বিশেষ্য পদ ‘দাবদাহ’ মানে বনাগ্নির তাপ, তীব্র যন্ত্রণা, প্রচণ্ড গ্রীষ্ম। এখন দেশে চাপাতাপির কোপে মাথা-কাটা লাশ হওয়ার ভয়ের পাশাপাশি তীব্র দাবদাহের যন্ত্রণা দেশবাসীকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। কোনোটা থেকেই পরিত্রাণের কোনো পথ আপাতত খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! দেশজুড়ে খাঁ খাঁ রোদ্দুর। কোথাও একটু ছায়া নেই। নেই স্বস্তি। বাইরে বের হলেই সূর্যতাপে গা পুড়ে যাওয়ার জোগাড়।
পুরোপুরি চোখ মেলে তাকানোর অবস্থাও থাকে না কখনও কখনও। এমন তাপে অসুস্থ হয়ে পড়ছে মানুষ। গা বেয়ে দরদর ঘাম ঝরছে। ভিজেপুড়ে একাকার অনেকে পানিশূন্যতায় ভুগছেন। পশুপাখির অবস্থাও ত্রাহি ত্রাহি। ওদিকে শুধু মানুষের মনে নয়, বনেও (সুন্দরবন) অদৃশ্য উৎস থেকে লাগা আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে লোডশেডিং। বাড়িয়ে দিচ্ছে জনভোগান্তি।
অতিরিক্তি গরমে হিটস্ট্রোকসহ নানা রোগ ব্যাধিও বেড়ে গেছে। তাপ প্রবাহের কারণে জ্বর, ডায়রিয়া, সর্দি-কাশিসহ নানা অসুখ-বিসুখ বেড়েছে । গরমের কারণে সবার মন-মেজাজ খিটখিটে হয়ে পড়েছে। রিকশাওয়ালা-সিএনজিওয়ালা-বাসের কন্ডাকটরদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের ঝগড়া বেড়েছে। সবচেয়ে বড় কথা ঘরে ঘরে দাম্পত্য কলহ বেড়েছে। এই গরমে কারও কথাই কেউ সহ্য করতে পারছে না। শীত আর শীতল খাবার ছাড়া অন্য কোনো উপহার-উপঢৌকন কারও পছন্দ হচ্ছে না। মধ্যবিত্তের শরীরনির্ভর যে প্রেম, সেই প্রেমের বাজারও বর্তমানে মন্দা।
এই গরমে হাত-ধরা, আলিঙ্গন তো দূরের কথা কেউ কারো ছায়ায়ও মারাতে চাইছে না! সবার মনে মনে আকাঙ্ক্ষা, উ! মরার গরম যায় না কেন! কবে বৃষ্টি নামবে? কবে দুনিয়া শীতল হবে?কিছু দিন আগেও এসি ছিল বড়লোকের বিলাসিতা। কিন্তু সূর্য নামের গ্রহটির হাই ভোল্টেজ আকস্মিক বেড়ে যাওয়ায় হুহু করে এসি বিক্রি হচ্ছে, এই ঠাণ্ডা মেশিন হয়ে যাচ্ছে আলু-পটলের চেয়ে বেশি কম্পালসরি। 
কোনো কোনো মধ্যবিত্ত এসি কিনে গরিব হচ্ছে, তারপর উপোস করে ঠাণ্ডা বাতাস খাচ্ছে! অবশ্য এটাও ঠিক যে যুগে যুগে সূর্য আগুন কিছু কম ঢালেনি। কিন্তু তখন মানুষ অনেক শক্ত ছিল। ফুলের ঘায়ে মুর্ছা যেত না। তখন মানুষের মেন্টালিটিই ছিল অন্যরকম। তখনকার লোকেরা এখনকার মতো এত বোর হত না, এত চট করে সমাজ সম্পর্কে গরগর করে লেকচার ঝাড়ত