‘দেশীয় জঙ্গিরা নয়, হলি আর্টিজানে হামলা করেছিলো আইএস,’- এমন বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আলোচনায় আসেন সন্ত্রাস ও জাঙ্গিবাদ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ দাবিদার রোহান গুনারত্ন। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর পলিটিক্যাল ভায়োলেন্স অ্যান্ড টেররিজম রিসার্চ (আইসিপিভিটিআর) এর পরিচালক তিনি। সিঙ্গাপুরভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক গুনারত্ন ১৪ দেশের পুলিশপ্রধানদের নিয়ে আয়োজিত সম্মেলনে অংশ নিতে সম্প্রতি ঢাকায় এসে বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি এবং কর্মকাণ্ড বিষয়ে কথা বলে আলো্চিত হন। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশ সরকার আইএসের ভূমিকা নাকচ করে অসত্য বলেছে।
পুলিশপ্রধানদের সম্মেলনে অতিথি বক্তা ছিলেন তিনি, তাই সরকার মোটামুটি ভদ্রোচিত ভাষাতেই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। পুলিশের আইজিপি শহীদুল হক গুনারত্ন’র পর্যবেক্ষণ নাকচ করে দিয়ে গণমাধ্যমের সামনে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, তার বক্তব্য একান্তই তার।
গুনারত্নকে নিয়ে বিতর্ক উঠার পর তার সম্পর্কে খোঁজ-খবর করে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তাকে নিয়ে বিতর্ক কম নয়। এমনকি অস্ট্রেলিয়ান গণমাধ্যমে তার পরিচয় এমন যে, যখনই সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে কোন মন্তব্য দরকার হয় তখনই ‘ভাড়াটে’ হিসেবে গুনারত্নকে পাওয়া যায়। এমনকি তাকে সন্ত্রাসবাদ দমনে অস্ত্র ব্যবসার একজন ‘বুদ্ধিবৃত্তিক দালাল’ও মনে করা হয় যার কাজ হচ্ছে কোথাও নতুন ধরণের কৌশল ও অস্ত্র প্রয়োজন দাবি করে অস্ত্র সরবরাহের প্রেক্ষাপট তৈরি করা।
আন্তর্জাতিকভাবে রোহান গুনারত্নর নাম প্রথম শোনা যায় ২০০১ সালের মার্চে। তখন তিনি বলেছিলেন, আফগানিস্তানের বামিয়ানে বড় এক প্রাচীন বৌদ্ধ মূর্তি ধ্বংস করার নির্দেশ দিয়েছে তালেবানী কাবুল সরকার। কেউ তাকে তেমন গুরুত্ব না দিলেও ছয় মাস পর নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলার ঘটনার পর থেকেই শুরু হয় রোহানের নতুন ক্যারিয়ার। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে এক ধরণের কর্তৃত্ব শুরু হয় তার। কারণ তিনি হয়ে উঠেন ‘ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় ঠিক ব্যক্তি’।
২০০১ সালের সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখের আগে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কেউ খুব বেশি কিছু ভাবতেন না। বিশ্ব তাই তখন এমন একজন বিশেষজ্ঞকে খুঁজছিলো যিনি বিশ্ব কীভাবে বদলাচ্ছে সেই ব্যাপারটা নিয়ে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করবেন। এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন খুবই দক্ষ। শ্রীলঙ্কায় জন্মগ্রহণকারী গুনারত্ন শুধু তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদ নিয়ে বিশেষজ্ঞ হলেও বাগ্মীতা এবং এরকম অন্য গুণাবলী থাকার কারণে সহজেই তিনি ওসামা বিন লাদেন এবং আল কায়েদা নেটওয়ার্ক সম্পর্কে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে বিশ্বকে চমক দেখাতে শুরু করেন। কারণ তিনি ‘চাহিদা এবং সরবরাহ’ তত্ত্বটা খুব ভাল বুঝতেন, এবং তাই চাহিদা অনুযায়ী ‘বিশেষজ্ঞ মত’ সরবরাহ দেয়া শুরু করেন তিনি। কেউ তার সূত্র সম্পর্কে কখনও কিছু জানতে পারেননি, তিনিও জানাননি; সবসময়ই তার বিশ্লেষণের তথ্য-উপাত্ত তার নিজস্ব বলে দাবি করেছেন যা অনেককে সময় সময় উদ্বিগ্ন করেছে।
২০০২ সালের মে মাসে আস্ট্রেলিয়ার এসএএস সৈন্যরা যখন কাবুলের দক্ষিণ পূর্ব অঞ্চলে বিন লাদেনের অনুসারীদের খুঁজছিলো তখন তার লেখা ‘ইনসাইড আল কায়েদা: গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অব টেরর’ বইটি অর্জন করে বেস্টসেলারের তকমা। সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে তার ‘সুনাম’ও। সবাই তাকে চিনতে শুরু করে সন্ত্রাসীদের বিষয়ে বিশ্বের ‘এক নম্বর বিশেষজ্ঞ’ হিসেবে।
ঠিক সেই সময়েই গুনারত্ন সামনে চলে আসেন যখন এ বিষয়ে ঠিকভাবে কথা বলার মতো কেউ ছিল না। আর গুনারত্ন মানুষের চিরাচরিত প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণের ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন। নিজের বুদ্ধিমত্তার উপর ভর করে তিনি চমকপ্রদ সব বিষয় সামনে নিয়ে আসতেন। এখনও তাই করছেন।
