প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কটূক্তির অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলা থেকে জামিন পেয়ে বাদী কর্তৃক সংঘবদ্ধ হামলার শিকার হয়েছেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার ও সনাতন উল্লাস। জামিন পেয়ে আদালত থেকে বের হওয়ার পথে বাদী ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা গোলাম রব্বানীর নেতৃত্বে এ হামলা হয়। হামলায় কেউ আহত না হলেও আদালত প্রাঙ্গণেই এমন হামলার ঘটনা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির শিক্ষা ও পাঠচক্র বিষয়ক সম্পাদক গোলাম রব্বানীর ক্ষোভ ইমরান ও সনাতন উল্লাসের নেতৃত্বে শেখ হাসিনার নাম উল্লেখ করে ‘ছিঃ ছিঃ’ বলে শাহবাগে মিছিল হয়েছে। দলের সভানেত্রীকে ঘিরে এমন স্লোগান হলে ক্ষোভ থাকাটা অস্বাভাবিক হয়তো না, কিন্তু এর সূত্র ধরে আইনের আশ্রয় নিয়েও আইনে আস্থা না রাখাটা স্বাভাবিক কিছু নয়। এটা রীতিমত অন্যায় এবং বিচারালয়কে অগ্রাহ্য করার শামিল।
ছাত্রলীগ নেতা গোলাম রব্বানীসহ মিডিয়া বলছে ইমরানের ওপর ডিম ছুঁড়ে মারা হয়েছে। ইমরান দাবি করেছেন তাদের ওপর লাঠিসোটা নিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। গণজাগরণ মঞ্চের পক্ষ থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রেরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ওই হামলায় তাদের কয়েকজন আহত হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। এখানে বিষয়টি যে কিছুটা বাড়িয়ে বলা হয়েছে তা সহজেই অনুমেয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে হামলার সময়কার ভিডিওচিত্র কেউ কেউ প্রকাশ করেছেন, যেখান থেকে পুরো বিষয়টি আঁচ করা সম্ভব। ওই সময়ে আদালত প্রাঙ্গণে যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল সেটা নিঃসন্দেহে অনাকাঙ্ক্ষিত। তাছাড়া বাদী-বিবাদীর মধ্যকার এমন সংঘাত যদি হয় তাহলে আদালতের প্রতি আস্থা থাকল কোথায়? আইন নিজের হাতে তুলে নিলে আইনের আশ্রয় নেওয়ার দরকারই বা কী?
গোলাম রব্বানী ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা, ইমরান এইচ সরকার গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র, সনাতন উল্লাস উদীচী কেন্দ্রীয় কমিটির সংগঠক ও গণজাগরণ মঞ্চের শতশত স্লোগানের জন্মদাতা। কিন্তু আদালতে বিচারপ্রার্থী হওয়ার পর থেকে তাদের পরিচয় আর সম্পর্ক কেবল বাদী-বিবাদীর। তাদের নামের পেছনে নানাবিধ তকমা থাকতে পারে, থাকতে পারে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিচয় কিন্তু আদালত তাদের ওই পরিচয়ের বাইরে অভিযোগ নিয়েই কাজ করবেন। সে হিসেবে আইনি মাধ্যমে ইমরান-সনাতন জামিনও পেয়েছেন। আদালতের এ আদেশের প্রতি বাদীর শ্রদ্ধা জানানোই ছিল স্বাভাবিক। অথচ তিনি সেটা দেখাননি, উল্টো দলবল নিয়ে আদালত প্রাঙ্গণেই ঝাঁপিয়ে পড়েছেন বিবাদীর ওপর। আদালতে প্রাথমিকভাবে পরাজিত হয়ে নিজের হাতেই তুলে নিয়েছেন আইন, এতে কি আদালতের আদেশ অমান্য হয় না? আদালতকে অশ্রদ্ধা জানানো হয় না?
একটু পেছন ফিরে তাকালে দেখা যাবে, গত ২৮ মে সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে জাস্টিসিয়া ভাস্কর্য সরানোর প্রতিবাদে গণজাগরণ মঞ্চের মিছিল থেকে ‘ছি ছি হাসিনা, লজ্জায় বাঁচি না’, ‘বাংলাদেশ হারেনি, হেরে গেছে হাসিনা’ স্লোগান দেওয়া হয়। স্লোগানটি ছাত্রলীগের চোখে আপত্তি ও মানহানিকর ঠেকেছে। গোলাম রব্বানী মিছিলের সংবাদ পেয়ে ইমরান এইচ সরকারকে প্রকাশ্যে পেটানোর হুমকি দিয়েছিলেন এবং ৩১ মে তারিখে মামলাও করেছিলেন। ওই স্লোগানে শেখ হাসিনার সম্মানহানি হয়েছে বলে দাবি ছিল তার।
কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সম্পাদকীয় পদবিধারী ব্যক্তি প্রকাশ্যে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্রকে পেটানোর হুমকির পরও ওই সময় ছাত্রলীগ কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। আর রোববারের (১৬ জুলাই) হামলার পরেও তাদের প্রতিক্রিয়া নাই। ফলে জানা যাচ্ছে না যে এ হামলায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কতখানি সম্মতি আছে। তবে নীরবতাকে যদি সম্মতির লক্ষণ ধরা হয় তবে বলা যায় এখানে এখনও তারা আপত্তির কিছু দেখেনি, কারণ আপত্তি থাকলে নিশ্চয়ই তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতো। আদালত অবমাননা, আদালত অমান্য এবং শেখ হাসিনার নামে রাস্তায়-আদালতে প্রকাশ্যে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ পরিচালনার জন্যে শাস্তি প্রদান করতো। কিন্তু এর কিছুই ঘটেনি, ছাত্রলীগ নীরব থেকে গেছে এখানেও। এতে কার লাভ হলো?