না, দড়াম করে ধৈর্যের টিনের দরজা ভেঙে যেত না। তখনকার মানুষদের প্রো-অ্যাক্টিভ নালিশবাজি, পার্মানেন্ট বিরক্তি, ফেশিয়াল ফুঁড়ে ফেলিয়োর: এ সব অকল্পনীয় ছিল। আনন্দিত হওয়া মানুষের একটা সচেতন কর্তব্যের মধ্যে পড়ে, এটার অনুশীলন একটা জরুরি অভ্যাস, এ রকমটা ভাবা হত। তখন পাতি কেরানি হাতি কিনতে চাইত না। সপ্তাহে একদিন মাংস হলেই খুশি থাকত। মানুষের এমন উদ্ভট উচ্চাকাঙ্ক্ষাও ছিল না।
উদ্ভট লোভের তালে কোটি কোটি বামন চাঁদ ধরতে কোরাসে লাফাচ্ছে, এ স্ল্যাপস্টিক বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়েনি। মানুষকে তো মেনে নিতেও শিখতে হয়। সূর্য প্রবল হয়েছে বলে সারা দিন কাঁই কাঁই কমপ্লেন করব কেন? একটু ছায়ায় দাঁড়াব। অনেক ক্ষণ ধরে ঘাম মুছব। বাড়ি এসে খালি গায়ে ছাদে বসে বসে হাওয়া খাব। আসলে একালের মানুষ হচ্ছে একেকটা কমপ্লেইন মেশিন! খালি কমপ্লেইন। এটা এভাবে হচ্ছে না কেন। ওটা ওভাবে হচ্ছে কেন। প্রতিনিয়ত কমপ্লেইন করা আর রানিং কমেন্ট লিখে যেতে যেতে জীবন যাপন করাটাই এখন ‘সুখ’।
একটা ফাস্টফুড দোকানে বসে একবাটি স্যুপের দুই চামচ মুখে দিয়ে তক্ষুনি ছবিটা আপলোড করে লিখতে হচ্ছে ফিলিং হ্যাপী। সারা দিন নিজ জীবনের রানিং কমেন্ট্রি করে যেতে হচ্ছে গোটা পৃথিবীর কাছে, মানে সমস্ত জাগ্রত মুহূর্ত নিজের আন্ডারেই অফিস করা, টানা টেনশনে ভোগা, ক’টা লোক আমাকে গ্রহণ করবে, ক’টা লোক বন্ধুত্বকামী হবে, নিজেকে এক সেকেন্ডও চুপ বসে খুশকি খোঁটবার ফুরসত দিচ্ছি না, এটাকে কী জয়ী হওয়া বলে? তা হলে হার কাকে বলে? 
সারাদিন নিজেকে নিয়ে পড়ে থাকা-নিজের ছবি, নিজের ফিলিং শেয়ার করা! এত কীসের হট্টমেলায় আয়নাবাজির দায়? এত কীসের ইনসিকিয়োরিটি? বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন, ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে বালক আপনমনে ছাদে ঘুরে বেড়ায়, গরম নিয়ে কোনও নালিশই করে না। কারণ সে বিস্মিত হতে জানে। এখন ব্যাপারটা উল্টে গেছে। বুদ্ধদেব বসুর যুগ চলে গেছে বলে, মানুষ বদলে গেছে বলে, সে নিজের মতো একশোটা ফুর্তির উপায় খুঁজে বের করে ফেলেছে বলে, কিন্তু টেম্পারেচার নিয়ন্ত্রণে আনার পথ বের করতে পারেনি। এই যে তীব্র দাবদাহ-এর পেছনে কি শুধুই জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব দায়ী? এমন অনল অনুভূতির জন্য আমরা কী দায়ী নই?
