অনুসন্ধানী সাংবাদিক বব উডওয়ার্ড, ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি ফাঁসের অন্যতম নায়ক। কার্ল বার্নস্টাইনের সঙ্গে মিলে যিনি পতন ঘটিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের। এবার তিনি আলোচনায় এলেন আরেক প্রেসিডেন্টের নামে বই লিখে।
‘ফিয়ার: ট্রাম্প ইন দ্য হোয়াইট হাউজ’ নামের নতুন বইটিতে বিখ্যাত এই আমেরিকান সাংবাদিক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ভেতরের বহু বিস্ফোরক তথ্য নিয়ে লিখেছেন।
এর মধ্যে একটি হচ্ছে: ট্রাম্প একবার সিরিয়ায় রাসায়নিক আক্রমণের ঘটনার পর সেদেশে হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে হত্যা করার পরিকল্পনা করছিলেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বইয়ের তীব্র নিন্দা করে একে ‘জনগণের সঙ্গে ধোঁকাবাজি’ বলে উল্লেখ করেছেন। তবুও বইটি নিয়ে ব্যাপক হৈচৈ চলছে এখন।
কিন্তু অভিযোগ তো অনেকই ওঠে, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, বইও লেখা হয় অনেক। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগও সেসব লেখায় নানা মাত্রার।
তাহলে উডওয়ার্ডের এই বই নিয়ে এত আলোচনা কেন? কেনই বা ট্রাম্প নিজেই এটা নিয়ে এত বেশি ক্ষেপেছেন?
সিরিয়াস ভাবমূর্তি > বিশ্বাসযোগ্যতা
বার্নস্টাইনসহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্য সব সাংবাদিকের তুলনায় উডওয়ার্ডকে অনেক বেশি গুরুত্বসহকারে নেয়া হয়। কারণ বিভিন্ন সরকার ও সরকারপ্রধানের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো নিয়েই কাজ করেন তিনি, তাদের ব্যক্তিগত রোমান্টিকতা বা কেলেঙ্কারি নিয়ে না।
শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্বজুড়েই উডওয়ার্ডের একটা সুখ্যাতি আর বিশ্বাসযোগ্যতা রয়েছে। তাই তিনি যা দাবি করবেন, তা খোদ প্রেসিডেন্ট উড়িয়ে দিলেও মানুষের মন থেকে উড়ে যেতে চায় না। তাই আসাদ হত্যা পরিকল্পনাসহ বইয়ে করা অন্যান্য দাবিগুলো ট্রাম্প অস্বীকার করলেও ভুলে যাওয়াটা এত সহজ নয়।
শক্তিশালী সূত্রের ভাণ্ডার
বব উডওয়ার্ড হচ্ছেন সেই সাংবাদিক – যিনি ওয়াটারগেট কেলেংকারি ফাঁস করে ১৯৭০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের পতন ডেকে এনেছিলেন। ওয়াশিংটনে ক্ষমতার কেন্দ্রে এমন সব লোকদের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা – যে কোথায় কি ঘটছে তার কিছুই তার অজানা থাকে না।
উডওয়ার্ড জানান, ‘ফিয়ার: ট্রাম্প ইন দ্য হোয়াইট হাউজ’ বইয়ে তিনি এমন সব লোকদের কাছ থেকে তথ্য পেয়েছেন যারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে প্রতিনিয়ত কথা বলেছেন, এবং উল্লিখিত বৈঠকগুলোতে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন।
নানামুখি বিচরণ
বব উডওয়ার্ডের বিশ্বাসযোগ্যতা নানামুখি। প্রেসিডেন্ট সংশ্লিষ্ট ঘটনা ছাড়াও তিনি মার্কিন প্রশাসন ও সরকারের বিভিন্ন উইংয়ের ভালোমন্দ নিয়ে গবেষণা করেছেন, বিশ্লেষণ করেছেন এবং তারপর বিস্তারিত তথ্য-প্রমাণসহ বই লিখে তা ফাঁস করেছেন।
