চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হো চি মিন এর দেশে ২

হ্যানয় শহরে আমরা যে হোটেলটিতে থাকলাম সেটি বেশ ছোট আকারের ছিমছাম থাকার জায়গায়। শহরের কেন্দ্রে হওয়ার সেখান থেকে হেঁটে বা বাসে-ট্যাক্সিতে করে খুব সহজে যেকোন জায়গায় যাওয়া যায়। হ্যানয়ে বাহন বলতে ট্যাক্সি, বাস রয়েছে। অ্যাপভিত্তিক ট্যাক্সি/বাইক সার্ভিস ‘গ্র্যাব’ ও আছে। তবে হ্যানয়বাসী স্কুটার বা বাইকের উপর নির্ভরশীল। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে স্কুটি বা বাইকে করে হ্যানয়ের রাস্তা ধরে ছুটে চলেছেন।

তবে এই বাইকারদের বিরুদ্ধে ট্রাফিক রুল ভাঙ্গার বদনাম রয়েছে। নিজের চোখে ট্রাফিক রুল ভাঙ্গতেও দেখেছি। বেশীরভাগ বাইকার নামমাত্র ক্যাপের মতো দেখতে হেলমেট পরেন। অনেকে হেলমেট ছাড়াই রাস্তায় নামেন। এই বাইকাররা হ্যানয়কে বাইকের শহরে বানিয়ে দিয়েছেন। আর হ্যাঁ, হ্যানয়ে খুব কম সংখ্যায় রিক্সাও চলে। তবে এসব রিকশার চালক বসেন যাত্রীর পিছনে। বেশীরভাগ রিক্সায় ট্যুরিস্টদেরই চলতে দেখা গেছে। ট্যুরিস্টদের জন্য ভাড়াটাও চড়া।

ভিয়েতনামী রিক্সা

হ্যানয়ে হোটেলে থেকে বেশ ইতিবাচক অভিজ্ঞতা হলো। হোটেলের প্রতিটি কর্মী খুব আন্তরিক। সেখানে ট্যুরিস্ট যেহেতু ভাষার সমস্যায় ভোগেন সে কারণে এ বিষয়ে হোটেলকর্মীরা সাধ্যমতো সহযোগিতা করতে তৎপর থাকেন। যেমন ট্যাক্সি ডেকে দেয়া এবং অতিথি যে জায়গায় যাবেন, সে জায়গার লোকেশন ট্যাক্সি চালককে বুঝিয়ে দেয়া। হোটেকর্মীরা প্রায় সবাই ইংরেজি ভাষায় যোগাযোগ করতে পারেন। ভিয়েতনামে ট্যুরিস্টের সংখ্যা বাড়ছে বছরে ১৩% হারে । ট্যুরিস্টরা যাতে স্বস্তির সঙ্গে নিরাপদে ভ্রমণ করতে পারেন সেটা নিশ্চিতে সরকারী-বেসরকারীভাবে কাজ করে যাচ্ছে তারা। দিনে বা রাতে হ্যানয়ের রাস্তায় চুরি-ছিনতাই নেই, চলতে ফিরতে কারো কোন বাঁকা দৃষ্টিও নেই। বাইকে চলাফেরা করায় হ্যানয়ের ফুটপাথে পথচারী বলতে ট্যুরিস্ট।

হ্যানয়ে ঘুরতে ঘুরতে অনেকগুলো বিশাল কলেবরে জাদুঘর চোখে পড়বে। এগুলোর কোনটায় টিকিট কেটে ঢুকতে হয়, কোনটা টিকিট ছাড়াই পরিদর্শন করা যায়। একদিনে শহরের দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরতে ‘সিটি ট্যুর বাসে’র ব্যবস্থা রয়েছে। এসব বাসে করে শহর দেখতে তিন ধরণের টিকিট রয়েছে। এক ঘন্টার টিকিটে আপনি বাসে বসেই দর্শনাীয় স্থানগুলোর সামনে দিয়ে ঘুরে আসতে পারবেন। চার ঘন্টার টিকিটে ঘুরতে ঘুরতে আপনি প্রতিটি স্পটেই বাস থেকে নেমে পড়তে পারেন। জাদুঘর বা সমাধীস্থলে যেখানেই নামেন সেটাতে ঢুকে পড়তে পারবেন। স্পটটি দেখাশেষে আপনি আবার পরের বাস ধরতে পারবেন। প্রতিটি পয়েন্টে আধাঘন্টা পরপর বাস মিলবে। চার ঘন্টায় সবগুলো স্পট ঘুরতে যদি তাড়াহুড়া মনে হয় তাহলে ২৪ ঘন্টার টিকিট করে ফেলুন। ১৪টি দর্শনীয় স্থান আয়েশ করে মনোযোগ দিয়ে দেখার সুযোগ পাবেন।

