অর্থ পাচার মামলায় তারেক রহমানকে বিচারিক আদালতে খালাস দিয়ে দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা আপিল মঞ্জুর করে তাকে ৭ বছরের কারাদণ্ডাদেশ ও ২০ কোটি টাকা জরিমানার রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। সেই সঙ্গে বিচারিক আদালতকে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
তারেকের বন্ধু গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের সাজাও বহাল রাখা হয়েছে।
বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি জে.বি.এম হাসান সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ রায় ঘোষণা করেন।
নিম্ন আদালতে তারেকের খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে দুদকের আপিল এবং দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে মামুনের করা আপিলের ওপর শুনানি শেষে গত ১৬ জুন মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখেন হাইকোর্ট। আদালতের ভেতরে বাইরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের মধ্য দিয়ে রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্ট বেঞ্চ।
দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান জানিয়েছেন, যেদিন তারেক রহমান গ্রেফতার হবেন বা আত্মসমর্পণ করবেন, সেদিন থেকে তার বিরুদ্ধে হওয়া এই রায় কার্য হবে।
অর্থ পাচার নিয়ে পর্যবেক্ষণও দেন হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ। এ ব্যাপারে খুরশীদ আলম খান বলেন, কিছু সংখ্যক রাজনীতিক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্থ পাচার করছেন। দেশের মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করছেন। তারেক রহমানের মামলাটি এর সেরা উদাহরণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
দুদক আইনজীবী বলেন, ব্যাপারটি আদালত পছন্দ করেননি। সাধারণ মানুষের অধিকার যেন প্রতিষ্ঠিত হয়, সে জন্য খুব কঠোরভাবে আইন অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
তারেক রহমান পলাতক থাকায় তার পক্ষে আইন অনুযায়ী কোনো আইনজীবী না থাকলেও তার বন্ধু গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের পক্ষে থাকা আইনজীবীরা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে তাদের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানান। আইনজীবী জয়নাল আবেদীন বলেন, যেহেতু তারেক রহমান চিকিৎসার জন্য বিদেশে রয়েছেন, তিনি পলাতক নন, সেহেতু এই অবস্থায় সিআরপিসি এবং অন্যান্য ধারাগুলো খতিয়ে দেখা হবে যে তিনি নিজে আপিল করতে পারেন কিনা।
তবে আপিল করার আগে তারেককে আগে আত্মসমর্পণ করে জেল হাজতে যেতে হবে বলে জানান দুদকের আইনজীবী। কারণ এটি হাইকোর্ট বিভাগের রায়। এতে আপিল করতে হয় রায় হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে।
তারেককে খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে দুদক ২০১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর আপিলের আবেদন করে। শুনানি শেষে ২০১৪ সালের ১৯ জানুয়ারি হাইকোর্ট দুদকের আপিল গ্রহণ করে আসামী তারেককে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দেন। আদালতের আদেশে তারেক রহমানকে আত্মসমর্পণ ও আপিলের বিষয়ে অবহিত করতে গত ২০ ও ২১ জানুয়ারি দু’টি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। চার্জশিটে থাকা দুই ঠিকানায় (লন্ডন ও ঢাকা) সমনের নোটিশও পাঠান বিচারিক আদালত।
মামলাটি দায়ের থেকে পুরো বিচার প্রক্রিয়ায় অনুপস্থিত ছিলেন তারেক রহমান। তিনি যুক্তরাজ্যে রয়েছেন।
ক্যান্টনমেন্ট থানায় ২০০৯ সালের ২৬ অক্টোবর মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলায় অভিযোগে বলা হয়, টঙ্গীতে প্রস্তাবিত ৮০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ নির্মাণ কনস্ট্রাকশনস নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে ২০ কোটি ৪১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ঘুষ নেন মামুন।
২০০৩ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ‘বিভিন্ন পন্থায়’ ২০ কোটি ৪১ লাখ ২৫ হাজার ৮৪৩ টাকা সিঙ্গাপুরের সিটি ব্যাংকে মামুনের অ্যাকাউন্টে পাচার করা হয়, যার মধ্যে ৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা তারেক খরচ করেন বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়।
২০১১ সালের ৮ আগস্ট এ মামলায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। ২০১১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। মামলাটিতে ১৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়।
২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর তারেক রহমানকে বেকসুর খালাস দিয়ে তার বন্ধু গিয়াস উদ্দিন আল মামুনকে অর্থপাচার মামলায় ৭ বছরের কারাদণ্ড দেন ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালত। রায়ে কারাদণ্ডের পাশাপাশি মামুনকে ৪০ কোটি টাকা জরিমানাও করা হয়।
এছাড়াও পাচার করা ২০ কোটি ৪১ লাখ ২৫ হাজার ৬১৩ টাকা আদালত রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করারও নির্দেশ দেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে ওই বছরের ৫ ডিসেম্বর আপিল করে দুদক।









