মাদকবিরোধী অভিযানে র্যাব ও পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে গত কয়েকদিন ধরে সারাদেশে প্রায় ৪০ জন মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ বিষয়টি বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একপক্ষ এই বন্দুকযুদ্ধকে সাধুবাদ জানিয়েছে, বিপরীত পক্ষ বলছে বিচারের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল যার ফলে মাদকের সাথে জড়িত গ্যাংদের সম্বন্ধে তথ্য উপাত্ত জানা যেত। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মাদক বিরোধী এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। কারণ, মাদক ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট কাউকেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। বিষয়টি অত্যন্ত ইতিবাচক তবে পাশাপাশি নিরীহ কেউ যেন এ অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
মাদক একটি ভয়ানক মরণব্যাধি এবং এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সকলেই অবগত। কিন্তু তারপরেও সমাজের এক শ্রেণির মানুষ মাদক সেবন, মাদক পাচার, মাদক বাজারজাতকরণ ও তৎসংশ্লিষ্ট কাজে জড়িত। মাদকের ভয়াবহ পরিণতির ফলে সামাজিক অনাচার, নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা, পারিবারিক অশান্তি ও ভয়াবহ অপরাধের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা ক্রম-বর্ধমান হারে মাদকের সাথে জড়িয়ে পড়ছে।বাংলাদেশে মাদকের সংস্কৃতি বেশ পুরনো। মরণঘাতক মাদক শেষ করে দিয়েছে অনেক সম্ভাবনাময় তরুণের আকাঙ্খিত ভবিষ্যৎ যাত্রাকে। ফেনসিডিলের পরে বাংলাদেশে মাদকের নতুন সংযোজন হচ্ছে ইয়াবা। ইয়াবার সংস্কৃতিতে প্রজন্মের অবনতি সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রকট আকারে দেখা দিচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক, ভেঙ্গে যাচ্ছে পারিবারিক বন্ধন, ছেলেমেয়েরা জড়িয়ে পড়ছে সমাজবিরোধী কর্মকান্ডে।এমনও দেখা যাচ্ছে, ইয়াবাসেবী হয়ে ছেলেমেয়েরা বাবা-মায়ের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, ঐশীর ঘটনাও আমাদেরকে হতচকিত করে তোলে। এর থেকে দ্রুত পরিত্রাণের জন্য এখন থেকেই প্রচেষ্টা চালাতে হবে তা না হলে ভবিষ্যতের সুস্থ সমাজ বিনির্মাণ করা বাঙালি জাতির জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে।
সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ইয়াবার বাণিজ্য শীর্ষক লিড নিউজ ছাপা হয়। নিউজের তথ্য উপাত্ত রীতিমতো চমকে উঠার মতই (ইয়াবা বিস্তারের ভয়াবহতা)। মাদক ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যে বাংলাদেশে তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক স্থাপন করে ফেলেছে এবং তাদের টার্গেট বর্তমান প্রজন্ম। বাংলাদেশের সরকার প্রধান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। কিন্তু তারপরেও মাদকের চক্রের কাছে আমরা অসহায় এবং এর মূল কারণ হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে মাদকের সাথে সংশ্লিষ্টরা এ দেশে তাদের বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে এবং তাদের সাথে রাঘববোয়ালরাও জড়িত রয়েছে। তাই খুব সহজেই হয়তো মাদকের সম্প্রসারণ রোধ করা সম্ভব নয় তবে সঠিকভাবে পলিসি প্রণয়ন করতে পারলে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ সম্ভবপর হবে নতুবা মাদকে ছয়লাভ হয়ে যাবে যুবসমাজ, বিনষ্ট হবে সার্বিক উন্নতি, ব্যাহত হবে সামগ্রিক অগ্রযাত্রায়। সামাজিক অবক্ষয় দেখা দিবে সর্বত্র, নষ্ট হবে সামাজিক সম্প্রীতি, ফিকে হয়ে উঠবে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন।
