সরকারি চাকরি নিতে কিছু নিয়মকানুন মানতে হয়। বলা বাহুল্য সময়ের সঙ্গে এসব পুরাতন নিয়ম সংস্কার করা হয়নি। ফলে মাঝে মাঝে আমরা আইনের মারাত্মক অমানবিক দিকটা দেখতে পাই। তখন আইনের সংস্কার অপরিহার্য হয়ে ওঠে। দুদিন ধরে সামাজিক গণমাধ্যমে আসপিয়া নামক একটি মেয়ের সব যোগ্যতা থাকার পরও পুলিশে চাকরি হয়নি। তার স্থায়ী ঠিকানা নেই। অর্থাৎ আসপিয়া ভূমিহীন। বাংলাদেশের মত দেশে ভূমিহীন মানুষ কোনো বিস্ময়কর সংবাদ নয়। বরং এটা একটি বাস্তবতা। এই বাস্তবতাকে স্বীকার করেই যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি চাকুরির আইন সংশোধন করা দরকার।
একটি দৈনিকের সংবাদে জানা যায়: বাবার মৃত্যুর পর আসপিয়া ইসলামের পরিবারে আর্থিক টানাপোড়েন শুরু হয়। এর মধ্যেও কষ্ট করে গত বছর এইচএসসি পাস করেন আসপিয়া। স্বপ্ন ছিল পুলিশ বাহিনীতে চাকরি করে সংসারে সচ্ছলতা আনবেন। সম্প্রতি পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরির আবেদন করার পর পরীক্ষার সব কটি ধাপে উত্তীর্ণও হয়েছিলেন আসপিয়া। চাকরির জন্য মনোনীত হওয়ায় আসপিয়ার পরিবারে খুশির জোয়ার বইছিল। কিন্তু হঠাৎই সেই খুশি ফিকে হয়ে গেছে। কারণ নিজেদের কোনো জমি না থাকায় চাকরিটা পাচ্ছেন না তিনি। এ খবর শুনে ভেঙে পড়েছেন বরিশালের হিজলা উপজেলার আসপিয়া।
২০২০ সালে আসপিয়া বরিশালের সরকারি হিজলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। উপজেলার খুন্না-গোবিন্দপুর গ্রামের এক ব্যক্তির জমিতে আশ্রিত হিসেবে বসবাস করেন তাঁরা। নদীভাঙনের কবলে পড়ে ১৫ বছর আগে আসপিয়ার বাবা সফিকুল ইসলাম পরিবার নিয়ে ভোলা থেকে হিজলায় আসেন। আসপিয়ারা চার ভাইবোন। তবে বাবার মৃত্যুর পর থেকে আসপিয়ার বড় ভাই এখন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাই চাকরি করে সংসারের আর্থিক টানাটানি দূর করার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। জমি না থাকায় চাকরি হবে না, এটা জেনেই গত বুধবার সকালে আসপিয়া ছুটে যান বরিশাল রেঞ্জ পুলিশের উপমহাপরিদর্শক এস এম আকতারুজ্জামানের কার্যালয়ে। চাকরি না হওয়ার কারণ জানার জন্য ডিআইজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন আসপিয়া।
ডিআইজি তাকে জানান, পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগের বিধি অনুযায়ী, প্রার্থীকে অবশ্যই নিজ জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। কিন্তু তার হিজলায় নিজস্ব কোনো জমি নেই। তাই আইন অনুযায়ী তাকে নিয়োগ দেয়ার সুযোগ নেই। হতাশ হয়ে আসপিয়া দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত বরিশাল পুলিশ লাইনসের মূল ফটকের সামনে বসে থাকেন। আসপিয়া জানান: গত সেপ্টেম্বরে বরিশাল জেলায় পুলিশ কনস্টেবলের শূন্য পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয়া হলে তিনি অনলাইনে আবেদন করেন। এরপর জেলা পুলিশ লাইনসে শারীরিক যোগ্যতা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৭ নভেম্বর লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন। এতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর গত ২৪ নভেম্বর একই স্থানে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মেধা তালিকায় পঞ্চম হন আসপিয়া।
আসপিয়া বলেন: আমি যোগ্যতাবলে সাতটি ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্ত নিয়োগের অপেক্ষায় ছিলাম। এর মধ্যে হিজলা থানার ওসি জানান, চাকরি পেতে হলে নিজেদের জমিসহ ঘর দেখাতে হবে। কিন্তু আমাদের কোনো জমি নেই। আমরা আরেকজনের জমিতে অনেক বছর যাবৎ বসবাস করছি। জমি নেই বলে আমার চাকরি হবে না, এটা বিশ্বাস হচ্ছিল না। বরিশাল রেঞ্জ পুলিশের উপমহাপরিদর্শক এস এম আকতারুজ্জামান বলেন: আসপিয়া নিঃসন্দেহে অত্যন্ত মেধাবী। তাকে পুলিশ বাহিনীতে পাওয়া গেলে ভালো হতো। কিন্তু জেলাভিত্তিক পুলিশে নিয়োগ হয়। এ ক্ষেত্রে চাকরিপ্রার্থীকে অবশ্যই জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে, এমন বিধান রয়েছে। কিন্তু আসপিয়ার জমি না থাকায় তাকে নিয়োগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
আমরা মনে করি, এই আইনের পরিবর্তন দরকার। সরকারি চাকরি বা অন্য ক্ষেত্রে যারা প্রকৃত ভূমিহীন তাদের যোগ্যতা থাকলেও চাকরি না হলে তারা বাংলাদেশের নাগরিক কিভাবে হয়? যদি তারা বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে থাকে তাহলে চাকরি পাওয়ার অধিকারও তার রয়েছে। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী যদিও ভূমি দিয়ে তাকে চাকরির ব্যবস্থার নির্দেশনা দিয়েছেন। এজন্য প্রধানমন্ত্রীকে আমরা ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তবে আমরা মনে করি এইসব মান্ধাতা আমলের সাংঘর্ষিক আইন সংশোধন করা জরুরি, যদিও গত ৫০ বছরে আমরা কোনো উল্লেখযোগ্য অবদান দেখিনি। কারণ ঔপনেবিশিক সব আইন শাসক শ্রেণির কাছে তুরুপের তাস। গণমানুষের কথা বলে কেউ আইন সংশোধন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেননি। আমরা চাই, এই মেয়েটির ক্ষেত্রেই শুধু নয়, এই ধরণের সব আইন সংশোধন করে একজন নাগরিককে তার যোগ্য মর্যাদা প্রদান করা হোক। তাতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অন্তত জনগণ স্বস্তি পাবে।







