চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হেফাজত, মৌলবাদ এবং করণীয়

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবর্ষ উদযাপনকে কেন্দ্র করে ২৫ থেকে ২৮ মার্চ ২০২১ তারিখের মধ্যে ধর্মান্ধ এবং উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী,হেফাজতে ইসলাম আবার নতুন করে সহিংস তাণ্ডব চালিয়েছে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী, মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, নোয়াখালী, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রামসহ বেশ কিছু স্থানে। তারা হামলা করে জ্বালিয়ে দিয়েছে যানবাহনে, ভূমি অফিসসহ বেশ কয়েকটি সরকারি কার্যালয়ে,সরাসরি পুলিশের উপরে, থানায়, প্রেসক্লাবে, গ্রন্থাগারে, আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বাসভবনে, হিন্দুদের মন্দির, অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গনে, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে। হেফাজতীদের আক্রমণের লক্ষ্য খুব স্পষ্ট। তারা ধ্বংস করতে চায় বাংলাদেশের মূল বিষয়গুলোকে: বঙ্গবন্ধু, অসাম্প্রদায়িকতা, আধুনিক শিক্ষা ও জ্ঞান, রাষ্ট্র ও সরকার। তারা প্রগতি বিরোধী। তারা বাংলাদেশ বিরোধী। তারা সাম্প্রদায়িক।

হেফাজতের নেতৃত্বে সংগঠিত এই সহিংস তাণ্ডবের অজুহাত ছিল: ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মোদির বাংলাদেশে আগমন। ধর্মান্ধ গোষ্ঠী নরেন্দ্র মোদিকে ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার জন্য দায়ী করে তাঁর বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদ হিসেবে চার দিন ধরে চালানো হয় এই সহিংস তাণ্ডব। হেফাজতের তাণ্ডব দমন করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় ১৩ জন। ১৩টি প্রাণের দায় অবশ্যই হেফাজতের। হেফাজতের সঙ্গে এই তাণ্ডবে যোগ দেয় বিএনপি এবং জামায়াত। প্রাণ খয়ের দায় তাদেরও। ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সর্বাত্মক সহায়তা করেছে। তাদের ষোল হাজার সেনা সদস্য বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছে। বাংলাদেশের সুবর্ণ জয়ন্তীর এই উৎসবে ভারতও অংশীদার। ব্যক্তি নরেন্দ্র মোদি যেই হোক না কেন তিনি ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভোটে দুই বার নির্বাচিত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে হতে পারে না।

বিজ্ঞাপন

হেফাজতের ডাকা হরতালকে “যৌক্তিক” বলে আখ্যা দিয়েছে বিএনপি এবং সমর্থন দিয়েছে গণ সংহতি আন্দোলন এবং ভাষানী অনুসারী পরিষদ। ২০১৪ সালে প্রথমবার নরেন্দ্র মোদি ভারতের জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিল বিএনপি। সে নির্বাচন চলাকালীন বিভিন্ন সভা-সমাবেশের বক্তৃতায় ভারতীয় জনতা পার্টি তথা মোদীকে সমর্থন করে বক্তব্য রাখেন বিএনপি নেতৃবৃন্দ। আমেরিকার তল্পিবাহক তথাকথিত সুশীল সমাজ নিয়ন্ত্রিত মিডিয়াগুলো মোদীর সমর্থনে সংবাদ প্রচার করে। সামাজিক মাধ্যমে জামায়াত, বিএনপি এবং অন্যান্য উগ্রবাদী ধর্মান্ধ গোষ্টী কংগ্রেসের বিরোধিতা এবং বিজেপি’র সমর্থনে প্রচারণা চালায়। তখন তাদের কাছে মোদি অনেক প্রিয়পাত্র ছিলেন।