ছাত্রলীগ নেতার আদালত থেকে জামিনপ্রাপ্তদের ওপর হামলা করার পর লাভ-ক্ষতি কাদের হলো? দীর্ঘদিন আলোচনার বাইরে থাকা ইমরান এইচ সরকার আলোচনায় ফিরে এসেছেন। দেশব্যাপী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নানা অপকর্মের পালে আরও কিছু পালক যুক্ত হলো আদালত প্রাঙ্গণে হামলার মাধ্যমে।
ন্যায়বিচারের আশায় আদালতে যাওয়া নাগরিকের মাঝে এ শঙ্কার কি জন্ম হচ্ছে না যে, আদালতে গেলে ফিরে আসতে পারব তো? আদালত কি আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারবে- এমন প্রশ্ন যদি ওঠে তাহলে তো দেশের বিচারব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি এমন কিছু হয় তাহলে এর দায় কে নেবে? সরকারে থাকার জন্যে আওয়ামী লীগ নিশ্চয়ই! ফলত ক্ষতিটা হলো আওয়ামী লীগ সরকারেরই। কিন্তু রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচি না হলেও কেন ছাত্রলীগের এক নেতার কারণে তারা ক্ষতিটা মেনে নিতে রাজি হয়ে যাচ্ছে- প্রশ্ন ও বিস্ময়টা এখানে!
ছাত্রলীগ নেতা হামলা করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘যতদিন শেখ হাসিনার কাছে করজোড়ে নি:শর্ত ক্ষমা প্রার্থনা না করবে, ততদিন ইমরান এইচ সরকারকে দেখা মাত্র পচা ডিম মারা হবে, ডিম থেরাপি চলবে!’ এমন যদি হয় আমাদের ভবিষ্যৎ রাজনীতিবিদের চরিত্র-মানসিকতা তাহলে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কি নিরুদ্বেগ থাকা যায়?
হামলা হয়েছে ইমরান এইচ সরকারের উদ্দেশে, আরও হামলা হবে বলে হুমকিও দেওয়া হয়েছে- এমন অবস্থায় বিষয়টিকে সিরিয়াসলি দেখা উচিত। এটা নাম দেখে গুরুত্ব অনুধাবন করার বিষয় নয় বলে মনে করছি। বিষয়টি আদালতে আসা বাদী-বিবাদীর নিরাপত্তা বিষয়কও। দেশের বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে মানুষ আদালতে আসছে, আর আদালতেই যদি এ ধরনের হামলা তুলনামূলক শক্তিশালী পক্ষ অপেক্ষাকৃত দুর্বলদের প্রতি করতেই থাকে তাহলে মানুষ আইনের প্রতি আস্থা হারাবে। বিচারালয়ে এসে যদি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, হুমকির মুখে পড়ে তাহলে মানুষ যাবে কোথায়?
ছাত্রলীগ নেতা গোলাম রব্বানী গণজাগরণ মঞ্চের স্লোগানের পর পরই ইমরান-সনাতনকে পেটানোর হুমকি দিলেও স্লোগানের তিন দিন পর বিচার চেয়েছেন আইনি প্রক্রিয়ায়। কিন্তু এর দেড় মাস পর যদি আদালত থেকে বিবাদীরা জামিন পায় তাহলে তিনি কেন হামলা করতে যাবেন। ডিম হোক আর লাঠিসোটা হোক এ হামলা হয়েছে পরিকল্পনা করেই এবং সেটা আদালত থেকে বিবাদীরা জামিন পাওয়ার পর পরই। ফলে বিষয়টিকে বাদী-বিবাদীর দ্বন্দ্ব হিসেবে না আদালতকে অগ্রাহ্য, অপমান, অমান্য ও অবমাননা হিসেবেই দেখা উচিত। জানি না আদালত এটাকে কীভাবে দেখছে। তবে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে একে দেখছি- আদালত প্রাঙ্গণেও নাগরিকের নিরাপত্তাহীনতার চিত্র হিসেবে। এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হতে থাকলে মানুষজন আস্থা হারাতে বাধ্য হবে নিরাপত্তা বাহিনীদের প্রতি। এধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে দেওয়া যাবে না। এজন্য দরকার সঠিক ও কঠোর পদক্ষেপ।
আদালতের প্রতি আমাদের আস্থা আছে, এ আস্থা ধরে রাখতে চাই। দরকার নিরাপত্তা। আপনারা এ নিরাপত্তা দিন। ছাত্রলীগ হামলা করেছে, এর কোন বিচার হবে না- এ ধরনের সামাজিক এক ধারণা সমাজে প্রচলিত। সাংগঠনিক, দলীয় ও প্রশাসনিক পদক্ষেপই পারে এ ধরনের ধারণাকে ভেঙে দিতে। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, আদালত, প্রশাসন কি উদ্যোগী হবে? না হলে তো দেশেরই বিপদ। আমরা কি বিপদটা ডেকে আনছি?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








