চ্যানেল আই অনলাইন
Advertisement
English
  • সর্বশেষ
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • রাজনীতি
  • খেলাধুলা
  • বিনোদন
  • অপরাধ
  • অর্থনীতি
  • আদালত
  • ভিডিও
  • জনপদ
  • প্রবাস সংবাদ
  • চ্যানেল আই টিভি
No Result
View All Result
চ্যানেল আই অনলাইন
En

আমার বাবা: একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রতিকৃতি

ঞ্যোহলা মংঞ্যোহলা মং
৪:০৩ অপরাহ্ণ ০৫, মে ২০১৮
মতামত
A A

বাবা মেট্রিকুলেশন পাশ করেছেন জেনে মানিকছড়ি রাজবাড়ি থেকে খবর আসে, অনেক পড়ালেখা হয়েছে, এবার বিয়ে করতে হবে। প্রথমে রাজী না থাকলেও কয়েকবার তলব করায় দাদা-দাদী বাধ্য হয়ে এ বিয়েতে রাজী হয়েছিলেন। কথা ছিল বাবাকে আরও পড়ালেখা করানো হবে। বাবারও স্বপ্ন ছিল ময়মনসিংহের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করার। কিন্তু রাজা আশ্বাসের বাইরে আর এগুলেন না। তাই রাজার মতিগতি বুঝতে পেরে বাবা মাকে নিয়ে মহালছড়ি ফিরে আসেন।

বাবাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে বিয়ের গল্প দিয়ে শুরু করলাম এ কারণে যে রাজা মংপ্রু সাইনকে আমরা জানি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। তিনি যুদ্ধের সময়ে তার রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত খুলে দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু যে সার্কেলের প্রজাদের রাজা তিনি, সেই প্রজাদের পড়ালেখা, জানাশুনা তার চাইতে বেশি হোক তা তিনি কখনো চাননি। সম্ভবত এ কারণে সার্কেলের লোকজনও তাকে মনে রাখেনি। বাবা প্রায়ই বলে থাকেন ‘রাজার কথা শুনলে পরিবারের সকলে আজ মাদকাসক্ত হয়ে থাকতে হতো’। বলা ভালো, একদিন মায়ের এক আত্মীয় আফু মংসাপ্রু কারবারীর হাত ধরে রাজার আত্মীয়-স্বজনদের দেখতে গিয়েছিলাম। সকাল দশটা বাজে তখনো তাদের চোখ ছোট ছোট লাল হয়ে রয়েছে। রাজার আশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে বেশিদূর যেতে না পারলেও বাবা কিন্তু তার একমাত্র ছোট ভাইকে দাদুর সাথে মিলে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াতে পেরেছিলেন। যিনি বংশের প্রথম সরকারি কর্মকর্তাও বটে।

মেট্রিকুলেশন পাশের পর রাজার খবরের পাশাপাশি নানা চাকরির প্রস্তাবও আসতে থাকে। প্রথম প্রস্তাব আসে পুলিশ হতে। দাদু রাজী হননি। (সেই সময়ে মহালছড়ি এলাকায় আসামীরা ধরে পুলিশকে পিটিয়েছে এমন একটি খবর প্রচার ছিল। আর তখন দুই একজন পুলিশকে শুধু লাঠি নিয়ে জঙ্গল পথ ধরে আসামিদেরকে মহালছড়ি থেকে রামগড় পর্যন্ত নিয়ে যেতে হতো। কি সাংঘাতিক!) বাবার ইচ্ছা থাকলেও দাদু বাবাকে পুলিশ হতে দেননি। সিঙ্গিনালায় মিডল ইংলিশ স্কুল বা এম ই (তখন এলপি স্কুল বলতে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বোঝাতো; ইউপি ছিল পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত, এমই ষষ্ঠ শ্রেণি, জুনিয়র অষ্টম শ্রেণি এবং তারপর ছিল হাইস্কুল) স্থাপিত হলে সেখানে শিক্ষকতা শুরু করেন তিনি, পরে এক সময় কৃষি বিভাগে কাজ করতে বরকল পর্যন্ত গিয়েছিলেন। সেখানে প্রায় ১ বছর থাকার পর চাকরি ছেড়ে দিয়ে আবার মহালছড়িতে ফিরে আসেন। এক সময় দাদু আর বাবা একই সময়ে ইউনিয়ন কাউন্সিলে মেম্বার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। বাবা চেয়ারম্যান হিসেবে প্রার্থী হয়ে ১ ভোটে হেরেছিলেন বলেও জানা যায়।

জনপ্রতিনিধি হিসেবে দাদু আর বাবা কেমন ছিলেন তা প্রথম জেনেছিলাম লংদুক্সা গোত্রের লোকজনদের কাছ থেকে। মূলত যে-সময়ে বাবার পিছনে পিছনে বাজার করতে যাওয়া শুরু করেছিলাম তখন থেকে। মহালছড়ি উপজেলায় লংদুক্সাদের বসতি মহালছড়ি ও মুবাছড়ি এই দুই ইউনিয়নের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে দেখা যায়। লংদুক্সাদের সচরাচর শুধুমাত্র সাপ্তাহিক বাজারদিনগুলোতে দেখা যায়। তারা বেচাবিক্রিও করে থাকেন বাজারের একটি নির্দিষ্ট জায়গায়, যেমন: জুমে উৎপাদিত শাক-সবজি হলে মাছবাজার সংলগ্ন সড়কে আর বাঁশগাছ হলে উপর বাজার আর নিচ বাজার সংযোগ সিঁড়ির বাম দিকে।