২০১৫ সালে নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময় তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তখন কোন ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী মোদীর সফরের বিরোধিতা করেনি। তবে এবার কেন বিরোধিতা? ধর্মান্ধ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ধারণা ছিল কংগ্রেস যেহেতু ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের বন্ধু সেহেতু বিজেপি বাংলাদেশ রাজনীতিতে আওয়ামী লীগর সঙ্গে সখ্যতা না বরং এদেশের আওয়ামী লীগ বিরোধীদের সঙ্গে তার নতুন করে বন্ধুত্ব সৃষ্টি করবে। আওয়ামী বিরোধীদের সে ধারণা সঠিক না হওয়ায় দিন দিন তারা মোদি বিরোধিতায় লিপ্ত হয়ে তাদের বহু পুরনো ভারত বিদ্বেষ রাজনীতি চাঙ্গা করে। ভারত বিরোধিতা প্রচণ্ডভাবে প্রদর্শন করার উদ্দেশ্যেই বিএনপি, গণ সংহতি আন্দোলন, ভাসানী অনুসারী, জামায়াত, হেফাজতসহ সকল ধর্মান্ধ এবং উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তিগুলো একত্রিত হয়ে এই সহিংস তাণ্ডব চালায়।

ব্রিটিশ রাজ তাড়িয়ে ধর্মের নামে নিজের জন্য আলাদা সাম্রাজ্য গড়তে দ্বি-জাতি তত্ত্ব হাজির করে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ। দ্বি-জাতি তত্ত্ব প্রয়োগ করার জন্য দরকার হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার। বিগত শতাব্দীর ৪০’র দশকে শুধুই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পুরণের লক্ষ্যে লাগানো হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। সেই থেকে শুরু হয়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি চলছে আজও –স্বাধীন বাংলাদেশেও। পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম প্রধান কারণ ধর্মীয় আগ্রাসন। মুক্তিযুদ্ধে সকল ধর্মের অনুসারীরা সমানভাবে অংশ গ্রহণ করে, স্বাধীন করে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দ্রুততম সময়ের মধ্যে উপহার দেন পবিত্র সংবিধান। সংবিধানের চার মূল ভিত্তির একটি হল-ধর্মনিরপেক্ষতা। বঙ্গবন্ধু নিষিদ্ধ করেন ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতি এবং রাজনৈতিক দল।

ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশ ধর্মপ্রাণ মানুষের দেশ। বেশিরভাগ মানুষ অসাম্প্রদায়িক চেতনার হলেও এখনও দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ ধর্মান্ধ। ধর্মান্ধদের ধর্মের বড়ি খাইয়ে রাজনৈতিক সমর্থন আদায় করা সহজ। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও দেশ থেকে দূর করা যায়নি ধর্মান্ধতা, উগ্রবাদিতা ও সাম্প্রদায়িকতার অশুভ শক্তি। এর প্রধান কারণ ৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়ার নেতৃত্বে রাষ্ট্র শক্তি হাতে নিয়ে নেয় মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত সাম্প্রদায়িকেরা, যুদ্ধাপরাধীরা। স্বাধীন দেশেও তারা পরাজিত ধর্মান্ধ মুসলিম লীগ, জামায়াত, নেজামে ইসলামসহ অন্যান্য ধর্মীয় উগ্রবাদীদের নিয়ে গড়ে তোলে নতুন রাজনৈতিক বলয়। ১৯৭৫ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত টানা ৩৩ বছর পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং আমেরিকার সমর্থনে তারা বাংলাদেশকে আফগানিস্থান বানানোর রাজনীতি চালিয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে অর্থনৈতিক শক্তিগুলো কুক্ষিগত করে, এনজিওদের নামে বিদেশী অর্থ এনে এরা ঘরে ঘরে গিয়ে ধর্ম প্রচারের নামে ছড়ায় ধর্মান্ধতা, উগ্রবাদীতা এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিষবাস্প। তারা ঢাকার রাজপথে স্লোগান দেয়–আমরা হব তালেবান/ বাংলা হবে আফগান।এর ফল হয় দীর্ঘ প্রসারী। বর্তমান সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থানের পেছনে রয়েছে ৩৩ বছর ধরে ছড়ানো সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প।