হ্যানয় শহরের সবচেয়ে প্রাচীন প্যাগোডা

এই স্পটগুলোর মধ্যে রয়েছে হোয়ান কিয়েম লেক, সেন্ট জোসেফ ক্যাথাড্রাল, ফ্ল্যাগ টাওয়ার, মিলিটারি হিস্টোরি মিউজিয়াম, হো চি মিন মিউজিয়াম, ওয়েস্ট লেক, নর্দান গেইট চার্চ, টেম্পল অব লিটারেচার, হোয়া লো প্রিজন, মিউজিয়াম অব ভিয়েতনামিজ ওমেন, হ্যানয় অপেরা হাউজ, হ্যানয় পোস্ট অফিস। ট্যুরিস্টরা যে স্পটটি কোনভাবেই মিস করেন না সেটি হলো হোয়ান কিয়েম লেক। এটিকে হ্যানয় শহরের প্রাণ বলা যায়। সপ্তাহের যেদিনই যান না কেন রোববারের বিকেলটা কোনভাবেই মিস করা যাবে না। রোববার বিকেলে ওই লেকে গেলে বোঝা যায় একটি দেশের মানুষ কতটা আনন্দমূখর থাকতে পারে। শরীরচর্চা যাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনের অংশ। রোববার লেকের আশেপাশের সব রাস্তায় বাস চলাচল বন্ধ থাকে। ছেলে-বুড়ো সবাই সেখানে জড়ো হয় ভাল সময় কাটাতে। সঙ্গে তাদের পোষা প্রাণীটিকেও নিতে ভুলে না।

সেখানে উদযাপনের কোন বাঁধাধরা নিয়ম নেই। লেকেরে কোন কোনায় লাউড স্পিকারে গান বাজছে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তরুণ-তরুণীরা নাচছে। একটু দূরেই অর্ধ-শত শিশু ছবি আঁকছে, পাশে তাদের মা-বাবা বসে আছে, আঁকায় সহায়তা করছে। আরেকটু দূরে কেউ কেউ স্কেটিং অনুশীলন করছে, বাইসাইকেল চালাচ্ছে। পাশেই চলছে বাঁশের নৃত্য। পর্যটকেরাও নেই নৃত্যে অংশ নিচ্ছেন। লেকের অন্য পাড়ে বাদ্যযন্ত্র পেতে মাইক্রোফোনে গান গাইছেন ভিয়েতনামী বা ইংরেজি ভাষায়। গোল হয়ে দাঁড়িয়ে দর্শনার্থীরা গান শুনছেন, নাচছেন। কেউ কেউ গান শুনে টিপস দিয়ে যাচ্ছেন। তারই অদূরে শরীর চর্চা করছেন অনেকে। এ যেন প্রাণের মেলা।

হোয়ান কিয়েম লেকের পাশে শিশুদের ইচ্ছামতো আঁকাআকি

লেকের পাশে রয়েছে পাপেট শো’র ব্যবস্থা। বিকাল তিনটা থেকে রাত ন’টা পর্যন্ত প্রতি ঘন্টায় একেকটি শো হয়। ভিয়েতনামের প্রাচীন ইতিহাস গল্পে গল্পে পাপেটদের মুখ দিয়ে বলা হয়। এখানে বলে রাখি ভিয়েতনামের মানুষের সকাল শুরু হয় ভোর ৫টায়। সকালের নাস্তা শেষ হয় সাড়ে ৬টা-সাতটার মধ্যে। দুপুরের খাবার সময় ১১-১২টা। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার মধ্যে রাতের খাবার সম্পন্ন। তাদের অফিস শুরু হয় সকাল ৮টায়। সাপ্তাহিক ছুটি দু’দিন। ভিয়েতনামীরা মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে নিজেদের ভাষায়।

