চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ কি একমাত্র সমাধান?

Nagod
Bkash July

শিক্ষামন্ত্রীর সমালোচনা এবং প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনে লেখার পর যে সারা পেয়েছি, তাতে আমি বিস্মিত। সেখানে শিক্ষামন্ত্রীর সমালোচনা যেমন ছিল তেমনি কিছু প্রশ্ন আমাকে দাঁড় করিয়েছে নতুন প্রশ্নের সামনে। অনেকেই জানতে চেয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী কি ভাল কিছুই করেননি? আর প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে কোন সমাধানের পথ না দেখিয়ে ঢালাও সমালোচনা কতটা যৌক্তিক? গণমাধ্যমে প্রকাশিত লেখা কিছু দায়বদ্ধতা সৃষ্টি করে, লেখক-প্রকাশক দু’জনের জন্যই। যেহেতু প্রশ্নে যুক্তি আছে, আমি শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিয়ে ‘খলিফা লোক’ না হয়েও পেশাসূত্রে কিছু অভিজ্ঞতা থেকে জবাব দেয়ার এ চেষ্টা।

Reneta June

সারাদেশে চলমান এসএসসি পরীক্ষাকে সামনে রেখে এখনও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁস। আর অতি মাত্রায় রাজনীতি সচেতন এই জাতির অবসর বিনোদন চর্চার প্রধান মাধ্যম যখন রাজনীতি, তখন সব আলোচনাই শেষ হয় এভাবে- যত দোষ মন্ত্রী ব্যাটাই নন্দ ঘোষ! অতএব জ্বালো, জ্বালো …এর গদিতে আগুন জ্বালো এক সাথে, আর নয়ত অমুকের পদত্যাগ চাই। এবারও তাই হয়েছে।

জাতীয় সংসদ থেকে থেকে শুরু করে সেন্ট মার্টিনের হাওয়া উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে। পণ্ডিত, পথিক থেকে পথকলি পর্যন্ত তাদের জ্ঞানগর্ভ বিশ্লেষণ শেষে উপসংহার টানছেন এই বলে যে, সমাধান একটাই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ! অধ্যপক, ডক্টরেট থেকে আমার মতো ম্যাংগোপিপল কলমের আঁচড়ে জাতির ভয়াবহ আগামীর ছবি এঁকে সমাপ্তি টানছি এভাবে- জাতির ভবিষ্যৎ এর স্বার্থে শিক্ষামন্ত্রীর সরে যাওয়ার কোন বিকল্প নেই! সমালোচনা এখন এসে দাঁড়িয়েছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক, ব্যক্তি নুরুল ইসলাম নাহিদ (শিক্ষামন্ত্রী) এর পদত্যাগেই সমাধান নিহিত।

সমালোচনা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হওয়ার পিছনে যে কারণ নেই তাও নয়। প্রথম কারণটি হতে পারে জনাব নাহিদের কাছে প্রত্যাশা সব সময়েই একটু বেশি যেহেতু তার দাবিমতে তিনি সৎ। দ্বিতীয় কারণটি বলা যায়, প্রশ্নফাঁস রোধে বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিক ব্যর্থতা। এর বাইরে তার নিজের এবং মন্ত্রণালয়ের বড় কর্তাদের বেসামাল কথার্বাতাও জনাব নাহিদকে নিয়ে এসেছে ক্ষোভের কেন্দ্রে। হাস্যকর ব্যাপার হলো, নাহিদ সাহেব বিন্দুমাত্র সম্পর্কিত নন এমন সব দায়ও তাকে বইতে হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা, পিএসসি, বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, পিয়ন থেকে পুলিশের চাকরির পরীক্ষা, ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষা যার ওপর কার্যত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোন নিয়ন্ত্রণ বা সংশ্লিষ্টতা নেই সে পরীক্ষাগুলোর প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেও আঙ্গুল ওঠে শিক্ষামন্ত্রীর দিকে। হাস্যকর হলেও সত্য যে আমার মতো কলমজীবী থেকে বহু বিদ্বান বুদ্ধিজীবী, আমজনতা নির্দ্বিধায় বলে ফেলি পাবলিক পরীক্ষা থেকে শুরু করে চাকরির সব পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে অতএব শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চাই!  ব্যাংকের চাকরি পরীক্ষার সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীর কি সম্পর্ক তা আমার জানা ছিল না।

