ক্রিসমাস ডে এলেই উৎসবে মেতে ওঠে গোটা বিশ্ব। আর ইউরোপ! সে তো বলাই বাহুল্য! দিনটি ডিসেম্বরের ২৫। কিন্তু ক্রিসমাসের হাওয়া বইতে শুরু করে নভেম্বর থেকেই। একে ঘিরে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের পরিকল্পনা তো চলে বলা যায় বছরজুড়ে। ইউরোপের ক্রিসমাস দেখার সুযোগ হয়েছিলো একবার। সে গল্পই বলছি।
আমাদের রোজার ঈদের প্রস্তুতি যেমন শুরু হয় শব-ই-বরাত থেকে তেমনি ক্রিসমাসের আয়োজন শুরু হয়ে যায় মাস দুয়েক আগে নভেম্বরের গোড়াতেই। শপিং মলগুলোতে এই অফার সেই অফার। বিখ্যাত সব ব্র্যান্ডের সামগ্রী ছেড়ে দেয়া হয় খুবই কম দামে। প্রায় সব দোকানেই বিশাল বড় বড় ব্যানারে লেখা ‘সেল’।
শুধু দোকান বলবো কি! ফুটপাথেও তো একই অবস্থা। আর অস্থায়ী মেলা তো আছেই। ছাড়ের সুযোগ নিতে হুমড়ি খেয়ে কেনাকাটার ধুম! আমাদের ঈদ মৌসুমের সঙ্গে দৃশ্যে মিল থাকলেও বড় অমিল আছে একটা । ঈদ ঘিরে ছাড় তো দূরের কথা আমাদের শপিং মল থেকে শুরু করে ফুটপাত সবখানেই তো দামের বাড়াবাড়ি!
ক্রিসমাসের সঙ্গে অবশ্য যোগ হয় আরো এক উপলক্ষ। আর সেটা হলো ইংরেজি নতুন বছর। শপিং মলগুলো ছেয়ে যায় ‘ক্রিসমাস এন নিউ ইয়ার’ অফারের পোস্টারে ।
পর্যটন কোম্পানিগুলোর তো রমরমা ব্যবসা এ দুই উপলক্ষ ঘিরে। অর্ধেক খরচে ইউরোপের শহর, দেশ কিংবা কয়েকটি দেশ ঘুরে দেখার অফার। তো জার্মানির সে রকম এক ট্যুরিজম কোম্পানি ‘ম্যাংগো ট্যুরস’ এর অফারেই জার্মান শহর বন থেকে গিয়েছিলাম প্যারিস। জার্মান রেডিও-তে কাজ করার সুবাদে ২০০৮ এর শেষটায় ছিলাম বন-এ। আসলে রেডিও-র সহকর্মী মারিনার উদ্যোগেই যাওয়া। অফারটা ছিলো মাত্র একশ’ ১৫ ইউরোতে প্যারিসে ৩ দিন ২ রাত থাকা, নাস্তা আর যাওয়া-আসার।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে কনকনে ঠাণ্ডায় শুরু হলো আমাদের যাত্রা। বন-এর পাশের শহর কোলন থেকে রাত ১২টায় উঠলাম বাসে। আমাদের রুট ছিলো বেলজিয়াম হয়ে ফ্রান্স। সকাল ৭টায় পৌঁছলাম প্যারিস। আহ! শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি আর রোমান্সের শহর! সকাল ৮টায় নামলাম প্যারিসের কেন্দ্রের এক হোটেলে।
দুপুরের দিকে বের হলাম শহর দেখতে। আরে এ তো রীতিমতো এলাহি কারবার! ওখানকার অবস্থা দেখে মনে হলো জার্মানিতে তো ক্রিসমাসের কিছুই নেই। ক্রিসমাস ঘিরে সেজেছে গোটা প্যারিস। এখানে ওখানে অস্থায়ী দোকান, জমে উঠেছে মেলা। বাস আর ট্রেন স্টেশনেও ক্রিসমাসের সাজ।
আর রাতের প্যারিস তো দেখার মতোন। কী সুন্দর আলোর শহর! যেন স্বপ্নপুরী! প্যারিসের বিখ্যাত শপিং স্ট্রিট শঁজে লিজে পুরোটাই সাজানো রঙিন আলোয়। শহরের বুক চিড়ে বয়ে চলা সেইন নদীজুড়ে ট্যুরিস্ট শিপের ছাড়াছড়ি।
আর আইফেল টাওয়ার! সেটাও তো সেজেছে অপরূপ সাজে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পতাকার সঙ্গে মিল রেখে টাওয়ারটিও নীল আলোয় সাজানো। এর কারণ, সে সময়টায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রেসিডেন্সি ছিলো ফ্রান্সের হাতে। নিয়ম অনুযায়ী ছ’মাস করে পালাক্রমে এই পদ পায় ইইউ’র সদস্য দেশগুলো।
মারিনা কেবল সহকর্মী আর বন্ধুই নয়, চমৎকার গাইডও। প্যারিসের বিখ্যাত সব জায়গা ঘুরিয়ে তো দেখালোই নিয়ে গেলো পাশের শহর ভার্সাই-তেও। ভার্সাই প্যালেস-এ সারাদিন থেকে মুগ্ধতা কাটছিলো না।
প্যারিস ট্যুরের পর আবারো অফিস। ক্রিসমাসের হাওয়া অফিসজুড়ে। ডিসেম্বরের শুরু থেকে অনেকেরই ছুটি শুরু। কেউ কেউ বছরের সব ছুটিই জমিয়ে রাখে ক্রিসমাসের জন্য।
ক্রিসমাস ডে’র সকালে তো অফিসে শুনশান নীরবতা। একেকটা ডিপার্টমেন্টে মাত্র দু’একজন করে কর্মী। সব মিলে বাংলা সার্ভিসেই আমরা সবচেয়ে বেশি মানুষ ছিলাম।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হৈ হৈ করতে করতে কয়েকটা মেয়ে আসলো রুমে। তাকিয়ে তো অবাক। ক্রিসমাসের শুভেচ্ছা জানিয়ে হাতে ধরিয়ে দিলো বিশাল বড় গিফট হ্যাম্পার। নানান ডিজাইনের কেক, চকলেট, বাদামে ভর্তি। অপ্রত্যাশিত গিফট পেয়ে ভাবছিলাম বাংলাদেশে কতো ঈদ কেটেছে অফিসে। ইশ্! ছুটির দিনে অফিস করার জন্যে এমন গিফট যদি পেতাম!
ক্রিসমাস শেষ হলেও উৎসবে কিন্তু ভাটা পড়েনি! এবার শুরু নতুন বছরকে বরণ করে নেয়ার পালা। ক্রিসমাস মেলা এবার হয়ে গেলো নিউ ইয়ার মেলা। উৎসবে উৎসবে কেটে যায় জানুয়ারির অর্ধেক। সুন্দর শান্তির বিশ্ব কামনায় নতুন বছর শুরুর আনন্দে ব্যস্ত ইউরোপ।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







