জাতিগতভাবে দেশের অধিকাংশ জনগণ সব কিছুতেই একসাথে এবং অতিরিক্ত কিছু একটা করতে পছন্দ করে বলে মনে হচ্ছে। এই ধরুন, ঈদের সময়টা। একটু আগে-পরে যাওয়ার চেয়ে আমরা সবাই একসাথে বাড়িতে যাই। ফলে কী হচ্ছে? তখন সরকার অতিরিক্ত যাতায়াত ব্যবস্থা করলেও সবাই একসাথে বাড়িতে যাওয়া কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থা সব সময় ঝুঁকিতে থাকে। অনাকাঙ্খিত ঘটনাও অনেক সময় ঘটে।
আর তাই স্যোশাল মিডিয়ার নিউজ ফিড আর মুল গণমাধ্যমের পাতায়-পাতায় শোভা পায় ট্রেন, বাস, লঞ্চের ছাদে ছোট-ছোট বাচ্চাসহ নারীদের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াতের দৃশ্য। উড়োজাহাজের ছাদে বসার ব্যবস্থা থাকলে হয়তো সেখানেও কিছু লোক উঠে বসে পড়ত!
আপনি একটু লক্ষ্য করলে দেখবেন, তিন, চার ঘন্টা জার্নি করার পর শুধু নামার সময় যাত্রীদের মধ্যে এক ধরনের তাড়াহুড়ো শুরু হয়ে যায়। কে কার আগে নামবে; এটি সড়ক, নৌ পথের বাইরে আকাশ পথের যাত্রীদের মাঝেও লক্ষ্য করা যায়।
কোটি-কোটি টাকা খরচ করে রাস্তা পারাপারের জন্য ফুটওভার ব্রীজ বানানো হলেও আমরা অধিকাংশ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এলোপাতারি রাস্তা পারাপার হয়ে থাকি। সাথে ছোট বাচ্চা বা নারী থাকলেও দুর্ঘটনার কথা চিন্তা যেন কিছু লোকের মাথায় কাজ করে না।
চট্টগ্রামের ইতিহাস-ঐতিহ্য আর রাজনৈতিক বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরী অভিন্ন একটি অধ্যায়। তাঁর মৃত্যুর পর লক্ষ-লক্ষ জনতার সক্রিয় অংশগ্রহণের জানাজায় তা প্রতীয়মান। আর কোটি-কোটি স্যোশাল অ্যাক্টিভিস্ট শোকবার্তা ও শোকাবহ খুদে বার্তার ব্যানারের মাধ্যমে বীর চট্টলার বীর পুরুষ মহিউদ্দীনের গ্রহনযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা গোটা জাতির সাথে-সাথে বিশ্ববাসীও অবলোকন করেছে।
অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, চট্টগ্রামবাসীর হৃদয় হতে এই বীর পুরুষের বিয়োগের শোক শুকাতে না শুকাতে জাতির মাঝে আরেক শোক নেমে এসেছে। প্রিয় মহিউদ্দীন চৌধুরীর কুলখানির অনুষ্ঠানে লক্ষ-লক্ষ মানুষের জনস্রোতে পদদলিত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে আগত দশ অতিথি।
এই খবরটি দেশ ও জাতির জন্য সত্যিই লজ্জার! আমরা নিজেরা কতটুকু সচেতন তা নিয়ে আজ প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আধুনিক এই সভ্যতায় অনাকাঙ্খিত পদদলিত ঘটনা এড়াতে আমরা বরাবরের মত ব্যর্থ হচ্ছি। এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও দুঃখজনক।
অনেকেই কুলখানি অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্যোশাল মিডিয়ায় সমালোচনা করেছেন। ভালো কথা। সমালোচনা বা প্রশ্ন আসতেই পারে। কিন্তু আমরা কতটুকু সচেতন বা আমাদের নিজ-নিজ দায়বদ্ধতা কতটুকু এটাও ভাবনার বিষয় আছে। অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের সাবধান-সতর্কতা কতটুকু অবলম্বন করেছি, সেটাও আগত অতিথিবৃন্দ নিজেদের প্রশ্ন করলেই উত্তর পাওয়া কঠিন হবে না।
বীর চট্টলার বীর পুরুষ, সবার শ্রদ্ধাভাজন রাজনীতিবিদ এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরী মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চট্টগ্রামবাসীর জীবন মান উন্নয়নের জন্য সংগ্রাম করেছেন। চট্টগ্রামের বাইরে যেতে হবে বলে ভালো-ভালো প্রস্তাব তিনি গ্রহণ করেননি। এমনকি মন্ত্রীত্বের মতন প্রস্তাবও তিনি চট্টগ্রামবাসীর পাশে আজীবন থাকবেন বলে ফিরিয়ে দিয়েছেন। কারণ তিনি চট্টগ্রাম মানুষকে মনে-প্রাণে ভালোবাসতেন।
