রাজনীতিবিদেরা দেশের শাসনব্যবস্থায় বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে থাকেন। কারণ, বাংলাদেশের সরকার যেহেতু রাজনৈতিক দল থেকে নির্বাচিত হয় তাই রাজনীতি এবং সরকার গঠনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে বর্তমানে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন শুরু হয়েছে। তাই, জাতীয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলো থেকেই প্রার্থী নির্বাচিত হয়ে থাকে। আমাদের রাজনীতিবিদেরা আমাদের গর্বের প্রতীক, রাজনীতিবিদদের পাহাড়সম দৃঢ়তা ও সঠিক নেতৃত্বের কারণে আজ আমরা স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশে বসবাস করতে পারছি। তাদের বদৌলতে পেয়েছি ভাষার স্বাধীনতা, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি কালচারের যোগসাজশ।
রাজনীতির মাঠে ময়দানে রাজনীতিবিদদের থাকাটাই যৌক্তিক, কিন্তু হরহামেশাই দেখা যাচ্ছে; সোনার হরিণের মতো রাজনীতির বাইরের মাঠ থেকে এসে রাজনৈতিক দলের বলয়ে অনেকেই নির্বাচন করে নির্বাচিত হয়ে আসছে।প্রতিনিধিত্ব করছে জনগণের।বিষয়টা ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ কিনা, প্রকৃত রাজনীতিবিদ মাত্রই অনুধাবন করতে পারবেন। আবার প্রথম সারির রাজনৈতিক দলগুলো যদি দলের বাইরের কাউকে মনোনয়ন দিয়ে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার সুযোগ দেয় তাহলে বিষয়টা রাজনৈতিকভাবে দৃষ্টিকটু মনে হয়। পাশাপাশি তৃণমূলের কর্মী থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ মনোনয়ন সংক্রান্তে মণোক্ষুণ হয়ে থাকে।
আমাদের রাজনীতিতে অনেক রথী মহারথী এখনো জীবিত রয়েছেন, যাদের কাছ থেকে শেখার অনেক কিছুই আছে বর্তমান প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের। বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে এইসব মহান মানুষদের আত্নত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাস থেকে নতুন রাজনীতিবিদদের উৎসাহ, অনুপ্রেরণা তথা দেশের জন্য কাজ করার আগ্রহ আসবে। সিনিয়রদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে জুনিয়ররাও দেশের তরে কাজ করার ব্যাপারে উৎসাহী হবে, রাজনীতিটাকে একমাত্র পেশা হিসেবে বেছে নিবে। অভিভাবকেরাও তাদের ছেলেমেয়েদের রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে ইতিবাচক মনোবাসনা পোষণ করবেন। তৈরি হবে মেধাবী নেতৃত্ব। মেধাবী ছেলেমেয়েরা রাজনীতিতে না আসলে রাজনীতির ভবিষ্যৎ পথ অন্ধকার প্রকোষ্ঠে পরিণত হবে। আমাদের সংস্কৃতিতে বাবা-মায়েরা এখন আর ছেলেমেয়েদের রাজনীতির বিষয়ে উৎসাহ দেখায় না। পড়াশোনা করে একটি ভাল ক্যারিয়ারের আশা পোষণ করে থাকে। কিন্তু একটা সময় রাজনীতিবিদদের নয়নের মণিকোঠায় রাখতো সাধারণ জনগণ। এর পিছনের কারণগুলো খুঁজে বের করে রাজনীতির মাঠটাকে সকলের জন্য সাবলীল করে গড়ে তুলতে হবে। রাজনৈতিক নেতারা জনগণের সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করতেন এবং জনগণও রাজনৈতিক নেতাদের শ্রদ্ধা ও সম্মান করতেন। দিনে দিনে এ পরিবেশটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের অকাল প্রয়াত জনপ্রিয় মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুর পর থেকেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী কে হচ্ছেন তা নিয়ে শোরগোল পড়ে যায়। অনেকেই আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের নিকট প্রার্থী হওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আবার কয়েকজনকে দল থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য। তবে শেষ পর্যন্ত পাওয়া খবরে জানা যায় একজন ব্যবসায়ীর আওয়ামী লীগের প্রার্থী হওয়ার কথা। যিনি কোনদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছে বলে শোনা যায় নি, তবুও তাঁর প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আবার এও শোনা যাচ্ছে দলীয় হাইকমান্ড থেকে স্বচ্ছ, জনপ্রিয় কাউকে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য খোঁজা হচ্ছে। দলের সাথে জড়িত নয় এমন কাউকে মনোনয়ন দেওয়ার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে। প্রয়াত মেয়রও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না। এর মানে কি দাঁড়াচ্ছে? আওয়ামী লীগ রাজনীতির সাথে জড়িত নয় এমন কারো মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি সেটি হয়ে থাকে তাহলে মেধাবী প্রজন্ম রাজনীতি বিমুখ হয়ে পড়বে প্রতিনিয়ত।
