কলকাতা, ভারত থেকে: ব্যাঙ্গালুরুতে বাংলাদেশ দলের অবিশ্বাস্য এক ট্র্যাজিক হারের ট্রমা নিয়ে দু’দিন হয় কলকাতা এসেছি। সেই ট্রমা এখনো কাটেনি! সহজে কেটে যাবার নয়। এই দু’দিন কলকাতা ঘুরছি ফিরছি খাচ্ছি দাচ্ছি। কিন্তু সেই ট্রমা এখনো পিছু ছাড়েনি!
২০০৪ সালের শেষ দেখার পর এ শহরের পরিবর্তন অনেক। লোকসংখ্যা, পাগলা ট্রাফিক সব বেড়েছে। ভারতীয় রাজনীতির ‘দিদি’ তথা মমতা ব্যানার্জির শহরের পরিবর্তন অনেক। নানা রঙ্গের নিয়ন বাতিতে রাতের কলকাতার প্রধান সব সড়ক বিয়ে বাড়ির সাজ নেয়। কিন্তু ব্যাঙ্গালুরুর অবিশ্বাস্য ট্র্যাজিক হারের পর কলকাতায় অবস্থানরত বাংলাদেশ দল, এর সমর্থকদের কাছে এ শহর এখন যেন এক ট্রমাক্রান্ত শববাড়ি!
এর আগে ইডেনে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের আগে কলকাতার উর্দুভাষী মুসলিম দর্শকদের অনেকে পাকিস্তান দলকে সমর্থন দিতে দলে দলে স্টেডিয়ামে গেছেন। কিন্তু এবার যেনো নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ম্যাচটিকে নিয়ে তাদের তেমন আগ্রহ নেই! ব্যাঙ্গালুরুতে বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচের টিকেট কিনেছিলাম ৩ হাজার টাকায়। অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ ম্যাচের টিকেট কিনতে ৫শ’ টাকা লেগেছিলো। কিন্তু কলকাতার নিউজিল্যান্ড ম্যাচের টিকেট নিয়ে অত হাহাকার নেই।
এবার কলকাতার গড়িয়াহাটার পার্ক প্লাজা হোটেলে উঠেছি। যে কোনো সময় যে কোনো জায়গায় যেতে পাঞ্জাবি ড্রাইভার কুলবান্ত সিং এসে হাজির। গত দু’দিন হালের সাজানো গঙ্গার তীরসহ কতো জায়গায় যে নিয়ে গেছেন কলকাতার এক বাঙ্গালি মেয়েকে প্রেম করে বিয়ে করা কুলবান্ত। খেলা থেকে শুরু করে স্থানীয় রাজনীতির নানা খবর তার মতো করে রাখেন।
বাতির নিচের অন্ধকারের মতো পাঁচ তারকা পার্ক প্লাজার রাস্তার মানুষের অন্য এক লড়াকু-সংগ্রামী জীবন। ধর্মশালা বা দিল্লী-ব্যাঙ্গালুরুর রাস্তার দোকানের লিকলিকে এক গ্লাস চায়ের দাম দশ টাকা। কিন্তু গড়িয়াহাটার পার্ক প্লাজার রাস্তার দোকানের এক গ্লাস চায়ের দাম চার টাকা!