চট্টগ্রামের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ অনুষ্ঠিত তার জানাযার নামাজ হওয়ার দুইদিন পর কুলখানির এই অনুষ্ঠানের ব্যাপক-বিশালতা চিন্তা-ভাবনা করেই নগরীর বড়-বড় কমিউনিটি সেন্টারগুলো ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। আমি ব্যক্তিগতভাবে খোঁজ-খবর নিয়ে জেনেছি, প্রতিটি কমিউনিটি সেন্টারে প্রায় দেড় প্লাটুন পুলিশসহ দলীয় সেচ্ছাসেবকগণের সমন্বয়ে কুলখানির অনুষ্ঠান সকাল থেকেই বেশ ভালোভাবে পরিচালিত হয়েছে।
কুলখানির জন্য এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরীর পরিবারের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম নগরীর ১৩টি কমিউনিটি সেন্টারে মেজবানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অমুসলিম এবং যারা গোমাংস খান না, তাদের জন্য মেজবানের ব্যবস্থা হয়েছিল ওই রীমা কমিউনিটি সেন্টারে।
দুই তলা বিশিষ্ট রীমা কমিউনিটি সেন্টার ভবনের নিচতলায় মূলত গাড়ি রাখা হয়। বসা ও খাওয়ার ব্যবস্থা দোতলায়। আসকার দীঘির পাড় কিছুটা নিচু এলাকা হওয়ায় ওই এলাকার অধিকাংশ ভবনের মত রীমা কমিউনিটি সেন্টারের প্রবেশ পথও বেশ খানিকটা ঢালু। সেখানেই ভিড়ের মধ্যে পদদলনের ঘটনা ঘটে।
ঘটনার বিস্তারিত খোঁজ খবর নিয়ে জেনেছি, বিনা কারণে অধৈর্য্য হয়ে কে কার আগে প্রবেশ করবে এই প্রতিযোগিতায় হুড়োহুড়ি শুরু করে। এক পর্যায় পুলিশ ও সেচ্ছাসেবকদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে লোকজন গেইট খুলে ঢুকতে শুরু করে। এক তো প্রচন্ড মানুষের চাপ। অন্যদিকে পেছনের দিকের চাপে সামনে ওই ঢালু জায়গায় থাকা বেশ কয়েকজন হঠাৎ মাটিতে পড়ে যান। তখন তাদের ওপর দিয়েই পেছনের লোকজন হুড়মুড় করে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে।
এই ধরনের ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষা অর্জন করি না বলেই বার-বার গণমাধ্যমের পাতায়-পাতায় লজ্জাজনক সংবাদ শিরোনাম পড়তে হয়। ২০১৫ সালের ২৭ মার্চ নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দে ব্রহ্মপুত্র নদে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অষ্টমী পুণ্যস্নানের ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারিনি বলেই একই বছরে ১০ জুলাই ময়মনসিংহে নূরানী জর্দা কারখানায় এই ঘটনা পুনরাবৃত্তি ঘটে।
নারায়াণগঞ্জে পুণ্যার্থীদের ভিড়ের মধ্যে একটি বেইলি সেতু ভেঙে পড়ার গুজব ছড়িয়ে পড়লে অপ্রশস্ত রাস্তায় হুড়োহুড়িতে পদদলনের ঘটনায় সেদিন নিহত হয় ১০জন। আর ময়মনসিংহের ঘটনা তো আরও ভয়াবহ! সেখানেও জাকাতের কাপড় সংগ্রহের জন্য অপেক্ষমান অতিরিক্ত মানুষের ভিড়ের কারণে সেহেরির পর কারখানার গেইট খোলার সঙ্গে সঙ্গে বহু নারী-পুরুষ একসঙ্গে ঢোকার চেষ্টা করেন। এতে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয় এবং এক পর্যায়ে পদদলিত হয়ে ২৭ জন নারী ও শিশু নিহত হয়।
এদিকে রীমা কমিউনিটি সেন্টারের পদদলিত ঘটনাটি কাঙ্খিত না অনাকাঙ্খিত কিংবা কারো কোনো দায়িত্ব অবহেলার কারণে ঘটতে পারে অর্থাৎ সবদিক বিবেচনা মাথায় রেখেই ঘটনা খতিয়ে দেখতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
আসলে অনাকাঙ্খিত ঘটনাগুলো আনাকাঙ্খিতভাবেই হয়ে থাকে। আর সেটা প্রায় ঘটে কোনো না কোনো ছোট-খাটো সুত্রপাত হতে। কুলখানির ঘটনা নিয়ে স্যোশাল মিডিয়াতে কিছু অকাঙ্খিত ছবিও ভাইরাল হয়েছে যা নিছক দুষ্টামি করার ছলে দৃশ্যমান…!
