বায়ার্ন মিউনিখ থেকে আর্তুরো ভিদালকে সই করানোর পর থেকেই বিভিন্ন দিক থেকে সমালোচনার তীরে বিদ্ধ বার্সেলোনা। এর কিছুটা ন্যায্য এবং কিছুটা আবার অন্যায্য। রোমার নাকের ডগা থেকে ম্যালকমকে যেভাবে ছোঁ মেরে নিয়েছিল, ঠিক একইভাবে ইন্টার মিলানের মুখ থেকে ভিদালকে কেড়ে নিয়েছে বার্সেলোনা।
কাজটা যেভাবে হয়েছে, সেটাকে নেতিবাচকভাবেই দেখছেন অনেকে। এই পক্ষীয়রা বলছেন, পুরনো ইতিহাস আর ব্র্যান্ডভ্যালুর বিচারে বার্সেলোনার সঙ্গে এই দৃশ্য কোনোভাবেই মিলছে না।
৩১ বছরের ভিদালের জন্য ২০ মিলিয়ন ইউরো খরচ করেছে বার্সেলোনা। তার উপর দীর্ঘ চার মাসের ইনজুরি থেকে সদ্যই ফিরেছেন তিনি। তাছাড়া চিলিয়ান তারকা বায়ার্নের হয়ে গত মৌসুমে ১৫ ম্যাচ মিস করেন, তার শারীরিক অবস্থা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। ঘনঘন ইনজুরির কারণে অনেকে তাকে ‘ইনজুরির রাজাও’ বলে থাকেন। তবে দেশ ও ক্লাবের হয়ে গত পাঁচ বছর তার ভূমিকাও নজরের বাইরে যেতে পারে না।
সফল হয়েও এই মৌসুমে বার্সেলোনা ছেড়েছেন পাউলিনহো। ব্রাজিলিয়ান তারকার সরাসরি বিকল্প খুঁজছিলেন কোচ আর্নেস্টো ভালভার্দে। দক্ষতার বিচারে ভিদাল হলেন ‘অবিকল’ সেই বিকল্প বা কিছু ক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি পরিপূর্ণ ও সূক্ষ্ম।
ভিদালের বিষয়ে ফয়সালা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে সই করানোর ব্যাপারে আত্মরক্ষামূলক ব্যাখ্যা দিয়েছেন ভালভার্দে, ‘ভিদাল এমন একজন ফুটবলার, যার জন্য আমরা মিডফিল্ডে অনেক ভরসা করতে পারি। তার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আমরা জানি। আগের দলগুলোর হয়ে তিনি প্রচুর ভালো ম্যাচ খেলেছেন। মাঠে কখনোই তিনি হারিয়ে যান না। তার একটি যোদ্ধার দৃষ্টিভঙ্গি আছে।’
এরপরই পাউলিনহোকে সই করানোর পরিস্থিতির কথা সামনে আনেন বার্সা কোচ। বলেন, ‘গত মৌসুমে পাউলিনহোকে সই করানোর সময়ও একই পরিস্থিতি হয়েছিল। তার আলাদা একটা সত্ত্বা ছিল, যেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং আমরা এরই মধ্যে সেটা দেখেছি। কিন্তু পাউলিনহোকে নিয়েও অনেক বিতর্ক হয়েছিল এবং ক্লাবের জার্সি গায়ে এক মিনিট না খেলার আগেই প্রচুর সমালোচনা হয়। কিন্তু তিনি ছিলেন আমাদের জন্য একজন দারুণ খেলোয়াড়। আমাদের মতো ক্লাবে সবধরনের খেলোয়াড়ের জন্য সবধরনের বিকল্প রয়েছে। প্রথমে অনেকে হয়তো খাপ খেতে পারেন না, কিন্তু দলকে এগিয়ে নিতে আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকে।’
হোর্হে সাম্পাওলি, পেপ গার্দিওলা, ইয়ুপ হেইস্কেস, কার্লো আনচেলোত্তি, মার্সিমিলিয়ানো অ্যালেগিরি এবং অ্যান্থনিও কন্তের মতো হেভিওয়েট কোচদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার কারণেই নতুন ক্লাবেও সফল হবেন ভিদাল।
