চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রাজনীতি, সংসদ ও হিরো আলম প্রবণতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ যেদিন ‘রাজনীতি এখন গরিবের ভাউজ (ভাবী)’ বলে মন্তব্য করলেন, তার এক মাস পরেই গণমাধ্যমের সংবাদ শিরোনাম: ‘এমপি হতে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করলেন হিরো আলম’। বগুড়া-৪ আসনে নির্বাচন করতে তিনি মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন। দলের কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের সঙ্গে মনোনয়ন ফরম হাতে তার হাস্যোজ্জ্বল ছবিও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

হিরো আলম কে—এখানে সেই পরিচয় দেয়ার নিশ্চয়ই প্রয়োজন নেই। কারণ হিরো আলম কেবল একজন ব্যক্তি বা একটি নাম নয়; হিরো আলম এখানে একটি প্রবণতা। হিরো আলম একটি উদাহরণমাত্র। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে হিরো আলমদের উত্থান এবং তাদের এমপি-মন্ত্রী হওয়া নতুন কিছু নয়।

আপনি আপনার এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখুন, যাদের ওই অর্থে কোনো পারিবারিক পরিচয় নেই, লেখাপড়া নেই, সাংস্কৃতিক মান তলানিতে, যাদের সাথে হয়তো পারতপক্ষে আপনার কথা বলার রুচি হয় না—তাদের পোস্টারে দেয়াল ছেয়ে আছে; হয় ঈদের শুভেচ্ছায়, নয়তো ভোট ও দোয়া চেয়ে। এইসব পোস্টারে তাদের নিজেদের ছবির পাশাপাশি শোভা পায় জাতীয় নেতাদের এমনকি খোদ জাতির পিতার ছবিও এবং এই লোকেরাই একসময় আপনার পৌরসভায়, উপজেলায়, সংসদীয় আসনে জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। একসময় যার চাল-চুলো বলতে কিছুই ছিল না, দশকের ব্যবধানে সেই লোককেই হয়তো আপনি দেখছেন ফুরফুরে পাঞ্জাবি গায়ে, দামি গাড়িতে চড়ে গরিব মানুষের মাঝে পয়সা বিলাচ্ছেন। খুবই জনদরদি, গরিবের বন্ধু।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, সংবিধান তো কেবল মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত এবং পাগল ছাড়া যেকাউকেই (২৫ বছর হলেই) জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার কিংবা নির্বাচন করার অধিকার দিয়েছে; সেখানে শিক্ষা-দিক্ষারও কোনো শর্ত নেই; এমনকি আইনপ্রণেতা হওয়ার জন্যও ন্যূনতম শিক্ষিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, সেখানে হিরো আলমরা এমপি হলে ক্ষতি কী? তাছাড়া জনগণই তো তাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করছে।

বাস্তবতা হলো, রাজনীতিই এখন সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা। এখানে বিনিয়োগ মানেই মুনাফা নিশ্চিত। ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে থাকলে লাভটা নগদ। আবার বিরোধী শিবিরে থাকলেও ভবিষ্যতে যখন দল ক্ষমতায় যাবে, তখন সুদে-আসলে সব তুলে নেয়া যায়। একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক সম্প্রতি একটি হিসাব দিয়ে বলেছেন, পাঁচ বছরে প্রতিটি সংসদীয় আসনে গড়ে এক হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয়। আর সব কাজেই সংশ্লিষ্ট এমপির কমিশন হিসেবে গড়ে ১০ শতাংশ টাকা ধরা থাকে। ফলে যিনি সবচেয়ে সৎ এবং নির্লোভ, তিনিও এক হাজার কোটি টাকার ১০ শতাংশ হিসেবে ৫ বছরে একশো কোটি টাকার মালিক হন (দুয়েকজন একেবারেই ব্যতিক্রম থাকতে পারেন)। এর বাইরে এমপি হিসেবে সম্মানি, ন্যাম ফ্ল্যাট, শুল্কমুক্ত গাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনের তরফে বৈধ-অবৈধ সুবিধা মিলিয়ে আরও প্রচুর অর্থ। সুতরাং এমপি হতে কে না চায়? শুধু একজন হিরো আলমকে দায়ী করে লাভ নেই।