জানার চেষ্টা করতে গিয়ে যে জ্ঞান লাভ করেছি তা পেলে স্বয়ং সক্রেটিসও পুলকিত হতেন। সমীকরণটি অতি সহজ যেহেতু প্রশ্ন মানেই পড়াশোনা সংক্রান্ত বিষয় আর পড়াশোনার মা-বাপ হলো শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাই প্রশ্ন ফাঁস মানেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় তথা শিক্ষামন্ত্রীর দোষ! এই যখন অবস্থা তখন শিক্ষামন্ত্রীর অবস্থা সহজেই অনুমেয়! দেশের সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত একটি মন্ত্রণালয়কে জনাব নাহিদ গত নয় বছর ধরে যেভাবে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন তা বিবেচ্য নয়। তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে শিক্ষার বিস্তারের তথ্য হাতের নাগালে থাকলেও তাতে কিছু যায় আসে না! শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি, জাতীয়করণ এমন অনেক উদাহরণের কোনটিই জনাব নাহিদের পক্ষে যায় না, কারণ তিনি বোর্ডসহ অন্যান্য পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস রোধে ব্যর্থ। এর কারণও আছে, কোন একটি উপজেলায় স্কুল নির্মাণে অনিয়ম বা একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে বৈষম্যের প্রভাব স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে। অন্যদিকে এসএসসি বা এইচএসসির পরীক্ষাগুলোতে কোন অনিয়মের প্রভাব পরে সারা দেশজুড়ে। ছাত্রছাত্রীদের ভবিষৎকে তা প্রভাবিত করে সরাসরি, এ কারণেই জনাব নাহিদের শিক্ষামন্ত্রী হিসেব সব সাফল্যকে ছাপিয়ে প্রশ্ন ফাঁস রোধে তার ব্যর্থতাটি বড় হয়ে ওঠেছে। এমনকি মন্ত্রী হিসেবে তার দায়িত্ব গ্রহণের বহু পূর্বেই পচে যাওয়া, দুনীতিগ্রস্ত একটি মন্ত্রণালয়কে ন’বছর একটানা নেতৃত্ব দেয়ার পরও পরিচ্ছন্ন, সৎ, ইমেজ তার সজ্জন ভাবমূর্তি কোন কিছুই তার পদত্যাগের দাবিকে ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি।

জনাব নাহিদকে কাজ করতে হয়েছে এমন এক মন্ত্রণালয়ে, যেখানে কর্মচারী, কর্মকর্তাদের নিয়ে যার ইট-কাঠ পর্যন্ত দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। এদের নিয়েই তাকে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, ছাপা, বিতরণের, পরীক্ষা গ্রহণের মত একটি জটিল কাজ করতে হয়েছে। এর যেকোন পর্যায়ে সামান্য একটি ছিদ্র ডেকে আনতে পারে বিপর্যয়। শুধু মন্ত্রণালয় নয় স্কুল পর্যায়ে বিতরণকৃত প্রশ্ন ফাঁসের জন্য প্রশ্ন দেখা ও বিতরণের সঙ্গে জড়িত অথচ নৈতিকভাবে অধঃপতিত একজন শিক্ষকই যথেষ্ট।

নৈতিক অধঃপতনের বাইরে স্রেফ রাজনৈতিক মতবিরোধ থেকেও সংশ্লিষ্ট কেউ সরকারকে বিপাকে ফেলার জন্য এমনটা করতে পারেন। হাতের কাছে রয়েছে সহজ প্রযুক্তি। কেবল একটি ক্লিকে ছবি তুলে তা ইন্টারনেটের মাধ্যমে নির্দিষ্ট গন্তব্যে প্রেরণ হতে পারে প্রশ্ন ফাঁসের সহজ পথ। বলাই বাহুল্য এই প্রযুক্তির দূরত্ব মোকাবিলায় শিক্ষামন্ত্রী স্রেফ ঢাল তলোয়ারবিহীন নিধিরাম সর্দার অর্থাৎ তার হাতে কিছুই নেই (এই না থাকা বা থাকার ব্যবস্থা গ্রহণে অপারগতা কার দায়!। শুধু তাই নয় তার মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক আমলাদেরও এই প্রযুক্তি মোকাবিলায় সামান্য ধারণা আছে বলে মনে হয় না।