হ্যাঁ, এর জন্য আমরাও অনেকটা দায়ী। দিন দিন নগরে কমছে গাছপালা। জলাশয় ভরাট হচ্ছে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। অথচ পরিবেশের ভারসাম্য ধরে রাখতে এই দুটোই খুব গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয়ও বটে।গাছপালা মানুষের নির্গত কার্বন-ডাই অক্সাইড টেনে নিয়ে অক্সিজেন ছড়িয়ে দেয় পরিবেশে। তেমনি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে জলাশয়ের ভূমিকাও কম নয়। পরিবেশ ঠাণ্ডা রাখে। ভূখণ্ডের তাপমাত্রা কমিয়ে ফেলে। ভূ-তটের গভীরের পানিও থাকে স্বাভাবিক স্তরে।
কিন্তু ভূখণ্ডের উপরের জলাশয় কমে যাওয়ায় দিন দিন মাটির গভীরে পানির স্তরও ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে নিচে। নগরবিদরা বরাবরই বলে আসছেন ঢাকার ভারসাম্যহীন পরিবেশের জন্য দায়ী অপরিকল্পিত নগরায়ন। বাণিজ্যিক এলাকা, শিল্প এলাকা এমনকি আবাসিক এলাকা, কোনোটাতেই নেই সঠিক ও পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনার ছাপ। স্থাপনাগুলোর বেশির ভাগই তৈরি হচ্ছে খেয়ালখুশি মতো। বাতাস আসা-যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত জানালা কিংবা জায়গাও রাখা হয় না। একেকটি ভবন যেন একেকটি খাঁচা। পার্থক্য শুধু লোহার খাঁচায় রাখা হয় পশুপাখি, আর কংক্রিটের খাঁচায় মানুষ।
কাগজেকলমে নথিবদ্ধ প্রায় দেড় কোটি মানুষের এই ঢাকায় প্রায় ৯ লাখের বেশি যানবাহন চলে বলে বিআরটিএ তথ্য দিচ্ছে। এর মধ্যে ৩০ হাজারের বেশি বাস ও মিনিবাস। বাকিগুলোর মধ্যে আছে ব্যক্তিগত গাড়িসহ ভারী যানবাহনও। বিপুল এসব যান চলাচলে নগরীতে বায়ু দূষণের পাশাপাশি বাতাসের ধুলোবালির পরিমাণ বেড়েছে। ইঞ্জিন থেকে নির্গত তাপ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র থেকে বেরিয়ে আসা তপ্ত বায়ু, কংক্রিট ও বিটুমিনের তৈরি রাস্তা থেকে ক্রমাগত ছড়িয়ে পড়া তাপবাষ্প পরিবেশকে ঠেলে দিচ্ছে বিপর্যয়ের দিকে।বায়ুমণ্ডলের তাপ বাড়ছে। ভূখণ্ডের তাপও ছাড়িয়ে যাচ্ছে স্বাভাবিক স্তর।
ঢাকায় এমন কতগুলো এলাকা রয়েছে যেগুলো রীতিমতো তপ্ত অঞ্চল হিসেবেই চিহ্নিত হয়েছে বিভিন্ন গবেষণায়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র ঘরের ভেতরের মানুষকে সাময়িকভাবে ঠাণ্ডা করছে ঠিকই, কিন্তু বাইরের পরিবেশকে করে তুলছে তপ্ত। ঢাকার অফিস পাড়া, আবাসিক এলাকার তাপমাত্রা এ কারণে বেশি থাকে। এ কারণে শহরের তাপমাত্রা ৩৩/৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বলা হলেও শরীরে অনুভূত হয় তারও কয়েকগুণ বেশি। দেশের অনেক জায়গায় মাপমাত্রা ৪১-৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে উঠা নামা করছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ।
যাহোক, এসব নিয়ে আপাতত আমাদের কিছুই করবার নেই! কাজেই মনের জোর বাড়াতে হবে। গরমকে মেনে নিতে শিখতে হবে। সন্ত্রাস-নৈরাজ্য-দুর্নীতির মত এটাকেও মেনে নিতে হবে। মনের সঙ্গে একটা ‘ডিল’ করে নিতে হবে। গরম নিয়ে বেশি ভাবব না। মনকে বোঝাতে হবে, গরম আসলে একটা মেন্টাল স্টেট। ওটাকে পেরিয়ে যেতে পারলেই, সব মোটামুটি ম্যানেজ করা যাবে।
গরমকে মনে মনে চ্যালেঞ্জ জানাতে হবে, ‘দেখি কে কাকে জিতে নেয়, তুমি না আমি!’ গরমকে বেশি পাত্তা দিলেই বিপদ। নিজের মতো এসেছে, নিজের মতো চলে যাবে। যত উফ্-আফ্-বাবারে করবেন, তত পেয়ে বসবে। গরম না পড়লে যে আম-জাম-লিচু-তরমুজ-কাঁঠাল, শত বারণ সত্ত্বেও রাস্তায় ঠাণ্ডা রঙিন শরবত খাওয়ার ধুম, আর বর্ষার জন্য আকুল অপেক্ষা সব হারিয়ে যাবে!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