উপরোক্ত ৩৩ বছরের মধ্যে ১৯৯৬–২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও আন্তর্জাতিক শক্তির প্রভাবের কারণে কোন পদক্ষেপ নিতে পারেনি সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কারণে নিজেরাও কিছুটা হেলে পড়ে ধর্মীয় রাজনীতির দিকে। ৯৬ সালের নির্বাচনের সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মাথায় হিজাব বেঁধে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন। নিজেদের ইসলামী আদর্শের অনুসারী হিসেবে প্রমাণ করতে অতি উৎসাহী হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া দলটি। একই পরিস্থিতি দেখা যায় ২০০৬ সালের নির্বাচনের সময় খেলাফতে মজলিসের সঙ্গে স্বাক্ষরিত এবং পরবর্তীকালে বাতিল করা চুক্তির ক্ষেত্রে এবং ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে শাস্তি দেয়া শুরু হলে। ৫ ফেব্রুয়ারি শাহবাগে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বলীয়ান প্রগতিশীল মানুষের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণজাগরণ শুরু হলে একাত্তরের পরাজিত ঘাতকেরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির উপর আক্রমণ চালায় দুই দিক থেকে। একদিকে তারা সরাসরি সরকারী বাহিনী এবং অফিস-আদালত সমূহের উপর সশস্ত্র আক্রমণ চালায় আরেক দিকে গণজাগরণে যোগ দেয়া প্রগতিশীল মানুষদের নাস্তিক আখ্যা দিয়ে তাদের একে একে চাপাতি দিয়ে হত্যা করতে থাকে। এরই মধ্যে রাজনীতির মাঠে উদয় হয় হেফাজতে ইসলামের।

২০০৮ সালের নির্বাচনের ফলশ্রুতিতে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণ করে ঘোষণা করে “নারীনীতি”। প্রগতিশীল এই নীতির বিরোধিতা করে বেশ কয়েকটি ছোট ছোট ধর্মান্ধ, উগ্রবাদী ও সাম্রদায়িক রাজনৈতিক দল কওমি মাদ্রাসাগুলোকে কেন্দ্র করে হাটহাজারী মাদ্রাসার প্রধান আল্লামা শফীর নেতৃত্বে অরাজনৈতিক ব্যাণারে গড়ে তোলে হেফাজতে ইসলাম। যে সকল দল এই ব্যানারে যুক্ত হয় তাদের বেশিরভাগের বিরুদ্ধে রয়েছে বাংলাদেশ বিরোধিতার এবং একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ। হেফাজতেইসলাম নামে সংগঠনটির অস্তিত্ব একাত্তর সালে না থাকায় এরা এক রকম আড়াল সৃষ্টি করে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষদের মধ্যে বিশেষ করে তাদের মাদ্রাসাগুলো থেকে পাশ করা মানুষদের মধ্যে সমর্থন পেয়ে যায়। ১৩ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচালের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে জামায়াত-বিএনপি চক্র এদের মধ্যযুগীয় ১৩ দফা দাবি নিয়ে মাঠে নামায়। ১৩ দফার মধ্যে ব্লাসফেমী আইন চালু করার দাবিও যুক্ত করা ছিল। জামায়াত, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি হেফাজতের ১৩ দফায় প্রকাশ্য বিবৃতির মাধ্যমে সমর্থন দেয়। ৫ মে ২০১৩ তারিখে মতিঝলের শাপলা চত্বরে সমবেত হয়ে তারা ১৩ দফা মেনে না নিলে ঢাকা দখল করে নেবার ঘোষণা দেয়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করে তাদের শাপলা চত্বর ছাড়তে বাধ্য করে। দেশ মুক্তি পায় তালেবানী রাষ্ট্র হওয়ার হাত থেকে; বর্বরদের রাজত্ব কায়েম থেকে; মধ্যযুগীয় অন্ধকারে প্রবেশের পথ থেকে।

হেফাজত ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক গোষ্ঠী হলেও এরা শুরুতে জামায়াত বিরোধী ছিল। জামায়াত রাজনীতি করে মওদুদী তথা ওয়াহাবী ঘরানায়। হেফাজত করে সুফি ঘরানায়। জামায়াত আন্তর্জাতিক পরিসরে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত আছে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সৌদি, তুর্কি, মিশরীয়সহ বেশ কয়েকটি দেশের ইসলামী মৌলবাদী দলগুলোর সঙ্গে। হেফাজত মূলত ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসা কেন্দ্রিক। এরা আন্তর্জাতিক নয়। জামায়াত রাজনীতি করে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনস্ত এবতেদায়ী মাদ্রাসাগুলোকে নিয়ে। হেফাজত করে কওমি মাদাসাগুলোর ছাত্রদের নিয়ে। সব সময় হেফাজত জামায়াতের বিরুদ্ধে রাজনীতি করলেও ১৩ সালে এসে জামায়াতের পয়সা আর পাকিস্তান, সৌদি ও আমেরিকার রাজনৈতিক চাপে জামায়াতের সঙ্গে এক প্লাটফর্মে যুক্ত হয়। ১৩ সালের জামায়াত-বিএনপি-হেফাজতের যৌথ সহিংস তাণ্ডব এবং তা থেকে উৎসারিত সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থানের ফলে যথেষ্ট উন্নয়নমূলক কাজ করার পরেও পর পর পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রতিটিতে আওয়ামী লীগের পরাজয় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগকে নতুন করে বাংলাদেশ রাজনীতি মূল্যায়নে এবং পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে। এমন অবস্থায় আওয়ামী লীগ সাম্প্রদায়িক শক্তিকে বিভক্ত করার উদ্যোগ নেয়। বিভিন্ন কৌশলে এবং উপঢৌকনে হেফাজতকে জামায়াত থেকে দূরে সরিয়ে আনতে সমর্থ হয়।

