ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার (এখন যিনি জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত সেলের প্রধান নির্বাহী) মো. আছাদুজ্জামান মিয়া তার মেয়াদ শেষের কয়েকদিন আগে গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বর বেশ জোর দিয়েই বলেছিলেন, ‘রাজধানীতে কিশোরদের গ্যাং কালচার বলতে কিছু থাকবে না। সব কিশোর গ্যাংকে নিশ্চিহ্ন করা হবে। কিশোর গ্যাং বলি আর বড় গ্যাং বলি ঢাকায় গ্যাং বলে কোনো শব্দ থাকবে না।’
তার সেই বক্তব্যের প্রায় ৬ মাস পরও বহাল তবিয়তেই আছে কিশোর গ্যাং কালচার। রাজধানীবাসী যার সর্বশেষ বলি হতে দেখলেন কিশোর রিপনকে। গ্যাং কালচারের শিকার হয়ে রোববার রাতে রাজধানীর হাতিরঝিলে ছুরিকাঘাতে খুন হন শিপন। আহত হয়েছেন মানিক নামের আরেক কিশোরও।
আমরা জানি তিন বছর আগে ২০১৭ সালের জানুয়ারির শুরু গ্যাং কালচারে শিকার হন উত্তরার একটি স্কুলের ছাত্র আদনান কবির। তাকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। সেই ঘটনা পুরো দেশে তোলপাড় ফেলে দেয়। উঠে আসে একের পর এক কিশোর গ্যাংয়ের নাম। তাদের অপকর্মের কাহিনী। র্যাব-পুলিশ নানা নামের সেইসব কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযানে নামে। আটক করা হয় শত শত কিশোরকে।
কিন্তু আলোচনা-সমালোচনা আর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় রাজধানীতে সেই সময় কিশোর গ্যাং কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও ঢাকার পাশে গাজীপুরে দুই মাসের ব্যবধানে গ্যাং কালচারে খুন হন দুই কিশোর। তাদের একজন নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী শুভ আহমেদ খুন হন ২০১৭ সালের ৭ জুলাই। আর ৩ সেপ্টেম্বর খুন হন নূরুল ইসলাম। তাদের দু’জনকেই কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
এসব ঘটনার পরের বছর ২০১৮ সালে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা অনেকটা কমে এসেছিল। কিন্তু গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। দুই কিশোর গ্যাংয়ের কোন্দলে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের সাত মসজিদ এলাকায় ছুরিকাঘাতে নিহত হন মহসিন নামে দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্র। সেই ঘটনায় তাকে বাঁচাতে গিয়ে আহত হন আরও ৩ জন।
এসব ঘটনা কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কেননা প্রতিটি ঘটনার পর কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত দাবি করে বহু সংখ্যক কিশোরকে গ্রেপ্তারের খবর ফলাও করে প্রচার করে র্যাব-পুলিশ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেশির ভাগই জামিনে বের হয়ে এসে আগের মতই গ্যাং কালচারে জড়িয়ে পড়ে। আর ফলাফল একই। আবারও খুন।
তাহলে এর থেকে মুক্তি পাবে না জাতি? এভাবেই একের পর এক মায়ের কোল খালি হতে থাকবে? পিতা তার প্রিয় সন্তানের লাশ কবরে রেখে আসবে? আমরা জানি, এর পেছনের কারণ হিসেবে সবাই বলবে মূল্যবোধের অবক্ষয়, সমাজের অবহেলা, তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহার, বাবা-মা সন্তানদের খেয়াল রাখে না- এমন অসংখ্য বিষয় চলে আসবে। আদৌ কি তাই?
আমাদের প্রশ্ন যে কয়েকটা খুনের কথা এখানে উল্লেখ করা হয়েছে; তার কয়টার বিচার হয়েছে? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কি কি পদক্ষেপ নিয়েছে? এসব প্রতিরোধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কি করছে? নিশ্চিত এর কোনো উত্তর কেউ দিতে পারবে না। আর সমস্যাটা এখানেই। রাজধানীতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েক লাখ সোর্স আছে। প্রতিটি থানাই জানে কোথায়, কোন কোন কিশোর গ্যাং কি করে। কিন্তু কোনো ঘটনা না ঘটনা পর্যন্ত তারা তৎপরতা দেখায় না। এবং ঘটনার রেশ থেকে গেলে তারাও হাত গুটিয়ে বসে থাকে।
আমরা মনে করি, এসব ঘটনায় শক্ত পদক্ষেপ না নেয়া হলে মুক্তি মিলবে না। একই ঘটনা ঘটতে থাকবে বার বার। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদী ও কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এ থেকে মুক্তি সম্ভব না।








