চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হাসেম ফুডস কারখানার অগ্নিকাণ্ড কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড: তদন্ত প্রতিবেদন

নারায়ণগঞ্জের হাসেম ফুডস কারখানার অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় গঠিত নাগরিক তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পেশকৃত প্রতিবেদনে বলা হয়, ভবনের যে অংশে (চতুর্থ তলা) সবচেয়ে বেশি লাশ পাওয়া গেছে সেখানে পেছনের জালি গেটে তালা দেয়া ছিলো।

নাগরিক তদন্ত কমিটি ৩০ কার্যদিবস তদন্ত শেষে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, হাসেম ফুডস কারখানার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয় বরং এটি একটি অবহেলাজনিত কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড।

তথ্য বিশ্লেষণ এবং প্রত্যক্ষ অনুসন্ধান থেকে তদন্ত কমিটি অগ্নিকাণ্ড ও হতাহতের যেসব কারণ উল্লেখ করেছে সেগুলো হলো-ছয়তলা ভবনের কোথাও কোনো ধরনের স্মোক ডিটেকটর, ফায়ার এলার্ম এবং জরুরি বহির্গমনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না, সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থা যেমন শ্রম অধিদপ্তর, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযত প্রতিপালন করেনি। বিভিন্ন ধরনের ছাড়পত্র দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের প্রথম থেকেই অনিয়ম ছিল, ভবনের যে অংশে (চতুর্থ তলা) সবচেয়ে বেশি লাশ পাওয়া গেছে সেখানে পেছনের জালি গেটে তালা দেয়া ছিল, সরকার ও বিভিন্ন মাধ্যমে নিহতের সংখ্যা ৫২ জন বলা হলেও নাগরিক কমিটির তদন্তে এ পর্যন্ত ৫৪ জনের নাম শনাক্ত করা গেছে, পরিদর্শন অধিদপ্তর এবং ফায়ার সার্ভিসের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং লোকবলের যথেষ্ট অভাব রয়েছে।

নাগরিক তদন্ত মনে করে যে, বাংলাদেশের শিল্পখাত এবং শ্রমিক ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে আছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণে তদন্ত কমিটি এটিকে কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড ধরে দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করা আবশ্যক বলে মনে করছেন।

বিজ্ঞাপন

তদন্ত কমিটি বলছেন, কারখানা ভবনের নকশা অনুমোদন, অগ্নিনির্বাপণ ও শ্রম আইনের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেনি বলে দায়িত্ব অবহেলাকারী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে তাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে, বিদ্যমান আইনের বহুরকম দুর্বলতা ও ঘাটতির অন্যতম দৃষ্টান্ত ক্ষতিপূরণ বিষয়ক আইন। আমরা মনে করি, কর্মস্থলে একজন শ্রমিক যদি নিহত হন তাহলে ক্ষতিপূরণ এমন হতে হবে যা তার বেঁচে থাকলে সারাজীবনের সম্ভাব্য আয়ের বেশি হয় এবং যা কর্তৃপক্ষের জন্য আর্থিক শাস্তিস্বরূপ হয়। শ্রম আইনের বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে নিহত, আহত ও নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবার প্রতি যথাপোযুক্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, শ্রম অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের পরিদর্শকের সংখ্যা ও দক্ষতা বাড়ানো এবং যেখানে আইনের ব্যত্যয় ঘটছে, সেখানে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার মতো সক্ষম করে তোলা প্রয়োজন। অগ্নিনির্বাপণে ফায়ার সার্ভিস-এর প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি দিয়ে এই প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে, সকল শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মপরিবেশ ও শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অগ্নিনির্বাপণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখার পাশাপাশি সকল শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে, কর্মস্থলে চিকিৎসা ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা, কারখানা কর্তৃপক্ষ বা নিয়োজককে নিজ খরচে ও দায়িত্বে চিকিৎসা করা প্রভৃতি।

সংবাদ সম্মেলনে সভায় সূচনা বক্তব্য রাখেন সদস্য সচিব মাহবুবুর রহমান ইসমাইল। প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন আহবায়ক জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, সভায় আরো বক্তব্য রাখেন নাগরিক কমিটির সদস্য মোঃ হারুন-রশিদ এবং অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।

আনু মুহাম্মদ বলেন, দেশের সরকার ছয় লাখ কোটি টাকার বাজেট প্রণয়ন করছে, হাজার কোটি টাকার নানা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে কিন্তু কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ করতে পারছে না। তিনি আরো বলে, এর আগে সংগঠিত তাজরিন ফ্যাশনস অগ্নিকাণ্ড ও রানাপ্লাজার ভবনধসের ঘটনায় দায়ীদের বিচার না হওয়ার কারণে হাসেম ফুডসে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।

জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, প্রতিষ্ঠানের মালিক, ফায়ার সার্ভিস ও কারখানা পরিদর্শক-এই তিন পক্ষের দায়িত্ব পালনে অবহেলা এবং বিদ্যমান আইন না মানার কারণে অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তাছাড়া, ফায়ার সার্ভিস আগুন লাগার আগে কারখানা ভবনে রক্ষিত মালামালের বিষয়ে অবগত ছিলেন না তাই বিপুল পরিমাণ তেলের মজুদ থাক সত্ত্বেও কেবল পানি ছিটিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেছেন যা মূলত আগুন ছড়িয়ে পড়ায় সহায়তা করেছে। সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা যেমন বৃদ্ধি করা প্রয়োজন তেমনি তাদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে।

সভায় নাগরিক তদন্ত কমিটির সদস্যবৃন্দের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন তানজীম উদ্দিন খান, প্রিসিলা রাজ, তাসলিমা আখতার লিমা, শহীদুল ইসলাম সবুজ, শবনম হাফিজ, মোশাররফ হোসেন, গোলাম মুর্শেদ, ব্রাত্য আমিন, মাহা মির্জা, বীথি ঘোষ এবং রেজাউর রহমান লেনিন। সাংবাদিকদের পাশাপাশি আরো উপস্থিত ছিলেন মোশরেফা মিশু, আবুল হোসেন, মহিদুল ইসলাম দাউদ।

বিজ্ঞাপন