চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হাওরে ট্রলারডুবিতে মৃত্যু থামবে কবে?

প্রতিবছরই হাওরে ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটছে। একই বছরে একাধিক বারও এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। গত একমাসে হাওরাঞ্চলে দু’টি ট্রলার ডুবির ঘটনায় ২৮ জন মানুষ মারা যান। গত ৫ আগস্ট নেত্রকোনার মদনে ট্রলার ডুবিতে মারা যান ১৮ জন। আবার ৯ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জের মধ্যনগর থেকে নেত্রকোনার ঠাকুরকোনা যাওয়ার পথে গুমাই নদীতে ট্রলার ডুবিতে মারা গেলেন ১০ জন। এসব ট্রলার ডুবিতে যারা মারা যান তাদের বেশির ভাগই মহিলা ও শিশু। মৃত্যুর এ মিছিল যেন থামছেই না। কোনোভাবেই এসব দুর্ভাগা মানুষের মৃত্যুকে মেনে নেওয়া যায় না। হাওরে ট্রলারডুবিতে এধরনের দুর্ভাগা মানুষের মৃত্যু বন্ধ করতে বা কমাতে আমরা কি কোন কিছুই করতে পারিনা? আর যদি পারি তাহলে কেন হাওরের এসব সহজ-সরল মানুষের মৃত্যুর এই মিছিল আমরা থামাচ্ছি না? নাকি এসব দরিদ্র মানুষের বাঁচা মরাতে আমাদের কিছু্ই আসে যায় না?

হাওরে যেসব কারণে নৌ দুর্ঘটনা ঘটে তার সিংহভাগই নৌকার মাঝিদের খামখেয়ালী ও অসচেতনতার জন্য। হ্যাঁ, মাঝ হাওরে হঠাৎ করেই প্রকৃতি রুদ্ররূপ ধারণ করলে হয়তো খুব একটা কিছু করার থাকে না। কিন্তু নিজের সামান্য কিছু অতিরিক্ত রোজগারের জন্য অতিরিক্ত যাত্রী বহনের কারণেই যখন দুর্ঘটনা ঘটে এবং সেই দুর্ঘটনায় ঝরে যায় তাজা প্রাণ। এর দায় কি আমরা কেউ গ্রহণ করবো না?

বিজ্ঞাপন

হাওরে এসব নৌযানকে তদারকি করার জন্য যেন কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। অথচ বাংলাদেশে নৌযানের জন্য ‘শিপিং অধ্যাদেশ ১৯৭৬’ নামে একটি আইন রয়েছে। এতে নৌযান শব্দের যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তাতে হাওরের ওই ট্রলার গুলো অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে কখনও হাওরে এ ধরনের নৌযান কর্তৃপক্ষের তৎপরতা দেখা যায়নি। এ যেন ‘কাজির গরু কেতাবে আছে গোয়ালে নেই’।

বিজ্ঞাপন

২০১০ সালের ৮ জুন ধর্মপাশার শৈল চাপড়া হাওরে নৌ দুর্ঘটনায় ১৬ জন মারা যায়। যার মধ্যে আট জনই ছিল স্কুলের ছাত্রী। এরা নৌকা করে স্কুলে যাচ্ছিল। সেই দুর্ঘটনার সময় অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইয়ের কারণে স্কুলের ছাত্রীরাসহ কিছু যাত্রী রাস্তায় তাদেরকে নামিয়ে দেয়ার অনুরোধ করলেও মাঝি নামিয়ে দেননি। এরপর ঘটে দুর্ঘটনা। ঝরে যায় ১৬ টি তাজা প্রাণ। গ্রাম জুড়ে ছিল শুধু লাশ আর মা-বাবার হাহাকার। এ ঘটনা আমাদের হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে কিছুটা ভাবিয়ে তুলেছিল। কিন্তু আমাদের সেই ভাবনা বেশিদিন টিকে থাকেনি। আমরা আবারো অন্য একটি ইস্যু নিয়ে কথা বলি। হয়তো লিখি। কিন্তু নৌ দুর্ঘটনা কমাতে কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

