কৃষির বাজারজাতকরণ
এরপর চিন্তা করলাম কৃষকের পণ্যের বাজারজাতকরণ নিয়ে। শুরু করলাম পলিসি লেভেলের কাজ। উৎপাদন তো সে করলো। তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পেলো কি না, উৎপাদিত পণ্য নিয়ে সে মার্কেট প্লেস পেল কি না, এটা হলো মাটি ও মানুষের নেক্সট জেনারেশন।
দেখলাম কৃষক তার উৎপাদিত ফসল ধরা যাক বাঁধাকপি বিক্রি করছে ৩ টাকায়। আর সর্বশেষ ক্রেতার কাছে এসে তা দাঁড়ায় ৩২ টাকায়। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষক ও সর্বশেষ ক্রেতা। আর মাঝখান দিয়ে বিশাল একটা অঙ্ক চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে। এটাই হচ্ছে ব্ল্যাকমানি। মধ্যস্বত্বভোগী একটা সিস্টেম। কৃষক নিজেও অনেক সময় মধ্যস্বত্বভোগী। এটাকে কমিয়ে আনা সম্ভব।
আমি খেয়াল করলাম নরসিংদীর একটি জমিতে কৃষক একটি বাঁধাকপি উৎপাদন করে পাইকারের কাছে বিক্রি করলো, বেলাবো বাজারে এসে তা হলো ১০ টাকা। এভাবে বিভিন্ন হাতবদল হতে হতে ঢাকার শান্তিনগরে এসে সেই বাঁধাকপির দাম হলো ৩২ টাকা। এই কথাগুলো শুরু করেছিলাম ২০০৪ সালে ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’-এর প্রথম অনুষ্ঠানে। বিষয় ছিল কৃষকের পণ্যের মূল্য। এর আগে কোনোদিন কৃষকের পণ্য নিয়ে কথা বলা শুরু হয়নি। ঐ থেকে মিডিয়া এ বিষয়ে কনসার্ন হলো। আর এগুলো প্রচার করা শুরু করলো।
বাংলাদেশ শুরুতে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল না। সেখানে বাংলাদেশ এখন চাল রপ্তানি করছে। নগরায়ণ হলেও সব মানুষ এখনও নগরের বাসিন্দা হয়ে ওঠেনি। বেশিরভাগ মানুষ এখনও গ্রামে বাস করে। এমনকি পুরো পৃথিবীটা এখনও গ্রামপ্রধান।
শহরে আমরা যারা আছি তারা আনন্দ করছি, ভালো খাচ্ছি কিংবা থাকছি। এটা আসলে উন্নয়নের আংশিক চিত্র বা ভঙ্গুর চিত্র। এটা কখনোই টেকসই উন্নয়ন নয়। কতদিন দাতাগোষ্ঠীর অর্থ দিয়ে চলবে। ওই কালো টাকা কিংবা মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে থাকা টাকা চলে যাচ্ছে সমাজের এমন এক শ্রেণির কাছে যারা কখনোই সমাজের উন্নয়নে কোনো অবদান রাখে না। এই টাকাগুলো চলে যাচ্ছে বিদেশে। এই জায়গায় দরকার ডিস্ট্রিবিউশন অব ইকুয়ালিটি। এগুলোই হলো মিডিয়ার উন্নয়ন সাংবাদিকতার ক্ষেত্র। 
এখনও বাংলাদেশের এগারো কোটি মানুষ গ্রামে বাস করে। কিন্তু যতটুকু তাদের ভালো থাকার কথা ততটুকু ভালো সে নাই। সে জানে না এত কষ্ট করে ফসল ফলানোর পরও ন্যায্যমূল্য তার ঘরে আসবে কি না। তার অনেক দ্রব্যেরই ক্রয়ক্ষমতা নেই অথচ সে উৎপাদক। আজকে যদি তার কেনার ক্ষমতা থাকতো তাহলে তার কথা চিন্তা করে বেশ কিছু শিল্প কারখানা তৈরি করা যেত। আমার তো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কথা চিন্তা করে সবকিছু বাইরে থেকে ইমপোর্ট করার দরকার নেই। আমাদের ডিস্ট্রিবিউশনে ইকুয়ালিটি নেই দেখেই এই অবস্থা।
পাশাপাশি কৃষকের পণ্যে নেই কোনো ভ্যালু এডিশন। টমেটো বেশি উৎপাদন হয় কিংবা তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। ৩০ টাকা দামের এক কেজি টমেটোতে বড়জোড় সালাদ বা তরকারি হচ্ছে। কিন্তু টমেটো যখন ফ্যাক্টরিতে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং সেটা বোতল হয়ে বেরিয়ে আসছে তখন এর দাম হচ্ছে ২৩০ টাকা। এভাবে বেশিরভাগ পণ্যের ভ্যালু এডিশন হয় নাই। যদি তাই হতো, তবে কৃষক এ থেকে বেশ কিছু টাকা পয়সা পেতো।
