দেশীয় চ্যানেলে ডাবিং বা ভাষান্তর করা বিদেশি সিরিয়াল বন্ধের দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন শিল্পী ও কলাকুশলীরা। ৩০ নভেম্বর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশে তারা ৫ দফা দাবি জানান। এগুলো হচ্ছে—বেসরকারি চ্যানেলে বাংলায় ডাবিংকৃত বিদেশি সিরিয়াল বন্ধ, ক্রয় ও প্রচারের ক্ষেত্রে এজেন্সির হস্তক্ষেপ ব্যতীত চ্যানেলের অনুষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ, দেশের টেলিভিশন শিল্পে বিদেশি শিল্পী ও কলাকুশলীদের অবৈধভাবে কাজ করা বন্ধ, টেলিভিশন শিল্পের সর্বক্ষেত্রে এআইটির নূন্যতম ও যৌক্তিক হার পুনঃনির্ধারণ করা, ডাউন লিঙ্ক চ্যানেলের মাধ্যমে বিদেশি চ্যানেলে দেশীয় বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধ করা।
যদিও নাট্যকার মাসুম রেজা তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন,‘বাংলায় ডাবিং করা বিদেশী সিরিয়াল বন্ধের দাবী নিয়ে বেশ বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে.. আমরা পরিস্কার বলেছি.. এইসব সিরিয়ালের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান না.. আমাদের অবস্থান এইসব সিরিয়ালে বাজার সয়লাব করে শিল্পী কলাকুশলীদের কাজের যে সঙ্কোচন হচ্ছে সেটার বিরুদ্ধে.. প্রায় সবকটা বিনোদন চ্যানেল প্রাইম টাইমে এইসব ডাবকৃত একাধিক সিরিয়াল চালাতে শুরু করেছে.. ফলে আমাদের সিরিয়ালগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে.. আমাদের সিরিয়ালের মান ভালো না সবাই বলছেন.. কিন্তু মান ভালো না হওয়ার কারণ যেই মুনাফাখোর ফড়িয়া শ্রেণীর আগ্রাসন সেটাও কিন্তু আমাদের দাবীর অন্তর্ভুক্ত।’
এই তর্ক-বিতর্ক নিয়ে দর্শক হিসেবে আমাদেরও কিছু প্রশ্ন আছে। প্রশ্নটা নির্মাতা, শিল্পী, প্রযোজক, পরিচালক সবার কাছে। বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে তো বটেই। কারণ ‘কোন মালটা দর্শক খাবে’ তার উপর ভিত্তি করে ওনারা পয়সা দেন। সেটা যদি স্টার জলসায় হয়, তারা দেবেন। সেটা চ্যানেল আইতে হলেও দেবেন। এখানে তার পণ্যের বিক্রিই মুখ্য। দেশপ্রেমট্রেম নিয়ে বিজ্ঞাপনদাতাদের ভাবার সময় আছে বলে মনে হয় না।

কথা হচ্ছে,বাংলাদেশের টেলিভিশনে বাংলায় ডাব করা সিরিয়াল অথবা সিনেমা প্রচার সাম্প্রতিক কোনো ব্যাপার নয়। আমরা ছোটবেলা থেকেই এটা বিটিভিতে দেখে অভ্যস্ত। আলিফ লায়লার মতো সিরিয়াল চলেছে। আবার অনেক ইরানি সিনেমাও আমরা দেখেছি ভাষান্তর করা। বস্তুত ওইসব সিনেমা দেখার জন্য আমরা অপেক্ষা করতাম। অনুষ্ঠানটি কোন দেশের সেটি চিন্তা করার অবকাশ দর্শকের নেই। দর্শক দেখে জিনিসটা কী, তাকে সেটি টানতে পারছে কি না। আজারবাইজানের কোনো সিনেমাও আমাকে টানতে পারে। আমার বাংলাদেশের খুব নামি দামি কোনো পরিচালক এবং অভিনেতা অভিনেত্রীর সিনেমা বা নাটক আমাকে নাও টানতে পারে। এখানে বলার সুযোগ নেই যে, এটা দেশি পণ্য, অতএব এটাই আপনাকে দেখতে হবে।