এমনিতে ব্যক্তি হতে পরিবার ও সমাজ-রাষ্ট্রে সব জায়গায় সব কিছুতেই গুরুত্বহীনতা বিদ্যমান। ঘটনার আগে গুরুত্ব না দিয়ে ঘটনার পরেই গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করি। ততক্ষনে যা ঘটার, ঘটে যায়। ঝরে যায় কিছু তাজা প্রাণ। পুড়ে ছাই হয়ে যায় কিছু সম্পাদ। সৃষ্টি হয় কিছু অপসংস্কৃতি।
যে যায়, সে কখনো ফিরে আসে না। যে পরিবারের যায় সে পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্য ছাড়া আমরা ততটা অনুভবও করতে পারবো না ঐ পরিবারের কী ধ্বংস হয়ে গেছে।
এই অনাকাঙ্খিত ও অপ্রীতিকর ঘটনার জন্য এককভাবে কাউকে দোষারোপ করা একটা অপরাধ। কারন কুলখানির উদ্দেশ্য আনাকাঙ্খিত ঘটনা সৃষ্টি নয়। শুধু শুধু সমালোচনার জন্য সমালোচনা না করে বরং এর দায়ভার আমাদের সকলের আমি মনে করছি। সবকিছুর মাঝে আমাদের অতিরঞ্জিত দল বেধে একই সময় বাড়িতে যেতে হবে এই ধরনের চিন্তা-ভাবনা পরিহার করে সচেতন হতে হবে। বাস, ট্রেন, লঞ্চ ও উড়োজাহাজ কিংবা অন্য কোনো যানবাহন থামার সাথে-সাথে দৌড়ে থামার অপচেষ্টা হতে আমাদের সাবধান হতে হবে এবং নতুন প্রজন্মের মাঝে শৃঙ্খলার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা উচিত।
ইতিমধ্যেই এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর পরিবারের পক্ষ থেকে নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে এক লাখ টাকা এবং শেষকৃত্যের জন্য পাঁচ হাজার টাকা দেওয়া হবে। এছাড়া আহতদের চিকিৎসা ব্যয়ও পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া হবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জানি, কোনো অনুদান বা ক্ষতিপূরণ কারো জীবন ফিরিয়ে দিতে পারবে না। আবার কোনো মধুর বাণী বা সান্তনা শোকার্ত পরিবারগুলোর হৃদয়ের ক্ষত শুকিয়ে দিতেও পারবে না। তবে অনাকাঙ্খিত ও কঠিন পরিস্থিতে মহিউদ্দীন চৌধুরীর পরিবার তাদের ভালোবাসার উদার হাত প্রসারিত করার মাধ্যমে শোকাহাত পরিবারের পাশে আছে; এটাই সভ্যতা ও দায়িত্ববোধ।
সমাজ-রাষ্ট্রে অনাকাঙ্খিত ঘটনা এড়াতে আমাদের সবাইকে সাবধান-সচেতন হওয়া অতি জরুরী। সেই সাথে যেকোনো অনুষ্ঠানের ব্যাপক-বিশালতা বিচার-বিশ্লেষণ করে সরকারের উচিত গুরুত্ব দিয়ে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