এখানে এক দোকানি, চল্লিশ বছর বয়সি বীরেন্দ্র’র সাথে কথা হয়। পাঁচ বছর বয়স থেকে বাবার সঙ্গে এই দোকানে তিনি চা বেচেন। এখন বাবা নেই। দোকানটি তিনিই চালান। দোকানের ভাড়া কতো জানতে চাইলে কোন রাখঢাক ছাড়াই বলেন এটি অপদখলীয় সম্পত্তি। চল্লিশ বছর ধরে তাদের দখলে আছে। ভাড়া দিতে হয় না। এই রাস্তায় অনেক গরিব মানুষ থাকেন তাই না বীরেন্দ্র? যুবক মাথা দুলিয়ে সায় দেন।
উত্তর প্রদেশ থেকে আসা হরিজন সম্প্রদায়ের ত্রিশ-পয়ত্রিশ হাজার লোকজন এই এলাকায় থাকেন। তারা সিটি কর্পোরেশনের রাস্তা ঝাড়ু দেন। নানান নোংরা পরিষ্কার করেন। সে এলাকারই পার্ক প্লাজায় সৌভাগ্যবান যারা এসে থাকেন তারা স্থানীয় প্রতিবেশীদের অবস্থা হয়তো খুব জানেন না বা জানার চেষ্টা করেন না! এটিই তো জীবন ভারতীয় উপমহাদেশের! কেউ খুব ধনী। কেউ খুব গরিব। ধারণারও বাইরের দারিদ্র্য তাদের জীবনসঙ্গী।
ভারতের আর অনেক রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গ-কলকাতায়ও এখন চলছে নির্বাচনী দামামা। এলাকায় এলাকায় রাস্তার ওপর চলে নির্বাচনী সভা-মিছিল! চারদিকে চোখে পড়বে শুধু নির্বাচনী অফিস, দেয়াল লিখন, ব্যানার-ফেস্টুন।
খেলা উপলক্ষে এক মাসের মধ্যে তৃতীয়বার কলকাতা এসেছি। যত ট্যাক্সি ড্রাইভারের সঙ্গে কথা হয়েছে তাদের বেশিরভাগকে মমতা বিরোধী বিরোধী মনে হয়েছে! মমতার মন্ত্রীদের ঘুষ কেলেংকারির একটা ভিডিও এখন অনলাইনে আছে। সেটি নিয়ে নানান সরস আলোচনা চলে।
আবার এক রাস্তায় এক ফেস্টুনে লেখা দেখেছি ‘লালেই বিপদ’! বামরা দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গ শাসন করেছে। তাদের হারিয়ে ক্ষমতায় আসা মমতার তৃণমূল কংগ্রেস এখনও এভাবে ভোটাদের ‘লালদের’ ভয় দেখায়! তৃণমূলের অনেক বদনাম সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন নির্বাচনে ক্ষমতার পালাবদল হবে মনে হয়নি।
বাংলাদেশের ৪৫তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে কলকাতার ওবেরয় গ্র্যান্ড হোটেলে শনিবার এক সংবর্ধনার আয়োজন করেছেন কলকাতাস্থ বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার মিসেস লামিয়া রহমান আহাদ। ডেপুটি হাইকমিশনের প্রথম সচিব (প্রেস) মোফাখখারুল ইকবালের আমন্ত্রণে শুক্রবার ডেপুটি হাইকমিশন ভবনে যাওয়া হয়েছিলো।
বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ঐতিহাসিক এক পীঠস্থান এই ভবন। একাত্তরে এখানকার ডেপুটি হাইকমিশনার হোসেন আলী বাঙালি কূটনীতিকদের মধ্যে প্রথম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তার অফিসের সব বাঙালি স্টাফদের নিয়ে যোগ দেন বাংলাদেশের পক্ষে। কলকাতায় এই ভবনেই প্রথম ওড়ানো হয় বাংলাদেশের পতাকা। এখানেই প্রথম গাওয়া হয় বাঙালির প্রাণের জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’।
৪৫ বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে কলকাতার ইডেনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশের সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের খেলা। সে কারণে স্বাধীনতার ৪৫তম বার্ষিকীর দিনে ইডেনেও বাজবে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’।
কিন্তু প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রস্থান নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় অন্য এক প্রতিক্রিয়া শুনলাম ডেপুটি হাইকমিশনের এক কর্মকর্তার মুখে! কলকাতার এক স্বনামখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক খেলার বেশ কিছু টিকেট তাকে দিয়েছেন। কিন্তু তিনি টিকেটগুলো বিলাবার জন্যে তেমন আগ্রহী লোক পাচ্ছেন না! হারজিতের খেলার এটিও একটি অংশ।
কিন্তু এরপরও বাংলাদেশ আজও দলের সঙ্গে থাকবে ইডেনের খেলায়। প্রতিযোগিতায় প্রথম দল হিসাবে সেমিফাইন্যালে পৌঁছে যাওয়া নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশ আজ জিতবে তা জোর গলায় আশা করতে সাহসের দরকার আছে। ব্যাঙ্গালুরুর ম্যাচে ভারতকে হারাতে পারলে বিস্তর পাওয়া যেতো তেমন সাহসী মানুষ! এরপরও তো আশা করতে হয়। আহ আজ যদি জিতে বাংলাদেশ! আহ কলকাতা! উহ কলকাতা!






