মোহাম্মদপুর থেকে বনানীর রাস্তার পরিধি ষোল কিলোমিটার, এ রাস্তায় মাত্র তিনবার হর্ন বাজিয়েছেন সিএনজি চালিত অটোরিকশা চালক মোহাম্মদ আলী। এরআগে সে এই রাস্তাতেই বিনা কারণে কত-শত হর্ন বাজিয়েছেন তার হিসাব জানা নেই তার।
নিজের ভুল শুধরে নিয়ে মোহাম্মদ আলীর ভাষ্য, ‘অতিরিক্ত হর্নে জনগণের ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ হয় না’।
কিন্তু কার সচেতনতায় অটো-রিকশা,গাড়ি চালকরা এমনটা বলছেন? তিনি মমিনুর রহমান রয়েল। একটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারী বিজ্ঞাপন সংস্থায় চাকরি করছেন।
যত্রতত্র চালকদের হর্ন বাজানো থেকে বিরত রাখতে ‘হর্ন হুদাই বাজায় ভুদাই’ লিখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে সচেতনতা মূলক অসাধারণ প্রচারণা চালাচ্ছেন তিনি। মমিনুরের ব্যানার পড়ে চালকরা রীতিমতোই বন্ধ করছেন অযথা হর্ন বাজানো। তা ছাড়া নানান শ্রেণিপেশার মানুষ যুক্ত হচ্ছেন তার এই উদ্যোগে। হর্ন বাজানো থেকে নিরুৎসাহিত করে লিখা এ প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাজধানীর রাস্তায় মমিনুর ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
সম্প্রতি চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে কথা হয় মমিনুর রহমান রয়েলের, শুনিয়েছেন তার অসাধারণ সচেতনামূলক প্রচারণার আদ্যোপান্ত কথা।
পাঁচ মিনিট আগে যাওয়ার জন্য এতো দ্বৈরথঃ
আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী হর্ন বাজাবে, অপ্রয়োজনে হর্ন বাজাবে না। বিষয়টা এমন হবে যে, আপনি নিশ্চয় প্রয়োজন না হলে কারো সঙ্গে কথা বলেন না। ঠিক তেমনি হর্ন একটা কথা এ কথাটা প্রয়োজন ছাড়া কারো সঙ্গে বলার দরকার নেই। নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে না পাঁচ মিনিট দেরি হবে তাই বলে রাস্তায় এমন প্রকাশের দরকার নেই। হর্ন একটি প্রকাশ, রাস্তায় আপনার প্রকাশভঙ্গী কেমন? অকারণে শব্দ দূষণকারী মানুষদের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন মমিনুর।

মানুষগুলো ভালো হয়ে যাকঃ
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ভাষ্যমতে, ৬০ ডেসিবল থেকে অধিক মাত্রার শব্দ মানুষকে সাময়িকভাবে বধির করে দিতে পারে এবং ১০০ ডেসিবলের থেকে অধিক শব্দে দীর্ঘসময় অতিবাহিত করলে স্থায়ীভাবে শ্রবণশক্তি কমে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা শহরের বেশ কিছু পয়েন্টে শব্দের মাত্রা ৭০ থেকে ১২০ ডেসিবল পর্যন্ত উঠানামা করে থাকে।
মমিনুর রহমান বলেন, অধিকাংশ গাড়িচালক অযথা কোনো কারণ ছাড়াই গাড়ির হর্ন বাজাচ্ছে। রাস্তার মানুষজন, ট্রাফিক পুলিশ থেকে শুরু করে অন্যান্যদের হর্ন বাজিয়ে যে বিপদে ফেলা হচ্ছে তাতে কানের সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে, যেসব পুলিশ দিনরাত কষ্ট করছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে তাদের ভবিষ্যত তো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তাহলে তারা কিভাবে আমাদের সেবা করবে।
মমিনুর বলেন, ‘‘এক ট্রাফিক পুলিশ আমাকে জানিয়েছে সে তার বাড়িতে গিয়ে যে উচ্চ শব্দে টেলিভিশনের সাউন্ড বাড়িয়ে দেয় তাতে পরিবারের মানুষ বিরক্ত হয়। কারণ রাস্তায় সৃষ্ট শব্দ দূষণে সে জোরে সাউন্ড ছাড়া কিছু শুনতে পান না।’’
‘আমরা নিজেরাই আমাদের মৃত্যুকূপ খনন করছি, আমার একটাই কথা মানুষগুলো ভালো হয়ে যাক’-যোগ করেন তিনি।

