চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সাগরতলের বিস্ময়কর জগতে একদিন

করোনাকালীন সময়ে সারা বিশ্বেই ব্যবসা বাণিজ্যে মন্দাভাব দেখা দিয়েছে বিশেষকরে মাঝারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে। সেটাকে কিছুটা কাটিয়ে উঠতে অস্ট্রেলিয়ার সরকার একটা মজার উদ্যোগ নেয়। ডাইন এবং ডিসকভার ভাউচার নাম সন্তানপ্রতি বাবা এবং মেক আলাদাভাবে একটা ডাইন এবং একটা ডিসকভার ভাউচার দেয়া হয়েছে। প্রত্যেকটা ভাউচারের মূল্যমান পঁচিশ ডলার। ডাইন ভাউচারগুলো খাওয়ার জন্য আর ডিসকভার ভাউচারগুলো বেড়ানোর জন্য। আমাদের এবং আশফাক ভাইদের এই ভাউচারগুলোর প্রায় সবগুলোই অব্যবহৃত রয়ে গিয়েছিলো এতোদিন। তাই পরিকল্পনা করা হলো রানীর জন্মদিনের (কুনস বার্থডে) লং উইকএন্ডে আমরা সিডনির সি লাইফে বেড়াতে যাবো।

যেই ভাবা সেই কাজ। আমরা অনলাইনে যেয়ে ১৪ জুনের টিকেট কিনে ফেললাম। সি লাইফে যেয়ে লাইনে দাঁড়িয়েও টিকেট করা যায় তবে আমরা সময় বাঁচানো এবং নির্দিষ্ট সময়ের টিকিটের নিশ্চয়তার জন্য আগে থেকেই টিকেট করে নিয়েছিলাম। এরপর আমাদের বাসা মিন্টো থেকে সি লাইফে যেতে এক ঘন্টার ট্রেন ভ্রমণ। সারা সময়টা বাচ্চারা ট্রেনের মধ্যে হুড়োহুড়ি করে কাটিয়ে দিলো। আমরা টাউন হল বা উইনার্ড যেকোন স্টেশনেই নামতে পারতাম। এরপর বাকি পথটুকু দশ পনের মিনিটের পায়ে হাটা পথ। আমরা নামলাম উইনার্ড স্টেশনে কারণ উইনার্ড স্টেশন থেকে একটা নতুন টানেল একেবারে বারাঙ্গারু পর্যন্ত চলে গেছে। টানেলের রহস্যময় নরম আলোয় বাচ্চারা অনেক আনন্দ পায় তাই এই ব্যবস্থা। বারাঙ্গারু থেকে কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমরা সি লাইফের সামনে চলে গেলাম।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

এরপর ওখানে দাঁড়ানো সি লাইফের সাহায্যকারীকে জিজ্ঞেস করে জানা গেলো আমাদের নির্দিষ্ট সময়ের পনের মিনিট আগে লাইনে দাঁড়ালেই হবে। এই অবসরে সবারই মনেহলো হঠাৎ ক্ষুধা পেয়ে গেছে। সি লাইফের সামনের কাঠের পাটাতনে বসে সবাই তাই সাথে আনা খাবার দিয়ে উদরপূর্তি করে নিলো। আপনি চাইলে সি লাইফের ক্যাফেতেও খাওয়া দাওয়া করতে পারেন। সি লাইফের বের হওয়ার রাস্তার মুখেই আছে প্রসাধন কক্ষ এবং ক্যাফে। খাওয়া দাওয়ার পাশাপাশি সবাই গল্পগুজবে মেতে উঠলো আর বাচ্চারা যথারীতি দৌড়াদৌড়ি করে সময় কাটালো। এরপর একসময় আমরা লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম।

