চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের যত অনিয়ম

অনিয়ম-দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ভর্তি বাণিজ্য, যৌন কেলেংকারীসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে দিনাজপুর হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভিযোগ বর্তমান ও সাবেক ভিসির অন্তর্দ্বন্দ্বে ঝিমিয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম। চলছে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, আন্দোলন, হামলা।

বিজ্ঞাপন

রয়েছে প্রশাসনে জামায়াতীকরণ, কর্মকাণ্ডের সকল স্তরে জামায়াতপন্থীদের নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং আওয়ামীপন্থীদের নিগৃহীত করার অভিযোগ।

৯টি দেশের প্রায় দুই শতাধিক বিদেশী শিক্ষার্থী অধ্যায়নরত এখানে। এ বিশ্ববিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ছিলো ভিসি শূন্য। ১ ফেব্রয়ারি’২০১৭ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে ওই বছরের ২ ফেব্রুয়ারি ভিসি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন প্রফেসর ড. মু. আবুল কাসেম।

তার দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকেই শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের যৌন হয়রানি, মানসিক নির্যাতন ও অনৈতিক কাজে বাধ্য করা, ভর্তি বাণিজ্যসহ নানাবিধ অভিযোগ ওঠে।

সাত শিক্ষকের পদত্যাগ
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ উপাচার্যের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বিভিন্ন দায়িত্বে থাকা সাত শিক্ষক চলতি বছরের জুলাই মাসে পদত্যাগ করেছেন।

পদত্যাগী সকলেই তাদের পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন বিভিন্নভাবে পক্ষপাতদুষ্ট কর্মকাণ্ড করে চলেছে, যার কারণে তারা স্ব স্ব ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে বিব্রত বোধ করছেন।

প্রশাসনে জামায়াতীকরণসহ কর্মকাণ্ডের সব স্তরে জামায়াতপন্থীদের নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং আওয়ামীপন্থীদের নিগৃহীত করার অভিযোগ উঠেছে।

পদত্যাগী শিক্ষকদের দাবি এসব কর্মকাণ্ডের একাধিকবার প্রতিবাদ করেও প্রতিকার পাওয়া যায়নি।

যৌন নিপীড়নকারী শিক্ষককে বাঁচাতে উপাচার্যের কৌশল
যৌন নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত এক শিক্ষককে বাঁচাতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনক (ইউজিসি)কে মিথ্যা তথ্য দিয়ে চিঠি প্রদান ও ভুয়া সফরসূচি অনুমোদনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে উপাচার্য ড. মু. আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে।

এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন শিক্ষকরা। সেখানে বলা হয়:  বিশ্ববিদ্যালয়ের মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের শিক্ষক রমজান আলীর বিরুদ্ধে ছাত্রীকে যৌন হয়রানি ও গৃহকর্মীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের সত্যতা পেয়েছে উচ্চ আদালতের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটি। এরপরও ওই শিক্ষককে বহিষ্কার করা হচ্ছে না। বরং ১৭ সেপ্টেম্বর ইউজিসি’র কাছে বিশ্ববিদ্যালয় চিঠি দিয়েছেন যে, ছাত্রীর অভিযোগটি মানসিক নির্যাতন। প্রকৃত ঘটনা গোপনের পাশাপাশি ওই শিক্ষককে বাঁচাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মু. আবুল কাশেম ভুয়া সফরসূচির অনুমোদন দিয়েছেন, যাতে অভিযুক্ত শিক্ষক মামলা থেকে খালাস পান।

সেসময় ইউজিসিকে দেওয়া চিঠি প্রত্যাহারের পাশাপাশি উপাচার্যকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অপসারণের দাবি জানানো হয় সংবাদ সম্মেলন থেকে।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক রমজান আলীর সাথে মুঠোফোনে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।

