নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের লেখা অপরাহ্নের গল্প লেখার সময়কাল হিসেব করলে এখন প্রায় একযুগ পার হতে চলেছে। সময় পাল্টালেও গল্পের আব্দুল মজিদের মতো এইচআইভি পজেটিভ ব্যক্তিদের (এইডস রোগী) প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়নি। বিদেশে অনিরাপদ যৌন মিলনের পর এই মরণব্যাধী বয়ে আনায় মজিদকে ত্যাগ করেছিলো সমাজ, এমনকি স্ত্রী-সন্তানদেরও পাশে পায়নি সে। তবে সবার শরীরে এইচআইভি একভাবে বাসা না বাঁধলেও মজিদের মতো একই সামাজিক-পারিবারিক পরিণতির অসহনীয় বঞ্চনা সহ্য করতে হচ্ছে অনেককে। এদেরই একজন মামুন (ছদ্মনাম)। চ্যানেল আই অনলাইনের কাছে নিজের সামাজিক-পারিবারিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরার আগে নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন তিনি। অপরাহ্নের গল্পের মজিদের মতোই একটি ছদ্মনাম দিতে বললেন নিজেই।
এই তরুণ জানান, শুধু আত্মীয়স্বজন ছাড়াও রোগীর সেবা করার মহান পেশার ডাক্তার-নার্সরাও অমানবিক আচরণ করে এইডস রোগীদের সঙ্গে।
তার সঙ্গে যখন এই প্রতিবেদকের দেখা হয় তখন রাত প্রায় ৯টা বাজে। মামুনের সঙ্গে তার দুই আত্মীয়। তাদের থেকে একটু দূরে এসে দাঁড়িয়ে অনুরোধের সুরেই বললেন, ‘দাওয়াত আছে, একটু তাড়া। সংক্ষেপে যা বলা যায় বলছি।’
শুরু থেকেই শুরু করলেন মামুন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করে এখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এই তরুণ জানালেন ২০১৫ সালে তিনি জানতে পারেন শরীরে বাসা বেঁধেছে এইডস।
কিভাবে এইচআইভি সংক্রমিত হলেন, এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি ৭-৮ বছর আগে একটি দুর্ঘটনায় আহত হই। তখন আমাকে আমার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় আমাকে রক্ত দিয়েছিলো। ২০১৪ সালের শেষের দিকে আমার শরীর খারাপ হওয়া শুরু করে। ২০১৫ সালে জানতে পারি আমি এইচআইভি পজেটিভ। পরে জানতে পেরেছিলাম আমার ওই আত্মীয় বিদেশে কাজ করতে গিয়ে এই ভাইরাস বয়ে এনেছেন।’
মরণব্যধীতে আক্রান্ত হওয়ার পর এমনিতেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মামুন দেখেন সমাজের অমানবিক চেহারা।
সেই চেহারার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘ভাইরাস ধরা পড়ার পর প্রথম দেড়-দুইমাস আমি পরিবার থেকে নিজেই আলাদা ছিলাম। তবে শরীর খুব বেশি খারাপ হলে পরিবারকে জানাতে বাধ্য হই। তারা আমার মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা করে। কিন্তু এরপরও আমাকে স্টিগমার শিকার হতে হয়। বাসাতে আলাদা করে রাখা, আলাদা করে খাবার খেতে দেয়া শুরু হয়। ছোটদের আমার কাছ থেকে দূরে রাখা শুরু হয়।’
মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং পেশাগত কারণে আত্মীয়স্বজন এবং পরিবারের এই আচরণ এখন অনেকটাই সহনীয় বলে জানান মামুন। মরণব্যাধীর সঙ্গে লড়াই করা এই তরুণ এখন নিজেই তার মতো এইচআইভি পজেটিভদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কারণ সব এইচআইভি পজেটিভ মামুনের মতো ‘সৌভাগ্যবান’ নয়। এমনকি চিকিৎসা সেবার মতো মহান জায়গাতেও এইচআইভি আক্রান্তরা ডাক্তারদের অপেশাদার আচরণের মুখোমুখি।
এমন রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এই রোগটাকে রোগের মতো করে নিতে পারে এমন ডাক্তার খুব কম আছে। অনেক ডাক্তার এইডস রোগীকে চিকিৎসা করতে চায় না, হাসপাতালগুলো সেবা দিতে চায় না। বক্ষব্যাধী হাসপাতাল, হার্ট ফাউন্ডেশনে এইচআইভি আক্রান্তের বেডে বড় করে এইচআইভি আক্রান্ত লিখে সাইনবোর্ড পর্যন্ত টানিয়ে দেয়ার ঘটনার কথা জেনেছি।’
অথচ মৃত্যু নিশ্চিত জানা এই মানুষেরা শেষ ভরসা হিসেবে চান মানবিক আচরণ। এইচআইভি পজেটিভদের প্রতি প্রচলিত ভীতি দূর করে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন চান মামুন।
এই পরিবর্তনে পরিবার, ডাক্তার ও সরকারকে শামিল করা উচিৎ জানিয়ে এই লড়াকু তরুণ বলেন, ‘এইচআইভি আক্রান্তরা একটা বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ চায়, মনের কথাগুলো বলার জায়গা চায়। চিকিৎসা কোথায় পাবে, এরকম ভরসার জায়গা খোঁজে। আর এখানেই আমাদের বড় ফাঁক রয়ে গেছে।’
এইচআইভি পজেটিভদের নিয়ে জাতিসংঘের ইউএনএইডস সহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে কাজ করা মামুন জানান মানবিক আচরণ চাইলেও তার জানাশোনা এইচআইভি পজেটিভদের অনেককে ছেড়ে চলে গেছে তাদের স্ত্রী। আবার বিদেশে শ্রমিক হিসেবে কাজ করা স্বামীর মাধ্যমে এইচআইভি ভাইরাসে না জেনেই আক্রান্ত হচ্ছেন স্বল্প শিক্ষিত অনেক নারী।