এরপর আমরা লাইন ধরে সি লাইফে প্রবেশ করলাম। লাইনে থাকা অবস্থাতেই করোনার বার কোড মোবাইলের সার্ভিস এনএসডব্লিউ এপে স্ক্যান করে চেক ইন দিতে হলো। এই চেক ইন এবং চেক আউটগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ করোনার সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য। কে কোথায় কোন সময়ে কতক্ষণ ছিলো সেটা দিয়ে মানুষের চলাচলের ট্র্যাক রাখা হয়। আমরা চেক ইন দিয়ে প্রবেশ করার সাথে সাথে জানতে চাওয়া হলো আমাদের একসাথে কতজন? তখন আমরা দুপরিবারের মোট আটজনকে দেখিয়ে দিলাম। তখন একজন ক্যামেরা ম্যান আমাদেরকে একটা দেয়ালের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে কি রকম অভিব্যক্তি দিতে হবে বুঝিয়ে দিলো। আমরা কখনও অবাক করা আবার কখনও ভয় পাওয়ার অভিব্যক্তি দিয়ে ছবি তুললাম। ছবি তোলা শেষ হলে বারকোডওয়ালা একটা শক্ত কার্ড দিয়ে দেয়া হলো। সি লাইফের ভ্রমণ শেষে আপনি সেটা দেখিয়ে ছবি প্রিন্ট করিয়ে নিতে পারেন কিন্তু তার জন্য আবার আপনাকে আরো কিছু বাড়তি ডলার গুণতে হবে। অথবা আপনি পরবর্তিতে যেকোন সময় সিলাইফের ওয়বেসাইটে যেয়ে বারকোড দিয়ে ছবিগুলো ডাউনলোড করে নিতে পারেন।
সি লাইফে মোট নয় রকমের ইন্টারেক্টিভ প্রদর্শণী রয়েছে। এই প্রদর্শণীগুলোতে তাদের চরিত্রের সাথে মিল রেখে পরিবেশ তৈরি করা আছে। আর একটা প্রদর্শণী অন্য প্রদর্শণীতে যাওয়ার পথে আলোর রং এবং পরিমাণ এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে যেন আপনার মনেহবে আপনি গভীর নীল সাগরের পানির নিচে হেটে বেড়াচ্ছেন। প্রদর্শনীগুলোর অনেক সুন্দর সুন্দর নামও আছে। অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট বেরিয়ার রিফের আদলে আছে ‘ডে এন্ড নাইট অন দ্য রিফ’ এখানে সবসময়ই আলোর খেলা চলতে থাকে। এই জায়গাটায় প্রবেশ করলে মনেহয় যেন রূপকথার সাগরতলে চলে এসেছি। চারিদিকে অনেক সুন্দর সুন্দর জীবন্ত কোরাল। তার মাঝে সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে রং বেরঙের বাহারি রঙের এবং আকৃতির মাছ।

আছে ‘পেংগুইন এক্সপিডিশন’ যেখানে দু প্রকারের পেংগুইন চলাফেরা করছে। বড় পেংগুইনগুলো যখন হেটে যায় তখন পেছন থেকে দেখলে আসলে স্যুট পরা ভদ্রলোক বলে ভ্রম হয়। শার্ক ভ্যালিতে আছে হরেক রকমের হাঙর। একটা কাঁচের টানেলের মধ্যে দিয়ে হেটে যাওয়ার সময় দুপাশে এবং মাথার উপর হরেক রকমের হাঙ্গরের দেখা মিলে। ডুগং আইল্যান্ডে দেখা মিলবে অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব কিছু প্রাণীর। ডিসকভারী পুলে সরাসরি অনেক কিছু নেড়েচেড়ে দেখার ব্যবস্থা আছে। এটা বাচ্চাদের জন্য খুবই উপযোগী। তারা এক একটা প্রাণী বা বস্তু ছুঁয়ে দেখে আর বাবা মাকে চিৎকার করে বলে সে কোনটা ধরেছিলো। এটা তাদের কাছে অনেক সাহসের কাজ। ‘সাউথ কোস্ট শিপ রেক’ এ আপনি একটা জাহাজের ভাঙা অংশ দেখতে পাবেন। যার একপ্রান্তে রয়েছে একটা মৎসকন্যার মূর্তি।

বিজ্ঞাপন

‘সিডনি হারবার’ জোনে বিশ্বের বিভিন্ন বিখ্যাৎ হারবারের প্রাণীদের সমারোহ। আর ‘জুরাসিক সি’তে আছে সাগরতলের ডাইনোসর সদৃশ সব প্রাণীর কংকাল। সাথে আছে জীবন্ত কুমির এবং অক্টপাস। শুরুতেই জুরাসিক সি পরে। সেখানে আমরা অক্টপাসের নড়াচড়া দেখে মুগধ হয়ে গেলাম। অক্টপাস দেখতে অনেক ছোট হলেও যখন এটা তার আট হাত পা ছড়িয়ে দেয় তখন অনেক বড় দেখায়। আর রায়ান কুমির দেখে কিঞ্চিৎ ভয় পেয়ে আর কাছেই গেলো না। এরপর আরও এগিয়ে গেলে দেখা মিললো হরেক রকমের জেলিফিশের। জেলিফিশের ওখানে কাঁচের দেয়াল দিয়ে একটা ধাঁধার মতো করা আছে আর আলোও অনেক কম। আমি একটা জেলিফিশের সাথে ঘুরতে ঘুরতে কাঁচের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে সরি বলে তাকিয়ে দেখি আমি নিজেই নিজের প্রতিবিম্বকে সরি বলেছি। একটা জায়গায় ভেতরে ঢুকে খুব কাছ থেকে চারপাশে জেলিফিস দেখা যায়। সেটা দেখে রায়ান আর দৃপ্ত খুবই অবাক হলো।