আশার কথা হচ্ছে, প্রায়শই সংবাদপত্রে মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচালিত অভিযানের নিউজ দেখতে পাই।আমাদের পুলিশ বাহিনী মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার তবে জাতিসংঘের তথ্য মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে পরিমাণ মাদক উদ্ধার করে তার পরিমাণ মোট মাদকের ১০ শতাংশ। বাকি ৯০ শতাংশ ঠিকই কোন না কোনভাবে তরুণ সমাজের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর ৪০ কোটি পিস ইয়াবা বিক্রি হচ্ছে যার বাজারমূল্য ছয় হাজার কোটি টাকা মাত্র (প্রতি পিস ইয়াবা দেড়শ টাকা হিসেবে)। যা বিজিবির বার্ষিক বাজেটের প্রায় দ্বিগুণ এবং বাংলাদেশের পুলিশের বার্ষিক বাজেটের অর্ধেক। এ বিশাল অংকের টাকা যদি কোন উৎপাদনশীল সেক্টরে ব্যবহার করা হয় তাহলে দেশের অর্থনীতির চাকা আরো বেশি সচল হবে, কিন্তু উল্টো মাদকের কারণে এ বিশাল অংকের টাকা অপচয় হচ্ছে, তরুণ মাদকসেবীরা নিমজ্জিত হচ্ছে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
বাংলাদেশে সাধারণত মায়ানমার থেকে ইয়াবা আসে। বেশ কিছুদিন আগে পুলিশের আইজিপিও বলেছেন: ইয়াবা আসছে প্রতিবেশি দেশ থেকে।তিনি আরো উল্লেখ করেন, পুলিশের একার পক্ষে কখনোই মাদক নিবারণ করা সম্ভব নয়।জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, দক্ষিণ এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বেশির ভাগ দেশে ইয়াবা সরবরাহ করে মিয়ানমার। ২০০৬ সাল থেকে মায়ানমার থেকে ইয়াবা আসা শুরু হয়েছে বাংলাদেশে।এখনও চলমান এবং দিন দিন ইয়াবা পাচারের অনুপাতও বাড়ছে।সীমান্তের ১৫টি পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে মায়ানমার থেকে ইয়াবা পাচার হয়। এমন অভিযোগও পাওয়া গিয়েছে, মায়ানমারের সেনাবাহিনী ইয়াবা উৎপাদন ও পাচারের সাথে জড়িত। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ করা হলেও মিয়ানমারের পক্ষ হতে কোন ধরনের সদুত্তর পাওয়া যায়নি। সীমান্তের কাছাকাছি অনেক পয়েন্টে মায়ানামারে ইয়াবার কারখানা রয়েছে। ইয়াবার চালান বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে পেরিয়ে শহর ও গ্রামে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে ইয়াবা পাচারকারী ও ইয়াবাসেবীদের সহায়তায়।
২০০৮ এর তুলনায় ২০১৬ সালে ইয়াবার ব্যবহার শতকরা ৮০ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৫ থেকে ২০১৬ সনে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে ৪৬ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশে মাদকসেবীর সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখের কাছাকাছি এবং এর মধ্যে ৬৩.২৫ শতাংশ মাদকসেবীর বয়স ১৫ বছরের বেশি। অর্থাৎ প্রতি ১৭ জনে একজন তরুণ মাদকাসক্ত বলে ধরে নেওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট তথ্য অত্যন্ত ভয়াবহ বার্তা নিয়ে আসছে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য। কারণ তরুণরা নেশায় মজ্জাগত হয়ে উঠলে বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন কখনোই সম্ভব হবে না। যেভাবে ইয়াবা পাচারের আনুপাতিক হার বৃদ্ধি পাচ্ছে, তার রোধ কল্পে বাস্তবধর্মী ও তড়িৎ পদক্ষেপ গ্রহণ না করার কারণেই বাংলাদেশে ইয়াবার বিস্তার রোধ করা সম্ভবপর হচ্ছে না বলে বিশেষজ্ঞদের মত।