বিজ্ঞাপন

মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী এবং সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তি হেফজতকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা না করে তাদের সঙ্গে এই কৌশলী সম্পর্ক স্থাপন করে তাদের কাছে টানতে গিয়ে আওয়ামী লীগের ক্ষতি হয়েছে অনেক বেশি। এদের ছাড় দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগকে জাতীয় শিক্ষা বোর্ডের কারিকুলামে অনেক পরিবর্তন আনতে হয়েছে যা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চরিত্র নষ্ট করেছে। এছাড়াও কোন রকম নিয়মকানুন তৈরি না করে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের মর্যাদা দেয়া ছিল আরেকটি হটকারী সিদ্ধান্ত। এসব প্রাপ্তি হেফাজতকে বেসামাল করে তোলে। তারা দিন দিন দাবি-দাওয়া বাড়াতে থাকে। তারা সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে ভাষ্কর্য সরাতে বাধ্য করে প্রধান বিচারপতিকে। হেফাজতকে কাছে টানার এই কৌশল আওয়ামী লীগের জন্য দীর্ঘ মেয়াদী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, হেফাজত প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা শফির মৃত্যুর পর হেফাজতের নেতৃত্ব সংগঠনের ভেতরে থাকা জামায়াত ঘনিষ্ঠদের হাতে চলে যাওয়ায় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রাপ্তি–ধর্মীয় উগ্রবাদীদের বিভক্ত করাও আর কার্যকর থাকল না। আওয়ামী লীগ এখন সকল ধর্মীয় উগ্রবাদী এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির বিপক্ষে।

হেফাজতকে কাছে টানার ভুল কৌশলের ফল হয়েছেঃসমাজে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার চর্চা বেড়ে যাওয়া; শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তক থেকে অসাম্প্রদায়িক এবং সাংস্কৃতিক বিষয়গুলোর কাটছাঁট; বুড়িগঙ্গায় বঙ্গবন্ধুর ভাষ্কর্য্য ছুঁড়ে ফেলার হুমকি শোনা, স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর ভাষ্কর্য্য ভেঙ্গে ফেলা, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে আগুন ধরিয়ে দেয়া –স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলাদেশের স্থপতির অবমাননা;প্রগতিশীল মানুষদের আওয়ামী লীগের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠা; সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষগুলোর মনোবল ক্ষয়ে যাওয়া;ধর্মান্ধ, উগ্রবাদী এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির সুসংগঠিত হয়ে নবোত্থান হওয়া।

মধ্যযুগে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মীয় প্রভাব ব্যাপকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। কোন একটা ধর্ম দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা করা হলে সে দেশে বহুমতের সুযোগ থাকে না, বিতর্ক হয় না, বিকাশ হয় না। ভিন্ন মতের এবং ধর্মের প্রতি অসহিস্নুতা এবং একই ধর্মের মধ্যে বিভক্তি বাড়তে থাকে ফলে সমাজে নির্যাতন, নিপীড়ন বেড়ে যায়। এক সময়ে বঞ্চিতরা প্রতিবাদ, প্রতিরোধ করে ওঠে – ধীরে ধীরে সমাজে সহিংসতা, হানাহানি, ধ্বংস, হত্যা, ইত্যাদি বাড়তে থাকে; প্রগতি বাধাগ্রস্থ হয়; সমাজ পিছিয়ে পড়ে। মধ্যযুগে রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মের প্রভাব বেড়ে যাওয়ার ফলশ্রুতিতে শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, প্রযুক্তি, বাণিজ্যসহ সকল ক্ষেত্রে সমগ্র পৃথিবী পিছিয়ে পড়েছিল। এ কারণেই মধ্যযুগকে অন্ধকারের যুগ বলে অভিহিত করা হয়। রেনেসাঁর মাধ্যমে ইউরোপসহ অনেক দেশ থেকে বিতাড়িত হয় মধ্যযুগীয় বর্বর রাজনীতি। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িকেরা বাংলাদেশকে মধ্যযুগের বর্বরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক কালে একই দৃশ্য দেখা গিয়েছে ধর্মান্ধ তালেবানদের রাজত্ব আফগানিস্তানে। বাংলাদেশকে তালেবানী রাষ্ট্র হতে দেয়া যায় না।