এতক্ষণ যা বললাম তা কেবল মোটাদাগের চিত্র, ভেতরের জটিলতার গভীরতা অনেক বেশি গভীর, জল অনেক বেশি ঘোলা বা আমলারা ইচ্ছাকৃত ঘোলা করে রেখেছেন। এই যখন অবস্থা তখন একা একজন শিক্ষামন্ত্রী বা ব্যক্তি নুরুল ইসলাম নাহিদ একা কী করতে পারেন? অথবা তার জায়গায় অন্য কেউ? তার মানে এই নয় যে পিইসি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে গৃহীত কোন পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের দায় জনাব নাহিদ এড়াতে পারেন। বিষয়টি এক-দু’বার হলে হয়ত তার সে সুযোগ ছিল কিন্তু গত সাত বছরের ধারাবাহিক প্রশ্ন ফাঁসের দায় এড়ানোর বা প্রশ্ন ফাঁস রোধে ব্যর্থতার দায় অস্বীকারের কোন সুযোগ তার নেই।

দায়ী যে বা যারাই হোক মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসেবে নৈতিক দায় তাকেই বহন করতে হবে। বিষয়টির কার্যকর সমাধানের জন্য হলেও দায় স্বীকার করেই পথ খুঁজতে হবে। ভুলগুলো চিহ্নিত করতে হবে। এই ভুলগুলো চিহ্নিত করতে যেয়ে তাকে মাথায় রাখতে হবে দীর্ঘদিন ধরে তাকে ঘিরে থাকা কতিপয় আমলাদের দ্বারা সেটি সম্ভব নয়। ঘড়ি যখন কিছুতেই সঠিক সময় দেয় না তখন ঘড়ি বদলে ফেলাই শ্রেয়। এখানে রাগ অনুরাগের কোন স্থান নেই, বিষয়টির সঙ্গে জড়িত জাতির ভবিষ্যতের প্রশ্ন। মুখে ডেসাপারেট, এগ্রেসিভ বলে লাভ নেই কাজে কঠোর হোন। মনে রাখবেন বহু রাজনীতিবিদের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে আমলারা বহাল তবিয়তে থেকেছে, এখনও হয়তো রয়েছে। আপনার আমলা নির্ভরতার গল্প বাতাসে ভাসে। আপনাকে যুক্তি দেখানো হতে পারে, ‘আমাদের বদলে যারা আসবে তারাও তো আমলা, পরিস্থিতির উন্নতি হবে তার গ্যারান্টি কী?’ বলুক, কান দিয়েন না, বরং এটা ভাবুন পরীক্ষিত ব্যর্থদের বাদ দিয়ে নতুনদের সুযোগ দিলে পরিস্থিতি-এর বেশি আর কী খারাপ হবে? যদি সুফল মিলে সেটা না হয় বোনাস ধরে নেবেন। এবারের এসএসসি পরীক্ষা শুরুর পূর্বে আপনি নিজেই বলেছিলেন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে এবার আপনি ডেসপারেট । আমলাদের বিষয়ে ডেসপারেট হোন।

মাননীয় মন্ত্রী, ভুল পথে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব নয় এবং আশার কথা এই যে কিছুটা হলেও আপনি নিজের ব্যর্থতা অনুভব করেছেন। এবারের পরীক্ষা শুরুর পূর্বে এবং পরীক্ষা চলাকালীন আপনি এবং অপনার মন্ত্রণালয়ের কতিপয় কর্মকর্তার আচরণ পরিস্থিতি কতটা জটিল করেছে সে চিত্রটি সামনে থাকলে আপনার পথচলা সহজ হবে বলে মনে করি। পরীক্ষাপূর্বক প্রেস কনফারেন্সে নিজেকে প্রশ্ন ফাঁস রোধে ডেসপারেট, এগ্রেসিভ বলে কঠিন পদক্ষেপের কথা বলছিলেন আমরা আশান্বিত হয়েছিলাম। কিন্তু আপনার পাশে বসা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব যখন মুখ খুললেন তৎক্ষণাৎ সব আশা বিশ বাঁও জলে। তার কণ্ঠে সেই পুরনো সুর, প্রশ্ন ফাঁস হলে, প্রমাণ পাওয়া গেলে সে পরীক্ষা বাতিল হবে। আমরা অপেক্ষায় ছিলাম ফাঁস রোধে মন্ত্রণালয় কী কী ব্যবস্থা নিয়েছে সচিব মহোদয় সে কথা জানাবেন।

