চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সরকারী ঘোষণায় যেসব সেবা ও প্রতিষ্ঠান ছুটির আওতামুক্ত

দেশে বৈশ্বিক মহামারী করোনার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে ইতোমধ্যে ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। তবে সরকারি-বেসরকারি প্রায় সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করলেও জনসাধারণের সুবিধার্থে কাঁচাবাজার, ফার্মেসি, হাসপাতাল, মুদি দোকান, মোবাইল ও ইন্টারনেট পরিষেবাসহ জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান খোলা রয়েছে। এছাড়া সীমিত আকারে চলছে ব্যাংকিং কার্যক্রমও।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা ২৪ হাজার ছাড়িয়েছে। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৯৪২ জন। এখন পর্যন্ত করোনায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রে। এর আগ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ছিল চীনে।

বিজ্ঞাপন

দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮ জনে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে ২৭জন, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১১ জন, প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে আছেন ৪৮ জন, হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন ২৩ হাজার, আইসোলেশনে আছেন ৪৭ জন এবং মারা গেছেন ৫ জন।

অহেতুক ভিড় এড়াতে উদ্বুদ্ধ করছে নিরাপত্তা বাহিনী
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, অহেতুক যেন জনসমাগম না হয় সে সম্পর্কে আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী তারা জনগণকে উদ্বুদ্ধ করছেন। জনগণকে বলছেন তারা যেন এই নির্দেশনা মেনে চলেন।

তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সচেতন রয়েছে। তারা জনগণকে উদ্বুদ্ধ করছেন এবং যাতে করে কোনো চুরি-ডাকাতি না হয়। সেজন্য তারা চোখ কান খোলা রেখে কাজ করছেন। আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি মনিটরিং সেল ২৪ ঘণ্টা খোলা রয়েছে। কোথায় কী হচ্ছে আমরা সব খোঁজখবর রাখছি এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছি।

চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সমন্বয় সেল
জরুরি পরিষেবা হিসেবে রাজধানীসহ সারা দেশে করোনা ভইরাস সংক্রমণ রোধে বিভিন্ন হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকদের নিরাপত্তা ও কর্মক্ষেত্রে তাদের সর্বোচ্চ সম্ভব পরিবেশ নিশ্চিত করতে দেশের ৮ বিভাগে একটি সমন্বয় সেল গঠন করেছে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ)।

যেকোন সংকট সমাধানে সমন্বয় সেলের প্রধানদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য চিকিৎসকদের আহ্বান জানিয়েছেন স্বাচিপ সভাপতি অধ্যাপক ডাক্তার এম ইকবাল আর্সলান ও মহাসচিব অধ্যাপক ডাক্তার এম এ আজিজ।

ক্রেতাশূন্য বাজার, পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে
জরুরি পরিষেবার অংশ হিসেবে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কমলেও রাজধানীর বেশিরভাগ বাজার ক্রেতাশূন্য দেখা গেছে। করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে রাজধানীবাসী প্রয়োজন ছাড়া কেউ তেমন বাইরে বের হচ্ছে না। ফলে রাজধানী এখন অনেকটাই জনশূন্য। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের পসরা সাজিয়ে অনেক বিক্রেতা বসে থাকলেও ক্রেতার দেখা মেলা ভার। ফলে দাম কমেছে অনেকটাই।

বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, নিত্য প্রয়োজনীয় কোনো পণ্যের ঘাটতি নেই। বাজার খোলা আছে এবং সব ধরনের পণ্যের সরবরাহ আছে। করোনাভাইরাসের কারণে মানুষকে ঘরে থাকতে বলা হয়েছে। সেই কারণে হয়তো প্রয়োজন ছাড়া মানুষ বাজারে আসছে না।

জনসাধারণের সুবিধার জন্য অনেক রেস্টুরেন্ট ও খাবার হোটেল বন্ধ রেখেও নিজস্ব ডেলিভারিম্যান দিয়ে খাবার ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছে। অনেক সুপারশপ অনলাইনে অর্ডার নিয়ে ঘরে ঘরে মুদিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ডেলিভারি করছে।

বিভিন্ন অনলাইন গ্রোসারি শপিংয়ের ওয়েবসাইটের প্রতিনিধিরা চ্যানেল আই অনলাইনকে জানান, তারা সর্বোচ্চ ১-৪ ঘণ্টার মধ্যে যেকোনে পণ্য ক্রেতার ঘরে পৌঁছে দেন। ডেলিভারিম্যান পণ্য পৌঁছানোর পর নগদে টাকা সংগ্রহ করছে।

দেশের জেলা প্রশাসকদের দেয়া এক চিঠিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় করোনাভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণ রোধে সরকার ঘোষিত ছুটির মধ্যে পোল্ট্রি, ডিম, দুধ, মুরগির একদিনের বাচ্চার উৎপাদন, সরবরাহ ও পরিবহন স্বাভাবিক রাখার নির্দেশ দিয়েছে।

ফার্মেসিতে ক্রেতাদের ৩ ফুট দূরত্ব নিশ্চিতে গোল চিহ্ন
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার ফার্মেসিতে ক্রেতাদের ৩ ফুট দূরত্ব নিশ্চিতে গোল চিহ্ন দেখা গেছে। রাজধানী গুলশানে আল মদিনা ফার্মেসির সামনে এমন গোল চিহ্ন দেখা যায়। এছাড়াও সিলেটের হবিগঞ্জ শহরের বাণিজ্যিক এলাকার প্রায় ১০টি ফার্মেসির সামনে জেলা প্রশাসক কামরুল ইসলামের নির্দেশে গোল চিহ্ন করা হয়।

