু শুরু করলেন অসহযোগ আন্দোলন। দেশের মানুষ তারই কথা শোনে, সরকারের কোনো কর্তৃত্ব রইল না। পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট তার সঙ্গে আলাপ-আলোচনার নামে সময় নষ্ট করতে লাগলেন, তারপর সুযোগ বুঝে ফিরে গেলেন রাজধানীতে।
নিরীহ নিরস্ত্র সাধারণ বাঙালিকে ভয়ঙ্কর সব অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করল পাকিস্তান সেনাবাহিনী। শেখ মুজিবকে অনেকে পরামর্শ দিল পালিয়ে যেতে। তিনি রাজি হলেন না। তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হল পাকিস্তানে। পরে তার বিচার হল সেখানে। তিনি যে ঘরে বন্দি ছিলেন, তার সামনেই তার কবর খোঁড়া শুরু হল। তিনি ভয় পেলেন না। বললেন, আমার একটাই অনুরোধ মৃত্যুর পরে আমার লাশ পাঠিয়ে দিও বাংলাদেশে।
সাহস আর দেশপ্রেম ছিল বঙ্গবন্ধুর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য
রাজনীতিতে যোগ দিয়ে শেখ মুজিব হয়ে ওঠেন মুসলিম লীগের নেতৃস্থানীয় কর্মী। তিনি আন্দোলন করেন পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে দেখা গেল, একের পর এক সরকার পূর্ব বাংলার মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করছে। শেখ মুজিব আন্দোলনে নামলেন সরকারের বিরুদ্ধে। প্রথমে হলো রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন। দেশের অধিকাংশ মানুষের ভাষা বাংলাকে সরকারি কাজকর্মে জায়গা দেবে না সরকার। তার প্রতিবাদে আন্দোলন, শেখ মুজিব তার একজন নেতা। তাকে গ্রেফতার করে জেলে নেয়া হলো। অন্যেরা আন্দোলন চালিয়ে নিয়ে গেল।
সেই থেকে শুরু হয় ছয়-দফার অন্দোলন। পূর্ব বাংলার স্বার্থের দিকে লক্ষ্য রেখে ছয়-দফা দাবি পেশ করেন শেখ মুজিব। তার একজন নেতা। তাকে গ্রেফতার করে। সেই ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত তিনি একবার জেলে যান, বেরিয়ে আসেন, আবার তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় জেলে। মুজিব ভয় পান না। নিজের দিকে খেয়াল নেই, সংসারের দিকে খেয়াল নেই। কদিন পরপরই কারাগারে- সেটিই হয়ে ওঠে তার থাকার জায়গা। সরকার একটা বড় মামলা দিল তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদোহের মামলা। তার মৃত্যুদণ্ড হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিল। তিনি কিন্তু অকুতোভয়। সরকারের সঙ্গে আপস করলেন না। জনসাধারণ আন্দোলন করে তাকে মুক্ত করে আনল। তিনি ওয়াদা করলেন, দেশের মানুষ এত ত্যাগ স্বীকার করে তাকে মুক্ত করেছে, তাদের সঙ্গে তিনি বেঈমানি করবেন না। সেই কথা তিনি রেখেছিলেন।
১৯৭০ সালে পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন হল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ লাভ করল বিপুল বিজয়। কিন্তু ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্ত্বেও তিনি ক্ষমতা লাভ করতে পারলেন না, সে কথা আগেই বলেছি। অসহযোগ আন্দোলনের মধ্যে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যে ভাষণ তিনি দিয়েছিলেন সেখানে বলেছিলেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম- যে ভাষণটি হয়ে আছে পৃথিবীর সেরা বক্তৃতাগুলোর একটা।
শুনলেই রোমঞ্চিত হতে হয়। গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তিনি ঘোষণা করে যান বাংলাদেশের স্বাধীনতা। তার অনুপস্থিতিতে তাকে রাষ্ট্রপতি করে গঠিত হয় প্রথম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। তার অনুপস্থিতিতে তার নাম করে পরিচালিত হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। লাখ লাখ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা। বিশ্বের জনমতের চাপে তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তান। তিনি মাতৃভূমিতে ফিরে এসে দেশের পুনর্গঠনে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। কিন্তু তার কাজ শেষ হওয়ার আগেই তাকে সরিয়ে দেয়া হয় পৃথিবী থেকে। তারপর চেষ্টা হয়েছে ইতিহাস থেকে তার মুছে ফেলতে। তবে সে প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছে, ব্যর্থ হতে বাধ্য।