আর তিনি কিনা বললেন, ফাঁস হলে কী করবেন! তাও আবার প্রমাণ পাওয়া গেলে! যে প্রমাণ তারা অতীতে কখনও খুঁজে পাননি! প্রশ্ন ফাঁস হলে পরীক্ষা বাতিল হবে এ কথা বলবার জন্য সচিব হতে হয় না। প্রশ্ন ফাঁস রোধে কোন কার্যকর ব্যবস্থা যদি সচিব মহোদয়ের জানা না থাকে তবে ২০ লাখ পরীক্ষার্থী ও তাদের পরিবারে আতঙ্ক না ছড়িয়ে নীরব থাকাই কাম্য ছিল না কি? এই প্রমাণ তো মন্ত্রী নিজে খুঁজবেন না, প্রমাণ খুঁজতে গঠিত হবে আমলা নিয়ন্ত্রিত বা তাদের দ্বারা গঠিত তদন্ত কমিটি। নেহায়েত নিরুপায় না হলে ১৮ কোটি বাঙালীও যদি কিরে কেটে সাক্ষ্য দেয় কমিটি প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণ পাবে না। আর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আমলাকুলের শিরোমণি সচিব মহোদয়ের বার্তার দুটো অর্থ হতে পারে, প্রমাণ পেলে পরীক্ষা বাতিল আর না পেলে ঘণ্টা! প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িতরা যদি প্রমাণ খোঁজার সঙ্গে জড়িত থাকে তাহলে তো সোনায় সোহাগা। কই সচিব মহোদয় তো একবারও বললেন না, যে বিষয়ের প্রশ্ন ফাঁস হবে প্রয়োজনে সে প্রশ্ন প্রণয়ন থেকে বিতরণ পর্যায় পর্যন্ত প্রত্যেককে তদন্তের আওতায় আনা হবে। খুঁজে বের করা হবে দোষীদের। অথবা অন্তত এটা বলতে পারতেন পরীক্ষা গ্রহণ বা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িত ঊর্ধ্বতন পাঁচজনকে বিদায় নিতে হবে। বিদায় বলতে চাকরি যাওয়া নয় তারা নির্দেশও হতে পারেন তাই ব্যর্থতার দায় নিয়ে তাদের কোন সমমর্যাদার নিষ্ক্রিয় পদে বা ওএসডি করা হবে। সচিব মহোদয় তা না করে হুমকিতে ফেললেন ২০ লাখ পরীক্ষার্থী ও তাদের পরিবারকে। পরীক্ষার্থী তো আর আমলা নয়! মাননীয় মন্ত্রী আপনি হঠাৎ করে ঘোষণা দিলেন সব কোচিং বন্ধ থাকবে পরীক্ষা শুরুর এক সপ্তাহ আগে থেকে পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত।

কোচিং সেন্টারতো একটা প্রতিষ্ঠান সে নিজে তো কিছু করে না। যদি প্রশ্ন ফাঁসে জড়িত থাকে তো সেটি থাকে এর পরিচালক বা শিক্ষকেরা। আপনার কি ধারণা কোচিং সেন্টার বন্ধ বিধায় প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ওদের কেউ সাধু, সন্ন্যাসী বনে যাবে? ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ কি খুব কঠিন এই সময়ে? বরং প্রথম থেকে নিউ টেন, একাদশ-দ্বাদশ ও এপ্রিলে অনুষ্ঠিতব্য এইচ.এস.সি পরীক্ষার্থী, ক্যারিয়ার বিষয়ক বা পি.এস.সি কোচিং করছিল তাদের কথা ভাবুন, তাদের প্রতিক্রিয়া ভাবুন। এই কোচিং সেন্টারগুলোতে শিক্ষকতা করে সারাদেশে অন্তত দশ হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী তাদের পড়ার ব্যয় নির্বাহ করত তাদের কথা কি বিবেচনায় ছিল? আপনি ফেসবুক বন্ধ রাখার কথা বলেছেন। উৎস থেকে প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ হলে তা ফেসবুকে আসার কোন কারণ নেই। আর ফেসবুকের বাইরে হাজারও অ্যাপ তো আছেই।