তবে, বিন লাদেন নিয়ে কথা বলার শুরুর সময়ই যুক্তরাজ্যের ‘অবজার্ভার’ পত্রিকার হোম অ্যাফেয়ার্স এডিটর মার্টিন ব্রাইট গুনারত্নকে ‘সবচেয়ে কম বিশ্বাসযোগ্য বিশেষজ্ঞ’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। অস্ট্রেলিয়ান সাংবাদিক এবং গোয়েন্দা কার্যক্রম বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ব্রায়ান তুহি সরাসরি তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাকে ‘স্বঘোষিত বিশেষজ্ঞ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। গুনারত্ন’র অনেক দাবিকেই তিনি বলেন ‘খুবই সাধারণ এবং বোকামিপূর্ণ বক্তব্য’।
গুনারত্ন সম্পর্কে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করার সময় অস্ট্রেলিয়ার ‘দি এজ’ পত্রিকা মনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর গ্লোবাল টেরোরিজম এর রিসার্চ ফেলো এবং অস্ট্রেলিয়ার অফিস অব দ্যা ন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট এর সাবেক বিশেষজ্ঞ ডেভিড রাইট এর কাছে তার সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল। রাইট কোন ব্যক্তি সম্পর্কে সরাসরি মন্তব্য না করে বলেন, সন্ত্রাসবাদ বিশ্লেষণ এমন একটা ক্ষেত্র যেখানে অনেক বিশেষজ্ঞের বিশেষজ্ঞ মতই প্রশ্নবিদ্ধ। অজ্ঞাত গোয়েন্দা সূত্রের তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে তিনি এও বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু রাষ্ট্রে অনেক গোয়েন্দা তথ্যই ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং সুনির্দিষ্ট কোন উদ্দেশ্যে কেউ কেউ গোয়েন্দা তথ্য ফাঁস করেন। গুনারত্ন’র সব বিশ্লেষণই যেখানে তথাকথিত গোয়েন্দা তথ্যনির্ভর সেখানে ডেভিড রাইট বলেন, এরকম অজ্ঞাত সূত্রের তথ্যকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়ার যুক্তি নেই কারণ অনেক গোয়েন্দা তথ্যই শেষ পর্যন্ত আসলে ভুয়া হিসেবে প্রমাণ হয়।
বিভিন্ন বই, ম্যাগাজিন এবং গণমাধ্যমে রোহান গুনারত্ন সম্পর্কে যেসব পরিচিতি তুলে ধরা হয় তাতে যে কেউ মুগ্ধ হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু ‘সানডে এজ’-এর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এর অনেকগুলোই ভুয়া। তার বই’র পরিচিতিতে উল্লেখ আছে যে তিনি জাতিসংঘের টেরোরিজম প্রিভেনশন ব্রাঞ্চের প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন। কিন্তু ‘এজ’-এর কাছে গুনারত্ন স্বীকার করেছেন, জাতিসংঘের ওই সংস্থায় প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা বলে কোন পদই নেই। তিনি সেখানে ২০০১-০২ সালে গবেষণা পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন।
জাতিসংঘ, মার্কিন কংগ্রেস এবং অস্ট্রেলিয়ান পার্লামেন্টে তিনি আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে বক্তৃতা করেছেন বলে তাই বইপত্রের পরিচিতিতে যে কথা বলা হয় সেটাও যে ভুয়া তা তার বক্তব্যেই প্রমাণিত। গুনারত্ন স্বীকার করেছেন, ওইসব জায়গায় তিনি সরাসরি বক্তৃতা করেননি। তিনি বলেন, তিনি অস্ট্রেলিয়ান পার্লামেন্ট নয় বরং পার্লামেন্টারি লাইব্রেরির একটি সেমিনারে বক্তা ছিলেন। একইভাবে তিনি মার্কিন কংগ্রেসে বক্তৃতা করেননি বরং কংগ্রেসের একটি শুনানিতে কিছু প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। আর জাতিসংঘে বক্তৃতা নয় বরং জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ বিভাগে একটি গবেষণাপত্র সরবরাহ করেছেন।
এখন যেমন আইএস নিয়ে তিনি বেশি কথা বলেন ঠিক তেমনি আগে কথা বলতেন আল কায়েদা বিষয়ে। আল কায়েদা সম্পর্কে তার ধারণা কিভাবে পাওয়া ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গুনারত্নে দাবি করেন, তার এত ধারণার উৎস: আল কায়েদার নেতাদের সাক্ষাতকার, আল কায়েদার বিভিন্ন স্তরের সদস্যদের সাক্ষাতকার, আফগান যুদ্ধের পর উদ্ধার হওয়া নানা তথ্য উপাত্ত এবং ডজনেরও বেশি দেশে আল কায়েদা সন্দেহভাজনদের বর্ণনা। এসবই হয়তো তিনি গোয়েন্দা সূত্রে পেয়েছেন। কিন্তু সেই সরবরাহ এবং এর পথ ধরে গুনারত্ন’র ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ যে ওই গোয়েন্দা সংস্থা/সংস্থাগুলোর স্বার্থেই উচ্চারিত তা যেকোন সাধারণ মানুষও সহজে বুঝতে পারেন।