কারণ, প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ধ্যান জ্ঞানে আদিষ্ট না থেকেও দলীয়ভাবে নির্বাচন করার সুযোগ থাকে অর্থাৎ দেশ পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করে। জনগণের সাথে সম্পৃক্ত না থেকে রাজনীতিতে আসাটা সমীচিন নয়। এতে করে রাজনীতি এবং নেতৃত্ব উভয়ই সংকটে পড়ে। আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে যে সকল অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম শোনা যাচ্ছে, দল তথা মার্কা ব্যতীত নির্বাচন করলে ফলাফল কি আসবে তা সহজেই অনুমেয়। অবশ্য তারাও স্বীকার করেছেন, দলীয় মনোনয়ন না পেলে নির্বাচনে আসবেন না। কাজেই বোঝা যাচ্ছে দল ছাড়া তারা অচল। আবার যারা দীর্ঘদিন যাবত দলের সাথে জড়িত থেকে ত্যাগ স্বীকার করেছেন তাদের দিকে নজর না দিলে অপরাজনীতি রাজনীতিতে প্রবেশ করে সামগ্রিক প্রক্রিয়াটিকে ঘোলাটে করে ফেলতে পারে।
আওয়ামী লীগের মতো বড় দলকেও কেন ব্যবসায়ীকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিতে হচ্ছে? স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করলে কয়েক ধরনের মতামত আসতে পারে।
প্রথমত: নির্বাচনে জয়লাভের জন্য আওয়ামী লীগে তেমন জনপ্রিয় প্রার্থী না থাকায় রাজনীতির সাথে জড়িত নয় এমন কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে। জনপ্রিয় থাকলে তো অবশ্যই দল থেকেই মনোনয়ন দেওয়ার কথা।
দ্বিতীয়ত: রাজনীতির সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে না। ঢাকা সিটিতে বিশেষ করে উত্তর আওয়ামী লীগে পোড়খাওয়া নেতৃবৃন্দ অবশ্যই রয়েছে। কারণ আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকাকালিন সময়ে সরকারের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে সেখানে আওয়ামী লীগের হাজার হাজার কর্মী সকল ভয়কে তুচ্ছ করে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তারা আজ কোথায়? তাদেরকে অবশ্যই মূল্যায়ণ করা উচিত। না হলে ভবিষ্যতে রাজনীতিতে দল অন্ত:প্রাণ নেতাকর্মী কমে আসবে পর্যায়ক্রমে।
তৃতীয়ত: রাজনৈতিক দলগুলো নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন নেতা তৈরি করতে পারছে না। এর পিছনের কার্যকরণ অনুসন্ধান করে অবশ্য কর্তব্য হয়ে পড়েছে।
চতুর্থত: মনোনয়নে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয় না কিংবা অন্য কোন প্রভাবকের মাধ্যমে প্ররোচিত হয়ে মনোনয়ন দেওয়া হয়ে থাকে। সাধারণত সংসদ নির্বাচনের সময় পত্রিকায় মনোনয়ন বাণিজ্য সংক্রান্ত মুখরোচক সংবাদ দেখা যায়।
পঞ্চমত: রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে ব্যক্তিগত ক্লেশ ও দ্বন্দ্বের কারণে দল থেকে প্রার্থী না দিয়ে ভিন্ন কাউকে মনোনয়ন দিয়ে দলীয় স্থিতাবস্থা রক্ষা করা হয়, যাতে সকলেই দলের জন্য কাজ করে।
রাজনীতি একটি মহান দায়িত্ব, এর একমাত্র ব্রত হচ্ছে দেশসেবা তথা জনগনের খেদমত করা। রাজনীতিবিদদের কাছে আমরা সাধারণ জনগণরা তেমনটাই প্রত্যাশা করি। আমাদের প্রাক্তন রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে মাঝে মধ্যেই শুনে থাকি, রাজনীতি আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই চলে যাচ্ছে ব্যবসায়ীদের হাতে। একজন ব্যবসায়ী নির্বাচনে অর্থ খরচ করে জয়লাভ করলে, স্বাভাবিকভাবেই সে তার খরচ করা অর্থ উঠিয়ে নিতে সক্রিয় হবেন। সেসময় হয়তো জনকল্যাণ বা জনসেবা বিঘ্ন হবে। আমাদের সংসদের চিত্রও তেমনটাই বলে দিচ্ছে। মনোনয়ন বাণিজ্যের সুযোগ নিয়ে রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্টহীন মানুষও রাজনীতিতে উঠে আসছেন যা রাজনীতির জন্য সুখকর নয়।
বিশ্বজুড়ে উন্নত বিভিন্ন দেশে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। যারা রাজনীতি সংশ্লিষ্ট তারাই কেবল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পায়। আবার টাকা পয়সা দিয়ে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়েও অনেকেই কথা বলছেন। দলীয় মনোনয়ন যেহেতু রাজনীতিবিদদের মাধ্যমেই দেওয়া হয়ে থাকে, তাই তাদেরকে সতর্ক হওয়া উচিত। রাজনীতির মাঠে স্বচ্ছ মানুষকে মনোনয়ন দেওয়া উচিত, ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা উচিত।
আশা রাখবো বিষয়গুলো বিবেচনায় এনে আওয়ামী লীগসহ বড় দলগুলোর মনোনয়ন বোর্ড দল প্রকৃত রাজনীতিবিদদের মনোনয়ন দেবে, যাতে করে সংসদ নির্বাচনের পূর্বে কর্মীরা আরো বেশি উজ্জীবিত হয়ে দল এবং সরকারের উন্নয়নে কাজ করার আগ্রহ পায়। রাজনীতির স্বার্থেই ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ প্রার্থী মনোনয়ন না দিয়ে দল অন্ত:প্রাল কর্মীদের মনোনয়ন দেওয়া উচিত। কবি বলেছেন ‘বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।’ অর্থাৎ রাজনীতিবিদদের রাজনীতি করা উচিত, ব্যবসায়ীদের নয়।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







