ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার নিয়ে নানামুখি আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএমে ভোটগ্রহণের বিধান রেখে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের পদক্ষেপ নেওয়ার পর থেকেই এই বিতর্কের সূত্রপাত।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের শরিক দলগুলো ছাড়া আর কেউই এখনই নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহারের পক্ষপাতি নয়। এমনকি একদিকে সরকারের শরিক এবং অন্যদিকে জাতীয় সংসদের বিরোধীদল জাতীয় পার্টিও ইভিএমকে এখনই সমর্থন করছে না।
কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই এই মতভেদ নয়, খোদ নির্বাচন কমিশনেও এনিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। পাঁচ সদস্যের নির্বাচন কমিশনের একজন কমিশনার ইতোমধ্যেই এর বিরোধিতা করেছেন প্রকাশ্যে। ইভিএমের বিরোধিতায় কমিশনের বৈঠক পর্যন্ত বর্জন করেছেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার গত ৩০ আগস্টের ইসির বৈঠকে ইভিএম নিয়ে লিখিত আপত্তি (নোট অব ডিসেন্ট) দিয়ে সভাত্যাগ করেছেন। এনিয়ে কথা বলেছেন গণমাধ্যমের সঙ্গেও। মাহবুব তালুকদারের দাবি ইসির রোডম্যাপে ইভিএম নিয়ে কিছু ছিল না। তিনি বলেছেন, আমি তিনটি কারণে আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিরুদ্ধে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছি। কারণগুলো হলো অধিকাংশ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ইভিএম ব্যবহারের বিরুদ্ধে; ইভিএম ব্যবহারের জন্য কমিশন যাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে তা অপর্যাপ্ত, জাতীয় নির্বাচনে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে যে সময়ের দরকার হবে তা আমাদের হাতে নেই; এবং ইভিএম ব্যবহারে ভোটারদের মধ্যে অনীহা রয়েছে। তাদের মধ্যে অভ্যাস গড়ে ওঠেনি। এজন্য আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করাটা ঠিক হবে না।
এটা সকলের জানা যে, ইসি পাঁচ সদস্যের। একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এবং চারজন কমিশনারের সমন্বয়ে ইসি গঠিত। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় গণতান্ত্রিক রীতি অবলম্বন করতে সাধারণত বেজোড় সংখ্যক সদস্য রাখা হয়। ফলে এটা ধারণা করাই যায় ইসি কিংবা যেকোনো প্রতিষ্ঠানে এমন থাকলে সেখানে সকলের মতামতের গুরুত্ব আছে-থাকে, এবং সংখ্যাধিক্যের মতামতেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়ে থাকে। কিন্তু কমিশনার মাহবুব তালুকদার যা করলেন সেটা ইসির বৈঠককে অগ্রাহ্য করার নামান্তর। তিনি গণতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বন করে লিখিত আপত্তি দিয়েছেন ঠিক, সভা বর্জন করেছেন সেটাও ঠিক, তবে এই সভা বর্জন শেষে এভাবে গণমাধ্যমকে বিষয়টি উল্লেখের পর এনিয়ে তাঁর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে না চাইলেও এই বিষয়টি রাজনৈতিক প্রচারণার উপকরণ হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই।
কমিশনার মাহবুব তালুকদারের এই সভা বর্জন, লিখিত আপত্তি এবং সাংবাদিকদের নিজের অবস্থান নিয়ে ব্রিফ করাকে স্রেফ গণতান্ত্রিক পন্থা হিসেবে বিবেচনা করছেন অনেকেই। এমনকি এটাকে ‘গণতন্ত্রের বিউটি’ বলেও মন্তব্য করেছেন ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তাঁর এই সভা বর্জনকে সম্মান করেছেন সিইসি কেএম নুরুল হুদা। আমরাও একে এভাবে দেখতে চাই, দেখছি; তবে একই সঙ্গে তাঁর প্রতি বিনীত প্রশ্ন রাখছি এর মাধ্যমে তিনি কি নির্বাচন কমিশনকেই অগ্রাহ্য করলেন না? কারণ সভায় এনিয়ে উপস্থিত থেকে নিজে কথা বলতে পারতেন, যুক্তি উপস্থাপন করতে পারতেন, তাঁর যুক্তি শক্ত হলে অন্যেরা সেটাকে গ্রহণ করলেও করতে পারত। ওটাই হতো প্রকৃত গণতান্ত্রিক সৌন্দর্য। পাবলিক প্লেসে কথা বলার চাইতে নিশ্চয়ই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের একজন সদস্য হিসেবে সেই প্রতিষ্ঠানের অন্যদের তিনি প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারতেন। সেখানে ব্যর্থ হলে পরে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন। এতে করে তাঁর লড়াইটা আরও সুন্দর হতো। কিন্তু তিনি সেটা না করে কমিশনের বাইরে কমিশনকে নিয়ে এসেছেন। এতে নির্বাচন কমিশনকে কি প্রশ্নবিদ্ধ করা হলো না?
