আজকে সবার ঘুমের ছুটি! আজকে সবার চোখের পাতা খুলে রাখার রাত। আজকে শততম টেস্টে জয়োৎসবের অপেক্ষায় থাকার রাত। আজকে গোধূলিতেই দিকে দিকে রটে যাওয়ার কথা ৮ উইকেট হারিয়ে ১৩৯ রানের লিড নিয়ে চর্তুথদিন শেষ করেছে শ্রীলঙ্কা।
টেস্টের ইতিহাসে নিজেদের শততম টেস্টে জয়ের নজির আছে তিন দেশের- অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ। চতুর্থ দেশ হিসেবে বিরল এই কীর্তি গড়ার ইতিহাস ডাকছে লাল-সবুজের পতাকাকে।
কলম্বোয় শনিবার লাঞ্চের আগে থেকে বেশ কিছু পটপরিবর্তন ঘটতে থাকে। ধীরে ধীরে তামিমের সাদা ট্রাউজারের চেহারা বদলে যেতে থাকে। কোমরের নিচের অংশে লালচে দাগ দেখা যায়। এই দাগে মিশে আছে অনেক উত্তর।
মাঠে মুশফিকই অধিনায়ক। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দায়িত্বটা ভাগ হয়ে যায় আরো দুজনের কাছে। নাম দুটো সাকিব, তামিম। দ্বিতীয় সেশনে বাংলাদেশ যখন পাঁচটা উইকেট তুলে নিল ওই সময় থেকেই তামিম বারবার বোলারের কাছে আসতে থাকেন। ট্রাউজার ব্যবহার করে বল ঘষতে থাকেন। বোলার যাতে টার্ন কিংবা সুইং পান সেই চেষ্টা করতে থাকেন বারবার। এই দৃশ্য চোখে পড়েছে সবার। কিন্তু সহঅধিনায়কের মনের ঘর্ষণ কেউ দেখেছেন কি?
তামিমের ট্রাউজারের রং বদলে যাওয়ার এই দিনে বদলে যাওয়া এক মুশফিককেও দেখেছে বাংলাদেশ। উইকেটের পেছনে নিজের মেধার সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রথম উইকেটররক্ষক হিসেবে ১০০ ডিসমিসালের মালিক হয়েছেন। আর ফিল্ডিং পরিবর্তন এবং বোলারদের ব্যবহারে দেখিয়েছেন চমক। শেষ বিকেলে মোসাদ্দেককেও বলে এনেছেন।
মুশফিককে প্রায়ই রক্ষণাত্মক অধিনায়কত্ব করতে দেখা যায়। পেসারদের যখন ব্যবহার করেন একটানা করে যান। স্পিনারদের ক্ষেত্রেও তাই। কিন্তু কলম্বো টেস্টের চতুর্থদিন সবাইকে মেপেমেপে প্রান্ত বদল করালেন। তাতে রানের চাকা ঘুরেছে ধীরে। বিভ্রান্ত হয়েছেন ব্যাটসম্যানরা।
মুশফিকের স্বস্তির শুরু হয়েছিল মিরাজকে দিয়ে। দিনের প্রথম বলে থারাঙ্গাকে বোল্ড করেন তরুণ স্পিনার। এই উইকেটের সঙ্গে তার টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম উইকেটের অনেক মিল আছে। চট্টগ্রাম টেস্টে বেন ডাকেটকে যেভাবে বোল্ড করেছিলেন ঠিক সেভাবে এদিন থারাঙ্গাকে ভড়কে দেন। বল মিডল লেগে পিচ করে সামনে যায়। ব্যাটসম্যান অ্যাঙ্গেল মেপে খেলতে যেয়ে বিপাকে। চোখের পলকে নেই অফস্টাম্প!
দ্বিতীয় উইকেট জুটি বাংলাদেশকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। কুশল মেন্ডিস আর দিমুথ করুনারত্নের ৮৬ রানের সেই জুটি ভাঙেন ‘বিস্ময় বালক’ মোস্তাফিজ। রিভিউতে মেন্ডিসকে ফিরতে হয় ৩৬ রানে। বল হালকা ব্যাটে লেগেছিল। শুরুতে আবেদন করেননি মুশফিকুর রহিম। আবেদন করলেন বোলার মোস্তাফিজকে দেখে। পরে রিভিউ নিয়ে উতরেও যান! এরপর মোস্তাফিজ দিনেশ চান্দিমালকে ফিরিয়ে লঙ্কানদের ব্যাকফুটে ঠেলে দেন। প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা চান্দিমাল এবার করতে পারেন ৫ রান। ফিজ পরে আরো দুটি উইকেট নিয়েছেন। শ্রীলঙ্কা যদি নির্দিষ্ট কোনো সময়কে দোষ দিতে চায়, তবে দ্বিতীয় সেশনকেই দিবে।
দ্বিতীয় উইকেট জুটির পর সেভাবে আর প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি লঙ্কানদের কোন জুটি। অথচ দ্বিতীয় দিন পর্যন্ত ম্যাচের গল্পটা ছিল স্বাগতিকদের আধিপত্যে ভরা।
হেরাথরা ৩৩৮ করার পর দ্বিতীয়দিনের শেষ বিকেলে ৫ উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়েছিল বাংলাদেশ। তৃতীয়দিন আবার গল্পে পরিবর্তন আসে। সাকিবের ‘মহাকাব্যিক’ শতক আর অভিষিক্ত ‘বালক-বীর’ মোসাদ্দেকের ৭৫ রানে ভর করে ১২৯ রানের লিড নেয় বাংলাদেশ।
চতুর্থদিন বল হাতেও সাকিবীয় দাপটের দেখা মিলেছে। অন্য স্পিনারদের থেকে তার শরীরী ভাষা আর বোলিংয়ে দাপট ছিল বেশি। তাইজুল-মিরাজরা যখন টার্নের জন্য জায়গা খুঁজে হয়রান, বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার তখন ‘ক্লোজে’ ফিল্ডার রেখে বিপজ্জনক। নতুন বল নেয়ার ঠিক আগে পেরেরাকে এলবিডব্লিউ’র ফাঁদে ফেলে আলীম দারের অবাক সিদ্ধান্তের শিকার হন। পেরেরা সেবার বেঁচে গেলেও নতুন বলে ঠিকই সেঞ্চুরিয়ান করুনারত্নের (১২৬) ব্যাটের কানা নিয়ে নেন। প্রথম স্লিপে দাঁড়ানো সৌম্য সরকারের নির্ভুল হাত তাকে তৃতীয় শিকারের দেখা পাইয়ে দেয়। দূর হয় পথের কাঁটা। দশ ওভার বাদে তাইজুল ইসলাম হেরাথকে ফেরান। ততক্ষণে সূর্য ডুবিডুবি। আর আফসোস বাড়তে থাকে পদ্মাপাড়ে।
যদি আরেকটু সময় থাকতো…