তারা বাবা এবং দাদুকে ভালো মানুষ বলে জানেন এবং খুব সম্মান করে থাকেন। বাবা এবং দাদু মেম্বার থাকাকালিন প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকেন বলে তারাই (লংদুক্সা) নাকি বেশি করে ত্রাণ এবং অন্যান্য সেবাদি পেতেন। সেই থেকে বাবা আর দাদুর প্রতি তাদের ভালবাসার জম্ম। ছোটবেলায় দেখেছি বাজার দিনে তাদের অনেকে আমাদের বাড়িতে বিশ্রাম নিতে আসতেন। দুপুরের ভাত খেয়ে আবার গ্রামের পথে চলে যেতেন। আবার তাদের অনেকে ধার হিসেবে আমাদের সমতলের ধান নিয়ে যেতেন এবং সময়ে তাদের জুমে উৎপাদিত ধান দিয়ে পরিশোধ করতে আসতেন। স্বাধীনতার এত বছর পরেও এখনকার ইউনিয়ন মেম্বার আর চেয়ারম্যানরা সেই গ্রামগুলোতে পৌঁছাতে পেরেছেন কিনা জানি না তবে এই চেয়ারম্যান মেম্বারদের সাথে ওই মানুষদের সেই রকম সখ্য/পরিচিতি যে থাকবেনা তা নির্দ্বিধায় বলা যাবে।
স্বাধীনতার পরে গ্রামে ফিরলে পুড়ে যাওয়া ঘর থেকে কালো কয়লা-মাখা আধাপোড়া খুঁটি দিয়ে ঘর নির্মাণ করে আবার নতুন করে সংসার শুরু করেন বাবা। ঘরের চারপাশে গাছপালার অভাব ছিল না, কিন্তু কালো কয়লা মাখা খুঁটিগুলো দিয়ে ঘর তৈরি করেছিলেন (খুঁজলে এখনো দু’-একটি পাওয়া যাবে), কারণ তারা যুদ্ধের স্মৃতিকে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন।

অবশেষে শিক্ষকতাকে স্থায়ী পেশা হিসেবে গ্রহণ করে সেখানে ডুবে থাকলেন তিনি। এ ডুবে থাকা কেমন একটি উদাহারণ দিলে তা বোঝা যাবে। ১৯৯১ সালের এপ্রিল মাসে বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল। সে-ঝড়ে আমাদের সবকটি ঘর (৪টি ঘর ছিল) ভেঙ্গে মাটির সাথে লেগে গেলো। ভোর হওয়ার আগে আগে বাবা শার্ট-প্যান্ট পরে সোজা নিজের স্কুলের দিকে যাওয়ার জন্য তৈরি হরেন। এটা দেখে মা বললেন ‘কোথায় যাও, আমরা কোথায় থাকবো’। বাবা বললেন ‘তোমরা এই দিকটা সামলাও আমি ভাতের পাতিলটা দেখে আসি’। ভাতের পাতিল মানে তার স্কুল। স্কুলের সবকিছু দেখভাল করে সন্ধ্যার আগে আগে বাড়ি ফিরলেন। আমার খুব মনে আছে সেদিন থেকে আমার ভেজা জ্বালানি কাঠ দিয়ে চুলায় রান্নার প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছিল।

Reneta

স্কুলকে তিনি ভাতের পাতিল, মন্দির, বিহার ইত্যাদির সাথে তুলনা করে থাকেন। আমার জীবনে তাকে কোনদিন কোন অজুহাতে স্কুলে না যেতে, ফাঁকি দিতে দেখিনি। স্কুলে কোন শিক্ষক অনুপস্থিত থাকবেন জানলে আমাকে খবর দিয়ে যেতেন, আমি যেন স্কুলে যাই। তার কথা মতো আমাকে সেখানে উপস্থিত থাকতে হতো। যে-শিক্ষক অনুপস্থিত বা ছুটিঁতে থাকেন তার ক্লাসটি আমাকে নিতে হতো। শুধু তাই নয়, পাড়ার ছেলেমেয়েদেরকেও তার সঙ্গে স্কুলে নিয়ে যেতেন। তার উদ্যোগে একদিন গ্রামের পাশে স্কুল স্থাপিত হলে স্কুলের চারপাশে সকল গ্রামের ছেলেমেয়েকে স্কুলে নিতে নিজেই গ্রামে গ্রামে গিয়ে ধরে আনতেন। অভিভাবকদের বুঝাতেন। এমনও দেখেছি, ছেলে বড় হয়ে হাল চাষ করতে শিখেছে, অভিভাবকেরা কোনভাবে স্কুলে দিতে নারাজ সেই ছেলেদেরকেও জোর করে ধরে স্কুলে আনতেন। চাকমা পাড়ার কিছু পরিবার বাবার এমন কাণ্ড দেখে খুব বিরক্ত হতেন, অনেকে বকাও দিতেন। তবে বাবা বলতেন ‘একদিন আমার কথা বলবে’। ঠিকই আমার এক বন্ধুর বাবা বেঁচে থাকতে বাবাকে সামনে রেখে প্রশংসা করতে দেখেছি। বাবার প্রচেষ্টায় তার সব ছেলে পড়ালেখা করে বর্তমানে ভালো চাকরি করছেন।
বাবা যে স্কুলে বদলি হতেন সেই স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা বৃত্তি পেতো। স্কুলকে বাড়ির ন্যায় ভালবাসতেন বলে স্কুল প্রাঙ্গণ গাছপালা আর ফুলে ভরিয়ে দিতেন। মহালছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে কটি বড় গাছ দাঁড়িয়ে রয়েছে তা বাবার লাগানো। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ উপজেলা পর্যায়ে একাধিকবার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন তিনি।