নির্বাচন কমিশনারের এই সভা ত্যাগকে ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক রঙ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক গঠিত সার্চ কমিটিতে মাহবুব তালুকদারের নাম বিএনপি প্রস্তাব করেছিল বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ এই নেতা। অর্থাৎ সরকারও এটা নিয়ে রাজনীতির আগ্রহ দেখাচ্ছে। অথচ এই ধরনের রাজনীতি সাংবিধানিক এক প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্যে যে যথেষ্ট সেটা একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর অনুধাবন না করার কথা না। মন্ত্রীর এই বক্তব্যে একজন কমিশনারকে বিএনপি ঘেঁষা প্রমাণ করে প্রশ্নবিদ্ধ করতে গিয়ে অন্য চারজনকে সরকার ঘেঁষা কি প্রমাণ করা হয় না? অথচ সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানকে আমরা আওয়ামী লীগপন্থী কিংবা বিএনপিপন্থী অথবা অন্য যেকোনো পন্থী হিসেবে দেখতে প্রস্তুত না।
বহুল আলোচনায় থাকা এই ইভিএমের মাধ্যমে ‘ডিজিটাল কারচুপি’ করতে চায় আওয়ামী লীগ- এমন অভিযোগ বিএনপির। পৃথিবীর উন্নত বিভিন্ন দেশ ইভিএম ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এমন মন্তব্যের জবাবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, পৃথিবীর ৯০ ভাগ গণতান্ত্রিক দেশে ই-ভোটিং, ইভিএম, ডিভিএম পদ্ধতি চালু নেই। হাতেগোনা যে কয়টি দেশ এই পদ্ধতি চালু করেছিল, প্রচণ্ড সন্দেহ ও বিতর্কের পর তারা এটি থেকে সরে এসেছে।
ইভিএম সম্পর্কে বর্ণনা ও সুরক্ষার বিষয়ে বলা হচ্ছে, এটি কম্পিউটার বা ইন্টারনেট বা অন্য কোনো নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত নয় ও হ্যাক করা সম্ভব নয়। জাল বা কারচুপি প্রতিরোধে ইলেকট্রনিকভাবে সুরক্ষিত। এ মেশিনে কন্ট্রোল ইউনিটের কোনো রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি (আরএফ) রিসিভার ও ডাটা ডিকোডার নেই। ফলে হ্যাকের যে শঙ্কার কথা বলা হচ্ছে সেটা নেই।
বাংলাদেশে ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ আগে হয়নি এমন না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে কয়েকটি কেন্দ্রে ইভিএমের ব্যবহার হয়েছিল। বিস্তৃত পরিসরে সেটা হয় নি। সদ্য সমাপ্ত সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দুইটি কেন্দ্রে ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ হয়। এবং সেই দুই কেন্দ্রে বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হন। সেখানে কোনোরূপ কারচুপির অভিযোগ ওঠেনি।
এমনকি বিএনপির স্থানীয় নেতারা নির্বাচনের আগে নির্দিষ্ট কয়েকটি কেন্দ্রে ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণের লিখিত আবেদনও করেছিলেন নির্বাচন কমিশনে। সিলেটের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কিছু কেন্দ্রে ইভিএম বিএনপির দাবি ছিল, এবং তারা সে দাবি জানিয়েছিল ইভিএমে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে সে বিশ্বাস থেকেই। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় বিএনপি পুরোপুরি ইভিএমের বিপক্ষেই।