এরপর একটা জায়গা আছে ‘মুনলিট ও বিচ’ এই জায়গাটা খুবই চমৎকার। মনেহবে আপনি পূর্ণিমার রাত্রে সাগরের সৈকতে বসে আছেন। মেঝেতে সাগরের পানির আদলে আলো ফেলা আছে। তার উপর দিয়ে হেটে গেলে সাগরের পানিতে যেভাবে ঢেউ তৈরি ঠিক সেরকম আলোর আলোড়ন তৈরি হয়। আর ব্যাকগ্রাউন্ডে সৈকতে ঢেউ ভাঙার শব্দ হতে থাকে। এরপর টানলেগুলো পার হওয়ার সময় দেখা হরেক রকমের প্রাণীর। সেখানে হাঙ্গর থেকে শুরু করে আছে অনেক রকমের মাছ। স্টিং রে মাছগুলোর চোখ এবং মুখ শরীরের নিচের দিকে। হঠাৎ চোখ পড়লে মনেহবে কোন মানুষ আপনার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। আমাদের হেটে যাওয়ার সময় ডুবুরিরা এই মাছগুলোর মুখে খাবার হিসেবে ছোট ছোট মাছ গুঁজে দিচ্ছিলো। সেটা ছিলো একটা মজার অভিজ্ঞতা।

এই জায়গাগুলোতে একটু সময় নিয়ে হাটলে অনেক কিছু দেখতে পাওয়া যায়। এরমধ্যেই একপাশে দেখলাম সাগর দৈত্যের মুখের আদলে একটা বিশাল মুখের মূর্তি। হঠাৎ দেখলে ভয় পেয়ে যেতে পারেন। আরো আছে একটা বিশাল কচ্ছপের মূর্তি। আর আছে থ্রি ডি মুভি এক্সপেরিয়েন্সের চেয়ার। এক জায়গায় দুজন করে বসা যায়। এটাও ছোট বড় সবার জন্য খুবই আকর্ষণীয়। আমাদের মেয়ে তাহিয়া মুভি শেষ করে এসে বললঃ একদম শেষে এসে না কি তাদেরকে হাঙ্গরে খেয়ে ফেলে। আমি বললামঃ বা কি চমৎকার গা ছমছম করা অনুভূতি। একেবারে শেষে আছে সমুদ্রের ঢেউয়ের আদলে তৈরী তৈরি একটা দেয়াল। সেখানে যেয়ে বাচ্চারা দৌড়ে দৌড়ে দেয়াল বেয়ে ওঠার চেষ্টা করছিলো। এভাবেই আমাদের সময়গুলো কেটে গেলো। বের হওয়ার মুখে আছে বিশাল স্যুভেনির শপ সেখান থেকে আপনি স্যুভেনির কিনতে পারেন। আর সবার শেষে আছে ক্যাফে এবং প্রসাধন কক্ষ। ঘুরে ঘুরে ক্ষুধা লাগলে এখান থেকে খেয়ে নিতে পারেন।

সাগরের তলের কতকিছুই আমাদের অজানা। আমরা ভিডিও বা ছবিতে যতটুকু দেখি তার চেয়ে সামনা সামনি দেখার অভিজ্ঞতা অনেকগুন বেশি আনন্দের। প্রাণীগুলোর নড়াচড়া, খাওয়ার মতো বিষয়গুলো দেখা এক জীবনের অন্যতম অর্জন। আর বাচ্চাদের সামনে খুলে যায় একটা বিশাল পৃথিবীর দরোজা। আমাদের পরিকল্পনা আছে আমরা সুযোগ পেলেই আবারও সি লাইফে বেড়াতে যাবো। প্রাণীগুলোর বাইরে ভেতরের সাগরের পরিবেশটাও আপনার নাগরিক ক্লান্ত মনকে কিছুটা হলেও শান্ত করবে নিশ্চিত। তাই আর দেরি কেন যান্ত্রিক জীবনে হাফিয়ে উঠলে এক্ষুণি ঘুরে আসতে পারেন সিডনির সি লাইফ থেকে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)