তার লাগানো গাছ

বাবা যে ভালো মানুষ তা আমরা সহজে বুঝতে পারতাম। কখনো কোথাও একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে কিংবা সন্ধ্যা নাগাদ বাজারে দেখলে অনেকেই (পরিচিত কিংবা অপরিচিত) আমাকে বলতেন ‘এই মাস্টারের ছেলে এখানে কী করছো, বাড়ি যাও, বাড়ি যাও’। সকলে এভাবে চোখে চোখে দেখে রাখতেন বলে আমাদের কারো মদ খাওয়া, সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়নি। এলাকার লোকজন বলতে গেলে সুযোগই দেননি। বাবা যেদিন চাকরি মেয়াদ পূর্ণ করলেন সেদিন তার স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের চোখে পানি দেখেছি। বিশাল এক দল ছাত্রছাত্রী আর শিক্ষক-শিক্ষিকা মিলে বাবাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে যান।

শিক্ষকতা শেষ হলেও এলাকার কিছু উদ্যোগী লোক প্রথমবারের মতো কেজি স্কুল চালু করলে বাবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়; সেখানে বাবা কয়েক বছর পর্যন্ত সময় দেন। কেজি স্কুলটির পাশে আমার এক স্কুল সহপাঠি মোরশেদের দোকান ছিল। সে একদিন আমায় বলেছিল ‘স্কুলের নাম ছিল (সাইনবোর্ডটি দেখিয়ে) কিন্ডার গার্ডেন। আর তোর বাবা সংশোধন করলো কিন্ডার গার্টেন। তোর বাবা ঠিক আছে তো?’ সেদিন কোন উত্তর দিতে পারিনি। তবে অনেক পরে জানলাম বাবা ঠিকই ছিলেন।

মহালছড়িতে প্রথম দিকের মিডল ইংলিশ স্কুলে শিক্ষকতা করতে গিয়ে কিছু ছাত্র পেয়েছিলেন তিনি, যারা পরবর্তী সময়ে নানা ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন; যেমন সুধা সিন্দু খীসা, উহলা প্রু চৌধুরী, বুদ্ধজয় চাকমা প্রমুখ। বাবা শুধু পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে ছাত্রদের ধরে আনতেন না তার সাধ্যের মধ্যে বন্ধু আর আত্মীয়দের চাকরি করতে অনুপ্রাণিতও করেছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী সমাজে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল বলে সেই সময়ে অনেক শিক্ষিত ছাত্রছাত্রী চাকরি করতে চাইতেন না। চাকরি করতে উৎসাহিত করার পাশাপাশি চাকরি পাইয়ে দিতে সাহায্য করেছিলেন এমন কয়েকজনের মধ্যে আছেন স্কুল শিক্ষক বিমল চাকমা, মংসানাই মারমা প্রমুখ। এমন তালিকা আরো লম্বা করা যাবে, যেখানে আমার আনেক সহপাঠি বন্ধুরাও আছেন।

স্কুল শেষে অবসর সময় মিললে গাছপালা লাগিয়ে বাগান করতেন। উপজেলা পর্যায়ে সমবায় সমিতির সভাপতি হিসেবে সদস্যদের লোনের ব্যবস্থা করতে সাহায্য করতেন যাতে তারা কৃষি এবং শিক্ষা খাতে ব্যয় করতে পারেন। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে সামনে থেকে স্বেচ্ছাসেবকের কাজও করতেন। প্রধান শিক্ষক হিসেবে বিদায় অনুষ্ঠানে তখনকার উপজেলা চেয়ারম্যান দীপালো চাকমাকে বলতে শুনেছি, বাবা নাকি কোন এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য অনেক যুবক থাকতে টেলিভিশনটি নিজেই বহন করছিলেন। মানুষের মরা মৃত্যু, ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণের চেষ্টা করেন। অবসরের পরে, এক সময় পার্বত্য অঞ্চলের দুই বিখ্যাত ধর্মীয় ভিক্ষুর ভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন, খুব যেতেন তাদের কাছে। পরে, অবশ্য, উক্ত ভিক্ষুদের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। যেখানেই যান সেখানকার ব্যাপারে তার একটি নিজস্ব পর্যবেক্ষণ থাকত। হয়ত ওই ভিক্ষুদের ব্যাপারে এমন কোন পর্যবেক্ষণ ছিল যা তাকে সেখানে আরও যেতে নিরুৎসাহিত করেছে।

সন্তানদের পড়ালেখা, খাওয়া-দাওয়া, কাপড়-চোপড় নিশ্চিত করতে খুব একটা অবসর পাননি তিনি। আমি খুব বুঝতে পারতাম, এলাকার কিছু অবস্থাসম্পন্ন পরিবার বাবার মেধাকে কম অর্থে ব্যবহার করেছিলেন। বাবাও বাধ্য ছিলেন নিজের ছেলেমেয়েদের সময় না দিয়ে অবস্থাসম্পন্ন ছেলেমেয়েদের পিছনে সময় ব্যয় করার। দুই একটা পরিবার তো বাবার সরলতার সুযোগ নিয়ে ছেলেমেয়েদেরকে আমাদের বাড়িতে থেকে পড়ালেখার বন্দোবস্ত করেছিলেন। বিশাল পরিবার চালাতে বাবা হিমসিম খেতেন। বাজারে মুদির দোকানগুলোতে বকেয়া থাকতো। অনেক সময় মাসের বকেয়া মাসের মধ্যে পরিশোধ করতে পারতেন না। কতবার দেখেছি বেতনের চেক অগ্রিম দোকানদারদের দিয়ে রাখতে। কোন কোন মাসে দিতে দেরি হলে দোকানদারদের অগ্রিম চেকসহ আরো বাড়তি সুদ দেয়ার মাধ্যমে সময় চেয়ে নিতেও দেখেছি।

