কক্সবাজারের টেকনাফে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত পৌর কাউন্সিলর ও উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা একরামুল হকের স্ত্রী আয়েশা বেগম বলেছেন, বন্দুকের নলের মুখেও মৃত্যুর আগ মুহূর্তে একরামের শেষ বাক্য ছিল, ‘আমি ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত নই।’
বৃহস্পতিবার কক্সবাজার প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার বিবরণ দিয়ে আয়েশা বেগম বলেন, রাত ১১ টার পরও তিনি ফিরে না আসায় আমার মেয়ে রাত ১১ টা ১৩ মিনিটে তার বাবার মোবাইলে ফোন করেন। এসময় তিনি কাঁদো কাঁদো কন্ঠে মেয়েকে বলেন, ‘মা আমি হ্নীলা যাচ্ছি। আমি যাদের কাছে এসেছিলাম সেই মেজর সাহেবের সাথে হ্নীলা যাচ্ছি কাজে। এরপর ফোন কেটে যায়।’
এরপর ১১ টা ১৪ মিনিটে আমার মেয়ে আবার ফোন করলে তিনি আবারও কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলেন, ‘আমি ইউএনও অফিসে যাচ্ছি। তোমার আম্মুকে বলো।’ মেয়ে কখন আসবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কাজ শেষে ইনশাল্লাহ ফিরে আসবো।’
একরামুল হকের স্ত্রী বলেন, এরপর সর্বশেষ রাত ১১ টা ৩২ মিনিটে আবারও ফোন করলে ফোন রিসিভ করেন। কিন্তু এসময় তিনি আর কথা বলছিলেন না। আমার স্বামীর সাথে অপরিচিত একটি কন্ঠের কথা বলতে শোনা যায়। সেই অপরিচিত কন্ঠে তাকে বলছেন, ‘তাহলে তুমি জড়িত নও। আমার স্বামী উত্তর দেন, না আমি জড়িত নই।’
এরপরই গুলির আওয়াজ শুনতে পাই এবং আমার স্বামীর আর্তচিৎকার শুনে আমি পাগলের মতো হয়ে যাই। আমি ও আমার মেয়েরা তাদেরকে চিৎকার করে অনুরোধ করতে থাকি আমার স্বামীকে আপনারা মারবেন না, তিনি নির্দোষ। কিন্তু আমাদের কথায় তাদের মন ঘামেনি। তারা পরপর গুলি করে আমার স্বামীকে হত্যা করে। এমনকি আমার স্বামীকে গুলি করার পর তাদের নিজেদের কথোপকথন আমাদের কানে আসছিল। সেখানে তারা বলছে, ‘এইবার গাড়িতে গুলি কর।’
এদিকে একরামুল হককে গুলি করার আগে ও পরে র্যাবের কথোপকথনের অডিও রেকর্ড হাতে এসেছে। ওই অডিও রেকর্ডে শোনা যায়, এ প্রান্ত থেকে স্ত্রী আয়েশা বেগম কথা বললেও ওপাশ থেকে কোন উত্তর আসে না। আয়েশা বারবার জানতে জানতে চান ফোন কে রিসিভি করেছে। তিনি নিজের পরিচয় দেন, আমি কমিশনারের স্ত্রী বলছি, ফোন রিসিভি করেছে এটা কে? ওপাশে অপরিচিত কন্ঠের কেউ একজন একরামকে বলছে, তুমি তাহলে জড়িত নও? একরাম উত্তর দেন, না। অডিও রেকর্ডের এক মিনিট ৩ সেকেন্ডের মাথায় বন্দুক লোড করার শব্দ পাওয়া যায়। এরপর একটি গুলি চলে। আর্তনাদ করে উঠেন একরামুল হক। আবারও গুলি চলে। ফোনের অপরপ্রান্তে ও আল্লাহ বলে বিলাপ শুরু করেন একরামুল হকের স্ত্রী আয়েশা বেগম।