৩০ লক্ষ শহীদ আর চার লক্ষ বীরাঙ্গনা পাকিস্তানী সাম্প্রদায়িকতার শিকার হয়ে বুঝেছিলেন বাংলাদেশ হতে হবে অসাম্প্রদায়িক। তারা অসাম্পদায়িক বাংলাদেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন, সর্বোচ্চ ত্যাগ করেছেন। বঙ্গবন্ধু তাদের চাওয়াকে ধারণ করেছেন বাহাত্তরের সংবিধানে। আমাদের ফিরে যেতে হবে বাহাত্তরের সংবিধানে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ আবার নতুন করে রচনা করতে হবে। যে কারণেই হোক না কেন দুই বৃহৎ রাজনৈতিক দলের সাময়িক কিংবা দীর্ঘমেয়াদী পৃষ্ঠপোষকতার ফলে দেশে সামগ্রিকভাবে সাম্প্রদায়িকতা বেড়ে গেছে অনেক অনেক গুণ। বিগত শতাব্দীর ৯০’র দশকের সঙ্গে তুলনা করলেও বর্তমানে ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রবাদী মানসিকতা এখন অনেক বেশি। ৬০’র দশকের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশকে এখন একটি সাম্প্রদায়িক দেশ বলতে হয়। এখান থেকে বেড় হতে হবে। এই পরিস্থিতি থেকে দেশকে মুক্ত করতে হলে, তালিবানী রাষ্ট্র হওয়া থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে, মুক্তিদাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবরের সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে, ৩০ লক্ষের রক্তে লেখা পবিত্র সংবিধানের মর্যাদাকে সমুন্নত রাখতে হলে এখই এদের রুখে দাঁড়াতে হবে। কার দায়ে কি হয়েছে তা বিবেচনা করার আর সুযোগ নেই। পারস্পরিক দোষারোপের রাজনীতি শেষ করে ধর্মান্ধতা, উগ্রবাদীতা এবং সাম্প্রদায়িকতা রুখে দাঁড়ানোর দ্বায়িত্ব দলমত নির্বিশেষে সকল প্রগতিশীল মানুষের, সামাজিক এবং রাজনৈতিক সংগঠনের। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা হাতে থাকায় রাষ্ট্র, সরকার এবং সরকারী দলের এই দ্বায়িত্ব এখন সবচেয়ে বেশি।

মধ্যযুগীয় রাজনীতি রুখে দাঁড়ানো সহজ নয়,অসম্ভবও নয়। প্রথমেই সংস্কার করতে হবে শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষা ব্যবস্থা হতে হবে সম্পুর্নভাবে বিজ্ঞান ভিত্তিক। বিশ্ব দরবারে সংস্কৃতি হচ্ছে একটি জাতীর পরিচয়। যে জাতীর সংস্কৃতি যত উন্নত অন্য জাতির কাছে সে জাতির মর্যাদা তত বেশি। বাঙালির রয়েছে সুদীর্ঘকালের সুউন্নত সভ্যতার ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য যা বিশ্ববাসীর কাছে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরার মত। এদেশের ক্ষুদ্র ণৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলোরও রয়েছে উন্নত ঐতিহ্য। বাঙালির এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর আবহমানকালের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি উর্ধে তুলে ধরতে হবে পাঠ্যপুস্তকে। যার যার ধর্ম চর্চার এবং শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকে। ধর্ম শিক্ষা বাধ্যতামূলক হবে না।

