২৪৮৫ মিটার উচ্চতায় ক্যাবলওয়েতে যাচ্ছিলাম। সাথে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আগত একজন শিল্পী, রাশিয়ার শিল্পী এবং উৎসব আয়োজক কমিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রধান আন্না গেলস্টোনসহ তার কয়েকজন বন্ধু। ১৮৪১ মিটার উচ্চতা থেকে আমরা হেঁটে চলেছি ২৪৮৫ মিটারের দিকে, যেখানে রয়েছে অপূর্ব সাজে সজ্জিত ক্যাবলওয়ে বা স্কাইলিপ্ট। চারিদিকে মনোরম পরিবেশ। নাম অজানা হরেক রকম বৃক্ষের সমাহার, পুস্পে ভরা সড়ক। যেন ভুস্বর্গ এক। হাঁটতে হাঁটতে বলেই ফেললাম, এটি আসলে ‘হ্যাপিল্যান্ড’। হঠাৎ চলে আসা নামটির যর্থার্থ আছে বলা চলে।

হ্যাপিল্যান্ড বা ‘আনন্দভূমি’ আদতে ‘সাঘকাদজর’ এর কোন বিশেষ নাম নয়। লেখায় যে আর্মেনিয়ার এই পর্যটন শহরকে ‘আনন্দভূমি” বলছি তা স্বয়ং আর্মেনিয়ানরাও জানেন না। হঠাৎ মনে আসলো তাই লিখে ফেললাম। মনের ভেতর থেকে লিখছি। ভালো লাগা-ভালোবাসা থেকে লিখছি। হৃদয়ের গভীর থেকে এই শহরের এমন নাম চলে আসছে। প্রশ্ন হতে পারে, আনন্দভূমি কেন? যদিওবা আক্ষরিক অর্থে ‘সাঘকাদজর’ অর্থ হচ্ছে, ‘পুস্পের উপত্যকা’ বা ভেলি অব ফ্লাওয়ারস। সাঘকুনাউটস পর্বতমালা থেকে এসেছে সাঘকাদজর, যে পর্বতমালা শহরটি থেকে পশ্চিমে অবস্থিত। তৃতীয় শতক থেকে এই শহরটি গড়ে উঠে।

জীবনকে আনন্দময় করে রাখার জন্য সবই আছে বলা চলে এই শহরে। আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভান থেকে প্রায় ৫০ কিমি উত্তরে, প্রাদেশিক কেন্দ্র হারদজান থেকে ৩ কিমি পূর্বে অবস্থিত সাঘকাদজর শহরটি পুরোপুরি প্রাকৃতিক শহর। সমুদ্র সমতল থেকে এই শহর ১৮৪১ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। বিশাল এবং সুউচ্চ পর্বতমালা দ্বারা বেষ্টিত সাঘকাদজরকে প্রকৃতি যেন নিজ হাতে গড়ে তুলেছেন। এটি আর্মেনিয়ার একটি স্পা শহর। স্বাস্থ্যকর এবং সংস্কৃতির শহরও বলা হয়। হ্যাপিল্যান্ড কিংবা ‘পুস্পের উপত্যকায়, পুস্প ফুটে সুশোভিত করে রাখে চারপাশ। রয়েছে স্বাস্থ্যকর সব রিসোর্টে। আবহাওয়াটাও মনোরম, দুর্দান্ত। গ্রীষ্মে এখানে হালকা জলবায়ু আর শীতকালে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা এবং প্রচুর তুষাপাত হয়।