তিনি বলেন, আমার জামাই কিছু করে নাই। ১২ মিনিটি ৫২ সেকেন্ড দৈর্ঘ্যের ওই অডিও রেকর্ডে অপরিচিত লোকজনকে কথা বলতে শোনা যায়। হুঁইশেল বাজে। অপরিচিত কেউ বলে উঠে, ‘কুত্তার বাচ্চারে ধর’। দৌড়াদৌড়ির শব্দ শোনা যায়। নিজেদের মধ্যে কথা বলতে থাকেন অপরিচিত লোকজন। কয়টা গুলি করা হয়েছে, অস্ত্র কি দেওয়া হয়েছে এসব কথা শোনা যায়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে আয়েশা আরও বলেন, ঘটনার পর আমার মেয়ে ও একজন নিকটাত্মীয়কে নিয়ে দৌড়ে থানায় যাই। থানায় গিয়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ঘটনা খুলে বললে তিনি নাম ঠিকানা জিজ্ঞেস করে আমাদের জানান, ‘একটু আগে মেরিনড্রাইভে বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে। তাতে একরামুল হক নামে একজন নিহত হয়েছেন।’ এসময় আমি পাগলের মতো হয়ে যাই। পর দিন আমার স্বামীর লাশ বুঝিয়ে দেওয়া হয়। রোববার রাতে টেকনাফ পাইলট হাইস্কুল মাঠে মরহুমের জানাযা সম্পন্ন হয়। হাজার হাজার মানুষ সেই জানাযায় সমবেত হয়েছিল। তারা তাদের প্রিয় মানুষটির জন্য কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। আমার স্বামীকে কারা ডেকে নিয়ে হত্যা করেছে। তার মোবাইল কল লিস্ট উদ্ধার করলে অবশ্যই বেরিয়ে আসবে, এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা জড়িত।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত একরামুল হকের দুই মেয়ে তাহিয়াত ও নাহিন এসময় বিলাপ করতে থাকেন। অঝোরে কাঁদেন আয়েশা এবং একরামের বড় ভাই নজরুল ইসলামও।
আয়েশা বেগম লিখিত বক্তব্যে আরও বলেন, গত ২৬ মে শনিবার আমার স্বামী একরামুল হককে টেকনাফে দায়িত্বরত একটি গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএআই’র এক কর্মকর্তা জমি কেনার কথা বলে মোবাইলে ফোন করে ডেকে নেন। এর প্রায় ৩ সপ্তাহ আগে থেকে ওই কর্মকর্তা জমি ক্রয়ের কথা বলে আমার স্বামীর সাথে যোগাযোগ করতে থাকেন। তিনি র্যাব এর একজন কর্মকর্তার সাথেও আমার স্বামীকে পরিচয় করিয়ে দেন। তারা মেরিন ড্রাইভের কাছে জমি কেনার কথা বলে আমার স্বামীর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করতে থাকেন। আমার স্বামী মেরিন ড্রাইভে তার পরিচিত কয়েক ব্যক্তির জমি বিক্রির জন্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তাদেরকে কয়েক দফা দেখাতেও নিয়ে যান। সর্বশেষ ২৬ মে আবারও জমির কথা বলে ঢাকা থেকে উর্ধ্বতন কর্মকর্তা কথা বলতে এসেছেন বলে পর্যটন হোটেল নেটং এ দেখা করার জন্য তাকে ডাকতে থাকেন। এক পর্যায়ে আমার স্বামী সরল বিশ্বাসে তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে শনিবার রাত আনুমানিক সাড়ে ৯ টার দিকে বাড়ি থেকে বের হন। যাওয়ার সময় তার কাছে মোটর সাইকেলের তেলের টাকা না থাকায় আমার কাছে কিছু টাকা চান। আমি দুইশ টাকা দিলে সেটি না নিয়ে তিনি পার্শ্ববর্তী নাফ হোটেলের ম্যানেজারের কাছ থেকে পাঁচশ টাকা ধার নিয়ে বাড়ি থেকে রওনা হন। তাকে ডেকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
শুধু তাই নয় বিবৃতিতে র্যাব একরামুল হকের পিতার নাম মোজাহের মিয়া প্রকাশ আব্দুস সাত্তার ও ঠিকানা নাজিরপাড়া উল্লেখ করেছে। প্রকৃতপক্ষে তার পিতার নাম মৃত আব্দুস সাত্তার ও সাং কায়ুকখালী পাড়া, টেকনাফ পৌরসভা।
একরামুল হকের স্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই।’