Advertisement

সুইডেনের স্থানীয় সরকারের একজন প্রতিনিধির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। পেশায় তিনি একজন ব্যবসায়ী। স্থানীয় কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং এটিকে তিনি নিতান্ত সেবা হিসেবেই গ্রহণ করেছেন। সুইডেনে এমনিতেই নাগরিকদের সুবিধার অন্ত নেই। কিন্তু তারপরও অল্প-বিস্তর যেসব সমস্যার মুখোমুখি নাগরিকরা হন, সেগুলো তড়িৎ সমাধান করেন জনপ্রতিনিধিরা। ওই জনপ্রতিনিধি জানান, তিনি সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা এই জনপ্রতিনিধিত্বের কাজে ব্যয় করেন। বাকি পুরো সময় নিজের ব্যবসায় সময় দেন। ফলে তিনি স্থানীয় সরকার থেকে ওই ২০ ঘণ্টার হিসেবে সম্মানি গ্রহণ করেন। এটা তার পার্টটাইম জব। কিন্তু আমাদের দেশের জনপ্রতিনিধিরা গোটা বিশেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক হওয়া এবং বছরের অধিকাংশ সময় ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত থাকার পরও, সংসদ বা তিনি যে প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি সেখান থেকে কড়ায় গণ্ডায় পুরো সম্মানি ও অন্যান্য সুবিধা বুঝে নেন। শুধু তাই নয়, নিজেদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর জন্য নিয়মিত আইন সংশোধনও করেন। অর্থাৎ একদিকে এমপি হয়ে নিজেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যেমন সুরক্ষিত রাখছেন, তেমনি এমপি হিসেবেও রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করছেন। সরকারি-বেসরকারি বহুবিধ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। সেসব জায়গা থেকেও বৈধ-অবৈধ নানা উপায়ে কামাচ্ছেন। ‍সুতরাং হিরো আলমরা সংসদ সদস্য হবার জন্য মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করলে তাতে আমাদের বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।

নিতান্ত জনগণের সেবার ব্রত নিয়ে রাজনীতি যারা করেন, তাদের পক্ষে এখন দলের মনোনয়ন পাওয়া খুব কঠিন। একটা সময় পর্যন্ত স্থানীয় সরকারপ্রতিষ্ঠানে স্থানীয় পর্যায়ের গণ্যমান্য ব্যক্তি যেমন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হতে পারতেন। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো দলীয় প্রতীকে করার পর থেকে সেই সুযোগটুকুও তিরোহিত হয়েছে। এখন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়ার জন্যও যে ধরণের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি এবং পয়সার খেলা খেলতে হয়, সেই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় কোনো সুস্থ মানুষের অংশ নেয়ার রুচি থাকার কথা নয়। এবং ধীরে ধীরে স্থানীয় সরকারপ্রতিষ্ঠানগুলোও শিক্ষিত-সজ্জন ও ভালো মানুষের কাছ থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। জাতীয় সংসদের কথা বলাই বাহুল্য।

প্রশ্ন হলো, রাজনীতি কারা করবেন এবং কারা জনপ্রতিনিধি হবেন? একজন রিকশাচালক, মুচি, জেলে, দোকানদার থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী—সবারই রাজনীতি করার অধিকার আছে এবং ভোটাররা যদি চায় তাহলে তার জনপ্রতিনিধি হওয়ারও অধিকার রয়েছে। কিন্তু আমাদের রাজনীতি কি সেই জায়গায় আছে? নামসর্বস্ব এবং অলঙ্কারস্বরূপ সংসদে নারীদের জন্য ৫০টি আসনে সংরক্ষিত থাকলেও সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, দলিতসহ সমাজের প্রান্তিক মানুষের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। বরং যার পয়সা আছে, পেশীশক্তি আছে, বড় নেতার সঙ্গে লাইন আছে, তিনিই মনোনয়ন পাবেন এবং তিনি যদি একজন কলাগাছও হন এবং যদি তার মার্কায় ধার থাকে, তাহলে ‘ভোট টু বানান ট্রি’র থিওরি অনুযায়ী তিনি অনায়াসে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিতও হয়ে যাবেন—তাতে আইন কোনো বাধা নয়।

রাজনীতি ক্রমশই রাজনীতিবিদদের হাত থেকে ফসকে ব্যবসায়ী এবং তারকাদের দখলে চলে যাচ্ছে। সেই তারকা খুব ইতিবাচক অর্থে যেমন, তেমনি নেতিবাচক অর্থেও। ভবিষ্যতে সেফুদার মতো চরম অশ্লীল ও বিতর্কিত লোকেরাও বড় রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন নেবেন এবং যেহেতু নির্বাচন মূলত প্রতীকের খেলা—ফলে দেখা যাবে সেই লোকগুলো মার্কা আর পয়সার জোরে স্থানীয় সরকার তো বটেই, জাতীয় সংসদে গিয়েও ‘মাননীয় স্পিকার’ বলে দাঁড়িয়ে যাবেন। সংবিধান, সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি, পয়েন্ট অব অর্ডার, বিল, সংশোধনী ইত্যাদি বিষয়ে ন্যূনতম ধারণা থাকুক বা না থাকুক, তিনি এলাকার জনদরদি প্রতিনিধি হিসেবে রাস্তাঘাট, সেতু ও ভবন নির্মাণের মাধ্যমে একদিকে জনতুষ্টি অর্জন করবেন, এবং নিতান্ত ভদ্রলোক হলেও ১০ শতাংশ হারে কমিশন পেয়ে পরবর্তী আরও দু তিনটি নির্বাচনের তহবিল গড়ে তুলবেন।

রাজনীতিতে এই যে এক ভয়াবহ প্রবণতা শুরু হয়েছে, ২০ বছর পরে এটি কোথায় গিয়ে ঠেকবে এবং তখন দেশের রাজনীতি, সংসদ এবং স্থানীয় সরকারপ্রতিষ্ঠানগুলোর কী দশা হবে—তা চোখ বন্ধ করলে কিছুটা দেখা যায়।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)