একাদশ সংসদ নির্বাচন ইভিএমে হবে এমন কোন সিদ্ধান্ত এখনও নেয়নি নির্বাচন কমিশন। আরপিও সংশোধন বিষয়ক ঘটনাবহুল সেই সভা শেষে সিইসি কেএম নুরুল হুদা বলেছেন, সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে, পরিস্থিতি কিন্তু সে রকম নয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচন ভালো ফল পেয়েছি। প্রয়োজনে যাতে সংসদ নির্বাচন তা ব্যবহার করা যায়, সে প্রস্তুতি নিতেই আমরা আইন সংশোধনের প্রস্তাব করেছি। রাজনীতিবিদেরা সম্মতি দিলে ইভিএম ব্যবহার করা হবে।
সিইসির বক্তব্যেই পরিস্কার এখনই ইভিএমে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়নি। নির্বাচন কমিশন একটা ব্যবস্থা রাখছে। এবং সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে রাজনীতিবিদেরা সম্মতি দিলেই। তবে এই আলোচনা যতখানি হচ্ছে তারচেয়ে বেশি পাশ কাটিয়ে যাওয়া হচ্ছে ব্যবহারের সিদ্ধান্তের বিষয়টিই।
এই সময়ে বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তিতে অনেকখানি এগিয়ে আছে, এগিয়ে যাচ্ছে। ভোটিং সিস্টেমেও ক্রমান্বয়ে এবং তাড়াহুড়ো না করে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে আপত্তির কিছু থাকার কথা নয়; এবং সেটাই কাঙ্ক্ষিত। সকল নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহারের সুযোগ থাকলে আস্তে আস্তে প্রযুক্তিবান্ধব হয়ে ওঠবে দেশের সবাই। এখন যেভাবে সবাই হুজুগে এবং স্রেফ রাজনৈতিক ঢঙয়ে বিরোধিতা করছে সময়ের সাথে সাথে সেটাও কমে আসবে বলেই বিশ্বাস করি। ইভিএম নিয়ে তাই এভাবে সরাসরি বিরোধিতা না করে একে কীভাবে সঠিকভাবে আগামিতে ব্যবহার করা যায় এনিয়েই আলোচনা জরুরি।
ইভিএম নিয়ে চলমান আলোচনার সময়ে সবচেয়ে প্রভাববিস্তারকারী মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিসমটেক সম্মেলন শেষে দেশে ফেরার পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তাঁর মন্তব্য ছিল, ‘তাড়াহুড়ো করে ইভিএম চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না’।
প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পর নির্বাচন কমিশনও আপাতত সরে এসেছে তাড়াহুড়ো থেকে। প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের পরের দিন সিইসির মন্তব্য ছিল সরকার চাইলে ইভিএম ব্যবহার হতে পারে। নির্বাচন কমিশনের দিকে ঠেলে দেওয়া বলকে ফের সিইসি ঠেলে দিলেন সরকারের দিকে, অথচ এটা নিয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নিলে সবচেয়ে বেশি বিতর্কই হবে। কারণ সরকারের প্রতি পদক্ষেপকেই সরকারবিরোধিরা বাঁকা চোখে দেখে আসছে।
ইভিএম নিয়ে আলোচনা কিংবা ইভিএমের মাধ্যমে সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণের যে উদ্যোগ এবং হুট করে এটা বাস্তবায়নের যে গতি সঞ্চার হয়েছিল তাতে রাশ টেনে ধরা উচিত। ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হলে কারচুপির সত্য-মিথ্যা সম্বলিত যে শঙ্কা ওড়ছে বাতাসে সেটা আরও শক্তিশালি হবে। বিতর্ক এড়াতে তাই ইভিএম নিয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে ‘ধীরে চলো’ নীতি অনুসরণ করতে হবে, এবং সেটাই হবে সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