প্রশাসনের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে কথা, ছুটি পেলেন না শিক্ষক
প্রশাসনের বিভিন্ন অনিয়ম সম্পর্কে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলায় দিনাজপুর হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) শিক্ষক শক্তি চন্দ্র মন্ডল পিএইচডির জন্য শিক্ষা ছুটিতে যাওয়ার অনুমতি পাননি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, ওই শিক্ষক যেসব অভিযোগ করেছেন তার ব্যাখ্যা দেওয়ার পরই অনুমতির বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড প্রসেসিং অ্যান্ড প্রিজারভেশন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শক্তি চন্দ্রের বিদেশে যাওয়ার কথা ছিল ২২ আগস্ট। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে অনুমতি না দেওয়ায় ওইদিন তিনি অনশন শুরু করেন। পরে অসুস্থ পড়লে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল সেন্টারে ভর্তি করা হয়।

এ বিষয়ে হাবিপ্রবি’র রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) প্রফেসর ডা. ফজলুল হক বলেন: বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখা সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর দায়িত্ব। শক্তি চন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার পাশাপাশি ফেসবুকেও স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তার এ মিথ্যা অভিযোগের ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। ব্যাখ্যা দিলেই তাকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেয়া হবে।

বিজ্ঞাপন

জানা যায়, চলতি বছর বাংলাদেশ থেকে ৫ জন শিক্ষককে পিএইচডি করার স্কলারশিপ দিয়েছে কোরিয়া সরকার। যাদের একজন অধ্যাপক শক্তি চন্দ্র মন্ডল।

শক্তি চন্দ্র মন্ডল জানান: সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলায় আমাকে জিও দেওয়া হচ্ছে না

নিয়োগে দুর্নীতি, চাকরি পেলেন না মেধাবী এবং মুক্তিযোদ্ধার সন্তান
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে নিয়োগ না দিয়ে রাজাকার ও জামায়াত পরিবারের সদস্যকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক ফোরামের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র মুহিউদ্দিন নুর জামায়াত পরিবারের সদস্য। বিশ্ববিদ্যালয়েও সে শিবিরের রাজনীতি করেছে। বিভিন্ন সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্কে কটূক্তি করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার সময় একজন জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টকে নিয়োগ দিতে বিজ্ঞপ্তি সংশোধন করা হয়েছিল। এছাড়াও বিজ্ঞপ্তিতে ১৬ জন কর্মকর্তা নিয়োগের কথা থাকলেও দেওয়া হয়েছে ২২ জনকে, যা পক্ষপাতিত্বমূলক কর্মকাণ্ড।

অভিযোগ করা হয়েছে প্রভাষক নিয়োগে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিয়োগে বোর্ডে সংশ্লিষ্ট বিভাগের অধ্যাপকদের রাখা হয়নি। অনেক মেধাবী যারা প্রথম শ্রেণিতে প্রথম এবং প্রধানমন্ত্রীর স্বর্ণ পদক পাওয়া ছাত্র-ছাত্রীকে বঞ্চিত করা হয়েছে। অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীদেরকে নেওয়া হয়েছে। উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের প্রভাষক নিয়োগে অনিয়ম হয়েছে, কীটতত্ত্ব বিভাগে প্রভাষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি করা হয়েছে।

জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে ৯ শিক্ষকের থানায় জিডি
জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে দিনাজপুরের হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাবিপ্রবি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ শিক্ষক। জিডি করা শিক্ষকরা হলেন প্রফেসর ড. মোঃ মোস্তাফিজার রহমান, প্রফেসর ড. মোহাম্মদ খালেদ হোসেন, প্রফেসর ড. মোঃ তারিকুল ইসলাম, প্রফেসর মোঃ ইমরান, প্রফেসর মোঃ নজরুল ইসলাম, প্রফেসর মাহবুব হোসেন, ড. মোহাম্মদ আবু সাঈদ, মোঃ বেলাল হোসেন।

জিডিতে ওই শিক্ষকরা অভিযোগ করেন: আমরা গোপন সূত্রে জানতে পেরেছি হাবিপ্রবি প্রশাসনকে সহায়তাকারি শিক্ষকরা আমাদের দিনাজপুর শহরের বিভিন্ন স্থানে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও অপমান করার পরিকল্পনা করছে। এই পরিস্থিতিতে আমরা জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।