ইয়াবা পাচারের সাথে একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত এবং প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে প্রতিনিয়ত ইয়াবা দেশে আসছে। সংঘবদ্ধ চক্রের মূলোৎপাটন ব্যতীত বাংলাদেশে ইয়াবা পাচার তথা বাজারজাতকরণ বন্ধ করা কখনোই সম্ভব হবে না। ইয়াবা পাচার এবং বাজারজাতকরণে প্রভাবশালী অনেক ব্যবসায়ীরাও জড়িত থাকতে পারে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা প্রমানিত হয়েছে। বিষয়টা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা উচিত। কারণ, ইয়াবার ব্যবসা অত্যন্ত লাভজনক এবং বাংলাদেশে এর চাহিদা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে। পুলিশের কাছে ধরা পড়া অনেক ইয়াবা ব্যবসায়ীর ব্যাংক হিসাবের পরিমাণ আঁতকে উঠার মতই। সম্প্রতি জানা যায়, পুলিশের গুলিতে নিহত মাদক ব্যবসায়ীর ব্যাংকে জমাকৃত টাকার পরিমাণ ১১১ কোটি টাকা। অনেক ব্যবসায়ী এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
নতুন প্রজন্ম কেন ইয়াবার দিকে ধাবিত হচ্ছে? একটা সময় দেখা যেত ধনী পরিবারের ছেলেমেয়েরা ইয়াবার সাথে সংযুক্ত ছিল, এখন সব পরিবারের ছেলেমেয়েরা ইয়াবার সাথে জড়িয়ে পড়ছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো: পূর্বের তুলনায় ইয়াবার দাম কম এবং সহজেই হাতের নাগালেই ইয়াবার সরবরাহ পাওয়া যায়। তাছাড়া আরো বেশ কিছু কারণ উল্লেখ করা যেতে পারে।প্রথমত: পিয়ার গ্রুপের প্ররোচনায় ছেলেমেয়েরা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। দ্বিতীয়ত: নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি প্রাকৃতিক আকর্ষণ কাজ করে থাকে। তৃতীয়ত: নেশা জাতীয় দ্রব্যের সহজলভ্যতা। চতুর্থত: দামে সস্তা হওয়ায় তরুণরা মাদকদ্রব্য হিসেবে ইয়াবার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। পঞ্চমত: বিশ্বায়নের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিকতার জৌলুসে নব্য প্রজন্মরা মাদকের দিকে ঝুঁকছে। শেষত: ইয়াবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণকারী দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মদক্ষতা তুলনামূলকভাবে কম থাকায় ইয়াবার সাথে সংযুক্তরা বারংবার এ ধরনের গর্হিত কাজ করেও রেহাই পেয়ে যাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত বিভিন্ন জায়গায় ইয়াবার চালানসহ ব্যবসায়ীদেরকে ধরে আইনের নিকট সোপর্দ করছে। সম্প্রতি পাওয়া তথ্যানুসারে জানা যায়, গত ৫ বছরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ২ লাখ ৮৭ হাজার ২৫৪ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারেরও সংখ্যা অনেক। কিন্তু তারপরেও মাদকের ভয়াবহতা থেকে দেশকে রক্ষা করা যাচ্ছে না। মাদকের ছোবলে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে আমাদের ভবিষ্যৎ কর্ণধাররা। এ অবস্থা চলতে থাকলে তরুণ প্রজন্মকে কোনভাবেই নেশার ভয়াবহতাকে থেকে দূরে রাখা যাবে না। তাই সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের জন্য মাদকমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অভিভাবকদেরকেও এ ব্যাপারে বিশেষভাবে সচেতন হতে হবে, ছেলেমেয়েরা কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে ইত্যাদি বিষয়ে সম্যক ধারণা প্রত্যেক অভিভাবককেই রাখতে হবে সন্তানদের স্বার্থেই। ইয়াবার সংস্কৃতি থেকে রাষ্ট্রকে বেরিয়ে আসতে হবে, বেরিয়ে আসার জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে। তা না হলে ভবিষ্যতের অগ্রযাত্রার পথ রুদ্ধ হয়ে পড়বে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