বিজ্ঞাপন

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি ফার্মেসির কর্মকর্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে জানান, জরুরী পরিষেবার অংশ হিসেবে ফার্মেসি খোলা রাখা হয়েছে। ক্রেতারাও ওষুধ কেনাকাটা করতে আসছে। তবে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার জন্য দোকানে ভিড় না করে ক্রেতা নিদিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে কেনাকাটা করছেন।   

জীবাণুনাশক ছিটাচ্ছে পুলিশ
২৫ মার্চ থেকে রাজধানীবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ও করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে প্রতিদিন ডিএমপির ৮টি ওয়াটার ক্যানন ৮ ক্রাইম বিভাগের (রমনা, তেজগাঁও, লালবাগ, ওয়ারী, মিরপুর, গুলশান, উত্তরা ও মতিঝিল) বিভিন্ন স্থানে প্রথম পালায় সকাল ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত জীবাণুনাশক ঔষধ ছিটাচ্ছে পুলিশ। দ্বিতীয় পালায় বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত জীবাণুনাশক ঔষধ ছিটানো হচ্ছে।

এছাড়াও সংক্রমিত করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত থাকতে রাস্তায় নেমে বিশেষজ্ঞ কর্তৃক ন্যনূতম দূরত্ব বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। নিম্ন আয়ের মানুষদের দৈনিক রোজগার বন্ধ থাকায় তাদের চাল, ডাল, আলু, তেল, সাবান ও পেঁয়াজ দিয়ে সহযোগিতা করছেন পুলিশ সদস্যরা।

করোনা সচেতনতার অংশ হিসেবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক দক্ষিণ বিভাগ জনসাধারণের কল্যানার্থে গুলিস্থানে একটি বেসিন স্থাপন করেছে। ফুলবাড়িয়া ট্রাফিক বক্সে পর্যাপ্ত পানি, সাবান, হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ এই বেসিন জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।

ব্যাংক খোলা থাকবে সকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত
করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সীমিত আকারে ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু রাখার নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন সময় অনুযায়ী সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত নগদ জমা ও উত্তোলন করা যাবে। লেনদেন পরবর্তী আনুষঙ্গিক কার্যক্রম শেষ করার জন্য ব্যাংক খোলা থাকবে বেলা দেড়টা পর্যন্ত।

আইএফআইসি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমরা গ্রাহকদের অনলাইন ব্যাংকিংয়ের সুবিধা দিচ্ছি। এছাড়াও যেকোন ব্যাংকের বুথ থেকে কার্ড দিয়ে টাকা উত্তোলনের বাড়তি চার্জ বাতিল করা হয়েছে।

প্রথমবারের মতো পরিষেবায় টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট
প্রথমবারের মতো সরকারিভাবে টেলিযোগাযোগ এবং ইন্টারনেটকে জরুরি পরিষেবা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সরকার ঘোষিত দশ দিনের সাধারণ ছুটির মধ্যে প্রায় সব সেবা সীমিত করা হলেও বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, ফায়ার সার্ভিস এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের সঙ্গে টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেটকে এর বাইরে রাখার কথা বলা হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপনে।

টেলিযোগাযোগ সংশ্লিষ্টরা চ্যানেল আই অনলাইনকে জানিয়েছেন, এখন যেহেতু দেশ একটি ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সে কারণেই এই ঘোষণা, তাদের সকল অঞ্চল ও বিভাগের কর্মকর্তাদেরকে ইতোমধ্যে জরুরি সেবা প্রদানে বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

গ্রামীণফোন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের কর্মীদের এই ছুটি দেয়া হয়নি। কর্মীরা হোম অফিস করছেন। জরুরি ক্ষেত্রে তারা প্রয়োজনীয় স্থানে গিয়ে সেবা দেবেন। রবিও তাদের কর্মীদের প্রস্তুত রেখেছে।

গত বুধবার শিল্প মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ কর্তৃক ২৪ মার্চ প্রদত্ত প্রেস বিজ্ঞপ্তির ৪ নম্বর নির্দেশনা অনুসারে করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকার কর্তৃক ঘোষিত সাধারণ ছুটি চলাকালে ওষুধ/খাদ্য প্রস্তুত, ক্রয়-বিক্রয়সহ অন্যান্য শিল্প কারখানা/প্রতিষ্ঠান/বাজার/দোকানপাট নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চলবে।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন জানিয়েছে, ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত বিপণিবিতান বা শপিং মল বন্ধ থাকবে। তবে এ সময় কাঁচাবাজার, মুদি দোকান, ওষুধের দোকার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকানগুলো ছাড়া সব বন্ধ থাকবে। অর্থাৎ এ সময়ে শপিং মল, দোকানপাট, রাস্তার পাশের চা দোকান, সেলুন, হোটেল-রেস্তোরাঁ ইত্যাদি বন্ধ থাকবে।

পরিবহনের ক্ষেত্রে ওষুধ, জ্বালানিসহ প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান সড়কে চলবে।

গতকাল ২৬ মার্চ থেকে আগামী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। তবে এর মধ্য ২৯ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ছুটি। এর আগে ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের ও পরে ২৭ ও ২৮ মার্চের সাপ্তাহিক ছুটিও যোগ হবে। এছাড়া ৩ ও ৪ এপ্রিল সাপ্তাহিক ছুটি এ ছুটির সঙ্গে যোগ হবে।