বিজ্ঞাপন

হ্যানয়ের চার্চ বা প্যাগোডায় জনসমাগম কম। কিন্তু খুবই ছিমছাম পরিবেশ। ফরাসীরা যখন ভিয়েতনাম শাসন করেছে সে সময়ে এগুলো প্রতিষ্ঠিত। সবখানেই বিশাল বিশাল বনসাই দিয়ে সাজানো। বাংলাদেশের সঙ্গে ভিয়েতনামের গাছপালা, ফুল, ফলে অনেক মিল। আমাদের মতো তাদেরও প্রধান খাদ্য ভাত। তারা প্রতিবছর উদ্বৃত্ত চাল রপ্তানী করে। বাংলাদেশও ভিয়েতনামের চাল আমদানি করে।

হ্যানয়ে সবচেয়ে বেশী দর্শনার্থী লক্ষ্য করা যায় হো চি মিন মিউজিয়ামে। যেখানে তাদের জাতীয় নেতা হো চি মিন এর মরদেহ মমি করে রাখা হয়েছে। যদিও ধারণা করা হয়, হো চি মিনের মরদেহ কোথায় আছে সেটা খুবই গোপনীয় ব্যাপার। হ্যানয়ে তাদের নেতার মরদেহ নেই। হো চি মিনের সমাধি সৌধে নিরাপত্তার বাড়াবাড়ি চোখে পড়ার মতো। এই সমাধি সৌধের খুব কাছেই ভিয়েতনামের পার্লামেন্ট ভবন, রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী ভবন, কমিউনিস্ট পার্টির কার্যালয় রয়েছে।

ওমেন মিউজিয়ামে ভিয়েতনামী নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক

হ্যানয়ে ব্যতিক্রমী মিউজিয়ামটি ওমেন মিউজিয়াম। বিশ্বের অন্য কোন দেশের কেবল নারীদের নিয়ে কোন মিউজিয়াম আছে বলে ধারণা নেই। এই জাদুঘর ঘুরে জানা যায়, ভিয়েতনামে অনেকগুলো সম্প্রদায়ের বসবাস। মাতৃপ্রধান এসব সম্প্রদায়ের পোশাক, জীবনযাপন বৈচিত্র্যময়। কৃষি থেকে শুরু করে যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্ত নারীদের অবদান খুবই জোরালো। দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধে নারীরা পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছেন। নারীরা তার স্বীকৃতিও পেয়েছেন। ক্যাম্বোডিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে স্বামী-সন্তান হারানো ৫০ হাজার বৃদ্ধা নারীকে ‘মাদার অব ওয়ার’ উপাধি দিয়ে তাদের জন্য পেনশন বরাদ্দ করেছে ভিয়েতনাম সরকার। নারীদের জীবন যাপন এবং দেশের জন্য তাদের অবদান সুচারুরূপে প্রদর্শিত হচ্ছে এই মিউজিয়ামে। আর মিউজিয়ামের নীচতলায় নান্দনিক একটি লাইব্রেরিও রয়েছে। আধুনিক এই লাইব্রেরিতে রয়েছে সময় কাটানোর সুন্দর ব্যবস্থা।