কোনো এক সাপ্তাহিক বাজার দিনে কেনাকাটা শেষে বাবাকে এক প্যাকেট সল্টেড বিস্কুটের জন্য বায়না ধরেছিলাম। বাবা রাজি হয়ে একটি দোকানে গিয়ে বিস্কুট চাইলেন এবং বললেন লিখে রাখতে। দোকানদার বাজার দিনে লিখে রাখা যাবে না বলে ফিরিয়ে দিলে বাবা আমার দিকে তাকিয়ে লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিলেন তা খুব মনে রেখেছি। আমার মাথায় হাত রেখে বললেন ‘পরে কিনে দিবো’। বাজার শেষে সেদিন বাবার আর কোন টাকাই ছিল না। এমনি কতজনের কাছ থেকে লজ্জা পেয়েছেন, কতজন বাবাকে নিজে না খেয়ে ছেলেমেয়েদেরকে পড়ালেখা করানোর জন্য লজ্জা দিয়েছেন তা আমি কাছ থেকে দেখেছি। কলেজ পর্যন্ত বাবার পিছনে পিছনে থাকতাম বা রাখতেন বলে অনেক অনেক দেখেছি। মহালছড়ির যে দোকানগুলোতে বাবা বাজার করতেন তারা কতভাবে বেশি লিখে রাখতেন তা-ও দেখেছি। যারা আদিবাসীদের সরলতার সুযোগে বেশি নিতেন, শোষণ করতেন, তারা কিন্তু খুব একটা ভালো করতে পারেননি। অনেক দোকানদারকে আর মহালছড়িতে খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার পাওয়া গেলেও মলিন মুখ নিয়ে তাদের দোকানে বসে থাকতে দেখা যায়। অনেকের দোকানতো ছোট হতে হতে খুঁজে পাওয়া এখন কঠিন। দুই এক দোকানদারকে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে যেতেও দেখেছি। তাদের দেখলে মনে মনে প্রশ্ন করি, প্রকৃতি তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করেনি তো?

ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার খরচ জোগাড় করতে গিয়ে কোনদিন দামি কাপড় কিনতে পারেননি। উপজেলায় হাজারো শিক্ষকদের ভিড়ে বাবা ছিলেন আলাদা, তাই নানা অনুষ্ঠানে তাকে থাকতে হতো বলে হাতেগোনা দু একটি কাপড়কে নিত্য ধুয়ে রাখতে হতো। কতবার আমি বাজার থেকে তার ভিজে কাপড় জোর করে ইস্ত্রি করে শুকিয়ে এনেছি তার হিসাব নেই। ইস্ত্রি দোকানদার বলতেন ‘এত ভেজা কী করে ইস্ত্রি করবো?’ তবে তারা বাবাকে জানতেন ও ভালবাসতেন বলে তা করে দিতেন।

আমাদের পড়ালেখার সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিল খুবই উত্তপ্ত। বাড়িতে অনেক ফলমূল, কাঁঠাল, কলা, গর্জন আর সেগুনের বাগান থাকলেও বিক্রি করলে দাম পাওয়া যেতো না। একদিকে ‘খারাপ যোগাযোগ’ অন্যদিকে ক্রেতাদের সিন্ডিকেট থাকার ফলে আমাদের হাতে থাকা কোন জিনিসের দাম কমার বদলে বাড়তো না। এমন এক সময় ছিলো যখন বাজারে কোন জিনিস বিক্রি করতে গেলে প্রথম দিকে যে-দামে চাইতো তাতেই দিয়ে দিতে হতো; পরে আরো কিছু দামের আশায় বসে থাকলে সংঘবদ্ধ ক্রেতারা পূর্বের দাম না দিয়ে কমে কিনতে চাইতো এবং এক সময় বিক্রেতা বাধ্য হতো আরো কম দামে বিক্রি করতে। সংঘবদ্ধ ক্রেতারা জানতো বিক্রেতাকে তাদের কাছে বিক্রি না করে ফেরত নেয়ার কোন সুযোগ নেই।
স্কুল থেকে ফিরে বাবা অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের ছেলেদের পড়াতে বসলে আমি যেতাম মুরগি বিক্রি করে চাল কিনতে (বছরে দুই থেকে তিন মাস চাল বাজার থেকে কিনতে হতো)। ভোরে বাবা জাগিয়ে দিতেন দূরের থলিপাড়ায় গিয়ে ধান ক্ষেতে পাখি তাড়াতে। স্কুল জীবনে আমাকে, আমাদেরকে সব মিলিয়ে ১ মাস পড়াতে পেরেছিলেন কিনা সন্দেহ রয়েছে।

