চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হল আতঙ্ক!

সন্তানকে নিয়ে কার না স্বপ্ন থাকে? প্রতিটি বাবা-মা ছোট থেকে সন্তানকে পড়াশোনা করান যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী। নিজেদের কষ্ট হলেও সন্তানকে বুঝতে দেন না। মাসে সন্তানের পড়াশোনার পেছনে যে খরচটা লাগে সেটা আলাদা করেই রাখেন প্রতিটি বাবা মা।

বিশেষ করে মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের কথাই যদি ধরি, যাদের আয় একটা নির্দিষ্ট পরিমানের। মোটামুটি চলে যায় মাসটা। কারো কাছে হাত পাততে হয় না বা ঋণ নিতে হয় না, এমন পরিবারের সংখ্যাই তো বেশি। এমন পরিবারের বাবা-মায়ের জীবনের সব স্বপ্নতো সন্তানদের নিয়েই। পড়াশোনা করে মানুষের মতো মানুষ হবে। পড়াশোনা শেষ করে একটা ভাল চাকরি করবে, তখন আর তাদের চিন্তা থাকবে না, বাকিটা জীবন সন্তানদের পরবর্তী প্রজন্মকে দেখাশোনা করেই কাটিয়ে দেয়া যাবে। এই হচ্ছে তাদের যাপিত জীবনের গল্প।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু সেই সন্তান যখন এসএসসি আর এইচএসসি পাস করার পর মেডিক্যিাল বা বুয়েট বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ ভালো কোথাও সুযোগ পেলো পড়াশোনা করার জন্য, তখনই শুরু হয় নতুন টেনশন। ঠিকমতো পড়াশোনা করছেতো? নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারছেতো?
বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধারে কাছে বাড়িঘর না থাকায় বাবা-মায়েদের টেনশন বেশি থাকে। যেসব শিক্ষার্থীদের হলে থাকতে হয়। কী যে যন্ত্রণা হলের জীবন! খাওয়ার সমস্যা তো আছেই। আর সে কারণেই ছুটিতে বাড়ি গেলে মা ভালো-মন্দ খাইয়ে দেন সন্তানকে। খাওয়া-দাওয়ার সমস্যা ছাড়াও অনেক ঘটনার কথা বাবা-মায়েদের কাছে অনেক সন্তানই লুকিয়ে রাখে, পাছে আবার বাবা-মা টেনশনে টেনশনে অসুস্থ হয়ে পড়েন!

কদিন আগেই হয়ে গেল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। পরদিন বেশ কয়েকটি কাগজে এসেছে ঢাকার কাছাকাছি এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা বাবা-মায়েদের টেনশনের চিত্রটি।

র‍্যাগিংএকটি দৈনিকে এসেছে একজন মা দেখতে চেয়েছেন আবরারের কক্ষটি। নিরাপত্তার কারণেই তাকে দেখতে দেয়া হয়নি। পরে সেই মা পেছনের জানালা দিয়ে সেই কক্ষটির ভেতরটা দেখার চেষ্টা করেছেন। একজন মায়ের এই অনুভূতি, এই উৎকণ্ঠা, এই কৌতুহল থাকাটাই স্বাভাবিক। কারণ তিনি মা। তিনি ভেবেছেন তার ছেলেটিও যদি সুযোগ পায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার তা হলে এরকম একটি কক্ষে হয়তো থাকবে। তাকেও হয়তো বড় ভাইয়েরা ডেকে নিয়ে নির্যাতন চালাবে।

সন্তানকে নিয়ে আসা অনেক অভিভাবকের চেহারায় ছিল আতঙ্ক আর ভয়। একজন বলেছেন, তার ছেলে সুযোগ পেলে তাকে কোনোভাবেই হলে রাখবেন না। এসেছেন ঢাকার বাইরে থেকে। ঢাকায় এক আত্মীয় আছে। তার বাসায় টাকা একটু বেশি খরচ হলেও হাতে-পায়ে ধরে সেখানে রাখার ব্যবস্থা করবেন। আর একেবারেই যদি না রাখেন ওই আত্মীয় তা হলে মেস-এ রাখবেন। তবুও এই জল্লাদখানায় রাখবেন না। এই হচ্ছে দেশের একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেকে ভর্তিচ্ছু এক মায়ের কথা। এটা যেন শুধু সেই মায়ের কথা না, এটা আজ সব মায়েরই কথার প্রতিধ্বনি যেন। কেউ বলেন কেউ বলেন না।

