ঈদের সময় যেমন চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তরা শরীরের যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাননি, তেমনি ঈদকে উপলক্ষ করে থেমে থাকেনি চিকুনগুনিয়া ছড়ানো মশারা। ঈদের আগে যেমন তারা ডিম পেড়েছে ঠিক তেমনি ঈদের মধ্যে ও পরেও অব্যাহত রয়েছে বংশ বিস্তার কার্যক্রম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃষ্টির কারণে মশার ডিম পাড়ার এক সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে যে কারণে বেড়েছে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। শহরকেন্দ্রিক এ রোগটির প্রাদুর্ভাব রাজধানী ঢাকায় সবচেয়ে বেশি। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা শীতকাল না আসা পর্যন্ত মুক্তি চিকুনগুনিয়া থেকে মিলবে না।
একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে কর্মরত সাইফ চিকুনগুনিয়া নিয়ে তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। রোজার শেষদিকে আক্রান্ত হন চিকুনগুনিয়ায়। তাই এবারের ঈদটাও করা হয়নি ভালভাবে। পরিবার ও স্বজনরা তার কাছে থাকলেও শারীরিক দুর্বলতার কারণে বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেননি। চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম দিন জ্বর অাসে ১০৫ ডিগ্রী। সারা শরীরে অসহ্য ব্যথা। সেই সঙ্গে দেখা যায় র্যাশ।
‘রাতে ঘুমাতে পারতাম না। দাঁতের মাড়ি ফুলে যাওয়ায় কোন খাবারও খেতে পারতাম না। শুধু আম আর লেবুর শরবত খেলে ভালো লাগতো। প্রথম তিনদিন জ্বরের প্রকোপ এতটাই ছিল যে সে দিনগুলো আমার স্মৃতিতে নেই।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন এবং মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ্ চ্যানেল আই অনলাইনকে জানান, মূলত পানি জমাট বেঁধে থাকায় মশারা ডিম পাড়ছে যত্রতত্র যে কারণে রোগটি ছড়াচ্ছে। সম্পূর্ণভাবে মশা নিধন না করা পর্যন্ত এ রোগ চলতেই থাকবে। আর তাই প্রয়োজন সচেতনতা।
চিকুনগুনিয়ার মশা দিনের আলোতে কামড়ায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, দিনের বেলা যাতে কোনভাবেই মশা কামড়াতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সেক্ষেত্রে দিনে ঘুমানোর অভ্যাস থাকলে অবশ্যই মশারি টাঙিয়ে ঘুমাতে হবে। নিজের আশপাশ, বাড়ির আনাচে কানাচে, বাসার গাছের ফুলের টব এগুলো পরিষ্কার রাখলে সহজেই এ রোগ থেকে বাঁচা সম্ভব।
এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির এক সপ্তাহ থেকে শুরু করে টানা দেড় থেকে দুই মাস শরীরে ব্যথা অনুভব করতে পারেন বলে জানান ডা. আব্তদুল্লাহ।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ নগরীর অন্যান্য হাসপাতালে এ রোগে চিকিৎসা নেয়া রোগীর সংখ্যা অনেক।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, গত এক মাসে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তের চিত্রটা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। এসময় তারা প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ জন রোগীকে দেখেছেন। এ রোগে পরিবারের একজন আক্রান্ত হলে তা থেকে আক্রান্ত হচ্ছেন অন্যরাও। হাসপাতালে রোগীর সঙ্গে আসা স্বজনরাও আক্রান্ত হচ্ছেন।
তবে এ রোগের আলাদা কোন চিকিৎসা না থাকায় ভাইরাস জ্বরের মতো প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ সেই সঙ্গে প্রচুর পরিমাণ শরবত ও তরল জাতীয় খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকারা।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট (আই ই ডি সি আর) এর তথ্য অনুযায়ী, ভাইরাসজনিত জ্বর চিকুনগুনিয়া যা মশার কামড়ের মাধ্যমে এক ব্যক্তি থেকে অপর ব্যক্তিতে ছড়ায়। ডেঙ্গু এবং জিকার মতোই এডিস প্রজাতির মশার কামড়ে ছড়ায় চিকুনগুনিয়া।
১৯৫২ সালে আফ্রিকায় রোগটি প্রথম ধরা পড়ে। পরে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ– ভারত, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার এবং ইন্দোনেশিয়াতে এর বিস্তার দেখা যায়। ২০০৮ সালে বাংলাদেশে প্রথম রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়, পরবর্তীতে ২০১১ সালে ঢাকার
দোহার উপজেলায়। তবে এরপর বিচ্ছিন্ন দুয়েকজন রোগী ছাড়া এ রোগের বড় ধরনের কোন বিস্তার আর বাংলাদেশে লক্ষ্য করা যায়নি।
বর্ষাকালে বা পরবর্তী সময়ে যখন মশার উপদ্রব বেশি হয় তখন এ রোগের বিস্তার বেশি ঘটে। চিকুনগুনিয়া ভাইরাস টোগা ভাইরাস গোত্রের। মশাবাহিত হওয়ার কারণে একে আরবো ভাইরাসও বলে। ডেঙ্গু ও জিকা ভাইরাসও একই মশার মাধ্যমে ছাড়ায় এবং প্রায় একইরকম রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। লক্ষণগুলো হল: হঠাৎ জ্বর আসার সঙ্গে গিঁটে গিঁটে প্রচণ্ড ব্যথা, প্রচণ্ড মাথা ব্যথা, বমি বমি ভাব, চামড়ায় লালচে দানা, মাংসপেশীতে ব্যথা।
প্রাথমিকভাবে চিকুনগুনিয়া ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত এডিস ইজিপ্টাই অথবা এডিস অ্যালবুপিক্টাস মশার কামড়ের মাধ্যমে রোগটি ছড়ায়। এ ধরনের মশা সাধারণত দিনের বেলা (ভোর বেলা অথবা সন্ধ্যার সময়) কামড়ায়। এ ছাড়াও চিকুনগুনিয়া ভাইরাস আক্রান্ত রক্তদাতার রক্ত গ্রহণ করলে এবং ল্যাবরেটরিতে নমুনা পরীক্ষার সময় অসাবধানতাবশত এ রোগ ছড়াতে পারে।
আশার কথা শুনিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতকাল এলে চিকুনগুনিয়া থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। তবে বর্ষাকালে একটানা তিন থেকে চারদিন বৃষ্টি হলেও এই রোগের প্রকোপ অনেকটা কমে আসবে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।