স্কুলে আমার বন্ধুরা প্রায় সকলে প্রাইভেট পড়তো। আমি মোট দু মাস জোর করে পড়তে চেয়েছিলাম। ১ মাস পড়েছিলাম কালাম স্যারের কাছে আর ১ মাস পড়েছিলাম বাদল স্যারের বাড়িতে (তার শ্যালক পড়াতেন)। এই দু মাসের প্রাইভেট টাকা পরিশোধ করতে আমার অনেক মাস লেগেছিল। বাবা দিতে পারতেন না। কালাম স্যার তো আমার প্রতি বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। আমিও বেতন না দিতে পারার লজ্জা-ভরা মুখ নিয়ে স্কুলে যেতাম। যেদিন ৩০০ টাকা পরিশোধ করতে পেরেছিলাম সেদিন মনে হয়েছিল আমি এক মুক্ত স্বাধীন এক ছাত্র। টাকা পরিশোধ করতে পারছিলাম না বলে কালাম স্যার নানাকথা শুনিয়েছিলেন। তবে হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক শাহজাহান পাটোয়ারী স্যার বাবাকে খুব ভালবাসতেন। বাবার অন্যান্য কলিগ বাবাকে অন্য উচ্চতায় দেখতেন।

বাবা আমাদের পড়ার খরচ যোগাতে গিয়ে কত রাত জেগে কাটিয়েছিলেন তা আমি জানি। বাবা টাকার কষ্টে থাকলে আমি বুঝতে পারতাম। অর্থের চিন্তায় ঘুমাতে পারতেন না। এপাশ ওপাশ করতেন। জেগে যে রয়েছেন সেই শব্দ পেতাম (চিন্তায় থাকলে বিছানায় কাশির ন্যায় শব্দে জেগে থাকতেন)। ছেলেমেয়েরা নানা জায়গায় পড়ালেখা করতেন বলে চিঠি আসতো প্রতি সপ্তাহে। কিছু চিঠি সংগ্রহ আর প্রেরণ হতো আমার হাত দিয়ে। অধিকাংশ চিঠির বক্তব্য একটাই, টাকা দরকার। চিঠির শুরুতে লিখতে হয় বলে সকলে লিখতেন ‘আশা করি আপনি ভাল আছেন’। তার পর সমস্যা শুরু এবং শেষ হতো টাকা দরকার দিয়ে। পড়ালেখা চলাকালিন কোন ভাইকে দেখিনি টাকার প্রয়োজন নেই তিনি কিছুটা উর্পাজনের চেষ্টা করছেন বলে চিঠি পাঠাতে। মা বাবার কষ্ট আমরা ভাই-বোনেরা কতটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছি, জানি না।

বাবা কম টাকায় জীবন চালিয়ে নিতে শিখেছিলেন বলে জীবনে তার কোন দুঃখ নেই। না পাওয়ার বেদনাও নেই। বাবাকে কোনদিন দেখিনি কোন ছেলেমেয়ের কাছ থেকে টাকা চেয়ে নিতে, জোর দিয়ে টাকা চাইতে। টাকা পেলে মুচকি হাসি দিতেন এইটুকু। আর হাতে টাকা দিতে চাইলে আগে বলবেন, ‘তোমার চলবে কি না দেখ, তারপর দাও’।

মাকে নিয়ে পূর্বের ( এ একই নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত) এক লেখায় বলেছি মা-বাবা নির্লোভ এক দম্পতি। নিজের পেনশনের টাকা দিয়ে পার্বত্য পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে মাটির ঘর নির্মাণ করলেন গ্রামের অদক্ষ শ্রমজীবী মানুষদের দিয়ে। বাবাকে ভালো মিস্ত্রি দিয়ে ঘর তৈরি করতে বললে বললেন, ‘আমার ঘর বানানোর মাধ্যমে গ্রামবাসীরা যদি কিছু টাকা পায় খারাপ কি’। বাড়ি, কৃষি আর বাগানের কাজকর্ম সবসময় গ্রামের লোকজনদের দিয়ে করাতে পছন্দ করেন। তিনি শুধু পরিবার নয় পরোক্ষভাবে গ্রামবাসীদেরকেও আগলে রাখেন। গ্রামে কারবারী (গ্রাম প্রধান) হিসেবে ছোটখাট বিচারও করতে হয় তাকে। তার প্রায় সব বিচারের উপসংহার হলো, ভুল ভেঙে মিলেমিশে বসবাসের চেষ্টা করো। তিনি বিচারে নারীদের দোষী বলতে সবসময় সর্তক থাকেন। নারীটি কোন প্রেক্ষাপটে সেটি করেছে তা বুঝানোর চেষ্টা করেন। গ্রামে বলতে গেলে অধিকাংশ জায়গা দাদুর আর বাবার (কাপ্তাই বাঁধের সৃষ্ট সংকটে দাদুরা প্রথম পাড়াটি সৃষ্টি করেছিলেন)। সংরক্ষণের নামে জায়গা জমিতে শক্ত বেড়া (সীমানা) দেয়া শুরু করলে গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের গৃহপালিত পশুপাখির বিচরণক্ষেত্রের অভাব হবে বুঝতে পারেন বলে সব সময় সীমানাগুলো ঢিলেঢালা রাখেন (আমাদের পাড়াটি মাত্র ৩ পরিবার দিয়ে শুরু হলেও সেখানে বর্তমানে শুধু মারমা পরিবার আছে ২৫ এর অধিক, যারা অধিকাংশই গ্রামের এক মহাজনের রাখাল হতে এসে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়া শ্রমজীবী মানুষ)।

