নতুন প্রধান বিচারপতির কাছে উচ্চ আদালতের কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতিসহ নানা অসংগতি ও অনিয়মের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মাহবুবে আলম বলেছেন, কজ লিস্টে নির্ধারিত সময়ের সঙ্গে বিচারকদের আদালতে ওঠা বা নামার কোনো সংগতি নেই। এ অবস্থা চললে বিচার ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে।’’
সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতি ও অ্যাটর্নি জেনারেলের পক্ষ থেকে প্রধান বিচারপতিকে দেয়া সংবর্ধনায় তিনি বলেন, ইদানীং হাইকোর্ট বিভাগের বিভিন্ন বেঞ্চ সম্বন্ধে যেসব আলোচনা হয় তা এখানে প্রকাশ করার মত নয়।
‘এমনও দেখা যায়, চার বছর আগে দায়ের করা মামলা লিস্টে বহাল তবিয়তে আছে, অথচ দু’মাস আগে দায়ের করা মামলা চূড়ান্ত শুনানি হয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও আদালতের কিছু অসাধু কর্মচারী মামলা নিচ থেকে উপরে উঠানোর কাজ করে হাতিয়ে নিচ্ছেন লক্ষ লক্ষ টাকা। কিছু মামলা শুনানি করা যাচ্ছে না। আবার কিছু মামলা শুনানি হয়ে যাচ্ছে রকেট গতিতে।’
তিনি আরো বলেন, কোনো কোনো আদালতে বিনা নোটিশে মামলা আংশিক শ্রুত হচ্ছে। অনেক মামলা শুনানির পরে রায় দেওয়া হচ্ছে না দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। আবার দেখা যায় মামলার রায় হলেও পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হচ্ছে না।’
‘‘আমি এই আদালতে যোগদানের পর দেখেছি সকাল সাড়ে দশটায় ঠিক কাঁটায় কাঁটায় অনেক বিচারপতি এজলাসে বসতেন এবং কোর্টে আসীন হওয়া ও কোর্ট থেকে নেমে পড়ার ব্যাপারে কজ লিস্ট-এ যে সময় দেওয়া আছে তার কোনো ব্যত্যয় হতো না। কিন্তু এখন কজ লিস্ট-এর যে সময় ধার্য করে দেওয়া হয়েছে তার সাথে বিচারকদের আদালতে ওঠা বা নামার কোনই সংগতি নেই। এ অবস্থা চললে বিচার ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে।’’
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আমি মনে করি উচ্চ আদালতের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ভেতরে একটি বিরাট অংশ ইতিমধ্যে দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়েছেন। সবচেয়ে ভয়াবহ যে বিষয়টি, তা হলও, বিশেষ বিশেষ কিছু কোর্ট বিশেষ বিশেষ আইনজীবীর কোর্ট হয়ে গেছে। বিচারপ্রার্থী ব্যক্তিগণ অনেকে জেনে গেছেন, কোন কোর্টে কাকে নিয়ে গেলে মামলা জেতা যাবে। এটাতো ন্যায় বিচারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। অনেকেই ছুটছেন বিচারপতিদের সন্তান, স্ত্রী যারা আইনজীবী হিসেবে নিয়োজিত আছেন তাদের দিকে এই চিন্তা করে যে, এদেরকে নিয়ে গেলে হয়ত মামলায় জেতা যাবে।
‘‘কোনো কোনো বিচারপতিরা সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েন তার বেঞ্চ অফিসারের উপরে এবং আইনজীবীদের কথায় তারা কোনো কর্ণপাত করেন না বরং তারা পরিচালিত হন তাদের বেঞ্চ অফিসারদের প্রভাবে। ইতিমধ্যে একজন বিচারপতি অবসরে গিয়েছেন। তার প্রতিটি মামলার রায়ই ছিল একই রকম বাক্য সমৃদ্ধ এবং অনেকে হাসাহাসি করতো এই কথা বলে যে, তার হয়ে তার রায় লিখে দিচ্ছে তার বেঞ্চ অফিসার।”
আদালতের রায় নিয়ে জাল জালিয়াতি শুরু হয়ে গেছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রের প্রধান অাইন কর্মকর্তা বলেন, আদালত থেকে জামিন দেওয়া হয়নি অথচ জামিনের কাগজ তৈরি করে আসামীরা জেল থেকে বেড়িয়ে গেছে। কতিপয় বিচারপতির আদালত চালানোর অব্যবস্থা দ্বারা সমস্ত বিচারালয়ের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।
‘‘মাননীয় প্রধান বিচারপতি, আমরা আপনাকে আশ্বস্ত করতে পারি এই বলে যে, আদালতের ভাবমূর্তি উন্নত করার জন্য, বিচার কাজকে গতিশীল করার জন্য, দেশের বিচার ব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য, বিচার কার্যে স্বচ্ছতা আনার জন্য এবং বিচারক ও আইনজীবীদের মঙ্গলের জন্য আপনি যে সমস্ত পদক্ষেপ নিবেন সে বিষয়ে আমরা আপনাকে নিঃশর্ত সমর্থন করব। আপনি এগিয়ে চলুন। আমরা থাকব আপনার সাথে।’’
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি জনাব সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ছাড়াও আপীল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিবৃন্দ, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি, সমিতির সাবেক সভাপতি, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেলসহ আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।