বিষয়ভিত্তিক অনুষ্ঠান, সিনেমা বা নাটক আমাদের দেশে যে হয়নি বা হয় না, তা নয়। কিন্তু আমাদের টিভি অনুষ্ঠানের মান যে বাড়ছে না অথবা প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আমাদের দেশের টিভি অনুষ্ঠানগুলো যে পেরে উঠছে না—তা তো সত্য। এর মূল কারণ সম্ভবত কনটেন্ট, নির্মাণকৌশল, অভিনয়দক্ষতা এবং সর্বেপারি আইডিয়া।

আমার ঘরের সদস্যরা যদি সন্ধ্যার পরে জি বাংলা বা স্টার প্লাস দেখে, তাদের হাত থেকে রিমোট কেড়ে নিয়ে দেশি চ্যানেল চালানোর অধিকার আমার নেই। কারণ কে কোন চ্যানেল দেখবেন, সেটি তার ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। আমি যখন বিবিসি বা সিএনএন-এর খবর দেখি, তখন আমার বউ আমার হাত থেকে রিমোট কেড়ে নেন না।এখানে পছন্দটা ব্যক্তিগত। বিটিভিতে যখন ‘কোথাও কেউ নেই’-এর মতো নাটক চলেছে, বাংলাদেশের কোনো দর্শক তখন অন্য কিছু দেখেছে, সেটি বলার সুযোগ নেই। অবশ্য তখন বিটিভি ছাড়া অন্য কোনো চ্যানেলও ছিল না। কিন্তু তারপরও সেই মানের কোনো নাটক কি এখন আমাদের নির্মাতারা বানাতে পারছেন?

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৫ বছরে এই মুক্তিযুদ্ধের উপরে একটা আন্তর্জাতিক মানের ডুমেন্টারি, নাটক বা সিনেমা হয়েছে বলে কেউ দাবি করতে পারবেন? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নানা অ্যাঙ্গেল নিয়ে যেসব শিল্পোত্তীর্ণ এবং কালোত্তীর্ণ সিনেমা হয়েছে, তার ধারেকাছে যায়, এরকম একটা সিনেমা আমরা বানাতে পেরেছি? কেন পারিনাই জিজ্ঞেস করলে সংশ্লিষ্টরা বলবেন, অত আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের নাই। আরে ভাই আধুনিক প্রযুক্তি বাদ দেন। প্রযুক্তি লাগে স্ক্রিনে। কিন্তু আইডিয়া জেনারেট করতে প্রযুক্তি লাগে না। মুক্তিযুদ্ধ মানেই দাড়িটুপিওয়ালা রাজাকার, খাকি পোশাক পরা কিছু পাকসেনা আর মাথায় গামছা পেচানো মুক্তিযোদ্ধা না। মুক্তিযুদ্ধের বিশালতা, ব্যাপকতা আরও বিস্তৃত। মুক্তিযুদ্ধের দর্শনগত দিক নিয়েও অসংখ্য সিনেমা বানানো যেত। কেউ সেই কাজটি করেছেন বা করলেও সেটি আন্তর্জাতিক মানের হয়েছে বলে দাবি করতে পারবেন না। আমার সঙ্গে আপনি দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। কারণ দেশ-বিদেশের নানা সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা থেকে মন্তব্যটি করলাম। পাল্টা প্রশ্ন করতে পারেন, এত বোঝেন তো আপনি নিজে কেন বানান না? উত্তর হলো, এটা আমার কাজ না। আমার যেটা কাজ সেটা আমি করছি। এবং দর্শক হিসেবে আমি আমার এই খেদ বা এই অতৃপ্তিটুকু বলতেই পারি।