বাবা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন মানুষও। পাড়ায় এনজিও কাজ করতে এলে বিষয়টি ভালোভাবে বুঝার চেষ্টা করেন। কমিউনিটি এমপাওয়ারমন্টে (সিপি) প্রকল্পের আওতায় গ্রামে কাজ করতে চাইলে ৪ লক্ষ টাকার লোভে অনেকে গ্রামকে দুই ভাগে ভাগ করতে চেয়েছিলেন। গ্রামটি ভাগ হওয়ার মতো যথেষ্ট উপাদানও ছিল, যেমন; চাকমাদের জন্য চাকমা বিহার, মারমাদের জন্য মারমা বিহার, চাকমাদের বসতি উত্তরে আর মারমাদের বসতি দক্ষিণে ইত্যাদি। কিন্তু অনেক ধৈর্য্য সহকারে পাড়াভাঙন রোধ করতে পেরেছিলেন তিনি। স্থানীয় বাস্তবায়নকারী সংস্থার কিছু কর্মীকে ধমক পর্যন্ত দিয়েছিলেন বলেও শোনা যায়। চাকমা আর মারমা মিলে বিরাট গ্রামের জন্য সীমিত অর্থ দিয়ে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন গ্রামের অনেকের কাছে পছন্দ না হলেও গ্রামের সার্বিক উন্নয়নে গঠনমূলক একটি কাজ করেছিলেন, বলা যায়। আমার বাবার ন্যায় উক্ত প্রকল্পের গ্রাম/পাড়া পর্যায়ে সভাপতি থাকলে শুধু ঐ প্রকল্পটি দিয়ে পার্বত্য সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন সাধন করা খুব একটা কঠিন হতো না বলে বিশ্বাস করি (প্রকল্পটির অধীনে গ্রাম পর্যায়ে অধিকাংশ কর্মী ছিল খুবই তরুণ এবং অনভিজ্ঞ, যাদের বিশ্লেষণ জ্ঞান গ্রামীণ অভিজ্ঞদের সহায়তা করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। ফলে গ্রাম পর্যায়ে আলু, কচু, হলুদ, আদা আর গরু প্রকল্পই হয়েছে বেশি)।

মহালছড়ি গেলে আমার ভালো লাগে। মহালছড়ি শুধু আমাদের জম্মস্থান নয় তারও বেশি কিছু। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মহালছড়ি আক্রমণ করতে পাকিস্তানি শত্রুরা অগ্রসর হতে থাকার খবর পেয়ে বাবাই প্রথম থানায় গিয়ে খবর দেন। সেখানে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধারা তার কথা প্রথমে বিশ্বাস করতে চাননি। তারা শক্রদের অবস্থান দেখাতে হবে বলে বাবাকে সম্মুখদিকে রেখে সিঙ্গিনালার দিকে যেতে থাকেন, একসময় সত্যিই সত্যিই শত্রুদের ভয়ে পাড়াবাসিদের পালাতে দেখেন। তবে রাত হয়ে যাওয়ায় সেদিন মুক্তিযোদ্ধারা বাবাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌছে দিয়ে গিয়েছিলেন। মা বলেন, ‘বাবা যখন ঘরে ফিরেন তখন গভীর রাত। সেই সময় মহালছড়িতে সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমান অবস্থান করছিলেন। বাবা যে ছাতা হাতে নিয়ে সংবাদটি দিতে গিয়েছিলেন ভুলে সেই ছাতাটি থানায় রেখে এসেছিলেন’। মুক্তি সংগ্রামে বাবার ছোট অবদান আমাকে গর্বিত করে।

মহালছড়ি নিচু বাজারে যে বট গাছটি দাঁড়িয়ে আছে (উপর বাজারে বাদল দোকানের সামনেও একটি বট গাছ ছিল যেটি কেটে ফেলা হয়েছে) তা আমার দাদুর লাগানো। আবার উপজেলা পরিষদের সামনে বর্তমানে যে বিশাল বটগাছটি রয়েছে সেটি আমার এক আত্মীয়ের (রুইউ মহাজন) হাতে রোপন করা। মহালছড়ি হাইস্কুলের দিকে যেতে আবাসিক বিদ্যালয়ের ভিতরে যে সেগুন গাছগুলো দেখা যায় সেগুলো আমার বাবার লাগানো। এমনি পুরাতন সিঙ্গিনালা ঘাটে যে একটি মাত্র গাছ রয়েছে সেটি বাবার রোপন করা। এ নানান স্মৃতিচিহ্ন আমাদের গর্বিত করে, উদ্বুদ্ধ করে মহালছড়ির পরিচয় দিতে, মহালছড়ির কথা বলতে।

বাবা এখনো বেশ হাসিখুশি। এখনো সময় মিললে গাছ লাগান। পাড়ার তরুণদের সাথে মজা করে বলেন ‘গাছ দেখে রাখবি একসাথে ফল খাবো’। তার কিছু প্রিয় ছাত্র রয়েছে যাদের কাছে তিনি সময় সুযোগ পেলে বেড়াতে যান। তবে প্রিয় ছাত্রদের মধ্যে অধিকাংশই নন-মারমা।