হাওরে সমুদ্রসম জলের উথাল পাতাল ঢেউ ভেঙ্গে এগিয়ে যাওয়া যাত্রীবাহী ট্রলারে থাকেনা কোন লাইফ জ্যাকেট। একেকটি লাইফ জ্যাকেট কিনতে লক্ষ টাকা খরচ হয় না। হাজার টাকার মধ্যেই লাইফ জ্যাকেট পাওয়া যায়। তবুও নৌকাগুলোতে কেন লাইফ জ্যাকেট থাকেনা? মাত্র বিশ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ করলেই নৌকাতে লাইফ জ্যাকেট রাখা যায়। কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করে নৌকা বানানো যায়। কিন্তু কয়েক হাজার টাকা খরচ করে লাইফ জ্যাকেট কেনা যায় না! কারণ নৌকা বানালে আয় হবে। লাইফ জ্যাকেট হয়তো কোনো বাড়তি আয় দিবে না। কাউকে জবাবদিহিও করতে হবেনা। শুধু বাঁচাবে কিছু জীবন। জীবনের মূল্য যেন কয়েক হাজার টাকারও কম! সত্যি সেলুকাস কি বিচিত্র এই দেশ!!

বিভিন্ন নৌ দুর্ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা যায় এসব দুর্ঘটনায় মৃত্যুর একটা বড় কারণ হল মাঝিদের অতিলোভ, অসচেতনতা ও দক্ষতার অভাব। নৌকা মালিকদের এবং মাঝিদের অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের ইচ্ছা থেকে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে নৌকা ছাড়া হয়। অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই হওয়ার কারণে নৌকাতে চাপ বেশি থাকে এবং সামান্য ঢেউ হলেই পানি নৌকায় প্রবেশ করে। অতিরিক্ত যাত্রী থাকলে ঢেউয়ের কারণে কোন ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে যাত্রীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যাত্রীরা এক দিকে ঝুঁকে যান। সেই কারণে সেই দিকটা কাত হয়ে যায় এবং হাওরের পানি সেদিকে নৌকায় প্রবেশ করে। একই সাথে মাঝিদের দক্ষতার এবং অভিজ্ঞতার অভাবেও অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। কোন দিকে ঢেউ আসলে নৌকার হাল কোনদিকে ধরতে হবে তা মাঝিদের জানা থাকতে হবে। না হলে সামান্য ঢেউয়ে নৌদুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আবার কখনো মাঝিদের খামখেয়ালিপনা ও অসুস্থ প্রতিযোগিতার জন্যও নৌকা ডুবে। গত ৯ সেপ্টেম্বর গুমাই নদীতে দুর্ঘটনাটা কার আগে কে যাবে এমন অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকেই হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এ তো গেল মাঝিদের কথা। যাত্রীদেরও কিছু সচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে। অনেক যাত্রীরা ঝুঁকি নিয়ে লাইফ জ্যাকেট বা নিরাপত্তা সামগ্রী ছাড়া হাওরে যাতায়াত করেন। কিন্তু তারা সাঁতার জানেন না। নিজের জীবন নিয়ে এমন খামখেয়ালি আচরণ মোটেও কাম্য নয়। তাই হাওরে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সাঁতার না জানলে অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট সাথে রাখা প্রয়োজন। যদিও অনেক সময় বিস্তীর্ণ হাওরে সাঁতার জানা লোকও কোন কূলকিনারা পান না। তবুও এতে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক কম থাকে।

অনেক সময় ফিটনেসবিহীন বা জরাজীর্ণ নৌকা যার বিভিন্ন দিকে ছিদ্র রয়েছে বা সামান্য পানি হলেই নৌকায় পানি ঢুকে পড়ে সেই ধরনের নৌকা দিয়ে চলাচলের কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। ফিটনেসবিহীন নৌকা দিয়ে যাত্রী পারাপার বন্ধ করতে হবে।