মাননীয় মন্ত্রী, আমরা বিশ্বাস করি আপনি যা বলেছেন তা সৎ উদ্দেশ্যে আন্তরিক হয়েই বলেছেন। কিন্তু বিষয়গুলোর সার্বিক প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় ছিল কী? কোচিং বন্ধ রেখে প্রশ্ন ফাঁস কি ঠেকানা গেছে? এও সত্যি সব কোচিং সেন্টার কর্তৃপক্ষ প্রশ্ন ফাঁসে জড়িত নয়। তারা কেন লোকসান গুনবেন? মুষ্টিমেয়ের অপরাধে সমষ্টিকে শাস্তি পেতে হবে এ কোন বিধান? জাতীয় স্বার্থে তাও মানা যেত যদি প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ হতো। তা যখন হয়নি তখন ভুল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সংশোধন করে কোচিংগুলো খুলে দিন।

ঢালাও ভাবে শিক্ষক, অভিভাবক, ফেসবুক, মোবাইল এদের দোষারোপ না করে সুনির্দিষ্ট সমস্যা চিহ্নিত করে কাজ করুন। আপনার মন্ত্রণালয়কে বলুন গত কয়েক বছর প্রশ্নফাঁসের যে অভিযোগগুলো এসেছে তা কিভাবে নিষ্পন্ন করা হয়েছে তা খতিয়ে দেখতে। প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত যারা গ্রেফতার হয়েছে তাদের কী শাস্তি হয়েছে অথবা বিচার কোন পর্যায়ে আছে তা দেখুন। তাদের আইনানুগ সাজার বিষয়টি নিশ্চিত করুন। মুেন রাখবেন একটি দৃষ্টান্ত শত হুঙ্কারের চাইতে কার্যকর। আর চোরে না শুনে ধর্মের কাহিনী।

মাননীয় মন্ত্রী, দোষারোপের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এই দেশে প্রশ্নফাঁস নিয়ে পরীক্ষা চলাকালীন আমলারা বললেন, এগুলো নির্বাচনী বছরে সরকারকে বিপাকে ফেলতে সরকার বিরোধীদের চক্রান্ত। আমলারা যখন ব্যর্থতা ঢাকতে রাজনৈতিক কার্ড খেলতে শুরু করেন তখন মনে প্রশ্ন জাগে। যারা এ ধরনের কথা বলছেন তাদের বলুন এই চক্রান্তে জড়িতদের খুঁজে বের করে গ্রেফতার করতে। সেটাই তো তাদের কাজ। ঘুষ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি বাস্তবতা। তাই সহনীয় মাত্রায় ঘুষ গ্রহণে আপনার দেয়া পরামর্শ হয়ত সেবা প্রার্থীদের কষ্ট কিঞ্চিত লাঘবে একটি মরিয়া চেষ্টা, তারপরও এটি প্রত্যাশিত নয়। প্রশ্ন ফাঁস রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হলে এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে আপনাকে। আবেগতাড়িত হয়ে কথা বলা বন্ধ করুন। শেষ বিচারে কোন আমলা নয় ইতিহাস আপনাকেই দায়ী করবে। কাজেই সামান্য সৎ পরামর্শ দেবার যোগ্যতা যারা রাখে না সে আমলাদের আপনি রাখবেন কিনা সে সিদ্ধান্ত আপনাকেই নিতে হবে।

এবার আসি প্রশ্ন ফাঁস রোধের বিষয়ে। একটি কথা খুব পরিস্কারভাবে বলছি, প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে যারা চায়ের কাপে ঝড় তোলেন, যেসব পণ্ডিত অধ্যাপক ডক্টরেট সাহেবরা বাক্য বানে মন্ত্রীকে ধোলাই করেন পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ে তাদেরও কোন স্বচ্ছ ধারণা নেই, আমি নিজেও সে দলে। তবে এ কথা বলার সময় এসেছে জনাব নাহিদের বা তার বদলে অন্য কারও পক্ষে এককভাবে প্রশ্ন ফাঁস রোধ সম্ভব নয়। এ জন্য চাই সমন্বিত উদ্যোগ। গতানুগতিক আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীলতা কোন সমাধান দেবে না। বরং এ বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে অভিজ্ঞদের সংশ্লিষ্ট করতে হবে। হতে পারেন তারা প্রশ্নপত্র প্রণয়ন থেকে বিতরণের সঙ্গে জড়িত মন্ত্রণালয়ের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী। আবার রথী মহারথী আমলাদের ভয়ে মুখ বন্ধ করে রাখা চাকরিরত নিন্মপদস্থ কর্মচারী। মন্ত্রী মহোদয় নিশ্চয়ই জানেন, বহু ডিগ্রীধারী ইঞ্জিনিয়ারের চেয়ে কর্মক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞ রাজমিস্ত্রির মতের মূল্য অনেক সময় বেশি হয়ে দাঁড়ায়। এখনও আমাদের এমন কিছু শিক্ষক আছেন যাদের সততা কিংবদন্তীতুল্য তাদের ডাকুন, কথা শুনুন। পেশাগত কারণেই গত কিছুদিন আমি নতুন প্রজন্মের এমন কিছু তরুণের সংস্পর্শে এসেছি যারা বিষয়টি নিয়ে ভাবছে এবং প্রশ্নফাঁস রোধে তাদের মডেল প্রস্তাবনাও উপস্থাপন করছে। এটি তারা করছে নিখাদ দেশপ্রেম থেকে তাদের কথা শোনা যেতেই পারে।