মা পরিবারে এবং পাড়ায় যতটা জনপ্রিয় সেই তুলনায় বাবা ততটা জনপ্রিয় নন। বাবা গ্রামবাসীদের নিজ সন্তানদের ন্যায় বকা দিয়ে থাকেন। পরামর্শ মতো কাজ না করলে রাগ করেন। অনেক সময় যা বুঝবেন তাই করবেন। গ্রামবাসীরা বিচারকার্যে আঘাতের বিনিময়ে আঘাত প্রত্যাশা করেন। কিন্তু বাবা তার ঠিক উল্টো; যেমন সহনশীলতা, ধৈর্য্য, ক্ষমা, যৌথ প্রচেষ্টা, সুযোগ সৃষ্টিতে তার অধিক পছন্দ। বাবার কাছে সবচেয়ে অপ্রিয় বাক্য স্বামীর মুখে স্ত্রীকে তালাক দেয়া। গ্রামবাসীরা বিভক্ত হয়ে অর্থ সংগ্রহের (সিইপি প্রকল্পের অধীনে পাড়াটি ভাগ হলে আরো ৪ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করা যেতো) চেষ্টা করলে বাবা বাঁধা দেন। এমনি কিছু তার অবস্থানের কারণে গ্রামে খুব একটা জনপ্রিয় নন। বাবা এখন আরো বুড়ো হয়েছেন তার কথা খুব কম লোকে শুনবে এটাই প্রত্যাশিত। তবে বাবা এখনো ছেলেমেয়েদের কাছে বেড়াতে এলে অতিরিক্ত দু/একদিনও থাকতে চান না। গ্রামে যেতে হবে, গ্রামবাসীদের দেখে রাখতে হবে বলে নিজেই যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে যান।

আবার এও সত্য যে নিজ গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করতে গিয়ে যে ভূমিকা পালন করেছিলেন তা গ্রামবাসীরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে থাকেন। গ্রামের স্কুলটিতে সভাপতি থাকাকালীন শিক্ষকদের উপস্থিতি এবং ফলাফলে খুশি হতে না পেরে সভাপতি হিসেবে স্বাক্ষর করতে তিনি শর্ত আরোপ করতেন। স্কুলটি যেন ঠিকমত চলে, এ জন্য। এমন ভূমিকার কারণে সভাপতি পদটি হারাতেও বেশি দিন সময় লাগেনি। বাবার কাজকর্ম এমনই, ভালোর জন্য হারানো, লজ্জার ইত্যাদি শব্দটিকে তিনি তেমন গুরুত্ব দিতেন না। গ্রামবাসীদের বকা দেন ঠিকই কিন্তু গ্রামের একমাত্র শ্মশানটি হাতছাড়া হলে নিজের জায়গায় একটি শ্মশান তৈরি করেন। বিহারের বিদ্যুৎ বিল নিজে একাই বহন করেন। আমি মাঝে মধ্যে বললে বলেন ‘যাদের নিত্যদিন নানা সমস্যা তাদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ বিলের জন্য অর্থ নেয়া ঠিক হবেনা’। পিতা মাতার স্মৃতি আগলে রাখার লোক হলেও খাগড়াছড়ি সড়কের পাশে থাকা চোংড়াছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জায়গাটির দাতা আমার বাবা।

আগেই বলেছি জীবনে শক্তি সামর্থ অনুযায়ী তরুণদের চাকরি পাইয়ে দিতে নানাভাবে সাহায্যও করেছেন। আমি কয়েকজনকে চিনি এবং তাদের অনেকে আমার সহপাঠি। বিভিন্ন স্কুলে ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হিসেবে থাকাকালীন নিয়োগে কমিউনিটির প্রতিনিধিত্ব প্রত্যক্ষ করতেন। তেমনি উপজেলা পর্যায়ে একটি হাইস্কুলে কোন মারমা শিক্ষক না থাকার যুক্তি উপস্থাপন করে একজন মারমা শিক্ষিকা নিয়োগে ভূমিকা রেখেছিলেন বলে জানি।

তবে বাবা একেবারে পরিপূর্ণ আর সমালোচনার উর্দ্ধে তা কিন্তু নন। বড় ছেলেদেরকে জোর করে তার পছন্দের বিষয়ে পড়তে বাধ্য করেছিলেন। পরিবারের অন্য সদস্যদের পরামর্শ খুব কমই শুনে থাকেন তিনি। সারাজীবন শিক্ষকতার কারণে কি না জানি না তার মনের মতো না হলে বকাঝকা করেন। এখন বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই রোগটি আরো বেড়েছে। পরিবারের মধ্যে দু’ভাই মাত্র শিক্ষিত হিসেবে (দাদা-দাদী পরিবারের দুই ছেলেকে পড়ালেখা করান মাত্র) আপন বোনের ছেলেমেয়েদেরকে পড়ালেখায় কার্যকর সহায়তা করতে দেখিনি। বাবা যদিও নানাসময়ে তাদের খাদ্যে, কৃষি কাজে, মাঝে মধ্যে পড়ালেখায় খরচ দিয়ে কিছুটা চেষ্টা করেছেন কিন্তু বোনদের শ্রমের বিনিময়ে তাদের দুই ভাইয়ের পড়ালেখা উপলব্ধি করতে কতটুকু পেরেছিলেন প্রশ্ন থেকে যায়। তবে বাবা কখনো দাদা-দাদীর যত্ন নিতে ভুল করেননি। আমি খুব বিশ্বাস করি পিতামাতাকে যত্ন নিলে নিজেও ভালো থাকা যায়, যার জ্বলন্ত উদাহারণ আমার বাবা। তার সাধ্যের মধ্যে দাদা দাদীকে মায়ের সহায়তা নিয়ে যত্ন করেছিলেন। পিতামাতাকে সেবার প্রতিদান হিসেবে এই বয়সেও বাবা বেশ সুস্থ আছেন, ভালো আছেন।

