বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশে গ্রন্থমেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মোড়ক-উন্মোচন চত্বরে আজ বিকাল চারটায় নিজের প্রথম বইয়ের মোড়ক খুলবেন চিত্রনায়িকা কবরী। দুপুরে তিনি বললেন, ‘বইমেলায় যাচ্ছি। আমার যে কী আনন্দ হচ্ছে, বলে বোঝাতে পারব না। আজ আমার বই বের হচ্ছে। আমি তো আছি, আরও কয়েকজনকে বলেছি। গুণদাকেও বলেছি। যারা যারা সেখানে উপস্থিত থাকবেন, তাদের সবাইকে নিয়ে বইটির মোড়ক খুলব।’
আজ বের হচ্ছে চিত্রনায়িকা কবরীর আত্মজীবনী ‘স্মৃতিটুকু থাক’। প্রকাশ করছে বিপিএল। মোড়ক উন্মোচনের পর বিপিএলের স্টলে থাকবেন কবরী।
চিত্রনায়িকা কবরীর আত্মজীবনী ‘স্মৃতিটুকু থাক’ বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। পাঠকদের জন্য এখানে তুলে ধরা হলো তার লেখাটি—
সুচিত্রা সেনকে নিয়ে, তাঁর জীবদ্দশায় আমি একটি কবিতা লিখেছিলাম । ঐ কবিতায় সুচিত্রা সেনের অভিনয় দক্ষতার পাশাপাশি তাঁর দৈহিক সৌন্দর্যের অকপট বর্ণনাও ছিল।
তাঁর মৃত্যুর বছর দশেক আগে লেখা আমার ঐ কবিতাটি সুচিত্রার মহাপ্রয়াণের পর আলোচনায় আসে।
তখন কেউ-কেউ কবিতাটির বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ হানেন।
সুচিত্রা সেন স্মরণে প্রযোজিত একটি টিভি অনুষ্ঠানে আমি এই কবিতাটি পাঠ করি। ঐ অনুষ্ঠানে প্রয়াত চিত্র পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম, চিত্রপরিচালক ও কথাশিল্পী আমজাদ হোসেন ও নায়িকা কবরী উপস্থিত ছিলেন। নায়িকা কবরী আমার কবিতাটির প্রসংশা করেন। বলেন, ‘সুন্দরের সুষম বন্টন’ কথাটা সুচিত্রা সেনের বেলায় খুব যথাযথ হয়েছে।
পরে কলকাতায় অনুষ্ঠিত একটি কবিসভায় আমি ঐ কবিতাটি পুনরায় পড়ি। দর্শকসারিতে সেদিন উপস্থিত ছিলেন সুচিত্রা সেনের কন্যা নায়িকা মুনমুন সেন। আমার কবিতা শুনে তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়। মঞ্চ থেকে নেমে আসার পর মুনমুন আমাকে পা ছুঁয়ে প্রণাম করেন এবং বলেন – “আমার মাকে নিয়ে এমন কবিতা পশ্চিমবঙ্গের কোনো কবি লেখেননি।”
কবরী এবং মুনমুন দুই নায়িকাই যে কবিতা বোঝেন– এই তথ্যটি সকলের গোচরে আনার জন্যই এই ঘটনাটির উল্লেখ করেছি।

সম্প্রতি আমাদের কিংবদন্তীতুল্য চিত্রনায়িকা কবরীর লেখা আত্মজীবনী “স্মৃতিটুকু থাক”-এর পান্ডুলিপি পাঠ করে আমার মনে হলো, আমি কোনো কবির রচিত আত্মজৈবনিক গদ্য পাঠ করছি।
১৯৬৪ সালে, সুভাষ দত্ত পরিচালিত সুতরাং ছবিতে সদ্য কৈশোর পেরোনো কবরীর অভিনয় ও কবরীর দেহপট দর্শন করে যারপরনাই মুগ্ধ হয়েছিলাম।
শুধু কবরীর টানে আমরা ক’জন বন্ধু সুতরাং ছবিটি দেখতে তিন-তিনবার অলকা সিনেমা হলে প্রবেশ করেছিলাম। কবরীর নেশায় মাতাল হয়েছিলো পূর্ব পাকিস্তানের সিনেমার দর্শক। পাকিস্তানী উর্দু ছবির দর্শকদের বাংলা ছবিতে টেনে এনেছিলেন যাঁরা, তাদের মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর ট্রাম্প কার্ড ছিলেন কবরী।
চিত্রনায়িকা কবরীর আত্মজীবনী, তাই শুধুমাত্র তাঁর নিজের জীবনীই নয়, পাকিস্তানী ছায়াছবির রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি-প্রত্যাশী বাংলা ছায়াছবি ও পূর্ব বাংলার মানুষের সাংস্কৃতিক মুক্তির সংগ্রামের এক বিশ্বস্ত দলিলও বটে।
বিশ বছরের সুফলা অভিনয়জীবন শেষে চিত্রনায়িকা কবরীর রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগে যোগদানের ঘটনাটিও কবরীর জন্য ছিল সঙ্গত ও স্বাভাবিক।
তাঁর অভিনীত শতপ্রায় ছবি ও তাঁর পরিচালিত ছবিগুলো বাংলাদেশের রূপালী পর্দায় আরও বহুবার ফিরে আসবে এবং এই কিংবদন্তী অভিনেত্রীকে আমরা ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করব।
কবরীর আত্মজীবনী সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করলো যে কবরী একজন সুলেখিকাও বটে।
চিত্রকল্পময় সুললিত গদ্যে আপনার আত্মজীবনী রচনার জন্য আমি আপনাকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। আপনার দীর্ঘ সুস্থ জীবন কামনা করি।
নিত্যশুভার্থী
নির্মলেন্দু গুণ
নয়াগাঁও
২০/০২/১৭