বহু দেশপ্রেমিক শিক্ষাবিদ আছেন যারা বিষয়টি নিয়ে ভাবেন তাদের কথাও শুনুন। মাননীয় মন্ত্রী, সমালোচনার মুখে আপনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগের ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন বলে সংবাদ মাধ্যমে জেনেছি। খেলার মাঝপথে পদত্যাগ কোন ভাল ক্যাপ্টেনের কাজ নয়, কাম্যও নয়। প্রধানমন্ত্রী আপনাকে কাজ চালিয়ে যেতে বলে কী ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন তা জানতে চেয়েছেন। আপনার উত্তর জেনে আপনাকে আমার প্রতিকূল স্রোতে একা এক যোদ্ধা মনে হয়েছে। আপনি বলেছেন বিটিআরসির সহযোগিতার অভাবের কথা। যেখানে আমরা সবাই জানি প্রশ্নফাঁস ও ছড়িয়ে পড়ার প্রধান মাধ্যম আজ ইন্টারনেট সেখানে আপনার সচিবের কাজ ছিল বিটিআরসির সহযোগিতা নিশ্চিত করা। সে লক্ষ্যে তিনি কী উদ্যোগ নিয়েছেন জানতে পারি? বিটিআরসি নিজের ওজনে নুয়ে পড়া এক প্রতিষ্ঠান সেখানে তাকে কয়েকটি চিঠি দিয়ে এমন একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সমাধানের জন্য বড় আমলার দরকার নেই। কেন একটি আলাদা সেল করা যায় না যা সত্যি কার্যকর? মন্ত্রণালয়ের বা বিটিআরসির অথর্ব আমলারা যদি দায়ীদের চিহ্নিত না করতে পারেন তো তরুণ প্রযুক্তিবিদদের ডাকুন। বিষয়টি অনেকটা হ্যাংকি প্রতিরোধে হ্যাকার নিয়োগের মতো। এ যুগে ইন্টারনেট কিছু চালাচালি করে লুকিয়ে থাকা কতটা সম্ভব? আরেকটি বিষয় বলেছেন প্রশাসনের কাম্য সহযোগিতা পাচ্ছেন না। প্রশাসনের কারা তা স্পষ্ট করে বলুন জাতির বৃহত্তর স্বার্থে মুখ বন্ধ রেখে তো লাভ নেই। পরীক্ষাপূর্বক কোচিং বন্ধে প্রশাসন আপ্রাণ চেষ্টা করেছে এ কথা দায়িত্ব নিয়ে বলছি।

সম্প্রতি একটি জরিপে উঠে এসেছে প্রশ্নফাঁস রোধে এ বিষয়ের সার্বিক দায়িত্ব সেনাবাহিনীকে দেয়া হোক। বারবার ব্যর্থ হওয়ার চেয়ে সে চেষ্টাতেও দোষের কিছু নেই। সেনাবাহিনী আমাদেরই সন্তান, জাতির প্রয়োজনে তারা আগেও এগিয়ে এসেছে। সেনাবাহিনীর ইন্টারনেট দক্ষতা, প্রযুক্তি সুবিধা অনেক এগিয়ে, প্রশাসনিক কাঠামো অনেক সংহত কাজেই বিষয়টি ভাবা যেতেই পারে। প্রয়োজনে সিভিল ও সেনাবাহিনী একযোগে কাজ করুক। লেখার পরিধি দীর্ঘ হবে বিধায় বিস্তৃত না বলে এটুকু বলি একযোগে কাজের মডেল আমরা উপস্থাপন করতে পারব বলে আশা রাখি যদি আপনি চান।