‘এটা একটা স্বপ্ন’ এই শব্দ দিয়েই বার্সায় পরিচয়পর্বে কথা শুরু করেন ভিদাল। পরে যোগ করেন, ‘আশা করি, আমি আমার লক্ষ্য অর্জন করব। এখানে (বার্সায়) আমি প্রচুর ট্রফি জিততে এসেছি। নিজের লক্ষ্য অর্জনে মাঠে সম্ভব্য সর্বোচ্চটাই দেব।’
একথা সত্য যে, পুরোপুরি ফিট থাকলে ইউরোপের সেরা সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার তিনি। ডিফেন্সে দক্ষতা, গতি আর আগ্রাসন দিয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে বেশ পটুও। আর সে কারণেই হয়তো নতুন ক্লাব যোগ দিয়ে এমন আত্মবিশ্বাসী কথা বলেছেন ভিদাল।
শারিরিক গঠন আর সাহসের জন্য যেকোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন ভিদাল। দুই পায়ে সমান দক্ষ এই মিডফিল্ডার রক্ষণের সঙ্গে জায়গা খুঁজে নিজের কাজটা বেশ ঠিকঠাকভাবেই করতে পারেন।
চোখ ধাঁধানো ডিফেন্সচেরা পাস, আক্রমণে সময় মতো জায়গা পরিবর্তন, সতীর্থদের সঙ্গে সমন্বয় সাধন এবং বল ধরে রাখার অসামন্য দক্ষতা আছে ভিদালের। আর এই কাজগুলোই বার্সার শৈল্পিক স্টাইলের সঙ্গে তাকে মিলিয়ে দেবে।
যদিও মাঝখানে বল পাসিংয়ে কিছুটা ত্রুটি দেখা দিয়েছিল দুইবারের কোপা আমেরিকা বিজয়ী ভিদালের। তবে বুন্দেসলিগার গত মৌসুমে তার পাসিংয়ের পরিসংখ্যান অন্য ছবি দেখাচ্ছে। জার্মান লিগে ১৫টি বা তার চেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন এমন মিডফিল্ডারদের মধ্য শীর্ষ দশে থেকে মৌসুম শেষ করেন ভিদাল। তার পাসিং রেট ছিল ৯০.৭ শতাংশ। লং পাসে ৭৯.৮ শতাংশ রেট নিয়ে ছিলেন পাঁচ নম্বরে, আর সবচেয়ে সঠিক পাস ৮৪.৫ শতাংশ রেট নিয়ে হন সপ্তম।
ক্লাব ক্যারিয়ারে গোলের সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ৬ গোল দূরে দাঁড়িয়ে ভিদাল। জাতীয় দলের হয়েও ১০০ ম্যাচে ২৪টি গোল করেছেন চিলিয়ান এই মিডফিল্ডার।
একজন পাওয়ারফুল শুটার ও চোখের পলকে আবার যিনি খালি জায়গা খুঁজে নিতে পারেন এবং সহকর্মীদের বল সরবরাহের জন্য অক্লান্তভাবে কাজ করেন। এই ভিদাল নিঃসন্দেহে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এবং ভয়াবহ প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে ফেলতে বার্সার হয়ে অতিরিক্তি শক্তি হয়ে কাজ করবেন।
মাঠের দুইপাশেই সমানভাবে বল সরবরাহ করতে পারেন ভিদাল। সেই সঙ্গে ডি-বক্সেও দারুণ নিখুঁত।তার চেয়ে আরো তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হল, অন্য নিখুঁত মিডফিল্ডার সার্জিও বুটসকেটস এবং ক্লাসিক্যাল ক্রিয়েটিভ ইভান রাকিটিচ বা ফিলিপে কৌতিনহোর সঙ্গে সম্পৃক্ততা হবে ভিদালের।
যুদ্ধংদেহী ভিদালকে দলে নেয়া যদিও কিছুটা ঝুঁকি রয়েছে, তবে বার্সা সমর্থকদের উৎসাহী হওয়ারও প্রচুর কারণ রয়েছে। যদি তিনি ফিট থাকেন, তাহলে লা লিগার বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের হয়ে বিস্ময়কর কোনো প্রভাবই ফেলতে পারবেন।