সকল প্রকার মাদ্রাসা শিক্ষা এবং ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষা ব্যবস্থা বন্ধ করে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা। মাদ্রাসা শিক্ষা যেমন বর্তমান পৃথিবীতে কাজে লাগে না তেমনি ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াশুনা করে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী বিদেশে চলে যায়। আর ফেরে না। বরং পরবর্তী সময়ে তারা দেশের সম্পত্তি বিক্রি করে তা পাচার করে বিদেশে নিয়ে সেখানে ঘর-বাড়ি কেনে। এরা দেশের কোন কাজে আসে না। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ার পরেও যারা দেশে থেকে যায় তারা দেশের মূলধারা থেকে দূরে অবস্থান করে এক রকম উন্নাসীক জীবন যাপন করে। বৃহৎ পরিসরে মিশতে পারে না। দেশের কাজে আসে না। প্রায় একই রকম অবস্থা হয় মাদ্রাসা ছাত্রদের ক্ষেত্রেও।

স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সুযোগ নেই। সুযোগ নেই ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল বা সংগঠন করার। দেশে যতগুলো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল এবং সংগঠন রয়েছে তার সব কয়টিকে নিষিদ্ধ করতে হবে। পরবর্তী দুই প্রজন্মসহ বাতিল করতে হবে মুক্তিযুদ্ধে বিরোধীতাকারীদের রাজনৈতিক এবং সরকারী চাকুরী পাবার অধিকার।

সংবিধানে একই সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং রাষ্ট্র ধর্ম থাকতে পারে না। রাষ্ট্র কোন ব্যাক্তি মানুষ নয়। এর ধর্ম পালনের বাস্তব কোন সুযোগ নেই। রাষ্ট্র ধর্ম একটি পরিহাস মাত্র। সংশোধন করে সংবিধানের পবিত্রতা ফিরিয়ে আনতে হবে। রাজনৈতিক শক্তিতে আওয়ামী লীগ যথেষ্ট বলিয়ান এই শক্তির সার্থক প্রয়োগ করে দেশ থেকে ধর্ম ব্যবসা দূর করতে হবে। অতীতে ধর্মান্ধদের সঙ্গে আপোষ করার ফল ভাল হয়নি। আওয়ামী লীগেরভোটের বাক্সে ধর্মান্ধদের একটা ভোটও পড়েনি। কাল্পনিক জুজুর ভয়ে ভীত না থেকে সঠিক কাজটি করতে হবে। এখনই উপযুক্ত সময়। একাজে বাঁধা আসবে। ধর্ম ব্যবসায়ীরা প্রতিরোধ করবে। জালা পোড়াও, নৈরাজ্য সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে যেমন জামায়াত ও হেফাজত করেছিল ১৩, ১৪ ও ১৫ সালে। আবারও সেরকম বা তার চেয়ে বেশি প্রতিরোধ আসবে। দেশ স্বাধীন হয়েছে ধর্ম ব্যবসায়ীদের ভয়ে ভীত থাকার জন্য নয়।

যুদ্ধাপরাধী ও জঙ্গিবাদীদের দমন করা হয়েছে যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। দমন হয়নি পুরনো সাম্প্রদায়িক শক্তি। ওদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্বটা বকেয়া হয়ে আছে বহুদিন। আর কত?বাঙালির সত্যিকারের রেনেসাঁর এখনই সময়। বাংলাদেশ থেকে চিরতরে নির্মূল করতে হবে সাম্প্রদায়িক রীতি-নীতি, রাজনীতি। বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্বের নেতৃত্ব দিয়ে আমাদের স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ দিয়েছেন। তাঁর কণ্যা একাত্তরের ঘাতকদের এবং তাদের হাতে সৃষ্ট জঙ্গিবাদ দমন করেছেন সাফল্যের সঙ্গে; দরিদ্র বাংলাদেশকে তুলে এনেছেন মধ্যবিত্তের কাতারে; স্বপ্ন দেখিয়েছেন ৪১ সালের মধ্যে উন্নত হবার। সে দিকেই এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। ধর্ম ব্যবসায়ীদের হাত থেকে দেশের রাজনীতি মুক্ত করতে না পারলে কোন অর্জনই স্থায়িত্ব পাবে না। অধরা থেকে যাবে উন্নত জীবনের স্বপ্ন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)