পরীক্ষার্থীদের আধ ঘণ্টা আগে হলে প্রবেশ একটি ভাল উদ্যোগ, তারপরও দেখছি হলে প্রবেশের ১৫/২০ মিঃ পূর্বে প্রশ্ন আসছে ইন্টারনেট। এক্ষেত্রে প্রশ্নপত্র খোলার দায়িত্বরত ব্যক্তিদের প্রতি অভিযোগের আঙ্গুল তাক করাই যায়। এটি প্রতিরোধে আপনি কি আমাদের নতুন প্রজন্মের উপর আস্থা রাখতে পারেন? নিয়ম করুন সীলগালা করা প্রশ্নপত্রের প্যাকেট প্রতিটি কেন্দ্রে উপস্থিত ৫ জন পরীক্ষার্থীর উপস্থিতিতে ৯-৩০ মিনিটে খুলতে হবে এবং সরকার নির্ধারিত ফর্মে তাদের নাম, রোল লিখে স্বাক্ষর নিতে হবে। প্রতিটি পরীক্ষায় নতুন করে ৫ জন এ কাজে অংশ নিবে। এতে করে ওদের দায়িত্ববোধও গড়ে উঠবে। যাদের জন্য পরীক্ষা তাদের কথা শুনুন। ওরাই ভাল জানে ইন্টারনেটে কোথায় প্রশ্ন পাওয়া যায় সেজন্য বিটিআরসি লাগে না। আর এই তরুণেরা এখনও অতটা পচে যায়নি। সমস্যা হচ্ছে প্রশ্ন পেয়ে তারা বিষয়টি জানাবে কোথায়?

জানালেও ব্যবস্থার নিশ্চয়তা কী? হয়রানির আশঙ্কাতো আছেই। এই পরীক্ষার্থীদের সাহায্য চান ওরা পথ দেখাবে। প্রতিটি জেলায় প্রশ্নপত্রের প্রতিটি প্রশ্নের শেষে জেলাভিত্তিক আলাদা চিহ্ন যোগ করুণ যাতে নেটে ফাঁস হলেও জেলাটি বোঝা যায়, এতে তদন্তের পরিধি কমে আসবে। আর অনেক কমিটির উদাহরণ আপনি বা আমলারা দেখালেও বিনয়ের সাথে বলি এসব পকেট কমিটি কম্মের নয় বাতিল করুণ। জানি সমাধানের এহেন পদ্ধতি শুনে আমলারা তেড়ে উঠবেন, আইন দেখাবেন।

আপনি তাদের প্রধানমন্ত্রীর সেই কথাটি মনে করিয়ে দিন; দেশ ও দশের স্বার্থে প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন করব। আর আমলারা যদি তাদের দোহাই অব্যাহত রাখেন তাদের কেবল এইটুকু বলার আছে ‘মশাই, পরিস্থিতি এর চেয়ে খারাপ আর কী হতে পারে! কাজেই চেষ্টা করতে দোষ কোথায়?’ বিষয়টি যখন জাতির ভবিষ্যৎ এর সাথে সম্পর্কিত এবং পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকেছে তখন সামনে এগিয়ে যাওয়ার বিকল্প নেই। এবং একজন নুরুল ইসলাম নাহিদের পদত্যাগও একমাত্র সমাধান নয়।

বিনয়ের সাথেই বলি সমস্যা সমাধানে যাত্রা শুরুর প্রথম পদক্ষেপ হতে হবে সমস্যা স্বীকার করে নেয়া। প্রশ্নফাঁস হচ্ছে এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে আপনার উচ্চারিত দুটি শব্দ ডেসপারেট ও এগ্রেসিভকে ভিত্তি করে আমরা শুরুটা করতে পারি, যে শুরুটা হবে সমন্বিত প্রচেষ্টায়। মাননীয় মন্ত্রী প্রথম যে কাজটি করতে পারেন সেটি হল এই সমন্বিত প্রচেষ্টার ক্ষেত্র প্রস্তুতে উদ্যোগ নিতে। আসুন সবাই মিলে চেষ্টা করি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

BSH
Bellow Post-Green View