আপনারা সুলতান সুলেমানের মতো সিরিয়াল বানানোর যোগ্যতা রাখবেন না, অথচ এটা দর্শকপ্রিয়তা পেলেই আপনাদের মাথা খারাপ হয়ে যাবে; আপনারা এত বছরেও মীরাক্কেলের মতো একটা অনুষ্ঠান বা মীরের মতো একজন উপস্থাপক তৈরি করতে পারবেন না, অথচ মীরাক্কেলে মানুষ বুঁদ হয়ে থাকলে বলবেন আকাশসংস্কৃতিতে দেশটা শেষ হয়ে গেলো; ইন্ডিয়ান বাংলা সিরিয়াল জনপ্রিয় বলে তার কপিপেস্ট করে সাংসারিক কুটনামি বানানোর বৃথা চেষ্টা করবেন এবং দর্শক তা না দেখলে বলবেন, দেশের শিল্পীদের ভাত মারা যাচ্ছে—তা হয় না। আগে নিজের কোয়ালিটি এনশিওর করেন। নিজেকে আন্তর্জাতিক মানের করেন, তখন আর মানুষ সুলতান সুলেমান দেখবে না, আপনারটাই দেখবে।
ভালো জিনিস হলে দর্শক দেখবে না কেন? একটা সময় পর্যন্ত আমাদের টিভিতে প্রচুর মানসম্পন্ন নাটক হত। দর্শক সেগুলো দেখেনি? এখনও ভালো মানের অনেক নাটক হয়। সেসব দর্শকরা দেখে। কিন্তু এখন নাটকের ক্ষেত্রে কপিপেস্ট এবং একঘেয়েমির প্রবণতা অনেক বেশি। ‘ধর তক্তা মার পেরেক’ টাইপের আইডিয়া দিয়ে দর্শককে সুড়সুড়ি দিয়ে, কিছু আঞ্চলিকতা দিয়ে সাময়িক হাসানো যায়—কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেগুলো দর্শকের মনে রেখাপাত করে না।

ভালো মানের নাটক বা সিনেমা তৈরির প্রশ্নে অনেকে বাজেটের কথা বলেন যে, হলিউড বলিউড এমনকি কলকাতার বাংলা সিনেমারও যে বাজেট, সে তুলনায় আমাদের অনেক কম। প্রশ্ন হলো,পথের পাঁচালি সিনেমার বাজেট কত ছিল আর জেমস বন্ড সিরিজের একেকটা সিনেমার বাজেট কত থাকে? জেমস বন্ডের কোনো সিনেমা অস্কার পেয়েছে? পথের পাঁচালি অন্তত ১৩টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে। সুতরাং সব সময় পয়সা বেশি হলেই কোয়ালিটি বাড়বে, সে কথা বলার সুযোগ নেই।
আপনারা সঠিকভাবে শিল্পী তৈরি না করেই ভুজুং-ভাজং দিয়ে লোকজনকে পর্দায় নিয়ে আসবেন; সে অভিনয় জানবে না, কাঁদলেও দর্শকের হাসি পাবে, চরম মারপিট দেখেও পোলাপান হাসবে, পয়সা থাকলেই আপনারা সিনেমার প্রযোজক হয়ে যাবেন, আপনার কোনো শিল্পবোধ থাকবে না, দেশ বিদেশের সিনেমা সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণা থাকবে না কিন্তু আপনি চলচ্চিত্রের পরিচালক হয়ে যাবেন; একই গল্পের এধার-ওধার করে চিত্রনাট্য বানাবেন আর দর্শক হিসেবে আমি সেই বস্তাপচা মাল দেখব, আমার কী ঠেকা পড়েছে? রিমোটের কন্ট্রোল আমার হাতে। সুতরাং আমি কী দেখব সেই সিদ্ধান্ত আমার। আপনার কথায় আমি টেলিভিশনের সুইচ পাল্টাই না। স্যরি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