হ্যানয়ের আরেকটি বহুল দর্শনীয় স্থান ‘টেম্পল অব লিটারেচার’। কেবল লেখাপড়া নয়, ভিয়েতনামের সবচেয়ে প্রাচীন এ বিশ্ববিদ্যালয় এখন শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার প্রাণকেন্দ্র। ট্যুরিস্ট ছাড়াও শত শত শিক্ষার্থী এখানে আসে। পরীক্ষায় ভাল ফল করতে শিক্ষার্থীরা এখানে প্রার্থনা করতে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পাশে একটি বৌদ্ধ মন্দির রয়েছে। রয়েছে পদ্মপুকুর, সুভেনির শপ। আমাদের দেশের শাপলার মতো সেদেশের খালে-বিলে ফোটে পদ্ম ।
ভিয়েতনামে বৌদ্ধ, খৃস্টানের পাশাপাশি খুব কম সংখ্যায় মুসলমান নাগরিকও আছে। হ্যানয়ে মসজিদ রয়েছে একটি। ইসলাম ধর্মাবলম্বী দেশগুলোর যেসব দূতাবাস রয়েছে হ্যানয়ে সেসব দেশের কূটনীতিক, কর্মকর্তারা মিলেই মূলত মসজিদটি চালিয়ে নেন। ঈদ উৎসবও হয় এই মসজিদকে কেন্দ্র করে। ঈদ উল আজহায় কোরবানীও হয়, সীমিত আকারে। ঈদের সময়ে অবশ্য সরকারী ছুটি নেই।

টেম্পল অব লিটারেচার, হ্যানয়ের বৃহত সমাধিক্ষেত্রও। এখানে নিহত বুদ্ধিজীবীদের সমাহিত করা হয়েছে। এপিটাফে প্রত্যেকের পরিচয় লিপিবদ্ধ আছে

হ্যানয়ে সবুজের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। আরো একটি বিষয় হলো, এ শহরে বহুতল ভবন খুব কম। ছোট ছোট মহল্লায় বিভক্ত এলাকায় ভবনগুলো বেশ পুরনো। এগুলোর নকশাও ঐতিহ্যবাহী। খুব ছোট জমিতে নির্মাণ করা হয়েছে দোতলা-তিন তলা ভবন। একটি পরিবারের থাকার ব্যবস্থা সেখানে। নীচ তলায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, দোকান। প্রতিটি পরিবারই কোন না কোন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ব্যবসা সে দেশের মানুষের প্রধান পেশা।

শহরজুড়ে রয়েছে ছোট বড় বেশ কয়েকটি লেক। সবচেয়ে বড় লেকটির নাম ‘ওয়েস্ট লেক’। হোয়ান কিয়েম লেকের মতো এখানে প্রাণ প্রাচুর্য না থাকলেও এখানে রয়েছে নির্মল পরিবেশ। রয়েছে নিরিবিলি সময় কাটানোর সুযোগ। পাশ দিয়ে হেঁটে যায় কলা, আমড়া, ড্রাগন ফ্রুট বহনকারী ফেরিওয়ালা। লেকের কোনায় ফাস্টফুডের দোকানও রয়েছে। আরো আছে শহরের সবচেয়ে প্রাচীন প্যাগোডা। পূর্ণিমার রাতে যেখানে প্রার্থনা করতে আসেন হাজারো ভিয়েতনামী নাগরিক। ওয়েস্ট লেক মাঝ বরাবর একটি রাস্তা দিয়ে বিভক্ত। ঐতিহাসিক কারণেও এ লেকটি ভিয়েতনামীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে যেটিকে খুব গর্বের সঙ্গে পর্যটকদের দেখায় তারা।

এই লেকের পাশেই প্যারাসুট দিয়ে আহত অবস্থায় নামতে বাধ্য হয়েছিলেন তৎকালীন মার্কিন সেনা, সদ্য প্রয়াত মার্কিন সিনেটর জন ম্যাককেইন। মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময়ে ১৯৬৭ সালে হ্যানয়ে একটি মার্কিন বোমারু বিমান ভূপাতিত করে ভিয়েতনামীরা। ‘অপারেশন রোলিং থান্ডার’ পরিচালনাকালে আহত অবস্থায় ভিয়েতনামী বাহিনীর হাতে আটক হন তিনি। এর পর দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর আটক ছিলেন জন ম্যাককেইন। বন্দী অবস্থায় নির্যাতনেরও শিকার হন তিনি। ওই সময়টাকে স্মরণীয় রাখতে ছোট একটা ভাষ্কর্য নির্মিত হয়েছে ওয়েস্ট লেকের পাড়ে।

চলবে

বিজ্ঞাপন