সাঘকাদজর পর্যটন অবকাঠামো অত্যন্ত উন্নত। এখানে আছে প্রায় ৪০টির মতো বিলাসবহুল হোটেল ও রিসোর্ট। প্রচুর পরিমাণে চিত্তবিনোদনের সুবিধা। রয়েছে অসাধারণ সব ক্যাবলওয়ে, যার সংখ্যা চারটি। প্রথমটি ১৯৬৯ মিটার, দ্বিতীয়টি ২২৩৪ মিটার, তৃতীয়টি ২৪৬৫ মিটার এবং সর্বোচ্চটা সমুদ্র সমতল থেকে ২৮১৯ উচ্চতায় তৈরি। উঁচু উঁচু পাহাড়ে এসব ক্যাবলওয়েতে চড়ছি আর নিজ দেশের রাঙামাটি, বান্দরবান কিংবা কক্সবাজারের হিমছড়ির পাহাড়গুলোর কল্পনা করছি। কতো সুন্দর আমাদের বাংলাদেশ। কত বৈচিত্র্যময় পাহাড়ের অবস্থান। আমরা চাইলেও এমন ক্যাবলওয়ে দিয়ে সুসজ্জিত করতে পারি কক্সবাজারকে। পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে গড়ে তুলতে পারি সবকিছুকে!
যাইহোক, আসা যাক সাঘকাদজরে। এখানে রয়েছে একটি সাংস্কৃতিক প্রাসাদ এবং একটি পাবলিক লাইব্রেরি। ক্রীড়ার দিক থেকেও উন্নত শহর এটি। আর্মেনিয়া প্রজাতন্ত্রের প্রধান ক্রীড়া কেন্দ্র সাঘকাদজর। দেশটির অলিম্পিক বিজয়ীদের সবার নাম লিখে রাখা হয়েছে একটি বৃক্ষের ভাস্কর্যে। সাঘকাদজর বিশেষ করে শীতকালিন ক্রীড়া কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

এই শহরকে সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্রও বলা যায়।আর্মেনিয়ার মূকাভিনয়ের প্রাণ পুরুষ ইয়েঙিভারিয়ান এর ভাস্কর্যকে কেন্দ্র করে এখানে প্রতিমুহুর্তে চলে সংস্কৃতি চর্চা। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে এই শহরে সংস্কৃতি চর্চা অনেক বিস্তৃত, প্রসারিত। বিশেষ করে মূকাভিনয়। প্রতি বছরই এই শহরে অনুষ্ঠিত হয় ‘লিওনিড ইয়েঙিভারিয়ান ইন্টারন্যাশনাল মাইম ফেস্টিভাল’। এবার অনুষ্ঠিত হয়েছে ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক মূকাভিনয় উৎসব। আর্মেনিয়ার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং আর্মেনিয়ার প্যান্টোমাইম থিয়েটার আয়োজনে এই উৎসবেই আমরা বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছি। ঢাকা ইউনিভার্সিটি মাইম অ্যাকশনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মীর লোকমান আর আমি দুই জনের টিম বাংলাদেশের।
৫ দিনের উৎসবে প্রতিদিন বিকাল থেকে রাত এগারটা পর্যন্ত ৮টি দেশের মূকাভিনয় শিল্পীরা সাঘকাদজরের মঞ্চ মাতিয়েছেন। অন্যান্য সময় সবাই মিলে ঘুরাঘুরি, সভা, মূকাভিনয়ের সেমিনার, কর্মশালা কিংবা আড্ডা, মাস্তি সবকিছুই ছিলো এই কদিন। জার্মানি, রাশিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, নাগার্নো কারাবাখ, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং আর্মেনিয়ার বিভিন্ন শিল্পীদের সঙ্গে পরিচয়, আলাপ, পরস্পরের সংস্কৃতির খোঁজ-খবর, একে অপরকে নিজ নিজ দেশে আমন্ত্রণ; সব মিলিয়ে দারুণ অভিজ্ঞতাপূর্ণ ভ্রমণ।

আর্মেনিয়ায় আসার আগে থেকে শুনেছি এই শহরের কথা। তখন ইন্টারনেট সার্চ করে এখানকার ছবি দেখলেও তেমন একটা আকর্ষণীয় মনে হয়নি। সরাসরি আসার পর বুঝলাম আসলে কতোটা মনোমুগ্ধকরা সাঘকাদজর। এমন একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ শহরে সংক্ষিপ্ত জীবনে প্রথম ভ্রমণ করলাম।
আজ এই হ্যাপিল্যান্ড থেকে বিদায় নেয়ার পালা। এখান থেকে ফিরবো রাজধানী ইয়েরেভানে। এই পুস্পের উপত্যকায় আর আসা হবে কিনা জানি না। তবে আমরা লাল-সবুজ পতাকার যে স্পর্শ দিয়ে গেলাম, বাঙালি সংস্কৃতির যে ছাপ এখানে রেখে যাচ্ছি,তা কেউ মুছতে পারবে বলে মনে হয় না। সংস্কৃতির ছাপ মুছা যায় না। প্রতিমুহুর্তে, প্রতিটি দেশে, প্রতিটি স্থানে এবং কালে তা জীবন্ত…