কৃষক একদিকে মূল্য পাচ্ছে না অন্যদিকে মুক্ত বাজার অর্থনীতির জন্য বাইরে থেকে অনেক কিছুই আমদানি করতে হচ্ছে। তাহলে সরকারের দায়িত্ব কী? আমদানি বন্ধ করতে না পারলেও নিরুৎসাহিত করতে পারে। যেসময় কৃষকের ফসল বাজারে উঠে ওইসময় উচ্চহারে কর আরোপ করে ইমপোর্টারকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। এভাবে ১১ কোটি মানুষের কাছে যদি ন্যায্য পাওনা যেত তাহলে বাংলাদেশের চেহারা আজ কী হতো? ওটা হতো টেকসই অর্থনীতি।
উন্নয়ন সাংবাদিকতা অনেকটা ইন-ডেপথ বিষয়, এখানে কাজ করার অনেক জায়গা রয়েছে! বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে তিনটি অর্থনৈতিক স্তম্ভের উপর- গার্মেন্টস, রেমিটেন্স ও কৃষি। এর মধ্যে সবচেয়ে টেকসই উন্নয়ন করা সম্ভব কৃষিতে। কিন্তু এই কৃষি বা কৃষককে আমরা কতটুকু মূল্যায়ন করছি? গার্মেন্টস যার মাধ্যমে বাংলাদেশের ৫০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে, কিছু রেমিটেন্স দেয়া ছাড়া বেশিরভাগ অর্থই যাচ্ছে এর মালিকের কাছে। এই গার্মেন্টসের বেশিরভাগ শ্রমিকরাই হলো দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান। বিদেশ থেকে যারা রেমিটেন্স পাঠায় তাদেরও মোটামুটি ৯০ ভাগই হলো গ্রামের সন্তান। তাদের টাকাটাই কৃষির সাথে সম্পর্কিত। ৫০ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিকের টাকাও এসে জুড়ে যাচ্ছে এই কৃষিতে। রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে ব্যবসায়ীদের কৃষিতে বিনিয়োগ করানোর জন্য। বিনিয়োগ করলে বাংলাদেশের চেহারাটা কেমন হতো তা বোঝা যায় নাটোরে প্রাণের বিনিয়োগের কথা চিন্তা করলে। ডাল আর মটর দানার চাষ করার মাধ্যমে তারা তাদের ভাগ্যের উন্নতি করেছে। আমের ক্ষেত্রেও তাই। গাছ থেকে পড়ে যে আম নষ্ট হচ্ছে সেগুলোকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করেছে বিশাল জুসের ফ্যাক্টরি। এরকম কত ধরনের ফসল হচ্ছে, যেগুলোতে ভ্যালু এডিশন করলে অনেক বেশি লাভ হতো কৃষকদের।
জলবায়ু পরিবর্তন এর সাথে আগামীর স্বাস্থ্য, কৃষি কিভাবে পরিবর্তন হবে এটাও দেখা উচিত আগামী দিনের উন্নয়ন সাংবাদিকদের। শুধুমাত্র ক্রাইম বিট বা পলিটিক্যাল বিট করাই সাংবাদিকতা নয়।
বৈশ্বিক গণমাধ্যমের কথা চিন্তা করলে দেখা যায় গণমাধ্যম যদি একটু একটু করে সমাজে অবদান রাখতো তাহলে এই পৃথিবীর মানুষ আরো উন্নত হতো। আর গণমাধ্যম সবচেয়ে বড় অন্যায় করছে কৃষিকে অবহেলা করে। দুর্যোগের আগে কৃষি সম্পর্কে গণমাধ্যম সচেতন হয় না। এ কারণে গণমাধ্যমকে অনেক চিন্তাশীল জায়গা থেকে কাজ করা দরকার। বিশেষ করে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে। জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি, প্রকৃতি এগুলোর দিকে চোখ রাখা উচিত। বিশেষ করে বর্তমান সময়ের তরুণ সাংবাদিকদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।