এক শিক্ষক দুই জায়গায় তিন পদে
খণ্ডকালীন শিক্ষকতার অনুমোদন নিয়ে গোপনে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিনের দায়িত্ব পালনের অভিযোগ উঠেছে হাবিপ্রবি’র এক অধ্যাপকের বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত ওই শিক্ষক হাবিপ্রবির পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস শাখার পরিচালকের পরিচালক ও মাইক্রোবায়োলোজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজার রহমান। অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ দুইটি পদে থাকার পরও হাবিপ্রবি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না নিয়ে বেসরকারি গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষদের ডিনের দায়িত্ব পালনের অভিযোগ এ অধ্যাপকের বিরুদ্ধে।

হাবিপ্রবির রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক মো. ফজলুল হক বলেন: আমি দায়িত্ব নেয়ার মাত্র ছয় মাস হলো। আগের রেজিস্ট্রার ছুটির দিনে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের যাওয়ার অনুমতি দেয়। আমি জানি যে তিনি শুধুমাত্র ছুটির দিনে সেখানে যান। তবে সেখানে ডিনের দায়িত্ব পালন করেন সেটি জানি না। অনুমোদন প্রক্রিয়া অনুযায়ী, ওনার সেখানে ডিনের দায়িত্ব পালনের কোনো সুযোগ নেই।

শিক্ষিকার সাথে ছাত্রের যৌন কেলেংকারি
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রের সাথে সদ্য চাকরিপ্রাপ্ত এক শিক্ষিকার যৌন কেলেংকারির ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীকে যৌন হয়রানী, মানসিক নির্যাতন ও অনৈতিক কাজে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। এর প্রতিকার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ প্রদান, মানববন্ধন, বিক্ষোভ, সমাবেশ, অনশন, ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে একাংশের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

যৌন কেলেংকারির সাথে জড়িত শিক্ষকদের বহিষ্কারের দাবিতে আমরণ অনশনও করেছেন শিক্ষকরা। এমনকি কয়েকজন শিক্ষক এর প্রতিকার চেয়ে পদত্যাগও করেন। সুশীল সমাজ এবং বিভিন্ন নারী ও সামাজিক সংগঠন আন্দোলনও করেছে।

এ বিষয়ে প্রগতিশীল শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড.বলরাম রায় বলেন: এত প্রতিবাদ ও আন্দোলনের পরও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যৌন কেলেংকারির সাথে জড়িত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত নেয়নি উল্লেখযোগ্য কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। তারা এখনও বহালতবিয়তেই চাকরি করে যাচ্ছেন।

রহস্যজনক চুরি
বিশ্ববিদ্যালয়ে রহস্যজনক চুরির ঘটনাও ঘটে। ড. এম.এ.ওয়াজেদ ভবনের বিজ্ঞান অনুষদের পরিসংখ্যান বিভাগের ডিজিটাল ল্যাব এর ৪৩৬ নম্বর রুমে সব কম্পিউটার সাজানো থাকলেও শুধু বিভাগীয় চেয়ারম্যানের ৪০টি কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক কে বা কারা খুলে নিয়ে গেছে। হার্ডডিস্ক, র‌্যাম, প্রসেসরসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশ এবং সিসি ক্যামেরার ভিডিআর রেকর্ডিং যন্ত্রপাতি কে বা কারা খুলে নিয়ে গেছে সে বিষয়ে অবগত নন কেউ।

ড.এস.এম হারুন উর রশিদ. যুগ্ম সম্পাদক, প্রগতিশীল শিক্ষক ফোরাম বলেন: বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে আগামীতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম অনিশ্চিত হয়ে পড়বে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মু. আবুল কাসেম সব অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলছে। তবে একটি স্বার্থন্বেষী মহল অরাজকতা পরিবেশ সৃষ্টির পাঁয়তারা করছেন।

Bellow Post-Green View