বাবা ছেলেমেয়েদের বিয়ের ব্যাপারে কোনদিন বাধা হয়ে দাঁড়াননি। বড় বোন ব্যতিত সকলে নিজের স্বাধীনতা নিয়ে পরিবার গঠন করেছেন। এদের মধ্যে এক ছেলে আর এক মেয়ের শ্বশুর-শ্বাশুড়ীকে প্রথম দিকে বাবাকে নানাভাবে অপমান করতে দেখেছি। কিন্তু বাবা কখনো মেয়েকে কিংবা ছেলেকে তা বুঝতে দেননি।

প্রত্যেকের বাবা মা বোধ হয় এমনই হয়। তারা আমৃত্য সন্তানদের কাছে অভিভাবক হয়ে বিরাট বটবৃক্ষের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকতে পছন্দ করেন। কিন্তু আমরা সন্তানরা কতটুকু তা উপলব্ধি করতে পারি! আমাদের শত ব্যস্ততার মধ্যেও বাবা মাদের খোঁজ খবর কতজনে রাখতে পারি! অন্তত নিজের বয়োবৃদ্ধ সময়টি সুন্দর করার জন্য প্রত্যেকে মা বাবার যত্ন নেয়া উচিত। অন্তত বাবার জীবনটি দেখে আমার তেমনটি মনে হয়।

শেষ করবো আরো একটি তথ্য দিয়ে। তা হলো, আজকালকার আদিবাসী সমাজে দুই একজন ছেলেমেয়েকে পড়ালেখা করানোর নামে (নিজেদের চাকরি থাকার পরও) জায়গা জমি বিক্রি করে পড়ালেখার খরচ যোগাতে দেখা যায়। কিন্তু আমার বাবা-মা, আমাদের ১১ ভাইবোনকে পড়াতে কোন জায়গা জমি বিক্রি করেননি। আমরা ভাইবোনরা বিক্রি করতে বাধ্য করিনি। দাদুরা কীভাবে জঙ্গল, পাহাড় কেটে চাষযোগ্য জমি তৈরি করেছেন তা বাবা খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বলে শত বাধার মধ্যেও জায়গা জমি রক্ষা করতে সফল হয়েছেন। আজকালকার পাহাড় সমাজে পূর্ব পুরুষদের ঘামে সৃষ্ট জমি কত পরিবার রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন তা তিন পার্বত্য জেলায় গেলে বুঝা যায়। হাজার হাজার পরিবার পাওয়া যাবে পরিবারে সকলে স্বচ্ছল কিন্তু নানা যুক্তি আর অজুহাতে পিতামাতার হাতে তৈরি করা চাষযোগ্য জমিসব হাতছাড়া করতে দ্বিতীয়বার ভাবেনি। এইক্ষেত্রে আমার বাবা ব্যতিক্রম। নিজ বাবার কাছ থেকে পাওয়া ভূমি এখনো আগলে রাখতে পেরেছেন। চারদিকে মারমা সমাজকে দেখে নিজের প্রতিষ্ঠিত ছোটভাইকে পর্যন্ত জমি ভাগ দিতে অনেক অনেক দেরি করেছেন। দেরিতে ভাগ দেয়ার একটাই কারণ তার বর্তমানে যেন পিতামাতার স্মৃতি হাতছাড়া না হয়। এই সব বিচারে আমার বাবাকে পাহাড়ি সমাজের জন্য সত্যিকারের একজন শিক্ষকই বলবো।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Channel-i-Tv-Live-Motiom

Jui  Banner Campaign
ট্যাগ: বাবা
শেয়ারTweetPin1

সর্বশেষ

ছবি: সংগৃহীত

দেশপ্রেমিক ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে রাষ্ট্র মেরামত করা হবে: তথ্যমন্ত্রী

মে ১৬, ২০২৬

জনগণের দাবি থাকলে কুমিল্লা বিভাগ হবে: প্রধানমন্ত্রী

মে ১৬, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে পাকিস্তানের জেএফ-১৭ পদক্ষেপ, আকাশশক্তির নতুন সমীকরণ

মে ১৬, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

রোববার ১৮ ঘণ্টা গ্যাস থাকবে না যেসব এলাকায়

মে ১৬, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

বিএনপির প্রবীণ নেতা মিজানুর রহমান সিনহা মারা গেছেন

মে ১৬, ২০২৬
iscreenads

প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
সম্পাদক: জাহিদ নেওয়াজ খান
ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড , ৪০, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণী, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮, বাংলাদেশ
www.channeli.com.bd,
www.channelionline.com 

ফোন: +৮৮০২৮৮৯১১৬১-৬৫
[email protected]
[email protected] (Online)
[email protected] (TV)

  • আর্কাইভ
  • চ্যানেল আই অনলাইন সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In
Bkash Stickey January 2026 Bkash Stickey September 2025 Desktop

Add New Playlist

No Result
View All Result
  • সর্বশেষ
  • প্রচ্ছদ
  • চ্যানেল আই লাইভ | Channel i Live
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • স্বাস্থ্য
  • স্পোর্টস
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • কর্পোরেট নিউজ
  • আইস্ক্রিন
  • অপরাধ
  • আদালত
  • মাল্টিমিডিয়া
  • মতামত
  • আনন্দ আলো
  • জনপদ
  • আদালত
  • কৃষি
  • তথ্যপ্রযুক্তি
  • নারী
  • পরিবেশ
  • প্রবাস সংবাদ
  • শিক্ষা
  • শিল্প সাহিত্য
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

© 2023 চ্যানেল আই - Customize news & magazine theme by Channel i IT