যাত্রী বোঝাই নৌকাগুলোর ঘাট থেকে ছাড়ার আগে থেকে আবহাওয়া বুঝে নৌকা ছাড়া উচিত। মাঝিরা তাদের অভিজ্ঞতা বা আকাশ পানে চেয়ে আবহাওয়ার পূর্বাভাস সম্বন্ধে ধারণা করেন। তবে সেটিকে তারা খুব একটা পাত্তা দেন না। কিন্তু হাওরের মাঝিরা আর কতদিন শুধুমাত্র আকাশের পানে চেয়ে আবহাওয়ার পূর্বাভাস নির্ধারণ করবেন? বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই উৎকর্ষতার যুগে তারা কি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কোন আবহাওয়ার পূর্বাভাস পেতে পারেন না? হাওর এলাকা দুর্যোগপ্রবণ হলেও হাওরে কোন আবহাওয়া পূর্বাভাস কেন্দ্র নেই। প্রতিবছরই হাওরবাসিকে বন্যার কবলে পড়তে হয়। প্রায় বছরই অকাল বন্যায় হাজার কোটি টাকার ফসল তলিয়ে যায়। তবুও হাওরাঞ্চলে কোন আবহাওয়া কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। আবহাওয়ার পূর্বাভাস এর জন্য হাওরেরর মানুষকে দূরবর্তী আবহাওয়া স্টেশনের সংকেতের অপেক্ষা করতে হয়। সেই সংকেত অবশ্য সাধারণ কৃষক, জেলে ও মাঝিদের কান পর্যন্ত পৌঁছায় না। তাই সুনামগঞ্জসহ হাওরের অন্যান্য জেলায় পূর্ণাঙ্গ আবহাওয়া কেন্দ্র এবং কমিউনিটি রেডিও স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। আবহাওয়া কেন্দ্র এবং কমিউনিটি রেডিও অনেকদিন থেকেই হচ্ছে হবে বলে শুনছি। কিন্তু এর কোনো কার্যকর বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না।

হাওরের নৌযানগুলোকে শিপিং অধ্যাদেশ ১৯৭৬ এর আওতায় আনতে হবে। যেসব ঘাট থেকে যাত্রী বোঝাই নৌকা ছাড়া হয় সেই সব ঘাটে নৌযান কর্তৃপক্ষের একটি মনিটরিং টিম থাকা দরকার। নৌকা ছাড়ার আগে যদি আবহাওয়া অনুকূলে না থাকে, তাহলে সেই টিম উক্ত সময়ে নৌ চলাচল বন্ধ রাখার জন্য নির্দেশনা দেবে। নৌকা ছাড়ার সময় অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করা হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করবে। লাইফ জ্যাকেট ছাড়া কোনো যাত্রীবাহী নৌকা চলতে দেয়া যাবে না। যদি পথিমধ্যে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া হয় বা আইন ভঙ্গ করা হয়, তাহলে ওইসব নৌকাকে জরিমানা বা শাস্তি প্রদানের করতে হবে। যা আইনে উল্লেখ করা বিভিন্ন বাজারে ও ঘাটে সচেতনতামূলক বিলবোর্ড টাঙ্গানো প্রয়োজন। এমনকি দুর্ঘটনা প্রবণ মৌসুমে ও এলাকায় মাইকিং করে এবং লিফলেট বিতরণ করে যাত্রী ও নৌযান কর্তৃপক্ষকে সচেতন যেতে পারে। সেজন্য প্রয়োজনে হাওরে আলাদা নৌ চলাচল কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে।

এর সবই সম্ভব হবে যখন আমরা হাওরের ট্রলারডুবিতে প্রাণনাশের ঘটনা কমানোর জন্য আন্তরিক হব। আর যদি শুধুমাত্র হাপিত্যেশ করেই নিজের দায়িত্ব শেষ করতে চাই তাহলে এসবের কোনকিছুই কাজে আসবে না। বছর বছর দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে মারা যাবেন হাওরের দুর্ভাগা, কঙ্কালসার কৃষক, শ্রমিক, জেলে। মানবতা ডুকরে কেঁদে বলবে- এদেশে গরিবের জন্য নয়!!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)