কৃষক শুধুমাত্র খাদ্য উৎপাদনের যন্ত্র নয়, তারাও রক্তমাংসের মানুষ। তাদেরও আনন্দ বিনোদনের প্রয়োজন রয়েছে। এ কারণে ধাপে ধাপে তৈরি করেছি কৃষকের ঈদ আনন্দ। ২৫-২৬ টি টেলিভিশন জুড়ে ঈদের সময় যতগুলো অনুষ্ঠান হয় সবগুলোই নগরপ্রধান। গ্রামপ্রধান বাংলাদেশে কোনো অনুষ্ঠানই কৃষকদের নিয়ে হয় না। আমরা এই ধরনের প্রোগ্রামগুলো করি কৃষকের ক্ষমতায়নের জন্য। তারা নিজেদের যেন ছোট না ভাবে। এমনকি আয়োজন করি কৃষকের ফুটবল কিংবা ক্রিকেট বিশ্বকাপ।
বেশি ফসল ফলাতে ফলাতে মাটি যেমন জরাজীর্ণ হয়ে যায়, তেমনি কৃষকও অনেক কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যেতে পারে। কৃষক এরকম নানা ধরনের অকুপেশনাল হ্যাজার্ডসের মধ্যে পড়ছে। বাংলাদেশের কৃষকরা গামবুট, গ্লাভস কিংবা মাস্ক ব্যবহার করে না। অন্যান্য উপকরণের মতো এই তিনটি জিনিস প্রতিটি কৃষকের ঘরে অবশ্যই রাখা উচিত। কারণ সে যে মাটিতে খালি পায়ে হাঁটছে সেখানে হয়তো একটু আগে সার বা কীটনাশক ছিটানো হয়েছে। হয়তো আগের দিনই তার পা কাটা গেছে কোনো কাজ করতে গিয়ে। এখন সার মেশানো পানি তার শরীরে ঢুকে পরে তার গ্যাংগ্রিন হতে পারে। সার কোম্পানিগুলোও পারতো কৃষকদের একটা করে মাস্ক দিতে। এগুলো করতে পারতো যদি মিডিয়াগুলো সচেতন হতো। বার বার হাত দিয়ে চারা বুনতে বুনতে কৃষকের হাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কৃষকের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্যও আমি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি।
আমাদের ডাক্তারদের গ্রামে পাঠাতে হবে। তারা কৃষকদের জীবনমানের উন্নয়ন করতে পারবেন। কী কী অকুপেশনাল ও সিজনাল হ্যাজার্ড সম্পর্কে সচেতন করতে পারি, সেটা ভাবা দরকার। তথ্য দিয়ে তাদের সচেতন করতে হবে। পড়াশোনা করে গ্রামে ফিরে গেলে গ্রামের মানুষের সাথে বন্ধন তৈরি হবে। এই বন্ধন এমন অটুট হয়, যে দুই বছর পর যখন গ্রাম থেকে সে ফিরে আসে, তখন সারা গ্রামের মানুষ ডাক্তারের জন্য কাঁদবে। এগুলো নিয়ে আমাদের উন্নয়ন সাংবাদিকদের কাজ করতে হবে।
দেশের অর্থনীতিতে বাজেট খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কিন্তু দেশের ১১ কোটি মানুষের মতামত না নিয়ে নীতি নির্ধারকরা বাজেট তৈরি করে। কৃষকদের কী দরকার এসম্পর্কে তারা জানেই না। তাদের কি প্রয়োজন না জেনেই একটা বাজেট দিয়ে দিলে তো সেটা ফলপ্রসূ হবে না। আগে তার কী দরকার, এটা জানার জন্য শুরু করলাম ‘কৃষি বাজেট, কৃষকের বাজেট’। এগুলো হলো পুরো একটা প্রসেস।
নগর আর গ্রামের মানুষের বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে। উৎপাদক উৎপাদন করেও দুবেলা খাবার পায় না, নগরের মানুষ কোনো অবদান না রেখেই খাবার খাচ্ছে। আজকের এই কর্পোরেট প্রজন্ম, যারা জানে না গ্রাম কী, কীভাবে খাবার আসে- তাদের অংশগ্রহণে শিকড়ের কাছে দিতে চেষ্টা করলাম ‘ফিরে চল মাটির টানে’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। বাচ্চাদের জন্য রয়েছে ‘ফিরে চল মাটির টানে, জুনিয়র’। সেখানে কৃষকরা কিভাবে টাকা আয় করে, সেই জীবনধারাকে শহরের সাথে রিলেট করতে এই আয়োজন। এভাবে দূরত্ব কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। সেখানে হয়তো যাচ্ছে তিন-চার জন ছেলে-মেয়ে, কিন্তু দেখছে হাজার হাজার মানুষ। মনের দিক থেকে সেখানে রয়েছে লাখ লাখ মানুষ। এগুলোই হলো উন্নয়ন সাংবাদিকতার বিভিন্ন ক্ষেত্র।