নিক্সনের ঘটনার ওপর লেখা বেস্টসেলার ‘অল দ্য প্রেসিডেন্ট’স মেন অ্যান্ড দ্য ফাইনাল ডেজ’-এর পর আসে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের ওপর লেখা ‘দ্য ব্রেদরেন’। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত ‘ভেইল’-এ সিআইএ’র সব গোপন লড়াই নিয়ে আলোচনা রয়েছে। ‘দ্য কমান্ডার্স’ বইয়ে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে পেন্টাগনের কর্মকাণ্ডের ওপর ফোকাস করা হয়েছিল। আর অ্যালান গ্রিনস্প্যানের জীবনী খতিয়ে দেখা হয়েছে ফেডারেল রিজার্ভের জটিল দুর্বোধ্য জগতটাকে।
উডওয়ার্ডের লেখা বইগুলোতে লক্ষণীয় বিষয় হলো, সবচেয়ে গুরুত্ববহ আর জ্বলজ্বলে অংশগুলো সাধারণত আসে খুবই উচ্চ পর্যায়ের সূত্রদের কাছ থেকে। ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর লেখা বই ফিয়ারের ক্ষেত্রেও এটি সত্যি।
এ বইয়ে বলা হয়েছে, চিফ অব স্টাফ জন কেলি নিজেই ট্রাম্পশাসিত হোয়াইট হাউজকে ‘ক্রেজিটাউন’ বা উন্মাদের আখড়া বলে অভিহিত করেছেন। আবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস ম্যাটিস নাকি ট্রাম্পকে পঞ্চম বা ষষ্ঠ শ্রেণি পড়ুয়া ১০ বছর বয়সী শিশুর সঙ্গে তুলনা করে উপহাস করেছেন।
বই প্রকাশের পর ম্যাটিস এ দাবি ডাহা অস্বীকার গেছেন। অন্যদিকে কেলি বলেছেন, প্রেসিডেন্টকে কখনোই ‘মুর্খ’ বলে ডাকেননি তিনি।
কিন্তু বিশ্বাসযোগ্যতার মাপকাঠিতে জনগণ কাকে বিশ্বাস করবে? কথা বলে নানা সময় কথা ঘোরানো রাজনীতিকদের, নাকি আমেরিকার অন্যতম বিশ্বস্ত সাংবাদিককে?
গুজব এড়ানোয় উডওয়ার্ডের সুখ্যাতি, ট্রাম্পের জন্য বিপদ
তবে ওয়াশিংটনের ভেতরের খবর রাখেন বলে যে সবকিছু নিয়েই উডওয়ার্ড লেখেন তা কিন্তু নয়। তিনি লেখেন বেছে বেছে, যেগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় শুধু সেগুলো নিয়ে। হোয়াইট হাউজের দৈনন্দিন জীবনে কী কী ঘটল, কত রকম গুজব আর বিতর্ক ছড়ালো, সবকিছুতে কান দেন না তিনি।
আর তারই প্রমাণ তার টুইটার অ্যাকাউন্ট। ২০১৩ সালে এই যোগাযোগ মাধ্যমে যুক্ত হওয়ার পর থেকে উডওয়ার্ড মাত্র ৯৩টা পোস্ট দিয়েছেন, যার সবই খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটাও তার লেখার কঠোরতা এবং সংযমের পরিচায়ক। অর্থাৎ উডওয়ার্ড ফালতু কথা লেখেন না।
প্রত্যেকটির দাবির পক্ষে যুক্তি-প্রমাণ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন উডওয়ার্ড তার বইয়ে। আগের লেখা বইগুলোতে তিনি এমনভাবে তথ্য-প্রমাণ যোগ করেছেন যে সেগুলো আমেরিকান ঐতিহাসিক দলিলাদির অংশ হয়ে উঠেছে। চাইলেই কি ট্রাম্প এই খ্যাতনামা সাংবাদিকের বিশ্বস্ততাকে উড়িয়ে দিতে পারেন?
ট্রাম্প প্রশাসন সম্পর্কে বাশার আল আসাদকে হত্যার পরিকল্পনার পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রুশ সংশ্লিষ্টতা ও ট্রাম্পের সঙ্গে যোগসূত্র, নর্থ আমেরিকান ফ্রি ট্রেড চুক্তি ও সাউথ কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেয়ার সিদ্ধান্ত ঠেকাতে প্রেসিডেন্টের ডেস্ক থেকে উপদেষ্টাদের দলিলাদি চুরি, ট্রাম্পের বদমেজাজের উদাহরণসহ তাকে নিয়ে হোয়াইট হাউজ সংশ্লিষ্টদের মন্তব্য – এ সবকিছু বব উডওয়ার্ডের বইয়ের মাধ্যমে উঠে আসায় তা যেন আরও বেশি বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়েছে।
আর এ কারণেই উডওয়ার্ডের এই বইয়ের আঘাত ট্রাম্পের রাষ্ট্রপতিত্ব ও প্রশাসনের অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।