আমরা বলেছি তাঁর সাহস ও দেশপ্রেমের কথা।
আরেকটি কথাও বলতে হয় সেইসঙ্গে- তার মানবিকতার কথা। যখন পাকিস্তানের জন্য আন্দোলন করেছেন, তখন হিন্দু-মুসলমানে খুব বড়ো দাঙ্গা। শেখ মুজিব তখন কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজের ছা্ত্র। কলেজের হিন্দু অধ্যাপক যেন নিরাপদে মুসলমান পাড়া পার হয়ে যাওয়া-আসা করতে পারেন সে দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন কয়েকজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে। তখন বিপদগ্রস্থ মুসলমান নরনারীকে যেমন উদ্ধার করেছেন, তেমনি বিপন্ন হিন্দুদেরও রক্ষা করেছেন। ১৯৬৪ সালে পূর্ব বাংলায় আরো একবার সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা হল। শেখ মুজিব ঝাঁপিয়ে পিড়েছিলেন তা থামাতে। সবাইকে নিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন। হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খিস্ট্রানকে তিনি আলাদা করে দেখেননি, সকলকে মানুষ হিসেবে দেখেছেন। তিনি যে বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন সেখানে সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন অত্যন্ত হৃদয়বান ব্যক্তি। তার ‘অসমাপ্ত আত্মতজীবনী’তে’ দেখি বড় বড় মানুষের কথা বলার পাশাপাশি তিনি অজ্ঞাত, অখ্যাত মানুষের কথা লিখে রেখেছেন। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে তিনি যখন গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যান, তখন সেখানে অনেক স্কুলছাত্র দেখতে পান, তারাও একই কারণে গ্রেপ্তার হয়েছিল। এদের মধ্যে নয়-দশ বছরের একটি ছেলে ছিল। জেলগেটে এসে তার বাবা তার সঙ্গে দেখা করেন এবং তাকে সেইদিনই মুক্ত করে নিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দেন। ছেলেটি তার বাবাকে বলে, অন্য ছাত্রদের না ছাড়লে আমি যাব না। জেলগেট থেকে ফিরে এসে বন্দিদের কাছে যখন ছেলেটি এ কথা বলে তখন সবাই তাকে আদর করে এবং তার নামে জিন্দাবাদ দেয়।
শেখ মুজিব তার নাম ভুলে গিয়েছিল, কিন্তু এই ঘটনা ভোলেননি। আত্মজীবনীতেও এই ভীষণ ‘শক্ত ছেলে’র কথা লিখে রেখেছেন। তেমনি আরেক ঘটনার কথা তিনি লিখেছেন। তিনি একবার গ্রেপ্তার হন তার এক বন্ধুর বাড়ি থেকে। সে বাড়ির ছোট ছেলে শাহজাহান বোধহয় স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ছিল , মুজিবকে খুব ভালোবাসতো, সময় পেলেই ছুটে যেতো তার কাছে। তাকে যখন পুলিশের গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়, শাহজাহান খুব কেঁদেছিল। শাহজাহানের এই কান্নার কথা তিনি কখনো ভোলেননি বলে লিখেছেন।
যিনি একজন রাজনৈতিক নেতা- হাজার হাজার লোকের সঙ্গে মেশেন, ওঠাবসা করেন বিখ্যাত সব রাজনীতিদের সঙ্গে তিনি যে এইসব ছোট ছোট ছেলেদের কথা এমন করে মনে রেখেছেন, তার থেকেই বোঝা যায় তিনি কত হৃদয়বান ছিলেন। পরবর্তীকালেও দেখা গেছে, যারা তার প্রতিপক্ষ, তাদের সঙ্গেও ক্ষমতার আসনে বসে তিনি কত সদ্বব্যবহার করেছেন। এই সদ্বব্যবহারের প্রতিদান যে তিনি সবসময় পেয়েছেন, তা নয়, প্রতিদান তিনি আশাও করেননি। তাকে যারা হত্যা করেছিল, সেদলেও এমন কেউ ছিল যাদের তিনি ব্যক্তিগতভাবে সাহায্য করেছিলেন।
মানুষ বড় হয় নিজের গুণে। সব মানুষের সব গুণ থাকে না, তবে কিছু কিছু গুণই মানুষকে অনেক বড় করে তুলতে পারে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এমন কিছু গুণের কথা বললাম। সকলেই চেষ্টা করলে কিছু না কিছু গুণের অধিকারী হতে পারে। যেসব গুণ তাকে জীবনের প্রতিষ্ঠা দিতে পারে। প্রতিষ্ঠা যদি নাও দেয়, তার জীবনকে সার্থক করতে পারে। তার মনকে তৃপ্তি দিতে পারে। সেটি কম কথা নয়।
(১৭ মার্চ জাতির জনকের জন্মদিন উপলক্ষে শ্রাবণ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত রাজীব পারভেজ সম্পাদিত ‘নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু’ বই থেকে পুন:প্রকাশিত)







