মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ভয়ংকর নির্যাতনের মুখে গত বছরের আগস্ট থেকে বাংলাদেশ অভিমুখে রোহিঙ্গাদের যে ঢল নেমেছিল তা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। শুধু তার তীব্রতা কমেছে মাত্র। নির্মম হলেও সত্য, কয়েক হাজার রোহিঙ্গার নৃশংস মৃত্যু, নির্দয় অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজের পরও মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতন যেমন থামেনি; তেমনি থামেনি তাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসার ঘটনাও।
এই ঘটনা শুরু হওয়ার আট মাসেরও বেশি সময় পর শনিবার প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কোনো প্রতিনিধিদল নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের দেখতে বাংলাদেশে এসেছে।পরিষদের স্থায়ী এবং অস্থায়ী ১৫টি সদস্য দেশের প্রতিনিধিসহ ৪০ সদস্যের ওই দলটি তিন দিন এদেশে থাকবে বলে জানা গেছে। শেষ দিন গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের পর দলটি মিয়ানমারের উদ্দেশে যাত্রা করবে।
আমরা দেখেছি, রোহিঙ্গা সংকট তীব্র অাকার ধারণ করার পর ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিসসহ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান রোহিঙ্গাদের দুর্দশা সরেজমিন দেখে গেছেন। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক ফোরাম নানাভাবে বিষয়টি নিয়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির কথা বলেছে। বিশ্ব প্রচার মাধ্যমেও উঠে এসেছে মিয়ানমারের হিংস্রতার খবর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউই কার্যকর ও শক্ত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
যে কোনো কারণেই হোক, শুরু থেকেই বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো রোহিঙ্গা ইস্যুতে নির্যাতনকারী দেশ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, কিছু সামরিক চুক্তি ও প্রশিক্ষণ বাতিল ছাড়া তেমন কোনো উদ্যোগ আমরা দেখিনি।
কিন্তু ইউরোপ-আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় এই ধরনের মানবিক সংকটে আমরা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে দ্রুত, কার্যকর এবং শক্ত পদক্ষেপে নিতে দেখেছি। তাহলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এমন উদাসীনতা কেন? বাংলাদেশের মতো একটা দেশে ওপর এত বড় সংকট চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা কেন?
এরই মধ্যে আমরা জেনেছি, নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিদলটি রোববার কক্সবাজারে কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেছে। সীমান্তের শূন্যরেখায় গিয়েও তরা কথা বলেছেন নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের সাথে। আর আগের দিন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করে তারা রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ফেরত, ত্রাণ, প্রত্যাবাসনসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত জেনেছে।
ওই বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জোরালো পদক্ষেপ চেয়েছে বাংলাদেশ। প্রতিনিধিরাও কার্যকর ভূমিকা রাখার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু এই আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতির খেলা কতদিন? আরো নৃশংসতা হলে শক্ত পদক্ষেপ নেবে জাতিসংঘ? নৃশংসতার বাকি আর কী আছে!
নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এই আট মাস কম সময় নয়। তাই এখন আর আলোচনা, নির্যাতিতদের দুঃখ-দুর্দশা কিংবা নির্যাতন-সহিংসতা বন্ধে মিয়ানমারকে অনুরোধের সময় নয়। এখন সময় শক্ত পদক্ষেপের। এখন এটাই দেখতে চায় বাংলাদেশসহ বিশ্ব। না হলে রোহিঙ্গা নির্যাতন কোনোভাবেই বন্ধ হবে না বলে আমরা মনে করি। উল্টো বাংলাদেশকে এই অসম্ভব চাপ বছরের পর বছর ধরে বয়ে বেড়াতে হবে।