ফেসবুক থেকে রাস্তায় প্রচারণাঃ
চার বছর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক কেন্দ্রিক শব্দ দূষণের বিরুদ্ধে সচেতনা বৃদ্ধির কাজ শুরু করে মমিনুর। তিনি বলেন, আগে যে ভলিউমে কাজ করেছি এখন তা অনেক বেড়েছে। এখন তো যার যার অবস্থান থেকে রাস্তায় দাঁড়াচ্ছে, স্টিাকার, লিফলেট, ব্যানার আছে। একটি গানও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে।
মমিনুর বলেন, আমার পরিচিতজনদের যাদের গাড়ি আছে, কিছু পরিচিত সিএনজি চালিত অটোরিকশা আছে, তাদের হর্নের অপকারিতা সম্পর্কে বুঝিয়েছি,ব্যানার দিয়েছি। তারা বলেছে যেদিন থেকে ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়েছি এরপর থেকে প্রয়োজন ছাড়া একটা হর্নও দেই না।

ব্যাপক সাড়া মিলছেঃ
মমিনুরের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ইতিমধ্যেই ঢাকা মহানগরীতে ব্যাপক হারে সাড়া ফেলেছে। শব্দ দূষণের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদ দেখে অনেকেই অযথা হর্ন বাজানো বন্ধ করে দিয়েছে। আগে অধিকাংশ চালক যখন কোনো কারণ ছাড়াই হর্ন বাজাত এখন তাদের একটি বড় অংশ রয়্যালের প্রতিবাদে অনেকটা সরে এসেছে।
মমিনুর বলেন, কয়েকদিন আগে কাটাবন মোড়ে একা ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, অনেকে ধন্যবাদ দিয়ে চলে যাচ্ছে, এর মধ্যে এই ছেলেটি বললো, ভাইয়া আপনার কাছে দুটো ব্যানার আছে? আমি বললাম হ্যাঁ, দাঁড়িয়ে গেল আমার পাশে, অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে ছিলাম, আমি চলে এলাম, ব্যানারটা দিয়ে এলাম, ও দাঁড়িয়েই রইল। ছেলেটির নাম নাজমুল, আমার এমন অনেকগুলো নাজমুল দরকার, ব্যানার আমার, নাজমুল আপনার।
খ্যাপাটে মমিনুর,শেষ দেখবেনঃ
অযথা হর্নের হাত থেকে মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত চালিয়ে যেতে চান এই কার্যক্রম। তার চাওয়া সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ুক এই সচেতনতার বার্তা। অকারণে শব্দ দূষণকারী মানুষকে লজ্জা দিতে হবে। যে যার জায়গা থেকে এগিয়ে এলে আমাদের কাজ আরো ভালোভাবে করতে পারবো।
মমিনুর বলেন, সম্প্রতি একটি প্রিন্টিং প্রেসের মালিক তাজ ভাই আমাকে অনেকগুলো ষ্টিকার ছেপে দিয়েছেন, বিনিময়ে একটি টাকাও নেয়নি। এভাবে যদি সবাই এগিয়ে আসে আমাদের সকলের চাওয়া, অকারণ হর্ন বন্ধ হতে বাধ্য।

মমিনুরের কাজে খুশি পুলিশওঃ
মমিনুরের এমন ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগে খুশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মমিনুলের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলছে, আমাদের নিজেদের আগে দায়িত্ববোধ বাড়াতে হবে তবেই ঢাকাসহ পুরো দেশে শব্দ দূষণমুক্ত একটি সহনশীল অবস্থায় ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ে যেতে পারব।

মমিনুরের সঙ্গে যেভাবে যুক্ত হবেনঃ
এ উদ্যোগে যে কেউ দেশের যে কোনো জায়গা থেকে সম্পৃক্ত হতে পারেন। যে কেউ চাইলেই মমিনুরের পোস্টার, স্টিকার, ব্যানারের ডিজাইনের আসল কপি পেতে পারেন। এজন্য আগ্রহীকে যোগযোগ করতে হবে ‘রয়েলের ছবি’ ফেসবুক পেজ:https://www.facebook.com/royalerchhobi-এ। নিজেদের দায়িত্ববোধ, ভালোবাসায় বর্তমানে হাজারেরও বেশি মানুষ এ উদ্যোগে শামিল হয়েছেন।