এই যে আবরার হত্যার পর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হল নির্যাতনের অন্ধকার চিত্রটি প্রকাশ্য হলো, এর আগেও হয়েছে। সহ্যের মাত্রা যখন ছাড়িয়ে যাবার মতো অবস্থা হয়ে যায় তখনই মুখ ফুটে কেউ কেউ বলেছে। ছিটেফোঁটা পত্রপত্রিকায় সে খবর এসেছে। কিন্তু এই আবরার হত্যার পর সারাদেশে বাবা-মায়ের মনে এক আতঙ্ক ঢুকে গেছে। যাদের ছেলেমেয়েদের হলে রেখে পড়াশোনা করাচ্ছেন। হলে রাখা ছাড়া আর কোনো পথ যাদের নেই।

বিজ্ঞাপন

প্রধানমন্ত্রী ঘটনা জানার সাথে সাথে ব্যবস্থা নেয়ায় দোষীরা ধরা পড়েছে। সব সময় যে এমনটা হবে সেটাও তো বলা যায় না।

হলগুলোর র‌্যাগিং নামে অকথ্য নির্যাতন, এটা বন্ধ করার পাশাপাশি কারা এসবে জড়িত ছিল তাদের ব্যাপারে সরকারিভাবে নির্দেশনা থাকা উচিত। কারণ ইতোমধ্যে দেখা গেছে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ঘটনার খবর প্রকাশিত হচ্ছে।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সে ধরনের খবর এসেছে সম্প্রতি। যেখানে র‌্যাগিংয়ের নামে কানধরে ওঠবস করা হয়েছে। যাদেরকে কানধরে ওঠবস করানো হয়েছিল তাদের দোষ কেউ লুঙ্গি পরে ঘুরছিল, আবার কেউ বা বড় ভাইদের সালাম দিতে দেরি করেছে। সবচেয়ে অবাক হবার বিষয় হচ্ছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ‘বঙ্গ’ রাজনীতি। ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ করে ছয়টি ‘বঙ্গ’ দল। যেমন দক্ষিণ বঙ্গ, উত্তর বঙ্গ, ময়মনসিং বঙ্গ, কুমিল্লা বঙ্গ, ঢাকা বঙ্গ, সিরাজগঞ্জ-পাবনা বঙ্গ। অদ্ভুত এই পদ্ধতি। বঙ্গ চালায় ছাত্রলীগের কর্মীরা। বঙ্গ চালানোর কারণ জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের সুবিধার জন্য অঞ্চলভিত্তিক বঙ্গ গ্রুপগুলো চালানো হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে টর্চার সেল আছে দুটি। এখানে রাতে ডেকে এনে বাতি নিভিয়ে রড, স্ট্যাম্প, চেয়ার বা বেঞ্চের হাতল পা দিয়ে পেটানো হয় ছাত্রদের। ছাত্রী হলে রয়েছে প্রোগ্রাম আতঙ্ক। হলে ওঠার পরদিন যেখানে সবাইকে ডাকা হয়। সেদিন থেকেই ছাত্রীদের সব ‘নিয়ম’ বলে দেন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রছাত্রীরা। কেউ অমান্য করলেই নির্যাতন চালানো হয়।

বুয়েট-ভর্তি পরীক্ষার‌্যাগিং বিষয়ে সাম্প্রতিক সময়ে কাগজে পড়ে যতটা জানা গেছে তার কিছুটা বিশ্বাস হতো না। কয়েক মাস ধরে এক সহকর্মীর কাছ থেকে শুধু শুনতাম তিনি এবং তার স্ত্রী চিন্তায় আছেন তাদের একমাত্র ছেলেকে খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করে। ছুটিতে ছেলে ঢাকা এলে মায়ের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলে। রাতে ডেকে নিয়ে যায় বড় ভাইয়েরা। ইনিয়ে বিনিয়ে মাকে যতটুকু মাকে বলা যায় ততটুকই বলে। মা চিন্তিত, বাবাও চিন্তিত। কারণ আগের বছর ছেলেকে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছিলেন। সেটা বাদ দিয়ে সুযোগ পাওয়ায় এক বছর লস দিয়ে খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছেন। এখন সেখানে পড়াশোনায় মন বসছে না ছেলের। এরই মধ্যে ঘটলো আবরার হত্যার মতো নিষ্ঠুর ঘটনা।

একজন অভিভাবককে সন্তানকে দূরে পড়াশোনা করতে পাঠিয়ে যদি এরকম দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় তা হলে এ জাতির ভবিষ্যত কোথায় গিয়ে ঠেকবে, ভাবা যায়?

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের প্রোভস্টদের র‌্যাগিংয়ের নামে নির্যাতন বন্ধ করতে বলা হোক। এমন প্রত্যাশাই করেন অভিভাবকেরা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।) 

Bellow Post-Green View